বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রাচীন যুগের সূচনা: ফুটবলের আদি উৎস/ শেখ সিদ্দিকুর রহমান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ১০:৫১ অপরাহ্ণ
প্রাচীন যুগের সূচনা: ফুটবলের আদি উৎস/ শেখ সিদ্দিকুর রহমান

শেখ সিদ্দিকুর রহমান

আজকের আধুনিক ফুটবল হুট করে একদিনে তৈরি হয়নি। হাজার বছর আগে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বল পায়ে খেলার প্রচলন ছিল: চীন (চু জু): খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে হান রাজবংশের আমলে চীনে ‘চু জু’ নামের একটি খেলার প্রচলন ছিল। চামড়ার তৈরি বল পায়ে মেরে জালে জড়ানো হতো। ফিফা একেই ফুটবলের সবচেয়ে প্রাচীন রূপ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। গ্রিস ও রোম: প্রাচীন গ্রিসে ‘এপিস্কিরোস’  এবং রোমে ‘হারপাসটাম’ নামে বল খেলার চল ছিল, তবে সেগুলোতে পায়ের পাশাপাশি হাতের ব্যবহারও হতো। মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ড: মধ্যযুগে ইংল্যান্ডে এক ধরণের ‘মব ফুটবল’  খেলা হতো। কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল না, পুরো গ্রাম মিলে বল নিয়ে হুড়োহুড়ি করত। সহিংসতা বেশি হওয়ার কারণে বিভিন্ন সময়ে রাজারা এই খেলা নিষিদ্ধও করেছিলেন।

২. আধুনিক ফুটবলের জন্ম: ইংল্যান্ডের অবদান: ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে ইংল্যান্ডের পাবলিক স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর (যেমন ক্যামব্রিজ ও অক্সফোর্ড) মাধ্যমে খেলাটি একটি সুনির্দিষ্ট রূপ পেতে শুরু করে। ১৮৬৩ সালের ঐতিহাসিক বৈঠক: ১৮৬৩ সালের ২৬ অক্টোবর লন্ডনের ‘ফ্রিমেসন্স ট্যাভার্ন’-এ কয়েকটি স্কুল ও ক্লাবের প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ঋঅ) গঠন করেন। এখানে প্রথমবারের মতো ফুটবলের লিখিত নিয়মকানুন বা ‘লজ অব দ্য গেম’ তৈরি হয়। হ্যান্ডবল ও ফুটবলের বিভাজন: এই বৈঠকেই নিয়ম করা হয় যে বল হাতে ছোঁয়া যাবে না। যারা বল হাতে নিয়ে খেলার পক্ষে ছিলেন, তারা আলাদা হয়ে গিয়ে ‘রাগবি’  খেলা শুরু করেন। বিশ্বের প্রথম টুর্নামেন্ট: ১৮৭১ সালে বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো ফুটবল টুর্নামেন্ট ‘এফএ কাপ’ শুরু হয়। আর ১৮৭২ সালে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের মধ্যে ইতিহাসের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়।

 

৩. ফিফা গঠন ও বৈশ্বিক রূপ : ইংল্যান্ডে ফুটবলের নিয়ম ঠিক হওয়ার পর তা দ্রুত ইউরোপ এবং দক্ষিণ আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। খেলাটিকে বিশ্বজুড়ে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ফিফার প্রতিষ্ঠা: ১৯০৪ সালের ২১ মে ফ্রান্সের প্যারিসে ফিফা  প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলো ছিল ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড। অলিম্পিকে অন্তর্ভুক্তি: ১৯০৮ সালের লন্ডন অলিম্পিকে ফুটবল প্রথমবারের মতো অফিসিয়াল প্রতিযোগিতা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

৪. বিশ্বকাপ ফুটবলের যুগ: ফুটবলকে জনপ্রিয়তার শিখরে নিয়ে যায় বিশ্বকাপ। ফিফা সভাপতি জুল রিমে-র উদ্যোগে এই মহাযজ্ঞ শুরু হয়। প্রথম বিশ্বকাপ (১৯৩০): ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম ফিফা বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। মাত্র ১৩টি দেশ এতে অংশ নিয়েছিল। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব অর্জন করে স্বাগতিক উরুগুয়ে। টেলিভিশন ও বিশ্বায়ন: ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপ প্রথম টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়। এরপর থেকে ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, বরং কোটি কোটি মানুষের আবেগ ও বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনোদনে পরিণত হয়। পেলে, ম্যারাডোনা থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের মেসি-রোনালদোদের হাত ধরে ফুটবল আজ এক বৈশ্বিক মহোৎসবে রূপ নিয়েছে।

আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার মাঠের মাপ, গোল বক্সের পরিমাপ এবং খেলোয়াড় পরিবর্তন সংক্রান্ত ফিফা (ঋওঋঅ) এর আন্তর্জাতিক নিয়মাবলির বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো: ১. আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার মাঠের পরিমাপ : আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্য ফুটবল মাঠের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ফুট হিসেবে নিচে দেওয়া হলো: দৈর্ঘ্য : সর্বনি¤œ ৩০০ ফুট থেকে সর্বোচ্চ ৩৬০ ফুট (১০০ থেকে ১১০ মিটার)। প্রস্থ : সর্বনি¤œ ২১০ ফুট থেকে সর্বোচ্চ ২৫০ ফুট (৬৪ থেকে ৭৫ মিটার)। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলোর (যেমন বিশ্বকাপ) জন্য সাধারণত ৩৩০ ফুট দ্ধ ২৩০ ফুট (১০৫ মিটার দ্ধ ৬৮ মিটার) সাইজের মাঠ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। ২. গোল বক্স এবং পেনাল্টি এরিয়ার পরিমাপ পোস্টের সামনে মূলত দুটি বক্স থাকে একটি ছোট (গোল বক্স) এবং একটি বড় (পেনাল্টি বক্স)। এদের পরিমাপ নিচে দেওয়া হলো:

গোল বক্স : প্রতিটি গোলপোস্টের ভেতরের দিক থেকে দুই পাশে ১৮ ফুট (৬ গজ) লম্বা দুটি রেখা মাঠের ভেতরের দিকে টানা হয় এবং সে দুটিকে আরেকটি রেখা দিয়ে জুড়ে দেওয়া হয়। এটি গোলপোস্ট থেকে মাঠের ভেতরের দিকে ১৮ ফুট চওড়া হয়। পেনাল্টি বক্স : প্রতিটি গোলপোস্টের ভেতরের দিক থেকে দুই পাশে ৪৮ ফুট (১৬.৫ গজ) লম্বা দুটি রেখা মাঠের ভেতরের দিকে টানা হয়। এটি গোলপোস্ট থেকে মাঠের ভেতরের দিকে ৪৮ ফুট চওড়া হয়। পেনাল্টি স্পট : গোললাইন থেকে ঠিক ৩৬ ফুট (১২ গজ বা ১১ মিটার) দূরে পেনাল্টি শট নেওয়ার জন্য একটি বিন্দু বা স্পট চিহ্নিত থাকে।

গোলপোস্টের পরিমাপ: দুই পোস্টের ভেতরের দূরত্ব ২৪ ফুট (৮ গজ বা ৭.৩২ মিটার) এবং মাটি থেকে ক্রসবারের উচ্চতা ৮ ফুট (২.৪৪ মিটার)। ৩. খেলোয়াড়ের সংখ্যা : মাঠে খেলোয়াড়: খেলা চলাকালীন উভয় দলে মাঠের ভেতরে ১১ জন করে মোট ২২ জন খেলোয়াড় থাকেন (যার মধ্যে ১ জন গোলরক্ষক বা গোলকিপার)। স্কোয়াড বা অতিরিক্ত খেলোয়াড়: আন্তর্জাতিক ম্যাচে মূল একাদশের বাইরে বেঞ্চে বা স্কোয়াডে সাধারণত ১২ থেকে ১৫ জন পর্যন্ত অতিরিক্ত  খেলোয়াড় রাখার অনুমতি থাকে। ৪. খেলোয়াড় বদল বা সাবস্টিটিউশন নিয়ম বর্তমান ফিফা নিয়ম অনুযায়ী একটি ম্যাচে খেলোয়াড় বদলের নিয়মটি নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো: সর্বোচ্চ পরিবর্তন: নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলায় একটি দল সর্বোচ্চ ৫ বার (৫ জন) খেলোয়াড় বদল করতে পারবে। সুযোগ বা উইন্ডোজ : খেলা চলাকালীন সময় অপচয় রোধ করার জন্য এই ৫ জন খেলোয়াড়কে সর্বোচ্চ ৩টি সুযোগে  বদল করতে হবে। অর্থাৎ, এক সুযোগে একসাথে ২ বা ৩ জন খেলোয়াড়ও বদল করা যাবে। তবে হাফ-টাইম বা মধ্যবিরতির সময় খেলোয়াড় বদল করলে তা এই ৩টি সুযোগের মধ্যে গণনা করা হয় না। অতিরিক্ত সময় : নক-আউট পর্বের ম্যাচে খেলা যদি অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে গড়ায়, তবে দলগুলো আরও ১ জন অতিরিক্ত খেলোয়াড় (৬ষ্ঠ খেলোয়াড়) বদল করার সুযোগ পায় এবং এর জন্য আরও ১টি বাড়তি সুযোগ পাওয়া যায়।

কনকাশন সাবস্টিটিউশন: কোনো খেলোয়াড়ের মাথায় মারাত্মক আঘাত লাগলে, বিশেষ নিয়মে অতিরিক্ত আরও একজন খেলোয়াড় বদল করা যায়, যা মূল ৫টি পরিবর্তনের নিয়মের বাইরে থাকে। ফুটবল মাঠের এই আন্তর্জাতিক নিয়মগুলো মূলত খেলাটিকে বিশ্বজুড়ে একই মানে পরিচালনা করতে সাহায্য করে। এই বিষয়ে আপনার আর কোনো নির্দিষ্ট অংশ জানার থাকলে জানাতে পারেন। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চ ফিফা বিশ্বকাপ এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত অধ্যায় হলো চ্যাম্পিয়নদের গৌরবগাথা এবং মাঠ কাঁপানো সেরা গোলদাতাদের কীর্তি। আপনার অনুরোধ অনুযায়ী, বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা গোলদাতা (যাদের পারিবারিক বা বাবার নাম ও ক্লাবের তথ্য পাওয়া যায়) এবং ১৯৩০ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত কোন দেশ কোন সালে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, তার একটি বিস্তারিত এবং বিশাল প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।
বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের সেরা গোলদাতাদের প্রোফাইল
বিশ্বকাপের ইতিহাসে গোল করাকে বলা হয় সবচেয়ে কঠিন কাজ। চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপসহ বিশ্বমঞ্চের ইতিহাসে শীর্ষ গোলদাতাদের বিশদ বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

১. লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা) বাবার নাম: হোর্হে হোরাসিও মেসি দেশ: আর্জেন্টিনা বর্তমান ক্লাব: ইন্টার মায়ামি (সাবেক বার্সেলোনা ও পিএসজি) বিশ্বকাপে গোল সংখ্যা: ২০টি (সর্বোচ্চ) সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: জন্ম : ২৪ জুন ১৯৮৭। ২০২৬ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফর্ম করে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসেকে টপকে তিনি এখন বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকালের একক শীর্ষ গোলদাতা। ২০২২ সালে তিনি আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দেন।

২. কিলিয়ান এমবাপে  বাবার নাম: উইলফ্রেড এমবাপে (ডরষভৎরবফ গনধঢ়ঢ়ল্ক) দেশ: ফ্রান্স । বর্তমান ক্লাব: রিয়াল মাদ্রিদ (সাবেক পিএসজি) বিশ্বকাপে গোল সংখ্যা: ১৮টি
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: জন্ম : ২০ ডিসেম্বর ১৯৯৮। বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা এই ফরাসি ফরোয়ার্ড ২০১৮ সালে ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ জেতেন এবং ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে হ্যাটট্রিকসহ গোল্ডেন বুট লাভ করেন। মাত্র তিন বিশ্বকাপে অংশ নিয়েই তিনি অল-টাইম গোলদাতার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছেন।

৩. মিরোস্লাভ ক্লোসে  বাবার নাম: জোসেফ ক্লোসে (ঔড়ংবভ কষড়ংব – তিনিও একজন ফুটবলার ছিলেন) দেশ: জার্মানি ঐতিহাসিক ক্লাব: বায়ার্ন মিউনিখ, লাৎসিও, ওয়ের্ডার ব্রেমেন (অবসরপ্রাপ্ত) বিশ্বকাপে গোল সংখ্যা: ১৬টি। সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: জন্ম : ৯ জুন ১৯৭৮। ২০০২ থেকে ২০১৪ টানা চারটি বিশ্বকাপে জার্মানির গোলমেশিন ছিলেন ক্লোসে। ২০১৪ সালে জার্মানির বিশ্বকাপ জয়ের পেছনে তার বিশাল অবদান ছিল।

৪. রোনালদো নাজারিও  বাবার নাম: নেলিও নাজারিও লিমা সিনিয়র (ঘল্কষরড় ঘধুপ্সৎরড় ফব খরসধ ঝবহরড়ৎ) দেশ: ব্রাজিল ঐতিহাসিক ক্লাব: রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, ইন্টার মিলান (অবসরপ্রাপ্ত) বিশ্বকাপে গোল সংখ্যা: ১৫টি। সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: জন্ম : ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৭৬। ‘দ্য ফেনোমেনন’ নামে পরিচিত রোনালদো ১৯৯৪ (খেলেননি) ও ২০০২ সালের বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য। ২০০২ বিশ্বকাপের ফাইনালে জোড়া গোল করে ব্রাজিলকে পঞ্চম শিরোপা এনে দিয়েছিলেন তিনি।

