শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

আশাশুনিতে বজ্রপাতে গৃহবধূর মৃত্যু

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৫৭ পূর্বাহ্ণ
আশাশুনিতে বজ্রপাতে গৃহবধূর মৃত্যু

আশাশুনি প্রতিনিধি: আশাশুনি উপজেলার কুল্যা ইউনিয়নে আকস্মিক বজ্রপাতে রুবিনা খাতুন (২৫) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টার দিকে ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কচুয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত রুবিনা খাতুন ওই গ্রামের ইলিয়াস আলীর স্ত্রী। তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দুপুরে রুবিনা খাতুন নিজ বাড়ির পেছনে গবাদিপশুর জন্য ঘাস কাটছিলেন। এ সময় হঠাৎ বজ্রপাত হলে তিনি ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

Ads small one

দস্যুমুক্ত সুন্দরবনই হোক জাতীয় অঙ্গীকার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১:২৪ অপরাহ্ণ
দস্যুমুক্ত সুন্দরবনই হোক জাতীয় অঙ্গীকার

মো. মামুন হাসান

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন নদীর মাঝিদের কথা, যাঁদের জীবন নদীর মতোই অনিশ্চিত, অথচ নদীকে ছাড়া যাঁদের জীবন অচল। সুন্দরবনের জেলে ও মৌয়ালদের দিকে তাকালে সেই পদ্মাপারের মাঝিদের ছবিই চোখে ভাসে। পার্থক্য এটুকুই, এখানে নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অস্ত্রধারী দস্যুদের ছায়া। বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তে বিস্তৃত এই বনভূমি আমাদের জাতীয় পরিচয়ের সবুজ ঢাল, জীববৈচিত্র্যের অমূল্য ভাণ্ডার এবং লক্ষাধিক মানুষের জীবিকার ঠিকানা।

 

ইউনেস্কো একে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দিয়েছে, রামসার তালিকাতেও পেয়েছে স্বীকৃতি। অথচ এই বনের গভীরে বছরের পর বছর ধরে যে ভয়ের সংস্কৃতি বাসা বেঁধেছে, তা প্রকৃতির এই বিস্ময়কে করেছে ম্লান এবং মানুষের জীবনকে করেছে অনিশ্চিত। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, দস্যুমুক্ত সুন্দরবন কোনো দূরের স্বপ্ন নয়; এটি আমাদের সম্মিলিত অস্তিত্বের পূর্বশর্ত।

 

সুন্দরবনের সৌন্দর্য কবিদের চিরকাল আকৃষ্ট করেছে। জীবনানন্দ দাশ যে রূপসী বাংলার ছবি এঁকেছিলেন, নদী, মাঠ আর ভাটফুলের গন্ধে ভরা সেই বাংলার সবচেয়ে বন্য ও রহস্যময় রূপটি ধরা দেয় এই বনেই। সেই সৌন্দর্য যদি ভয়ের পর্দায় ঢাকা পড়ে, তবে ক্ষতি কেবল অর্থনীতির নয়, আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারেরও। বনবিবি ও দক্ষিণ রায়ের লোককথা আমাদের শেখায়, বিপদে পড়লে মানুষ এই বনে বনদেবীর কাছে আশ্রয় খুঁজেছে। এসব লোকবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্কের যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা আমাদের বিনয় ও বিশ্বাসের শিক্ষা দেয়। অথচ আজ সেই বিশ্বাসের জায়গায় স্থান করে নিয়েছে আতঙ্ক। দস্যুরা যেন লোককথার সেই বাঘের চেয়েও ভয়ংকর রূপে হাজির হয়েছে। কারণ, বাঘের আচরণে অন্তত প্রকৃতির নিয়ম কাজ করে; দস্যুদের কাছে আছে কেবল লোভ।

যাঁরা এই বনের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকেন, তাঁদের কথা ভাবুন। জেলের জাল কেবল মাছ ধরে না, একটি পরিবারের চুলাও জ্বালিয়ে রাখে। মৌয়ালের কাঁধের চাক কেবল মধু আনে না, জোগায় সন্তানের বই-খাতার খরচ। বাঘের থাবা আর কুমিরের আক্রমণ তাঁদের নিত্যদিনের ঝুঁকি। এর সঙ্গে যখন যুক্ত হয় অপহরণ, মুক্তিপণ ও চাঁদাবাজি, তখন জীবিকা অর্জন পরিণত হয় জীবন বাজি রাখার খেলায়। মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করতে ভিটেমাটি বিক্রি করা পরিবারগুলো আবার ঋণের জালে জড়িয়ে একই বনে ফিরতে বাধ্য হয় এবং পুনরায় একই ভয়ের মুখোমুখি হয়। এভাবে দস্যুতা হয়ে ওঠে দারিদ্র্যকে পুনরুৎপাদনকারী এক নিষ্ঠুর চক্র।

পর্যটনবিজ্ঞানের আলোকে দেখলে সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়। মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম মাসলোর চাহিদার স্তরবিন্যাস তত্ত্ব আমাদের শেখায়, খাদ্য ও আশ্রয়ের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি মানুষের কাছে নিরাপত্তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তার ভিত্তি দুর্বল হলে সৌন্দর্য উপভোগ কিংবা আত্মোপলব্ধির উচ্চতর স্তরে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো ভ্রমণকারী এমন গন্তব্যে অবকাশ যাপন করতে চান না, যেখানে নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। রিচার্ড বাটলারের পর্যটন গন্তব্যের জীবনচক্র তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রতিটি গন্তব্য আবিষ্কার, উন্নয়ন ও সংহতিসহ বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে। যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কোনো গন্তব্য নবজীবন পেতে পারে, আবার অব্যবস্থাপনার কারণে ক্ষয়ের পথেও এগিয়ে যেতে পারে। নিরাপত্তাহীনতা সেই ক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে। বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে সুন্দরবনের যে সম্ভাবনাময় অবস্থান তৈরি হওয়ার কথা ছিল, দস্যুভীতি তাকে বারবার পিছিয়ে দিয়েছে।

পর্যটন গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো গন্তব্যের ভাবমূর্তি বাস্তব পরিস্থিতির চেয়েও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। একটি অপহরণের খবর হাজারটি ইতিবাচক প্রচারণার সুফল মুহূর্তেই ম্লান করে দিতে পারে। এর প্রভাব পড়ে পর্যটন গাইড, নৌযানচালক, রিসোর্টকর্মী, হস্তশিল্পী ও স্থানীয় খাদ্য ব্যবসায়ীদের ওপর। জন ডক্সির বিরক্তি সূচক তত্ত্ব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্থানীয় মানুষের আস্থা ও সহযোগিতা ছাড়া পর্যটনের টেকসই বিকাশ সম্ভব নয়। অন্যদিকে, সম্প্রদায়ভিত্তিক পর্যটনের দর্শন বলে, পর্যটনের সুফল যখন বনসংলগ্ন মানুষের ঘরে পৌঁছায়, তখন তাঁরাই হয়ে ওঠেন বনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রহরী। দস্যুতা এই আস্থার বন্ধন ভেঙে দেয়। টেকসই পর্যটনের তিনটি স্তম্ভ—অর্থনীতি, সমাজ ও পরিবেশ—সব কটিতেই একযোগে আঘাত হানে দস্যুতা। অর্থনীতিতে স্থবিরতা, সমাজে ভয় ও বিভাজন এবং পরিবেশে অবৈধ শিকার ও বনসম্পদ লুটের প্রবণতা বাড়ে।

এবার আসা যাক রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রসঙ্গে। টমাস হবস ও জন লকের সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের মূল কথা হলো, নাগরিকেরা নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার প্রত্যাশায় রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব মেনে নেন। যে জেলে বা মৌয়াল রাষ্ট্রের অনুমতিপত্র নিয়ে বনে প্রবেশ করেন, তিনিও এই সামাজিক চুক্তির অংশীদার। তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাই কোনো দয়া নয়; বরং রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। অ্যালবার্ট ভেন ডাইসির আইনের শাসনের ধারণা অনুযায়ী, আইনের চোখে সবাই সমান এবং কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অস্ত্রের জোরে বনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা দস্যু বাহিনী এই নীতির প্রকাশ্য লঙ্ঘন করে।

