নবম পে-স্কেল: এক শ্রেণির স্বস্তি, কোটি মানুষের বঞ্চনা?
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
দীর্ঘ প্রায় এক যুগ পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। নতুন বেতন কাঠামোয় সর্বনি¤œ প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য সুবিধাভোগী এ সিদ্ধান্তে উপকৃত হবেন।
সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির বাস্তবতা বিবেচনায় বেতন বৃদ্ধি অবশ্যই যৌক্তিক। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে দেশের বেসরকারি চাকরিজীবী, শ্রমিক ও নি¤œআয়ের মানুষের জীবনযাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সমান্তরাল পরিকল্পনা কী? নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
সরকারি কর্মচারীদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ গেলে বাজারে ভোগক্ষমতা বাড়বে, যা সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। রাজস্ব আদায়ে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি না এলে এত বড় ব্যয় রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি ও বাজেট ব্যবস্থাপনার জন্যও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সরকারি খাতে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারি খাতের কর্মীদের মধ্যেও বেতন বৃদ্ধির প্রত্যাশা তৈরি করবে। কিন্তু গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একই হারে বেতন বাড়ানো সম্ভব নাও হতে পারে। ফলে সরকারি ও বেসরকারি কর্মজীবীদের আয়ের ব্যবধান আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় দেশের বিশাল অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার। দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারীসহ কোটি কোটি মানুষের কোনো নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নেই।
সরকারি কর্মচারীর বেতন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে বাড়লেও দ্রব্যমূল্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন শ্রমজীবী মানুষের আয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ে না। অথচ একই বাজার থেকে সরকারি কর্মকর্তা ও দিনমজুর দুজনকেই চাল, ডাল, তেল ও ওষুধ কিনতে হয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান উন্নত করা নয়, শ্রমিক, কৃষক, বেসরকারি চাকরিজীবী ও নি¤œআয়ের মানুষের জন্যও ন্যূনতম মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা।
সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তার সঙ্গে সামাজিক বৈষম্য কমানোর কার্যকর উদ্যোগও জরুরি। শুধু বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি কমবে এমন নিশ্চয়তাও নেই। বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজন জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং সরকারি সেবার মান বৃদ্ধি।
জনগণ স্বাভাবিকভাবেই আশা করবে, বাড়তি রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের বিনিময়ে তারা আরও দ্রুত, দক্ষ ও জনবান্ধব সেবা পাবেন। নবম পে-স্কেল তাই শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারেরও একটি পরীক্ষা। সরকারি কর্মচারীদের মুখে হাসি ফুটুক, সেটিই কাম্য। কিন্তু সেই স্বস্তি যেন দেশের শ্রমজীবী ও নি¤œআয়ের মানুষের বঞ্চনার কারণ না হয় রাষ্ট্রকে সেই ভারসাম্যও নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা









