বিশ্ব সাপ দিবস: ভয় নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও সংরক্ষণ
সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রতি বছর ১৬ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব সাপ দিবস। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো সাপ সম্পর্কে মানুষের ভ্রান্ত ধারণা দূর করা, এই প্রাণীর পরিবেশগত গুরুত্ব তুলে ধরা এবং বিপন্ন সাপের প্রজাতি সংরক্ষণে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। মানুষের কাছে সাপ এমন একটি প্রাণী, যার নাম শুনলেই অধিকাংশের মনে ভয়, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার অনুভূতি জাগে। অথচ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় সাপের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব সাপ দিবসের প্রচলনের পেছনে ভিন্ন মত রয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের একটি স্নেক ফার্মের নাম শোনা যায়, যা ১৯৬০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করে। পরবর্তীকালে সাপ সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৬ জুলাইকে বিশ্ব সাপ দিবস হিসেবে বিভিন্ন সংগঠন পালন করতে শুরু করে। বর্তমানে বিশ্বের নানা দেশে দিবসটি উপলক্ষে সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান, প্রদর্শনী, কর্মশালা ও সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
জীববিজ্ঞানের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী এরা সরীসৃপ শ্রেণীর অন্তর্গত। প্রাগৈতিহাসিক যুগের বিভিন্ন প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনে সাপের চিত্র পাওয়া যায়, যা মানবসভ্যতার সঙ্গে এ প্রাণীর দীর্ঘ সম্পর্কের ইঙ্গিত বহন করে। ধর্ম, পুরাণ, সাহিত্য ও লোককাহিনীতেও সাপের উল্লেখ ব্যাপক। বাইবেলের আদম-হাওয়ার কাহিনি, ভারতীয় মহাভারতের নাগলোক, প্রাচীন মিশরের রাজমুকুট কিংবা বাংলার বেহুলা-লখিন্দরের গল্পেÑ সাপ এক বিশেষ প্রতীক। পবিত্র কোরআনে হজরত মূসা (আ.)-এর মুজিজার বর্ণনায় সাপের উল্লেখ রয়েছে, যেখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর লাঠিকে সাপে পরিণত করেছিলেন। সাপও আল্লাহ তাআলার সৃষ্ট একটি প্রাণী এবং অকারণে কোনো প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা সমর্থিত নয়।
বর্তমানে পৃথিবীতে ৪,০০০-এরও বেশি প্রজাতির সাপ শনাক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে মাত্র এক-চতুর্থাংশের মতো বিষধর। অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া প্রায় সব মহাদেশেই সাপের বিচরণ দেখা যায়। ক্ষুদ্র থ্রেড সাপের দৈর্ঘ্য যেখানে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার, সেখানে অজগর বা অ্যানাকোন্ডা কয়েক মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। বিলুপ্ত টাইটানোবোয়া নামের এক বিশাল সাপের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩ মিটার বলে ধারণা করা হয়।
সাপের কিছু বৈশিষ্ট্য মানুষকে বিস্মিত করে। এদের বাহ্যিক কান নেই, ফলে প্রচলিত অর্থে শব্দ শোনে না; বরং মাটির কম্পন অনুভব করে পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা নেয়। সাপের পা নেই, কিন্তু শক্তিশালী পেশির সাহায্যে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চলাচল করতে পারে। অনেকেই মনে করেন সাপ বাঁশির সুরে নাচে; বাস্তবে সাপ সাপুড়ের বাঁশির শব্দ নয়, বরং তার নড়াচড়ার প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখায়। আবার ফুলের গন্ধে সাপ ছুটে আসে, সাপ দুধ পান করে, সাপ প্রতিশোধ নেয় বা মানুষের চেহারা মনে রাখে—এসব ধারণারও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