আমাদের সংবিধানও এ বিষয়ে নীরব নয়। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয়লাভ ও আইনানুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার এবং ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। ১৮ক অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে পরিবেশ, বন, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণসংক্রান্ত আইনেও বনসম্পদ ও বন্যপ্রাণী রক্ষার বিধান রয়েছে। এসব সাংবিধানিক অঙ্গীকার যদি কেবল গ্রন্থের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা নিষ্প্রাণ অক্ষরমালায় পরিণত হবে। সুন্দরবনের গভীরে এসব অঙ্গীকারের বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হবে নিয়মিত টহল, কার্যকর নজরদারি ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে।

অপরাধ দমনের তত্ত্বও আমাদের পথ দেখায়। সিজার বেকারিয়ার মতে, শাস্তির কার্যকারিতা কেবল কঠোরতার ওপর নির্ভর করে না; বরং শাস্তি নিশ্চিত ও দ্রুত হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। কোহেন ও ফেলসনের রুটিন কার্যকলাপ তত্ত্ব অনুযায়ী, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে যখন অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি, উপযুক্ত লক্ষ্যবস্তু এবং কার্যকর অভিভাবকত্বের অনুপস্থিতি একই সঙ্গে উপস্থিত থাকে। সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ জলপথে কার্যকর নজরদারির ঘাটতি পূরণ করাই এখানে বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য প্রয়োজন নিয়মিত যৌথ টহল, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, জেলেদের জন্য জরুরি সংকেত পাঠানোর প্রযুক্তি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।

তবু আমি বিশ্বাস করি, কেবল অস্ত্রের জোরে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট মার্টনের চাপ তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজ যখন মানুষের সামনে সাফল্যের লক্ষ্য তুলে ধরে, অথচ সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর বৈধ সুযোগ সীমিত রাখে, তখন কেউ কেউ অপরাধের পথে পা বাড়াতে পারে। উপকূলের অনেক তরুণ দারিদ্র্য, নদীভাঙন ও কর্মহীনতার চাপে অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। তাই আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের পুনর্বাসন, বিকল্প কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ জরুরি। অপরাধ দমন ও অপরাধীদের পুনর্বাসন—এই দুটি উদ্যোগ সমান্তরালে কার্যকর হলেই দস্যুতা নির্মূলের লক্ষ্য বাস্তব রূপ পেতে পারে। দারিদ্র্যের শিকড় অক্ষত রেখে কেবল ডালপালা ছেঁটে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা যায় না।

আমি আমার শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন শেখাই, আতিথেয়তা মানে কেবল অতিথিকে আপ্যায়ন করা নয়, তাঁকে নিরাপদ বোধ করানোও। যে গন্তব্য পর্যটককে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে না, সে আতিথেয়তার গর্ব করতে পারে না। সুন্দরবনসংলগ্ন অঞ্চলের তরুণেরা আজ পর্যটনশিক্ষায় নিজেদের দক্ষ করে তুলছেন। কেউ হতে চান প্রকৃতিবিষয়ক গাইড, কেউ ইকো-রিসোর্টের ব্যবস্থাপক, আবার কেউ স্থানীয় উদ্যোক্তা। তাঁদের চোখে যে স্বপ্ন, তা বাঁচিয়ে রাখার দায় আমাদের সবার।

সুন্দরবন আমাদের ঘূর্ণিঝড়ের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল, কার্বনের ভাণ্ডার এবং জীবিকার আশ্রয়। এই বনকে দস্যুভীতি থেকে মুক্ত করা মানে কেবল একটি আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যার সমাধান নয়। এর অর্থ জেলের চোখে ভরসা ফিরিয়ে দেওয়া, মৌয়ালের মনে সাহস জোগানো এবং পর্যটকের মনে বিশ্বাস গড়ে তোলা। রাষ্ট্র, প্রশাসন, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পর্যটন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হাতে হাত রাখলে সেই দিন আর দূরে থাকবে না, যেদিন সুন্দরবনের নদীতে নৌকার পালে লাগবে নির্ভয়ের হাওয়া, আর মাঝির কণ্ঠে আবার ফিরবে ভাটিয়ালির সুর।
দস্যুমুক্ত সুন্দরবনই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।

মো. মামুন হাসান, শিক্ষক ও পর্যটন উন্নয়ন গবেষক

আমি কে—নিজেকে চেনার নিরন্তর অনুসন্ধান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১:২২ অপরাহ্ণ
আমি কে—নিজেকে চেনার নিরন্তর অনুসন্ধান

তারেক মনোয়ার

সারাটা জীবন কেটে যেতে পারে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে—‘আমি কে?’ কখনো মনে হবে, নিজেকে বুঝতে পেরেছি। আবার কিছু সময় পরই আবিষ্কার করবেন, নিজের সম্পর্কে এমন অনেক কিছুই অজানা ছিল। আসলে মানুষের ‘আমি’ বহুমাত্রিক। পরিবেশ, সম্পর্ক ও সময়ের পরিবর্তনে তার স্বরূপও বদলে যায়। তবু প্রশ্নটি একই থাকে—‘আমি কে?’

