ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুতে শীর্ষে পুরুষ
ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে সম্প্রতি ময়মনসিংহের স্বদেশ হাসপাতালে ভর্তি হন আল-আমিন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নিশ্চিত হয় তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। চিকিৎসকের পরামর্শে বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে আবারও তাকে স্বদেশ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে বুধবার বিকেলে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেদিন সন্ধ্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
শুধু আল-আমিনই নয়, চলতি বছরে ২৫ জুন পর্যন্ত সরকারি হিসেবে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কর্মক্ষেত্রে বা বাইরে বেশি সময় কাটানো, যার ফলে মশার সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা বাড়ে। এছাড়া, কিছু ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব বা চিকিৎসার জন্য দেরিতে হাসপাতালে যাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের শুরু থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ১৩ জনের মধ্যে ৬১.৫ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮.৫ শতাংশ নারী। অর্থাৎ মৃত্যুর হারেও পুরুষ এগিয়ে। একই সময়ে দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ৫ হাজার ৫১৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৬২.২ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭.৮ শতাংশ নারী। অর্থাৎ আক্রান্তের ক্ষেত্রেও পুরুষের আধিক্য স্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। কর্মক্ষেত্রে বা বাইরে পুরুষদের বেশি সময় কাটানো, ফলে এডিস মশার সংস্পর্শে বেশি আসা, সচেতনতার ঘাটতি এবং অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা নিতে দেরি করাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বশার বলেন, স্ত্রী এডিস মশা ডিম ধারণের সময় রক্তকে প্রধান খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এ সময় প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের বেশি কামড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। বিশেষ করে ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সী পুরুষদের বিপাকক্রিয়া তুলনামূলক দ্রুত হওয়ায় এবং তারা বেশি চলাফেরা করায় শরীরের তাপমাত্রা ও ঘাম বৃদ্ধি পায়। ফলে শরীর থেকে বেশি পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসৃত হয়, যা মশাকে আকৃষ্ট করে। এছাড়া অনেকেই জ্বরকে গুরুত্ব না দিয়ে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। এতে ডেঙ্গু জটিল রূপ নিতে পারে এবং মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।
অধ্যাপক কবিরুল বশার আরও বলেন, ডেঙ্গুর এই মৌসুমে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। জ্বর হলে তিন দিনের মধ্যে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে ডেঙ্গু হয়েছে কি না। ডেঙ্গু শনাক্ত হলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে।
অধ্যাপক কবিরুল বশার বলেন, ডেঙ্গুর এই সময়টায় পরিবারের সবাইকে অত্যন্ত সচেতন থাকতে হবে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত নারী বা পুরুষ কারো ক্ষেত্রেই অবহেলা করা উচিত নয়। জ্বর হলে তিন দিনের মধ্যে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে ডেঙ্গু হলো কি না। যদি ডেঙ্গু হয় তাহলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা নিতে হবে।
জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক গোলাম সারোয়ার বলেন, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার ভয়ংকর গাণিতিক বৃদ্ধির বিপরীতে যতগুলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আছে তার সবগুলোরই উপযুক্ত প্রয়োগ আবশ্যক। নিশ্চিত করতে হবে ক্রমবর্ধমান মশার প্রজনন ক্ষেত্রের নিয়মিত ধ্বংস ও ম্যানেজমেন্ট।
তিনি বলেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ব্রিডিং সোর্স ম্যানেজমেন্ট। ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, নির্মাণাধীন ভবনের পানির ট্যাংক, বহুতল ভবনের বেইসমেন্টে জমে থাকা পানি, ঘরের ড্রাম বা বালতিতে সংরক্ষিত পানি—এসব স্থান নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে অথবা পানি জমতে দেওয়া যাবে না। যেসব স্থানে পানি অপসারণ সম্ভব নয়, সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে।
তার মতে, শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত হতে হবে। প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশে এডিস মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।









