মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩

মিয়ানমার উপকূলে নৌকাডুবিতে ৫০০ রোহিঙ্গা মৃত্যুর শঙ্কা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬, ৫:৪৫ অপরাহ্ণ
মিয়ানমার উপকূলে নৌকাডুবিতে ৫০০ রোহিঙ্গা মৃত্যুর শঙ্কা

মিয়ানমার উপকূলে শরণার্থী বোঝাই দুটি নৌকাডুবির ঘটনায় ৫০০ জনেরও বেশি রোহিঙ্গার মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এই নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সংস্থাগুলো জানিয়েছে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি থেকে নিরাপত্তা ও উন্নত জীবনের আশায় শরণার্থীরা এই ঝুঁকিপূর্ণ সামুদ্রিক পথ বেছে নিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা এক যৌথ বিবৃতিতে প্রাথমিক তথ্যের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, জুনের শেষের দিকে নৌকা দুটি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রওনা হয়েছিল।

নৌকা দুটিতে মূলত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের যাত্রী ছিলেন, যাদের মধ্যে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবির থেকে আসা কিছু শরণার্থীও ছিলেন বলে জানা গেছে। নৌকাডুবির ফলে ৫০০-এরও বেশি মানুষ মারা গেছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

যৌথ বিবৃতিতে সংস্থা দুটি জানায়, “যদিও এই দুর্ঘটনা এবং হতাহতের সংখ্যা এখনও সরকারিভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, তবুও বিপুল সংখ্যক মানুষের এই সম্ভাব্য প্রাণহানিতে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।”

মিয়ানমারে চলমান সহিংসতা এবং বাংলাদেশের জনাকীর্ণ শরণার্থী শিবিরগুলোর চরম মানবিক সংকট থেকে বাঁচতে নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুরা বছরের পর বছর ধরে কাঠের তৈরি নড়বড়ে নৌকায় নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে সমুদ্রযাত্রা করছেন। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে নিরাপদ আশ্রয় ও জীবিকার সুযোগ খোঁজার আশায় তারা এই পথ বেছে নেন।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর আন্দামান সাগর এবং বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা শরণার্থী মারা গেছেন অথবা নিখোঁজ হয়েছেন। এর ফলে এই অঞ্চলটি শরণার্থী ও অভিবাসীদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং মারাত্মক সামুদ্রিক রুটে পরিণত হয়েছে।

Ads small one

সম্পাদকীয়/ বনের অধিকার বনাম দালালের দৌরাত্ম্য

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:১৩ অপরাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ বনের অধিকার বনাম দালালের দৌরাত্ম্য

সুন্দরবনের সম্পদ আহরণ করে জীবনধারণ করা প্রান্তিক জেলে ও বাওয়ালীদের জীবন সংগ্রাম এমনিতেই চরম প্রতিকূল। ঝড়-ঝাপটা, বাঘের ভয় আর জলদস্যুর আতঙ্কের সঙ্গে লড়াই করে তাঁদের টিকিয়ে রাখতে হয় অস্তিত্ব। অথচ প্রজনন মৌসুমের তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে যখন এই শ্রমজীবী মানুষেরা বনে ফেরার স্বপ্ন দেখছেন, ঠিক তখনই তাঁদের ওপর চেপে বসেছে এক খড়্গ। সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের চার স্টেশনে বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) নবায়নে ব্যাপক অনিয়ম ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের খবর কেবল হতাশাজনকই নয়, বরং চরম উদ্বেগের।

সংবাদ মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সরকারিভাবে বিএলসি নবায়ন ফি ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা হলেও তা জমা দিতে গিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দালালদের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ জেলেরা। অভিযোগ উঠেছে, স্টেশন কর্মকর্তাদের ছত্রচ্ছায়ায় একটি সুসংগঠিত দালাল চক্র প্রতিটি লাইসেন্সের জন্য ৯০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছে। বন কর্মকর্তা ও দালালের এই যোগসাজশ বনের প্রান্তিক মানুষদের ওপর এক নির্দয় শোষণ ছাড়া আর কিছুই নয়। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, অনিয়ম ঢাকা দিতে গণমাধ্যমকর্মীদের উৎকোচ দেওয়ার মতো বিস্ফোরক অভিযোগও উঠে এসেছে, যা অনিয়মের গভীরতাকেই নির্দেশ করে।