নম্রতা, ভদ্রতা ও বিনয় একজন ভালো মানুষের গুণ হতে পারে। কিন্তু শুধু এসব গুণ দিয়ে একজন মানুষকে পুরোপুরি বিচার করা যায় না। প্রচলিতভাবে আমরা যখন নিজেকে চিনতে চাই, তখন অনেক সময় নিজের প্রকৃত সত্তার বদলে নিজেরই একটি প্রতিচ্ছবি খুঁজি।

প্রশ্ন জাগে, আমি কেমন মানুষ—ভালো, নাকি মন্দ? প্রত্যেকেই নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে দেখতে চায়, কেউ নিজের কাছে, কেউবা অন্যের কাছে। কিন্তু নিজের মন-মানসিকতা, বুদ্ধি ও বিবেক দিয়ে নিজেকে বিচার করলেও সেই বিচার সব সময় নির্ভুল হয় না। নিজের জ্ঞান ও উপলব্ধির সীমাবদ্ধতা থাকলে আত্মমূল্যায়নেও ভুল হতে পারে। তাই নিজেকে ভালো মনে করলেই যে বাস্তবে সব ক্ষেত্রে তা-ই, এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

প্রতিটি মানুষের চিন্তা, চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছু না কিছু পার্থক্য থাকে। ফলে সবার কাছে ভালো মানুষ হয়ে ওঠা সম্ভব নয়—এটাই স্বাভাবিক। অন্যের মূল্যায়নের চেয়ে নিজের সীমাবদ্ধতা, ভুল ও সম্ভাবনাগুলো উপলব্ধি করাই আত্মপরিচয়ের পথে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিজেকে জানার আগ্রহ কখনো হারিয়ে ফেলা উচিত নয়।

গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের সঙ্গে সম্পর্কিত বিখ্যাত উক্তি—“Know Thyself” (নিজেকে জানো)। আত্মোপলব্ধির এই আহ্বান মানুষকে নিজের ভেতরে তাকাতে শেখায়। নিজেকে জানার মধ্য দিয়েই মানুষ জগৎ ও সৃষ্টির অর্থ অনুধাবনের পথে এগিয়ে যেতে পারে।

তারেক মনোয়ার, ইতিহাস বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ

যশোরের খেজুরের রস-গুড়: সংকটে ঐতিহ্য, প্রয়োজন সংরক্ষণের উদ্যোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১:১৭ অপরাহ্ণ
যশোরের খেজুরের রস-গুড়: সংকটে ঐতিহ্য, প্রয়োজন সংরক্ষণের উদ্যোগ

মাসুদ রানা

শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে আবহমান বাংলার গ্রামীণ জীবনে উৎসবের আমেজ নিয়ে আসে খেজুরের রস, ঝোলা গুড় ও পাটালি। ‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’—প্রচলিত এই প্রবাদ যশোরের খেজুরের রস ও গুড়ের ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। সুস্বাদু খেজুরের গুড়ের জন্য যশোরের রয়েছে দেশজুড়ে পরিচিতি। তবে সময়ের পরিবর্তন, গাছির সংকট, খেজুরগাছ কমে যাওয়া এবং ভেজালের দৌরাত্ম্যে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে।

খেজুরের রস ও গুড়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকলেও উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় এ শিল্পের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। যথাযথ উদ্যোগের অভাবে একদিকে যেমন খেজুরগাছের সংখ্যা কমছে, অন্যদিকে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গ্রামীণ লোকজ জ্ঞান ও সংস্কৃতি।

