আশাশুনির জেলেপাড়ায় হাহাকার: সাগরে মানা, ঘরে অভাবের ৫৮ দিন
সচ্চিদানন্দ দে সদয়, আশাশুনি: ঘাটে বাঁধা নৌকাগুলো জোয়ারের জলে দুলছে। সাগরে যাওয়ার জন্য নৌকাগুলোর এই ছটফটানি থাকলেও পাড়ে বসে থাকা মানুষগুলোর চোখেমুখে পাথরের মতো নিস্তব্ধতা। সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার উপকূলীয় জেলেপাড়াগুলোতে এখন এমনই গুমোট আবহাওয়া। সাগরে মাছ ধরার ওপর ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শুরু হতেই থমকে গেছে হাজারো জেলের জীবন ও জীবিকার চাকা। নেই জাল বোনার ব্যস্ততা, নেই রুপালি ইলিশের ঝিলিক; আছে শুধু অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দীর্ঘশ্বাস।
সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার সব ধরনের মাছ আহরণ ও বিপণন নিষিদ্ধ করেছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ইতিবাচক হলেও তাৎক্ষণিকভাবে উপকূলের এই জনপদে নেমে এসেছে চরম হাহাকার। অনেক ঘরে এখন দুবেলা উনুন জ্বলা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
উপকূলের এক প্রবীণ জেলে বলেন, “সাগর আমাগো মা। মা তো অনেক দেয়, কিন্তু এই দুই মাস আমাগো ঘরে বসে থাকতে হয়। সাগরে যাওয়ার অনুমতি নেই, আবার হাত পাতারও জায়গা নেই। সরকার চাল দেবে বলছে, কিন্তু সেই চাল ঘরে আসতে আসতে ঋণের বোঝা পাহাড় হয়ে যাবে।”
নিষেধাজ্ঞার এই কঠিন সময়ে জেলেদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত বুধবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ইউএনও শ্যামানন্দ কু-ুর সভাপতিত্বে ওই সভায় উপজেলার ৪ হাজার ৫৫৫ জন নিবন্ধিত জেলের প্রত্যেককে ৭৭ কেজি করে চাল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) শফিকুল ইসলাম জানান, দ্রুততম সময়ে প্রকৃত জেলেদের হাতে এই সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। ইউএনও শ্যামানন্দ কু-ু বলেন, “আমরা কঠোর নজরদারি রাখছি যেন প্রকৃত জেলেরা বঞ্চিত না হন।”
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বেশ রূঢ়। অনেক জেলের অভিযোগ, নিবন্ধনের জটিলতায় প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অনেকেই তালিকার বাইরে রয়ে গেছেন। আবার যারা তালিকায় আছেন, তাঁদের আশঙ্কাÑবরাদ্দ পৌঁছাতে দেরি হলে দাদন ব্যবসায়ীদের ঋণের জালে আটকে পড়তে হবে তাঁদের। নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দামের এই বাজারে শুধু চাল দিয়ে পরিবারের চিকিৎসা বা অন্যান্য খরচ মেটানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৎস্য সম্পদ রক্ষায় এই নিষেধাজ্ঞা জরুরি হলেও বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে প্রান্তিক এই মানুষগুলোর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
আশাশুনির জেলেপাড়ায় এখন এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। নৌকা আছে, জাল আছে, সামনে অবারিত জলরাশিও আছে; নেই শুধু সেখানে যাওয়ার অনুমতি। প্রতিদিন বিকেলে নদীর তীরে অপলক চেয়ে থাকেন জেলেরা। তাঁদের এই দৃষ্টি যেন এক নীরব আর্তিÑকবে শেষ হবে এই প্রতীক্ষা? কবে আবার ঢেউয়ের মিতালি করে ফিরবেন রুপালি ফসলের পসরা নিয়ে?