কর্মকর্তারা সরকারি ফির কাঠামোগত ব্যাখ্যা দিয়ে নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করলেও, সাধারণ জেলেদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য উপাধি দেয় এক ভিন্ন বাস্তবতার। নির্দিষ্ট ফি পরিশোধের প্রক্রিয়াকে জটিল করে দালালমুখী করা এবং বনজীবীদের অসচ্ছলতার সুযোগ নিয়ে অর্থ আদায় করার এই চর্চা কঠোর হস্তে বন্ধ হওয়া জরুরি।

বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষার পাশাপাশি বনজীবীদের ন্যায্য অধিকার সুনিশ্চিত করা বন বিভাগের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। অবিলম্বে সাতক্ষীরা রেঞ্জের চারটি স্টেশনের বিএলসি নবায়ন প্রক্রিয়ায় গঠিত অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। দালাল চক্রের মূলোৎপাটনসহ যেসকল কর্মকর্তা এই অসাদচরণ ও অর্থ আত্মসাটের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল বা হয়রানিমুক্ত উপায়ে সরাসরি সরকারি ফি পরিশোধের স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করে উপকূলীয় জেলেদের প্রশাসনিক নিপীড়ন থেকে মুক্ত করার জোরালো দাবি জানাচ্ছি।

নবম পে-স্কেল: এক শ্রেণির স্বস্তি, কোটি মানুষের বঞ্চনা?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:০২ অপরাহ্ণ
নবম পে-স্কেল: এক শ্রেণির স্বস্তি, কোটি মানুষের বঞ্চনা?

‎গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

দীর্ঘ প্রায় এক যুগ পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। নতুন বেতন কাঠামোয় সর্বনি¤œ প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য সুবিধাভোগী এ সিদ্ধান্তে উপকৃত হবেন।

 

সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির বাস্তবতা বিবেচনায় বেতন বৃদ্ধি অবশ্যই যৌক্তিক। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে দেশের বেসরকারি চাকরিজীবী, শ্রমিক ও নি¤œআয়ের মানুষের জীবনযাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সমান্তরাল পরিকল্পনা কী? নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।

 

সরকারি কর্মচারীদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ গেলে বাজারে ভোগক্ষমতা বাড়বে, যা সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। রাজস্ব আদায়ে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি না এলে এত বড় ব্যয় রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি ও বাজেট ব্যবস্থাপনার জন্যও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

 

সরকারি খাতে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারি খাতের কর্মীদের মধ্যেও বেতন বৃদ্ধির প্রত্যাশা তৈরি করবে। কিন্তু গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একই হারে বেতন বাড়ানো সম্ভব নাও হতে পারে। ফলে সরকারি ও বেসরকারি কর্মজীবীদের আয়ের ব্যবধান আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় দেশের বিশাল অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার। দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারীসহ কোটি কোটি মানুষের কোনো নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নেই।

 

সরকারি কর্মচারীর বেতন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে বাড়লেও দ্রব্যমূল্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন শ্রমজীবী মানুষের আয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ে না। অথচ একই বাজার থেকে সরকারি কর্মকর্তা ও দিনমজুর দুজনকেই চাল, ডাল, তেল ও ওষুধ কিনতে হয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান উন্নত করা নয়, শ্রমিক, কৃষক, বেসরকারি চাকরিজীবী ও নি¤œআয়ের মানুষের জন্যও ন্যূনতম মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা।

 

সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তার সঙ্গে সামাজিক বৈষম্য কমানোর কার্যকর উদ্যোগও জরুরি। শুধু বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি কমবে এমন নিশ্চয়তাও নেই। বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজন জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং সরকারি সেবার মান বৃদ্ধি।

 

জনগণ স্বাভাবিকভাবেই আশা করবে, বাড়তি রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের বিনিময়ে তারা আরও দ্রুত, দক্ষ ও জনবান্ধব সেবা পাবেন। নবম পে-স্কেল তাই শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারেরও একটি পরীক্ষা। সরকারি কর্মচারীদের মুখে হাসি ফুটুক, সেটিই কাম্য। কিন্তু সেই স্বস্তি যেন দেশের শ্রমজীবী ও নি¤œআয়ের মানুষের বঞ্চনার কারণ না হয় রাষ্ট্রকে সেই ভারসাম্যও নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা

বাংলাদেশের উন্নয়ন: সমস্যার চেয়ে সমাধানই বড়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৫৪ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশের উন্নয়ন: সমস্যার চেয়ে সমাধানই বড়

