বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস: নীরবতা ভেঙে সহমর্মিতা
সাকিবুর রহমান বাবলা
আত্মহত্যা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ। প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ উদ্যোগে দিবসটির সূচনা হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো আত্মহত্যা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক কুসংস্কার দূর করা এবং এই বার্তা পৌঁছে দেয়া যে আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব। ২০২৪-২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘আত্মহত্যা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার পরিবর্তন’।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ৭ লাখ ২৭ হাজার মানুষ আত্মহত্যার মাধ্যমে প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ ছিল আত্মহত্যা। জনসংখ্যার অনুপাতে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডে প্রতি লাখে প্রায় ৭৫ জন। তবে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশগুলোর মধ্যে এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে লেসোথো, সুরিনাম প্রতি লাখে ২৮ জন, দক্ষিণ কোরিয়া প্রতি লাখে ২৮ জন এবং গায়ানা প্রতি লাখে ২৫ জন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিশ্বের মোট আত্মহত্যার প্রায় ৭৩ শতাংশই ঘটে নি¤œ ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই সংকটকে আরও বেশি ঘনীভূত ও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বে আত্মহত্যার প্রবণতা একেবারে শূন্য এমন কোনো দেশ না থাকলেও বার্বাডোস ও অ্যান্টিগুয়া এবং বারবুডার মতো ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে এই হার সবচেয়ে কম, প্রতি লাখে ১ জনেরও কম। মূলত জোরালো ধর্মীয় ও পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক বন্ধন এই হার কম রাখতে সাহায্য করে, যদিও সামাজিক কুসংস্কার বা আইনি জটিলতার কারণে অনেক দেশের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ না পাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।
আত্মহত্যা কেবল মানসিক রোগের ফল নয়; এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত নানা কারণের সম্মিলিত প্রভাব। বিষণ্নতা, মানসিক চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন, আর্থিক সংকট, দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, সহিংসতা, বৈষম্য, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং হঠাৎ সৃষ্ট সংকটময় পরিস্থিতি অনেক মানুষকে আত্মঘাতী আচরণের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অনেক আত্মহত্যা তাৎক্ষণিক আবেগ ও সংকটময় মুহূর্তের ফল, যখন ব্যক্তি জীবনের চাপ মোকাবিলার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় আত্মহত্যার হার হ্রাসকে মানসিক স্বাস্থ্য ও কল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘কমপ্রিহেনসিভ মেন্টাল হেলথ অ্যাকশন প্ল্যান ২০১৩–২০৩০’ এবং ‘লাইভ লাইফ’ উদ্যোগ আত্মহত্যা প্রতিরোধে সমন্বিত ও প্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। তাদের কৌশলে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়Ñআত্মহত্যার উপায়ের সহজলভ্যতা সীমিত করা, দায়িত্বশীল গণমাধ্যম চর্চা নিশ্চিত করা, তরুণদের জীবনদক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে সহায়তা প্রদান করা। পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি, বহুখাতভিত্তিক সহযোগিতা, গবেষণা, পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নকে আত্মহত্যা প্রতিরোধের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ১৩,৪৯১ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন, যা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪১ জন। এ তথ্য আত্মহত্যা বিষয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয়। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে অজ্ঞতা, সামাজিক কুসংস্কার, পারিবারিক বিরোধ, শিক্ষাগত চাপ, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, পরীক্ষা ও প্রেমে ব্যর্থতা, অপরাধী মন এবং সহজলভ্য ক্ষতিকর উপকরণ আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে মানসিক চাপ, বুলিং, সাইবার ও যৌন হয়রানি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় ২০২৬ সালের মে থেকে জুলাইÑমাত্র তিন মাসে ৬৫ জনের আত্মহত্যা অন্যান্য অপমৃত্যু ছাড়া এক বড় আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের দেখা যায়, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব, পারিবারিক অশান্তি ও চাহিদা পূরণে ব্যর্থ, বাল্যবিবাহ, সামাজিক অপমান, বুলিং, পরীক্ষা ও প্রেমে ব্যর্থতা, জুয়ায় অর্থ হারানো ও কীটনাশকের সহজলভ্যতার পাশাপাশি জলবায়ু সংকট এর মূল কারণ। বিশেষ করে বারবার ঘূর্ণিঝড়, নদীর বাঁধ ভাঙ্গন, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং কৃষি বা অন্য খাতে ক্ষতির ফলে সৃষ্ট ঋণের চাপ উপকূলীয় পরিবারগুলোকে দীর্ঘস্থায়ী হতাশায় ফেলছে, যেখানে অর্থনৈতিক দুর্দশা ও মানসিক স্বাস্থ্য সংকট একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে কেবল বর্তমান উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; শিক্ষা, পরিবার, স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম, আইন ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত ভূমিকা অপরিহার্য। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং সেবা চালু করা, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, পারিবারিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান, বুলিং ও সাইবার হয়রানি প্রতিরোধ এবং সংকটাপন্ন ব্যক্তিদের জন্য সহজলভ্য সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সেবা দেওয়ার পাশাপাশি ‘কান পেতে রই’-এর মতো বেসরকারি সংগঠনগুলো মানসিক সহায়তায় কাজ করছে। এ ছাড়া যেকোনো সংকটে জাতীয় হেল্পলাইন ৯৯৯, নারী ও শিশু সহায়তায় ১০৯ এবং শিশু সুরক্ষায় ১০৯৮ নম্বর যুক্ত রয়েছে।
পৃথিবীর প্রধান ধর্মসমূহ এবং বিশিষ্ট দার্শনিক চিন্তাধারা একযোগে জীবনকে পরম পবিত্র, উদ্দেশ্যপূর্ণ ও অমূল্য আমানত হিসেবে তুলে ধরে আত্মহত্যার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মহনন হলো ঐশ্বরিক নিয়ম, কর্মফল ও আমানতের চরম লঙ্ঘন; অন্যদিকে দার্শনিক বিচারে এটি নৈতিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুতি, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি অন্যায় এবং জীবনের বাস্তবতার সামনে এক ধরনের আত্মসমর্পণ। সব মতবাদই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করে ধৈর্য, সাহসিকতা ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে জীবনের সংকট মোকাবিলা করে জীবনকে রক্ষা করাকেই মানব অস্তিত্বের মূল সার্থকতা ও পরম কর্তব্য বলে সাব্যস্ত করে।
বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আত্মহত্যা কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি একটি জটিল জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যা, যার সমাধানও হতে হবে সমন্বিত ও মানবিক। সহমর্মিতা, সচেতনতা, প্রমাণভিত্তিক নীতি এবং সময়োপযোগী সহায়তার মাধ্যমে অসংখ্য জীবন রক্ষা করা সম্ভব। তাই আসুন, নীরবতা ভেঙে সংলাপ শুরু করি, মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিই এবং এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি যেখানে সংকটের মুহূর্তে প্রত্যেক মানুষ প্রয়োজনীয় সহায়তা ও আশার আলো খুঁজে পায়।