৫. গার্ড মুলার (ডবংঃ এবৎসধহু) বাবার নাম: হাইনরিখ মুলার দেশ: পশ্চিম জার্মানি (বর্তমান জার্মানি) ঐতিহাসিক ক্লাব: বায়ার্ন মিউনিখ (প্রয়াত) বিশ্বকাপে গোল সংখ্যা: ১৪টি। সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:জন্ম : ৩ নভেম্বর ১৯৪৫। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ জয়ী এই কিংবদন্তি স্ট্রাইকারকে বলা হতো বক্সের ভেতরের সবচেয়ে বিপজ্জনক শিকারী। মাত্র ২টি বিশ্বকাপ খেলেই তিনি ১৪টি গোল করেছিলেন।

কোন দেশ কোন কোন সালে চ্যাম্পিয়ন (১৯৩০-২০২২/২০২৬)
১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ফুটবল বিশ্ব বেশ কিছু ঐতিহাসিক চ্যাম্পিয়ন পেয়েছে। নিচে চ্যাম্পিয়ন দেশগুলোর তালিকা সালভিত্তিক বিস্তারিত দেওয়া হলো: বিশ্বকাপের ইতিহাসে শিরোপার স্বাদ পেয়েছে কেবল মাত্র ৮টি দেশ। নিচে তাদের অর্জনের পরিসংখ্যান দেওয়া হলো:

১. ব্রাজিল (৫ বার – রেকর্ড চ্যাম্পিয়ন) ১৯৫৮: সুইডেনের মাটিতে মাত্র ১৭ বছর বয়সী পেলের জাদুতে প্রথম শিরোপা জেতে ব্রাজিল। ১৯৬২: পেলে ইনজুরিতে পড়লেও গারিঞ্চার দুর্দান্ত নৈপুণ্যে টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হয় সেলেসাওরা। ১৯৭০: পেলের শেষ বিশ্বকাপে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবল খেলে ইতালিকে হারিয়ে তৃতীয় শিরোপা ঘরে তোলে তারা। ১৯৯৪: ইতালিকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ২৪ বছর পর রোমারিও-বেবেতোর হাত ধরে চতুর্থ শিরোপা জয়। ২০০২: এশিয়ার মাটিতে (জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া) রোনালদো নাজারিওর জাদুতে জার্মানিকে হারিয়ে পঞ্চম ও শেষ শিরোপা।

২. জার্মানি/পশ্চিম জার্মানি (৪ বার) ১৯৫৪: হাঙ্গেরির ঐতিহাসিক ‘ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স’ দলকে হারিয়ে ‘মিরাকল অব বার্ন’ খ্যাত ম্যাচে প্রথম জয়। ১৯৭৪: টোটাল ফুটবলের জনক ইয়োহান ক্রুইফের নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে ঘরের মাঠে দ্বিতীয় শিরোপা। ১৯৯০: ডিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে হারিয়ে রোমায় তৃতীয় শিরোপা উদযাপন। ২০১৪: লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময়ের গোলে হারিয়ে ব্রাজিলের মাটিতে চতুর্থ শিরোপা লাভ।

৩. ইতালি (৪ বার) ১৯৩৪: ঘরের মাঠে চেকোস্লোভাকিয়াকে হারিয়ে প্রথম শিরোপা জয়। ১৯৩৮: হাঙ্গেরিকে হারিয়ে ইতিহাসের প্রথম দেশ হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড। ১৯৮২: পাওলো রসি-র একক নৈপুণ্যে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে বিদায় করে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে তৃতীয় শিরোপা। ২০০৬: ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে জিনেদিন জিদানের বিদায়ী বিশ্বকাপে চতুর্থবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় ইতালি।

৪. আর্জেন্টিনা (৩ বার) ১৯৭৮: ঘরের মাঠে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে মারিও কেম্পেসের হাত ধরে প্রথম বিশ্বকাপ জয়। ১৯৮৬: মেক্সিকোর মাটিতে ডিয়েগো ম্যারাডোনার একক জাদুতে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে দ্বিতীয় শিরোপা। ২০২২: কাতারের মাটিতে কিলিয়ান এমবাপের ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফাইনাল খেলে টাইব্রেকারে লিওনেল মেসির হাত ধরে তৃতীয় শিরোপা।

৫. ফ্রান্স (২ বার) ১৯৯৮: ঘরের মাঠে জিনেদিন জিদানের জোড়া হেডের গোলে ফাইনালে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ৩-০ ব্যবধানে উড়িয়ে প্রথম শিরোপা। ২০১৮: রাশিয়ার মাটিতে তরুণ কিলিয়ান এমবাপে ও আঁতোয়ান গ্রিজম্যানের নৈপুণ্যে ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয় শিরোপা।

৬. উরুগুয়ে (২বার) ১৯৩০: ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ১৯৫০: ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে প্রায় ২ লাখ দর্শকের সামনে স্বাগতিক ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটন ঘটিয়ে দ্বিতীয় শিরোপা জেতে (যা ‘মারাকানাজো’ নামে পরিচিত)।
৭. ইংল্যান্ড (১ বার) ১৯৬৬: ঘরের মাঠে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে জিওফ হার্স্টের বিতর্কিত হ্যাটট্রিকে একমাত্র বিশ্বকাপটি জেতে ইংল্যান্ড।

৮. স্পেন (১ বার) ২০১০: আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপে নিজেদের বিখ্যাত ‘টিকি-টাকা’ ফুটবল শৈলী দিয়ে ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার অতিরিক্ত সময়ের গোলে হারিয়ে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন।

সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের শীর্ষে যাঁরা
পেলে (ব্রাজিল): একমাত্র ফুটবলার যিনি ৩টি ফিফা বিশ্বকাপ (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০) জিতেছেন। তাঁর অবিশ্বাস্য গোল করার রেকর্ড এবং খেলার ধরন তাঁকে ফুটবল সম্রাটের মর্যাদা দিয়েছে।

দিয়েগো ম্যারাডোনা (আর্জেন্টিনা): ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে তাঁর একক নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানো এবং ড্রিবলিংয়ের জাদুকরী ক্ষমতা তাঁকে ফুটবলের অন্যতম সেরা আইকন করে তুলেছে।

লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা): আধুনিক ফুটবলের রেকর্ড ৮ বারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এবং ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী মেসিকে অনেকে ইতিহাসের সবচেয়ে পরিপূর্ণ ও ধারাবাহিক ফুটবলার মনে করেন।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল): ফুটবলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ অফিশিয়াল গোলদাতা। তাঁর অবিশ্বাস্য ফিটনেস, গোল করার ক্ষুধা এবং ৫টি ব্যালন ডি’অর জয় তাঁকে সর্বকালের সেরাদের কাতারে মজবুত স্থান দিয়েছে।

উপসংহার: বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডায় যৌথভাবে ৪৮ দলের অংশগ্রহণে চলছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞ। ফুটবল ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় লুকিয়ে আছে এমন অসংখ্য বীরত্বগাথা, যা প্রতি চার বছর পর পর বিশ্ববাসীকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলে। ইতিহাসের এই গৌরবময় পথ বেয়ে ফুটবল এগিয়ে যাচ্ছে তার চিরন্তন সৌন্দর্যের দিকে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: বর্তমানে উত্তর আমেরিকায় (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা) ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ অত্যন্ত জমজমাটভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে মেসি ও এমবাপের মতো তারকারা তাদের গোলের রেকর্ডকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাচ্ছেন। লেখক: সাবেক ব্যাংকার, গবেষক

 

Ads small one

কোহলির ব্র্যান্ডের জুতা পরে এশিয়া কাপে পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৫৪ অপরাহ্ণ
কোহলির ব্র্যান্ডের জুতা পরে এশিয়া কাপে পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা

ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চিরন্তন। কিন্তু সেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরেও যে অন্যরকম যোগসূত্র তৈরি হতে পারে, সেটিই যেন দেখা গেল নারী এশিয়া কাপে। মাঠে পাকিস্তানের জার্সি, আর পায়ে ভারতের সাবেক অধিনায়ক বিরাট কোহলির স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড ওয়ান-এইট এর জুতা! বিষয়টি চোখ এড়ায়নি ক্রিকেটভক্তদের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয়েছে আলোচনা।

চলমান নারী এশিয়া কাপে হংকংয়ের বিপক্ষে ম্যাচে পাকিস্তানের বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারকে ওই ব্র্যান্ডের স্নিকার্স পরতে দেখা গেছে। সোমবার দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে বাঁহাতি স্পিনার নাশরা সান্ধু ও ডানহাতি ব্যাটার আইমান ফাতিমাসহ কয়েকজনের পায়ে ছিল সেই জুতা।

খেলোয়াড়দের জুতা পরা ছবি ও ভিডিও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম বড় তারকা কোহলির সঙ্গে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের এই অপ্রত্যাশিত যোগসূত্র নিয়ে ভক্তদের মধ্যে তৈরি হয় নানা আলোচনা।

