বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস: জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ
সাকিবুর রহমান বাবলা
“একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ তার সোনা-দানা বা খনিজ পদার্থ নয়, বরং তার মানুষ।”— নেলসন ম্যান্ডেলা।
প্রতি বছর ১১ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য, লিঙ্গসমতা, দারিদ্র্য হ্রাস, মানবাধিকার এবং টেকসই উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টিই এ দিবসের মূল লক্ষ্য।
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা যেমন একটি দেশের জন্য সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে, তেমনি সুশাসন ও পরিকল্পনার অভাবে তা নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করতে পারে। তাই জনসংখ্যাকে শুধু সংখ্যা হিসেবে নয়, বরং মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের সূচনা হয় ১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই, বিশ্বে জনসংখ্যা ৫০০ কোটির মাইলফলক অতিক্রম করে ঐ দিন। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির গভর্নিং কাউন্সিল প্রতি বছর ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এরপর থেকে দিবসটি জাতিসংঘ ও বিভিন্ন দেশের সরকার, উন্নয়ন সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের উদ্যোগে পালিত হয়ে আসছে।
ধারনা, বর্তমানে পৃথিবীর জনসংখ্যা ৮৩০ কোটিরও বেশি। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব জনসংখ্যা ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর ৮০০ কোটি অতিক্রম করে। বিবিএস সূত্রে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৭৮ লাখ। ভৌগোলিক আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। ফলে দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে, অন্যদিকে দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের সুযোগও সৃষ্টি করেছে।
গবেষণা অনুযায়ী, মানব ইতিহাসে প্রথম ১০০ কোটিতে পৌঁছায় ১৮০৪ সালে। এরপর ১৯২৭ সালে ২০০ কোটি, ১৯৮৭ সালে ৫০০ কোটি এবং ২০২২ সালে ৮০০ কোটি অতিক্রম করে। অর্থাৎ প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে মানুষের আয়ু বেড়েছে, শিশুমৃত্যু কমেছে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি অভূতপূর্ব পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদিও সাম্প্রতিক দশকগুলোতে অনেক দেশে জন্মহার হ্রাস পাওয়ায় ভবিষ্যতে বৈশ্বিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন।
বিশ্বের জনসংখ্যার সঙ্গে জাতিগত, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাসে পৃথিবী এক বহুবর্ণ সমাজে পরিণত হয়েছে। খ্রিষ্টান, মুসলিম, হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বের বৃহৎ জনগোষ্ঠী গঠন করেছে, আর দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়া সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম। তবে জনসংখ্যার বণ্টন সর্বত্র সমান নয়; মোনাকো, সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের মতো অঞ্চলে জনঘনত্ব অত্যন্ত বেশি, বিপরীতে অ্যান্টার্কটিকা, গ্রিনল্যান্ড ও সাহারা মরুভূমির মতো প্রতিকূল পরিবেশে জনসংখ্যা খুবই কম।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে জনসংখ্যা গণনারও দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। ধারণা করা হয়, প্রাচীন ব্যবিলন সাম্রাজ্যে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৩৮০০ অব্দে প্রথম জনসংখ্যা গণনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে চীনের হান রাজবংশ খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে পরিকল্পিত আদমশুমারি পরিচালনা করে। বর্তমানে জনশুমারি একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে মানবজাতির ইতিহাস ও বিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র আল-কুরআন অনুযায়ী, মহান আল্লাহ প্রথম মানুষ হযরত আদম (আ.)-কে মাটি থেকে সৃষ্টি করেন এবং তাঁর বংশধরদের মাধ্যমে মানবজাতির বিস্তার ঘটান। ইসলাম মানবকল্যাণ, ন্যায়পরায়ণতা ও দায়িত্বশীল জনসমাজ গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। মহাবিশ্বের নিখুঁত হিসাব: “আমি (আল্লাহ) প্রত্যেক বস্তুকে পরিমিতরূপে সৃষ্টি করেছি, (সূরা আল-ক্বামার: ৪৯) এবং তাঁর (আল্লাহর) কাছে তাদের পরিসংখ্যান রয়েছে এবং তিনি তাদের গণনা করে রেখেছেন, (সূরা মারইয়াম: ৯৪)।”
আজকের বিশ্বে জনসংখ্যা শুধু সংখ্যাগত বিষয় নয়; টেকসই উন্নয়নের জন্য জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা, পরিবার পরিকল্পনা, নারীর ক্ষমতায়ন, মানসম্মত শিক্ষা, মানবস্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। জনসংখ্যাকে বোঝা নয়, সম্পদে পরিণত করা রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। সচেতনতা, সুশাসন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে জনসংখ্যাকে জাতীয় অগ্রগতির শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের মূল বার্তাও হলো—মানুষই উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু, আর সুশিক্ষিত ও সুস্থ মানুষই একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই ভবিষ্যতের ভিত্তি।