হক মো. ইমদাদুল, জাপান

প্রায় চার যুগ দেশের বাইরে কাটিয়েও বাংলাদেশের কথা ভাবা থেকে নিজেকে কখনো দূরে রাখতে পারিনি। বরং দূরত্ব যত বেড়েছে, দেশের প্রতি ভাবনাটা তত গভীর হয়েছে। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে দূর থেকে দেখার সুযোগ যেমন হয়েছে, তেমনি অন্য অনেক দেশের সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনও কাছ থেকে দেখেছি। তাই আজও একটি প্রশ্ন আমাকে ভাবায়Ñবাংলাদেশের মানুষের মেধা, পরিশ্রম ও সম্ভাবনার তুলনায় আমাদের উন্নয়নের গতি কি আরও দ্রুত হতে পারত না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, আমাদের সমস্যার বড় অংশ অর্থ বা সম্পদের অভাবে নয়। বরং আমরা কীভাবে চিন্তা করি, কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দিই এবং উন্নয়নকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করিÑতার মধ্যেও আমাদের অনেক সমস্যার শিকড় লুকিয়ে আছে।

বাংলাদেশে উন্নয়ন হয়েছে, পরিবর্তনও হয়েছেÑএ কথা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে উন্নয়নের সুফল সর্বস্তরের মানুষের জীবনে সমানভাবে পৌঁছায়নি এবং বহু পুরোনো সমস্যা এখনো আমাদের পথ আটকে আছে। ফলে এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু ‘আর কত উন্নয়ন হয়েছে’ নয়; বরং ‘যে উন্নয়ন হয়েছে, তার প্রতিটি বিনিয়োগ ও উদ্যোগ থেকে আমরা আরও বেশি ফল পেতে পারতাম কি না’। সীমিত সম্পদ, সীমিত সময় এবং বিপুল জনসংখ্যার একটি দেশে এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা অনেক সময় উন্নয়নকে বড় প্রকল্পের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি। নতুন সেতু, মহাসড়ক, ভবন, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিংবা নগর অবকাঠামো নিঃসন্দেহে উন্নয়নের প্রয়োজনীয় অংশ। কিন্তু উন্নয়নের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য স্থাপনা তৈরি করা নয়; মানুষের জীবনকে সহজ, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় করা। একজন কৃষক তার উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কি না, একজন শ্রমিক নিরাপদ কর্মপরিবেশ পাচ্ছেন কি না, একজন তরুণ নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পাচ্ছেন কি না, একটি পরিবার সন্তানকে ভালো শিক্ষা ও চিকিৎসা দিতে পারছে কি নাÑএই বাস্তব প্রশ্নগুলোর উত্তরেই উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য নিহিত। এই জায়গায় এসে আমাদের চিন্তার একটি বড় পরিবর্তন প্রয়োজন। আমরা সমস্যার কথা বলতে পারি, ব্যর্থতার কথা বলতে পারি, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারিÑএগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু সমস্যা চিহ্নিত করার পর আমাদের আলোচনা কতটা দ্রুত সমাধানের দিকে যায়, সেটিও একটি জাতির পরিণত হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। কোনো সমস্যাকে দীর্ঘদিন ধরে শুধু সমস্যা হিসেবে আলোচনা করতে থাকলে মানুষের মধ্যে একসময় হতাশা তৈরি হয়; কিন্তু একই সমস্যার কারণ, সম্ভাব্য সমাধান এবং কোথাও কার্যকর কোনো উদাহরণ নিয়ে আলোচনা হলে সেই সমস্যাই পরিবর্তনের সুযোগে পরিণত হতে পারে।

এখানেই সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বের কথা আসে। একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমের কাজ কখনোই অন্যায় বা অপরাধ আড়াল করা নয়। চুরি, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা সামাজিক অনিয়মÑএসবের অনুসন্ধান ও প্রকাশ সংবাদপত্রের অপরিহার্য দায়িত্ব। কিন্তু সংবাদমাধ্যম যদি সমাজের অন্ধকারের ওপর এত বেশি আলো ফেলে যে সমাজের সম্ভাবনা ও ইতিবাচক পরিবর্তনের জায়গাগুলো প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়, তাহলে পাঠকের সামনে দেশের একটি অসম্পূর্ণ চিত্র তৈরি হয়।