ওয়ান-এইট এখন শুধু কোহলির নামের সঙ্গে যুক্ত একটি ব্র্যান্ড নয়। ফুটওয়্যার, পোশাকসহ বিভিন্ন স্পোর্টস পণ্য নিয়ে নিজেদের পরিসর বাড়িয়েছে ব্র্যান্ডটি। ‘অ্যাজিলিটাস’এর সঙ্গে মিলে চালু হওয়া এই ব্র্যান্ডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিরাট কোহলি।

ভারতের সাবেক অধিনায়ক কোহলি নিজেও অ্যাজিলিটাসের একজন বিনিয়োগকারী। প্রতিষ্ঠানটিতে তিনি ৪০ কোটি রুপি বিনিয়োগ করেছেন।

‘মেয়ে হয়ে কেন ছেলেদের কোচ হতে পারবো না’

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৪৬ অপরাহ্ণ
‘মেয়ে হয়ে কেন ছেলেদের কোচ হতে পারবো না’

মেয়েদের কুস্তির মঞ্চ পেরিয়ে এবার ছেলেদের কোচের ভূমিকায় শিরিন সুলতানা। একসময় নিজেই প্রতিপক্ষের সঙ্গে কুস্তির ম্যাটে লড়েছেন। খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করেছেন ছয় বছর আগে। এরপর হাতে তুলে নিয়েছেন কোচিংয়ের দায়িত্ব। গত এক বছর ধরে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে কাজ করছেন। তবে মেয়েদের নয়, শিরিন এখন কোচিং করাচ্ছেন ছেলেদের জাতীয় দলকে। আর সেটিই তাকে নিয়ে এসেছে আলোচনার কেন্দ্রে।

এশিয়ান গেমসে অংশ নেবে বাংলাদেশের কুস্তি দল। সেই দলের ছেলেদের দুই বেলা অনুশীলন করিয়ে যাচ্ছেন ময়মনসিংহ থেকে উঠে আসা সাবেক এই কুস্তিগীর। ৩৭ বছর বয়সী শিরিনের ছেলেদের কোচ হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। ছেলেদের দলের কোচ হওয়ার জন্য আরও অনেকে থাকলেও ফেডারেশন বেছে নিয়েছে শিরিনকে। সিদ্ধান্তটি নিয়ে কারও কারও আক্ষেপ থাকলেও তাতে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি ফেডারেশন।

তবে আলোচনা-সমালোচনায় কান দিচ্ছেন না শিরিন। অনুশীলনের এক ফাঁকে তিনি বলেছেন, ‘কে কী বললো তা কানে নিচ্ছি না। আমার কাজ কোচিং করানো তাই করে যাচ্ছি। তা সেটা ছেলে বা মেয়েদের কোচ হই না কেন। একজন মেয়ে হয়ে কেন ছেলেদের কোচ কিংবা শেখাতে পারবো না। কোথায় কী লেখা আছে। আমি তো ছেলে কোচদের কাছ থেকে শিখেছি। ছেলেদের কাছ থেকে যদি শিখতে পারি, তাহলে আমি কেন কোচিংয়ে এসে ছেলেদেরই আবার শেখাতে পারবো না।’

বাংলাদেশের ফুটবলে মিরোনা, হ্যান্ডবলে ডালিয়ার পর এবার কুস্তিতেও ছেলেদের কোচের ভূমিকায় একজন নারী। তবে শিরিনের পথচলা শুরু হয়েছিল খেলোয়াড় হিসেবে। ২০০৯ সালে কুস্তির সঙ্গে তার যাত্রা শুরু। ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমানতালে নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন তিনি।

২০১২ সালে ইন্দো-বাংলা রেসলিং চ্যাম্পিয়নশিপে ৫৫ কেজি ওজনশ্রেণিতে জিতেছিলেন স্বর্ণপদক। ২০১৬ সালে গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত এসএ গেমসে ৬৮ কেজি ওজনশ্রেণিতে পেয়েছিলেন রৌপ্যপদক। পরের বছর আজারবাইজানের বাকুতে ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে অর্জন করেন ব্রোঞ্জ। ২০১৮ সালের গোল্ড কোস্ট কমনওয়েলথ গেমসে হয়েছিলেন চতুর্থ। অংশ নিয়েছেন এশিয়ান ইনডোর অ্যান্ড মার্শাল আর্টস গেমসেও। ২০১৯ সালে কুস্তির ম্যাট থেকে বিদায় নেন শিরিন।

ম্যাটের সেই অভিজ্ঞতা ও অর্জনকে কাজে লাগিয়েই এখন নতুন প্রজন্মের কুস্তিগীর তৈরি করছেন তিনি। কোচ হিসেবেও নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। সম্পন্ন করেছেন সলিডারিটি কোচেস কোর্স লেভেল-২।

শিরিন কুস্তি ফেডারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও। এ কারণে সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করেন, ফেডারেশনে নিজের প্রভাব কাজে লাগিয়েই কোচ হয়েছেন তিনি। তবে এমন অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন শিরিন। তিনি বলেছেন, ‘আমি কোচ হওয়ার জন্য কাউকে প্রভাব বিস্তার করিনি। এমন কাজ আমি কেন করবো। আমার যোগ্যতা আছে বলেই জাতীয় দলের কোচ হয়েছি। আর কে কী বললো তা নিয়ে আমি ভাবছি না। আমার মনোযোগ অনুশীলনে।’

জ্বালানি সংকট বাড়িয়ে দিয়েছে মাসের সংসার খরচ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৪৩ অপরাহ্ণ
জ্বালানি সংকট বাড়িয়ে দিয়েছে মাসের সংসার খরচ

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজিচালিত পরিবহন, বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাসের কম চাপের কারণে সিএনজি চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। অন্যদিকে বাসাবাড়িতে রান্নার জন্য গ্যাস না পেয়ে অনেকে সিলিন্ডার ও বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভর করছেন। এতে মাসের সংসার খরচের সঙ্গে যোগ হয়েছে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়।

রাজধানীর হাজিপাড়া পেট্রোলপাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সিএনজিচালক হালিম উদ্দিন বলেন, ‘একবার গ্যাস নিতে আসলেই দুই থেকে তিন ঘণ্টা চলে যায়। আগে যেখানে একবার গ্যাস নিতে আসলে ৩৫০ টাকার গ্যাস ঢুকতো, এখন সেখানে ১৩০ টাকার বেশি নেওয়া যায় না। কারণ গ্যাসের চাপ কম। এই গ্যাস দিয়ে ৪ ঘণ্টার বেশি সিএনজি চালানো যায় না। আবার গ্যাস নিতে আসলে ২ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়। অর্থাৎ কেউ ৮ ঘণ্টা সিএনজি চালাতে হলে তাকে ৪ ঘণ্টা গ্যাসের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এদিকে আয় হোক আর না হোক মালিকের জমা তো দিতেই হয়।’

গ্যাসচালিত পরিবহনে এক চাপে যতটা গ্যাস নেওয়া যায়, তাই নিতে হয়। স্বাভাবিকভাবে গ্যাসের চাপ বেশি থাকলে সিলিন্ডারে বেশি গ্যাস ঢোকে, আর চাপ কম থাকলে কম গ্যাস নেওয়া যায়। একবার সিএনজিতে গ্যাস প্রবেশ করালে নির্দিষ্ট পরিমাণ শেষ না হলে নতুন করে গ্যাস নেওয়াও যায় না।

অন্যদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার আবাসিক বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কোনও কোনও এলাকায় একেবারেই গ্যাস থাকে না। আবার কিছু এলাকায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে টিমটিম করে চুলা জ্বলে। এতে গরম পানিও করা যায় না, রান্না তো দূরের কথা।

ফলে সকালে অফিসে যাওয়ার আগে রান্না করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন মানুষ। কেউ ভোরে উঠে রান্না করছেন, কেউ মধ্যরাতে রান্না করছেন। আবার কেউ সিলিন্ডার বা বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভর করছেন। এতে বাড়তি খরচের পাশাপাশি সময়ও নষ্ট হচ্ছে।

মিরপুরের বাসিন্দা রাসনা চৌধুরী বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরেই সকালে উঠে দেখি চুলায় গ্যাস নেই। দুপুরের আগে চুলা জ্বালানো যায় না। আগে সকালে রান্না করে রেখে বের হতাম। আর এখন অফিস থেকে এসে ক্লান্ত হয়েই রান্না করতে হয়। এই রান্না শুধু সেদিনের না, পরের দিনের দুপুরের রান্নাটাও সেরে ফেলতে হয়। দুপুরে যারা বাসায় থাকে তারা ওভেনে গরম করে সেই তরকারি খায়, আর ভাত রান্না করে রাইস কুকারে। সকালে নাস্তা করতে হলে হয় আগের দিনের বাসি খাবার ওভেনে গরম করি, না হলে বাইরে থেকে কিনে আনি। কারণ বিদ্যুতের চুলায় রান্না করতে সময় লাগে। সকালে এত সময় থাকে না। প্রতিদিন এভাবে চলা সম্ভব নয়।’

খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা আনজুম সুলতানা বলেন, ‘গ্যাসের চাপ কখন থাকবে, কখন থাকবে না, তার ঠিক নেই। সকাল ১০টার দিকে রান্না বসানোর পর হঠাৎ গ্যাসের চাপ কমে যায়। আধা রান্না করে পরে সেটা আবার সিলিন্ডার চুলায় নিয়ে যেতে হয়। সিলিন্ডারই যদি ব্যবহার করতে হয়, তাহলে আমরা গ্যাস বিল দেবো কেন? মাসের বাজারের খরচের সঙ্গে এখন গ্যাসের বাড়তি খরচও যোগ হয়েছে।’

শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতেও সংকট

শুধু সিএনজি বা বাসাবাড়ি নয়, গ্যাস সংকটে চাপে পড়েছে শিল্প খাতও। চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও মেশিন বন্ধ রেখে শ্রমিকদের বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।

চট্টগ্রামে প্রায় ১ হাজার ২০০টি ভারী শিল্পসহ প্রায় ৩ হাজার কারখানা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে বলে সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন কমছে। এর সঙ্গে কয়লা ও জ্বালানি তেলের সংকট এবং কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কম থাকায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও নাজুক হয়ে উঠেছে।

চলতি বছরের বিদ্যুতের হিসাবেও দেখা যাচ্ছে, গ্রীষ্মে গড়ে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। পিজিসিবির হিসাবে, গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় দেশে লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৮৪৪ মেগাওয়াট। আজ একই সময়ে লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৯৪৩ মেগাওয়াট।

পেট্রোবাংলার হিসাবে, গ্যাসভিত্তিক ৭২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৪১টিতে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনে এসব কেন্দ্রের প্রয়োজন ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ৮৫২ মিলিয়ন ঘনফুট।

চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম

বর্তমানে দুটি এলএনজি টার্মিনাল সক্রিয় হওয়ার পরও রাজধানীতে গ্যাস সংকট কাটছে না। এর প্রধান কারণ, এলএনজি সরবরাহ ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি বাড়ানো যাচ্ছে না। ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহক্ষমতার এলএনজি টার্মিনাল থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট কম পাওয়ার কারণ হিসেবে আমদানি বিঘ্নিত হওয়াকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যদিও সরকার বলছে, চলতি মাসে বেশ কয়েকটি এলএনজি কার্গো আসার কথা রয়েছে। কিন্তু যতক্ষণ সেগুলো না আসবে, ততক্ষণ সাধারণ মানুষের কষ্ট কমানো যাচ্ছে না।

দেশে এখন মোট গ্যাসের চাহিদা ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার বিকেল ৪টার হিসেবে মোট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে ২ হাজার ৩২৯ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ৭০৯ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি থেকে পাওয়া যাচ্ছে। দেশীয় খনি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট।

সংসদে দুঃখ প্রকাশ

সাম্প্রতিক সময়ে সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ২ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে দেশের মানুষ কষ্টে আছে বলে স্বীকার করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

এ সময় বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। জাতীয় সংসদে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমরা লুকোচুরি করতে চাই না। মানুষ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে কষ্টে আছে। আমি আমার মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি। তবে আজকের এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। বিগত দেড় দশক ধরে ফ্যাসিস্ট সরকারের ভুল নীতির অনিবার্য পরিণতি আজ এ দেশের মানুষকে ভোগ করতে হচ্ছে।’

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তাৎক্ষণিকভাবে এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই সমাধান নয়। দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘এই পরিস্থিতি একদিনে হয়নি। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি আর এক শ্রেণিকে সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ওপর ভর্তুকির বোঝা চাপানোর ফলেই আজকের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সরকার এলএনজি টার্মিনাল করার কথা বলছে, এই টার্মিনাল করতেও কমপক্ষে তিন বছর সময় লাগবে। ফলে আজকের সংকট সমাধানের কোনও গতি নেই সরকারের হাতে।’

ফলে একদিকে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট, অন্যদিকে এলএনজি আনার পরিকল্পনা, ভোলার গ্যাস আনার পরিকল্পনা, স্থলভাগে বা সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান—যে পরিকল্পনাই করা হচ্ছে, তার কোনোটিই এখনকার গ্যাস সংকট কমাতে পারবে না। দীর্ঘমেয়াদে হয়তো চাহিদা পূরণ করা যাবে। সব মিলিয়ে গ্যাসের ভোগান্তি থেকে সহসাই মুক্তি মিলছে না সাধারণ মানুষের।