বিশ্ব ফুসফুস ক্যান্সার সচেতনতা দিবস: প্রতিরোধই হতে পারে সর্বোত্তম চিকিৎসা
সাকিবুর রহমান বাবলা
পহেলা আগস্ট বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব ফুসফুস ক্যান্সার সচেতনতা দিবস ফুসফুস ক্যান্সারের ঝুঁকি, কারণ, প্রাথমিক লক্ষণ, প্রতিরোধ এবং আধুনিক চিকিৎসা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, রোগীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ এবং গবেষণাকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে দিবসটি পালন করা হয়। বর্তমান বিশ্বে ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ফুসফুস ক্যান্সার। অথচ সময়মতো সচেতনতা, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং দ্রুত রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে এ রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
বিশ্ব ফুসফুস ক্যান্সার সচেতনতা দিবসের সূচনা হয় ২০১২ সালে। আন্তর্জাতিক শ্বাসতন্ত্রবিষয়ক সংগঠনগুলোর জোট Forum of International Respiratory Societies (FIRS), International Association for the Studz of Lung Cancer (IASLC) এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসংস্থা যৌথভাবে দিবসটি চালু করে। তাদের লক্ষ্য ছিল ফুসফুস ক্যান্সার সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের গুরুত্ব তুলে ধরা এবং রোগীদের জন্য উন্নত চিকিৎসা ও গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণে বৈশ্বিক সমর্থন গড়ে তোলা। বর্তমানে দিবসটি বিশ্বব্যাপী চিকিৎসক, গবেষক, রোগী সংগঠন এবং জনস্বাস্থ্যকর্মীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সচেতনতামূলক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। ফুসফুস মানবদেহের শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যবস্থার প্রধান অঙ্গ, যা বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে রক্তে পৌঁছে দেয় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড শরীর থেকে বের করে দেয়। এটি শরীরের অম্ল-ক্ষারের ভারসাম্য রক্ষা এবং স্বাভাবিক শারীরিক কার্যক্রম পরিচালনায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন জিনগত বা পরিবেশগত কারণে ফুসফুসের কোষে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে এবং সেগুলো নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, তখন ফুসফুস ক্যান্সারের সৃষ্টি হয়। তবে রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে সফল চিকিৎসার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ফুসফুস ক্যান্সার বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া ক্যান্সারগুলোর একটি এবং ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর প্রধান কারণ। ২০২২ সালে বিশ্বে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ নতুন করে ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় এবং প্রায় ১৮ লাখ মানুষ এ রোগে মৃত্যুবরণ করে। অর্থাৎ ক্যান্সারজনিত মোট মৃত্যুর একটি বড় অংশের জন্য ফুসফুস ক্যান্সার দায়ী। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তামাক ব্যবহার, বায়ু দূষণ এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে বিলম্বের কারণে এ রোগের বোঝা আরও বাড়ছে।
বাংলাদেশেও ফুসফুস ক্যান্সার একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। দেশে তামাক ব্যবহার এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটার দূষণ, শিল্পকারখানার নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলাবালি এবং নগরাঞ্চলের বায়ু দূষণ মানুষের ফুসফুসের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। গ্রামীণ এলাকায় কাঠ, খড় ও অন্যান্য জৈব জ্বালানি ব্যবহার করে রান্নার ফলে সৃষ্ট ধোঁয়াও ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। তাই ফুসফুস ক্যান্সার প্রতিরোধে স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ফুসফুস ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ ধূমপান, যা এ রোগজনিত প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তামাকের ধোঁয়ায় থাকা বিষাক্ত ও ক্যান্সারসৃষ্টিকারী উপাদান ফুসফুসের কোষের ক্ষতি করে। শুধু ধূমপায়ীরাই নয়, পরোক্ষ ধূমপানের শিকার ব্যক্তিরাও ঝুঁকিতে থাকেন। এছাড়া রেডন গ্যাস, অ্যাসবেস্টস ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ, বায়ুদূষণ, শিল্পকারখানার ধোঁয়া এবং অতি সূক্ষ্ম ধূলিকণা ফুসফুস ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। পরিবারে এ রোগের ইতিহাস থাকলে বা সিওপিডি, পালমোনারি ফাইব্রোসিস কিংবা যক্ষ্মার মতো ফুসফুসজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঝুঁকি আরও বেশি।
ফুসফুস ক্যান্সারের আরেকটি বড় সমস্যা হলো এর নীরব অগ্রগতি। রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। ফলে অনেক রোগী তখনই চিকিৎসকের কাছে আসেন, যখন রোগটি অনেক দূর অগ্রসর হয়ে যায়। তবে দীর্ঘদিন কাশি থাকা, কাশির সঙ্গে রক্ত আসা, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, কণ্ঠস্বর কর্কশ হয়ে যাওয়া, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, ক্ষুধামন্দা, অতিরিক্ত ক্লান্তি কিংবা ঘন ঘন নিউমোনিয়া বা ব্রঙ্কাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ফুসফুস ক্যান্সার নির্ণয়ে বর্তমানে চেস্ট এক্স-রে, লো-ডোজ সিটি স্ক্যান, ব্রঙ্কোস্কোপি, পেট-সিটি স্ক্যান ও বায়োপসিসহ বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়, যার মধ্যে বায়োপসি ক্যান্সার নিশ্চিত করার চূড়ান্ত পরীক্ষা। চিকিৎসাক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে; অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির পাশাপাশি টার্গেটেড থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপির মতো আধুনিক পদ্ধতি রোগীদের নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। রোগের ধরন, পর্যায় ও শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশ সরকারও ফুসফুস ক্যান্সার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, তামাকপণ্যের ওপর কর বৃদ্ধি এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় ক্যান্সার প্রতিরোধে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। মহাখালীর জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচে ক্যান্সার নির্ণয় ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্নভাবে সরকারি সহায়তায় অসচ্ছল ক্যান্সার রোগীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থাগুলো বিশ্বব্যাপী তামাক নিয়ন্ত্রণ, বায়ু দূষণ হ্রাস, প্রাথমিক রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির প্রসারে কাজ করছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-এর আওতায় অসংক্রামক রোগজনিত অকালমৃত্যু কমানোর বৈশ্বিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ফুসফুস ক্যান্সার প্রতিরোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
ফুসফুস ক্যান্সার প্রতিরোধে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রÑসবারই ভূমিকা রয়েছে। ধূমপান বর্জন, পরোক্ষ ধূমপান থেকে দূরে থাকা, দূষিত পরিবেশে মাস্ক ব্যবহার, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিয়মিত ব্যায়াম, পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সরকারকে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ক্যান্সার স্ক্রিনিং কার্যক্রম সম্প্রসারণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশ্ব ফুসফুস ক্যান্সার সচেতনতা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ফুসফুস ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু চিকিৎসকদের নয়, বরং সমগ্র সমাজের দায়িত্ব। সচেতনতা, প্রতিরোধ, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক চিকিৎসার সমন্বয়ই পারে এই প্রাণঘাতী রোগের বোঝা কমাতে। বিশ্ব ফুসফুস ক্যান্সার সচেতনতা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোকÑতামাকমুক্ত জীবন, নির্মল পরিবেশ এবং সুস্থ ফুসফুস নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।