একজন সম্পাদককে তাই শুধু ‘কোন খবরটি বেশি মানুষ পড়বে’Ñএই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই চলবে না; তাকে এটিও ভাবতে হবে, ‘কোন খবরটি মানুষের চিন্তাকে সমৃদ্ধ করবে এবং সমাজকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে’। কোনো এলাকায় অপরাধ বেড়েছেÑতার খবর অবশ্যই হবে। কিন্তু কেন বেড়েছে, এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ কী, অন্য কোথাও কীভাবে একই সমস্যা কমানো হয়েছে এবং সেই অভিজ্ঞতা আমাদের দেশে কাজে লাগানো যায় কি নাÑএসব প্রশ্নও সংবাদে আসা দরকার। একইভাবে কোনো বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান খারাপ হলে সেটি যেমন সংবাদ, তেমনি সীমিত সম্পদের মধ্যেও কোনো বিদ্যালয় অসাধারণ ফল করলে তার সাফল্যের কারণ খুঁজে বের করাও সংবাদ। কৃষিতে কোনো সংকট দেখা দিলে ক্ষতির হিসাব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কোনো কৃষক বা প্রতিষ্ঠান কীভাবে সেই সংকট মোকাবিলা করেছে, সেটিও জানা দরকার।

এই ধরনের সাংবাদিকতা সমস্যাকে ছোট করে না; বরং সমস্যার গভীরে নিয়ে যায়। কারণ শুধু ‘কী ঘটেছে’ জানা আর ‘কেন ঘটেছে এবং কীভাবে পরিবর্তন সম্ভব’ জানা এক বিষয় নয়। একটি পরিণত সংবাদমাধ্যম মানুষের কৌতূহল মেটানোর পাশাপাশি মানুষের বিচারবোধ ও চিন্তাশক্তিকেও সমৃদ্ধ করে। সংবাদপত্র তখন শুধু সংবাদপত্র থাকে না; সমাজের চিন্তা গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে।

তবে সংবাদমাধ্যমের পরিবর্তনের কথা বলতে গিয়ে পাঠকের ভূমিকাও ভুলে গেলে চলবে না। আমরা যে খবরকে বেশি পড়ি, আলোচনা করি এবং ছড়িয়ে দিই, প্রকাশকের বাণিজ্যিক বাস্তবতা অনেক সময় সেই চাহিদার প্রতিফলন ঘটায়। তাই পাঠকেরও নিজের সংবাদ-রুচি নিয়ে ভাবতে হবে। আমরা কি শুধু চাঞ্চল্যকর ঘটনা জানতে চাই, নাকি সেই ঘটনার পেছনের কারণ ও সমাধানও জানতে চাই? আমরা কি শুধু কার ব্যর্থতা হয়েছে তা জানতে চাই, নাকি কে ভালো কাজ করছে এবং তার কাছ থেকে কী শেখা যায় সেটিও জানতে চাই? পাঠকের এই পরিবর্তন সংবাদমাধ্যমের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বড়Ñএ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আইন, বিচার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরির প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্র একা উন্নত সমাজ তৈরি করতে পারে না। নাগরিকের আচরণ, ব্যবসায়িক নৈতিকতা, প্রশাসনিক সংস্কৃতি, শিক্ষার মান, সামাজিক মূল্যবোধ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিÑসবকিছু মিলেই একটি দেশের উন্নয়নের ভিত তৈরি হয়।

আমরা যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলি, কিন্তু নিজের সুবিধার জন্য নিয়ম ভাঙাকে স্বাভাবিক মনে করি, তাহলে পরিবর্তন অসম্পূর্ণ থাকবে। আমরা যদি পরিচ্ছন্ন শহর চাই, কিন্তু নিজের ময়লা যেখানে-সেখানে ফেলি, তাহলে শুধু পৌরসভাকে দায়ী করে লাভ নেই। আমরা যদি ন্যায়বিচার চাই, কিন্তু নিজের স্বার্থে অন্যের অধিকারকে উপেক্ষা করি, তাহলে আমাদের দাবি ও আচরণের মধ্যে একটি মৌলিক অসঙ্গতি থেকে যায়। উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে আমাদের যে শিক্ষা নেওয়া সবচেয়ে জরুরি, তার একটি হলোÑআইন ও প্রতিষ্ঠান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দৈনন্দিন জীবনে দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণও উন্নয়নের ভিত্তি।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষ। আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী, কৃষকের শ্রম, উদ্যোক্তার সাহস, প্রবাসীদের দক্ষতা, গবেষকদের মেধা এবং সাধারণ মানুষের প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতাÑএসবকে বিচ্ছিন্ন শক্তি হিসেবে রেখে দিলে তার পূর্ণ মূল্য পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে শিক্ষা মানুষকে শুধু চাকরির জন্য প্রস্তুত করবে না, দক্ষতা ও উদ্ভাবনের জন্য প্রস্তুত করবে; যেখানে ব্যবসা শুধু মুনাফা নয়, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতার কথাও ভাববে; যেখানে প্রবাসীদের অবদান শুধু অর্থ পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাও দেশের কাজে লাগবে।

আমাদের উন্নয়নের হিসাবেও তাই একটি পরিবর্তন প্রয়োজন। একটি প্রকল্পে কত টাকা খরচ হলো, কত বড় স্থাপনা তৈরি হলোÑএসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। কিন্তু এর সঙ্গে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত: মানুষের জীবন কতটা বদলেছে? কতজনের কর্মসংস্থান হয়েছে? সেবার মান কতটা বেড়েছে? অপচয় কতটা কমেছে? প্রকল্পটি কতটা টেকসই? অর্থাৎ উন্নয়নের মূল্যায়ন শুধু ব্যয়ের অঙ্কে নয়, মানুষের জীবনে তৈরি হওয়া পরিবর্তনের অঙ্কে হওয়া উচিত।

আমার মনে হয়, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাজগুলোর একটি হলো জাতীয় আলোচনার ভাষা বদলানো। আমরা যেন শুধু ‘কে দোষী’ প্রশ্নে আটকে না থেকে ‘কীভাবে ঠিক করা যায়’ প্রশ্নটিকেও সমান গুরুত্ব দিই। শুধু ব্যর্থতার উদাহরণ খুঁজে না বেড়িয়ে সফলতার কারণ অনুসন্ধান করি। শুধু অধিকার নিয়ে কথা না বলে দায়িত্বের কথাও বলি। শুধু সরকারের কাছে প্রত্যাশা না রেখে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কী করা যায়, সেটিও বিবেচনা করি। একটি জাতির অগ্রগতি শুরু হয় তখনই, যখন তার মানুষ সমস্যাকে শুধু অভিযোগের বিষয় হিসেবে নয়, সমাধানের দায়িত্ব হিসেবেও দেখতে শেখে।

প্রায় চার যুগ দেশের বাইরে থেকেও তাই দেশের উন্নয়নের প্রশ্নটি আমার কাছে শেষ হয়ে যায়নি। বরং সময় যত গেছে, প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট হয়েছেÑআমরা কি আমাদের সীমিত সম্পদকে সর্বোচ্চ দক্ষতায় ব্যবহার করছি? আমরা কি মানুষের মেধা ও শ্রমের যথাযথ মূল্য দিচ্ছি? আমরা কি আমাদের সন্তানদের শুধু পরীক্ষায় সফল হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছি, নাকি জীবন ও সমাজের সমস্যা সমাধানের শিক্ষা দিচ্ছি? আমাদের সংবাদমাধ্যম কি শুধু সমাজের ক্ষত দেখাচ্ছে, নাকি সুস্থতার পথও দেখাচ্ছে? আমাদের জাতীয় আলোচনায় কি সমস্যার পাশাপাশি সমাধানের যথেষ্ট জায়গা আছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একদিনে পাওয়া যাবে না। কিন্তু প্রশ্নগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবা শুরু করাই পরিবর্তনের শুরু হতে পারে। বাংলাদেশের উন্নয়ন থেমে নেই; বরং আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই উন্নয়নের গতি, মান ও সুফলকে আরও বহুগুণ বাড়ানো। তার জন্য অর্থনীতি যেমন বদলাতে হবে, প্রতিষ্ঠান যেমন শক্তিশালী করতে হবে, তেমনি আমাদের চিন্তার ধরনও বদলাতে হবে।
আমরা যদি সত্যিই দ্রুত উন্নত বাংলাদেশ চাই, তাহলে শুধু আরও বেশি সম্পদ নয়Ñসম্পদের আরও ভালো ব্যবহার, শুধু আরও বেশি প্রকল্প নয়Ñআরও ভালো অগ্রাধিকার, শুধু আরও বেশি সংবাদ নয়Ñআরও দায়িত্বশীল সংবাদ এবং শুধু অন্যের পরিবর্তনের দাবি নয়Ñনিজেদের পরিবর্তনের সাহস প্রয়োজন।

কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো দেশ বাইরে থেকে এসে বদলে দিয়ে যায় না।
একটি দেশ বদলায় তার নিজের মানুষ যখন সিদ্ধান্ত নেয়Ñসমস্যার কাছে আমরা আর শুধু অভিযোগকারী হয়ে থাকব না; আমরা তার সমাধানের অংশ হব। বাংলাদেশের সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।

হক মো. ইমদাদুল, জাপান: লেখক, সংগ্রাহক ও গবেষক