কিস্তির খাতায় বন্দী গ্রামের জীবন/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
ভোর হলেই গ্রামের রাস্তায় মানুষের চলাচল শুরু হয়। কেউ মাঠে যাচ্ছেন, কেউ বাজারের দিকে, কেউ দোকানের ঝাঁপ তুলছেন। কারও হাতে কোদাল, কারও মাথায় সবজির ঝুড়ি, কারও ভ্যানের পেছনে দিনের পণ্য। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবেÑগ্রাম তার স্বাভাবিক ছন্দেই চলছে।কিন্তু এই স্বাভাবিক ছবির আড়ালে আরেকটি অদৃশ্য হিসাব চলছে। কারও আজ কিস্তি দেওয়ার দিন। কারও কাল। কারও আবার ব্যক্তিগত ধার করা টাকার সুদ দেওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে।এই গ্রামের নাম ধরা যাক শান্তিপুর। বাংলাদেশের হাজারো গ্রামের মতোই একটি সাধারণ গ্রাম। পাকা-আধাপাকা বাড়ি, সরু রাস্তা, ছোট বাজার, মসজিদ-মন্দির, স্কুল, চায়ের দোকান আর চারপাশে কৃষিজমি।
গ্রামের মানুষের জীবন খুব সাধারণ। কিন্তু তাঁদের হিসাব এখন আর ততটা সহজ নয়। শান্তিপুরের রহিম মিয়া ছোট একটি মুদি দোকান চালান। দোকানে চাল, ডাল, তেল, বিস্কুট, সাবানÑসবই আছে। কিন্তু দোকানের তাক যতটা পণ্যভরা, তাঁর মাথার ভেতরের হিসাব তার চেয়েও বেশি।
একটি এনজিওর কিস্তি আছে। ব্যবসা বাড়ানোর জন্য আরেক জায়গা থেকে নেওয়া টাকা আছে। মেয়ের পড়াশোনার জন্য নেওয়া ব্যক্তিগত ধার আছে। সকালবেলা দোকান খোলার আগে তাঁর প্রথম চিন্তাÑআজ কত টাকা বিক্রি হবে? কারণ বিক্রি শুধু সংসারের জন্য নয়, কিস্তির জন্যও দরকার।
দুপুরে দোকানে ক্রেতা কম হলে তাঁর মুখ ভার হয়ে যায়। সন্ধ্যায় বিক্রি আশানুরূপ না হলে তিনি নীরবে হিসাব করেনÑআজকের টাকা দিয়ে আগামীকালের কিস্তি হবে তো? রহিম মিয়ার গল্প কাল্পনিক। কিন্তু তাঁর মতো হিসাব কষতে কষতে দিন কাটানো মানুষের সংখ্যা বাংলাদেশে কম নয়।
গ্রামের আরেক প্রান্তে কৃষক হাবিবুর রহমান। ধান চাষ করেছেন ঋণ নিয়ে। সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিকÑসবকিছুর খরচ বেড়েছে। ফসল ভালো হলে তিনি ঋণ শোধ করবেন। কিন্তু প্রকৃতি কি সব সময় কৃষকের পক্ষে থাকে?কখনো অতিবৃষ্টি, কখনো খরা, কখনো জলাবদ্ধতা, কখনো রোগবালাই। ফসলের বাজারদরও নিশ্চিত নয়। অথচ ঋণের কিস্তির তারিখ নিশ্চিত। ফসল মাঠে থাকুক বা না থাকুক, কিস্তির হিসাব সামনে চলে আসে। শান্তিপুরের একটি পরিবারকে ধরা যাক। বাবা এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন। মা অন্য একটি সমিতি থেকে কিছু টাকা নিয়েছেন। ছেলের চিকিৎসার সময় প্রতিবেশীর কাছ থেকে ব্যক্তিগতভাবে টাকা ধার করা হয়েছে।তিনটি ঋণ। তিন ধরনের হিসাব।
মাসের আয় সীমিত। কিন্তু টাকা দেওয়ার জায়গা তিনটি।ফলে মাসের শুরুতেই পরিবারের আয়ের বড় অংশ চলে যায় ঋণ পরিশোধে। এরপর বাজার খরচ, বিদ্যুৎ বিল, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসাÑসবকিছুর জন্য আবার টাকার প্রয়োজন হয়। তখন শুরু হয় নতুন ধার। ঋণ শোধ করতে গিয়ে নতুন ঋণ। এই চক্রই সবচেয়ে ভয়ংকর। ব্যক্তিগত সুদের টাকা গ্রামে এমন মানুষও আছেন, যাঁরা ব্যাংক বা এনজিওর নিয়মকানুনের বাইরে পরিচিতজনের কাছ থেকে টাকা ধার করেন। কারণ প্রয়োজনের সময় দ্রুত টাকা দরকার। কাগজপত্র লাগে না। অপেক্ষা করতে হয় না। কিন্তু সেই টাকার সঙ্গে যদি উচ্চ সুদের বোঝা যুক্ত হয়, তাহলে সাময়িক স্বস্তি পরে দীর্ঘস্থায়ী সংকটে পরিণত হতে পারে।মূল টাকা পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সুদের টাকা জমতে থাকে।
একসময় ঋণগ্রহীতার কাছে মনে হয়Ñতিনি যেন একটি গর্ত থেকে বের হতে গিয়ে আরেকটি গর্তে পড়েছেন। গ্রামের চায়ের দোকান সাধারণত খবরের জায়গা। কে কোথায় গেলেন, কার ছেলে চাকরি পেল, কার মেয়ের বিয়েÑসব খবর সেখানে পাওয়া যায়। কিন্তু শান্তিপুরের চায়ের দোকানে এখন আরেকটি কথাও শোনা যায়Ñ‘কিস্তি কবে?’ ‘কত টাকা বাকি?’ ‘ওই টাকা কবে দেবে?’ ‘আরেক জায়গা থেকে ধার পাওয়া যাবে কি? ’কেউ প্রকাশ্যে বলেন, কেউ নিচু গলায়।কারণ ঋণের কথা বলা অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর।