প্রকৃতিতে সাপের গুরুত্ব অপরিসীম। সাপ খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে ইঁদুরের উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে সাপের অবদান কৃষির জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। সাপ এসব প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রেখে খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যে পরোক্ষ অবদান রাখে। একই সঙ্গে সাপ নিজেও বিভিন্ন প্রাণীর খাদ্য হিসেবে কাজ করে, ফলে প্রকৃতির জটিল খাদ্যজালের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও।
সাপের বৈজ্ঞানিক উপবর্গের নাম হলো Serpentes (সেরপেনটিস)। সাপের বিষ থেকে তৈরি বিষপ্রতিরোধী ওষুধ সাপের কামড়ে আক্রান্ত মানুষের জীবন রক্ষা করে। এছাড়া বিভিন্ন সাপের বিষে থাকা প্রোটিন ও এনজাইম ব্যবহার করে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, রক্ত জমাট বাঁধা সংক্রান্ত সমস্যা এবং কিছু স্নায়বিক রোগের ওষুধ তৈরিতে গবেষণা ও প্রয়োগ করা হচ্ছে। ক্যান্সার, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, স্ট্রোক এবং রক্তনালির রোগের চিকিৎসায়ও সাপের বিষের উপাদান নিয়ে গবেষণা চলছে। ফলে সাপের বিষ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ওষুধ গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। আমাদের দেশে প্রায় ১০০টিরও বেশি প্রজাতির সাপের উপস্থিতি পাওয়া যায়, যার মধ্যে ৩০টিরও অধিক প্রজাতি কেবল সুন্দরবনেই বাস করে। তবে সব সাপ বিষধর নয়; বরং বাংলাদেশের অধিকাংশ সাপই বিষহীন এবং এগুলো মানুষের কোনো ক্ষতি করে না।
আমাদের স্থলভাগে থাকা সাপের মধ্যে গোখরা, কালাচ (কেউটে), কিং কোবরা (শঙ্খচূড়), চন্দ্রবোড়া এবং কিছু পিট ভাইপার (সবুজ বোড়া) বিষধর হওয়ায় মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আইইউসিএন বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, আবাসস্থল ধ্বংস, নির্বিচারে হত্যা ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে দেশের কিছু সাপের প্রজাতি হুমকির মুখে রয়েছে।
বাস্তবে সাপ কখনোই মানুষকে লক্ষ্য করে শিকার করতে আসে না; বরং সুযোগ পেলেই তারা মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলে। সাপের দংশনের অধিকাংশ ঘটনাই ঘটে অসাবধানতাবশত তাদের ওপর পা দেওয়া, তাদের মারার চেষ্টা করা বা অন্য কোনোভাবে বিরক্ত করার কারণে। তাই সাপ দেখে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়াই শ্রেয়।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ায় সাপের কামড় একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে বর্ষাকালে সাপের উপদ্রব বাড়ে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনো অনেক মানুষ সাপে কামড়ানোর পর হাসপাতালে না গিয়ে ওঝা, কবিরাজ বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর করেন, ফলে মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। অথচ আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের মাধ্যমে অধিকাংশ বিষধর সাপের কামড়ের সফল চিকিৎসা সম্ভব।
সাপ কামড়ালে প্রথমেই রোগীকে শান্ত রাখতে হবে, অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া বন্ধ করতে হবে এবং দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। আক্রান্ত স্থানে কাটা, চুষে বিষ বের করার চেষ্টা, অতিরিক্ত শক্ত করে বেঁধে দেওয়া, আগুন বা রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা কিংবা ঝাড়ফুঁকের আশ্রয় নেওয়া বিপজ্জনক। সময়মতো চিকিৎসাই জীবন রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
তাই বিশ্ব সাপ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—সাপ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জন, কুসংস্কার পরিহার, সাপের আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে আধুনিক চিকিৎসার প্রতি আস্থা বৃদ্ধি। কারণ প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীর মতো সাপও পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যার অস্তিত্ব রক্ষা মানেই পরিবেশের সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।