সবচেয়ে বড় বোঝাÑমানসিক চাপটাকার অভাব চোখে দেখা যায়। কিন্তু দুশ্চিন্তা দেখা যায় না। একজন মানুষ সারাদিন কাজ করছেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন, হাসছেন। অথচ রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় তাঁর মাথায় ঘুরছেÑআগামীকাল টাকা কোথা থেকে আসবে?কিস্তি কীভাবে দেব? পাওনাদারকে কী বলব? সংসারের খরচ কীভাবে চলবে? এই প্রশ্নগুলো দিনের পর দিন চলতে থাকলে মানুষ মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারেন। আর এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। সাতক্ষীরার আশ্শুনির বুধহাটা গ্রামের দিপংকর দত্তের আকস্মিক মৃত্যু আমাদের এই বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয়; যথাযথ চিকিৎসা-তথ্য ও তদন্ত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়া উচিত নয়।কিন্তু তাঁর জীবনকে ঘিরে যদি আর্থিক চাপ, এনজিওর কিস্তি, ব্যক্তিগত সুদ ও দুশ্চিন্তার বাস্তবতা থেকে থাকে, তাহলে সেটি নিছক ব্যক্তিগত বিষয় বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।কারণ শান্তিপুরের মতো বাংলাদেশের হাজারো গ্রামে একই গল্প ভিন্ন নামে লেখা হচ্ছে। কেউ দোকানদার। কেউ কৃষক। কেউ শ্রমিক। কেউ ছোট ব্যবসায়ী।
কিন্তু অনেকের জীবনের হিসাব একইÑআয় একদিকে, কিস্তি আরেকদিকে।এ সমস্যা শুধু গ্রামের নয়। শহরের নি¤œমধ্যবিত্ত পরিবারও ঋণের চাপের বাইরে নয়। বাড়িভাড়া, সন্তানের স্কুল, চিকিৎসা, বাজার, পরিবহনÑসব খরচের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ঋণ। বেতন আসার আগেই বেতনের একটি অংশের মালিক হয়ে যায় বিভিন্ন কিস্তি। ফলে বেতন বাড়লেও স্বস্তি বাড়ে না। এ যেন নতুন এক বাস্তবতাÑমানুষ আয় করছে, কিন্তু নিজের আয়ের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ কমে যাচ্ছে। ঋণ দরকার, কিন্তু ঋণের ফাঁদ নয়ঋণ বন্ধ করা কোনো সমাধান নয়। বরং দরকার দায়িত্বশীল ঋণব্যবস্থা।
মানুষের আয় ও পরিশোধ ক্ষমতা বিবেচনা করে ঋণ দিতে হবে। একাধিক ঋণের ঝুঁকি কমাতে হবে। দুর্যোগ বা ব্যবসায়িক ক্ষতির ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত পুনঃতফসিলের সুযোগ থাকতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলোÑঋণগ্রহীতাকে শুধু টাকা ফেরত দেওয়ার যন্ত্র হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে দেখা। শান্তিপুর কোনো নির্দিষ্ট গ্রামের নাম নয়। এটি বাংলাদেশের হাজারো গ্রামের প্রতীক।ভোরে সেখানে সূর্য ওঠে। কৃষক মাঠে যান। দোকান খোলে। স্কুলে শিশুরা যায়। বাজারে মানুষ কেনাকাটা করে। সবকিছু স্বাভাবিক। কিন্তু সেই স্বাভাবিক জীবনের ভেতর দিয়ে অনেক মানুষ প্রতিদিন অদৃশ্য এক বোঝা বহন করেন। কিস্তির বোঝা। ব্যক্তিগত সুদের বোঝা।
সংসারের দায়ের বোঝা।আর সবশেষেÑদুশ্চিন্তার বোঝা। আশাশুনির বুধহাটা গ্রামের দিপংকর আর নেই। তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ যা-ই হোক, তাঁর জীবনকে ঘিরে ওঠা প্রশ্নগুলো আমাদের থামিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। আমরা কি মানুষের হাতে ঋণ তুলে দিয়ে শুধু কিস্তি আদায়ের হিসাব করছি? নাকি দেখছিÑঋণ নেওয়ার পর মানুষটি কেমন আছেন?
কারণ একটি ঋণগ্রহীতা পরিবার শুধু একটি হিসাবের খাতা নয়।সেখানে থাকে মানুষের স্বপ্ন, সন্তানের ভবিষ্যৎ, সংসারের হাসি-কান্না এবং বেঁচে থাকার সংগ্রাম। ঋণ মানুষের জীবনকে এগিয়ে নিকÑমানুষ যেন ঋণের ভারে পিছিয়ে না পড়ে। এটাই হওয়া উচিত আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।
লেখক: সংবাদ কর্মী