সংকটের কারণ
গাছির সংকট ও পেশার অনিশ্চয়তা
খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করা অত্যন্ত শ্রমসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। গাছের পরিচর্যা, গাছের মাথা চাঁছা, হাঁড়ি বাঁধা এবং রস সংগ্রহের জন্য প্রয়োজন বিশেষ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা। প্রবীণ গাছিরা ধীরে ধীরে পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। অন্যদিকে কঠোর পরিশ্রম, নিরাপত্তাঝুঁকি ও উপযুক্ত আয়ের নিশ্চয়তা না থাকায় নতুন প্রজন্ম এ পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে। ফলে অনেক রস সংগ্রহের উপযোগী গাছ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।

খেজুরগাছ নিধন ও নতুন চারা রোপণে অনীহা
জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার, জমির ব্যবহার পরিবর্তন এবং অবকাঠামো নির্মাণসহ বিভিন্ন কারণে খেজুরগাছ কাটা হচ্ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে নতুন চারা রোপণ ও পরিচর্যার উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে দীর্ঘমেয়াদে রস ও গুড় উৎপাদনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। খেজুরগাছের সংখ্যা কমে গেলে শুধু উৎপাদনই নয়, গ্রামীণ পরিবেশ ও ঐতিহ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও আবহাওয়ার প্রভাব
শীতের তীব্রতা, তাপমাত্রার ওঠানামা এবং আবহাওয়ার পরিবর্তন খেজুরের রস সংগ্রহে প্রভাব ফেলতে পারে। অনুকূল আবহাওয়া না থাকলে রসের পরিমাণ ও গুণগত মানে তারতম্য দেখা দিতে পারে। এ কারণে উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে গাছের পরিচর্যা ও রস সংগ্রহের উপযুক্ত পদ্ধতি সম্পর্কে গাছিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।

ভেজাল গুড়ের দৌরাত্ম্য
খাঁটি খেজুরের গুড়ের চাহিদা ও দামকে পুঁজি করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে চিনি, কৃত্রিম সুগন্ধি বা অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে গুড় তৈরির অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের প্রবণতা খাঁটি গুড়ের বাজার ও ভোক্তার আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একই সঙ্গে প্রকৃত উৎপাদকরা ন্যায্য দাম পাওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় পড়েন।

ঐতিহ্য রক্ষায় করণীয়
যশোরের খেজুরের রস ও গুড়ের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

গাছিদের প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা: গাছিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রণোদনা এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি নিরাপদে গাছে ওঠা, গাছের পরিচর্যা, স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে রস সংগ্রহ এবং উন্নত পদ্ধতিতে গুড় তৈরির বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এ পেশাকে লাভজনক ও সম্মানজনক করে তুলতে পারলে নতুন প্রজন্মও আগ্রহী হবে।

পরিকল্পিতভাবে খেজুরের চারা রোপণ: সড়কের উপযুক্ত স্থান, নদীর বাঁধ, পতিত জমি এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে পরিকল্পিতভাবে খেজুরের চারা রোপণ করতে হবে। শুধু চারা বিতরণ নয়, সেগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা ও বেঁচে থাকা নিশ্চিত করাও জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচিতে খেজুরগাছকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

গাছ সংরক্ষণ ও নির্বিচারে কাটা বন্ধ: খেজুরগাছ সংরক্ষণে কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ এবং অবৈধভাবে গাছ কাটা ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ইটভাটাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
খাঁটি গুড়ের মান নিশ্চিত ও বাজার সম্প্রসারণ: খাঁটি খেজুরের গুড়ের মান যাচাই, নিরাপদ উৎপাদন এবং সঠিকভাবে মোড়কজাত করার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ভেজাল প্রতিরোধে নিয়মিত বাজার তদারকি ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। উৎপাদকদের সমবায় গঠন, অনলাইন বিপণন এবং সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে তাঁরা ন্যায্য দাম পেতে পারেন।

ঐতিহ্যবাহী পণ্যের পরিচিতি ও ব্র্যান্ডিং: যশোরের খেজুরের গুড়ের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতির বিষয়টি যথাযথভাবে প্রচার এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যের স্বীকৃতি ও মানসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে কার্যকর ব্র্যান্ডিং করা প্রয়োজন। দেশীয় বাজারের পাশাপাশি প্রযোজ্য মান ও রপ্তানিবিধি অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক বাজারেও এ পণ্যের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যেতে পারে।

ঐতিহ্য বাঁচাতে এখনই উদ্যোগ প্রয়োজন
খেজুরের রস ও গুড় কেবল শীতের মৌসুমি খাদ্য নয়; এটি বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, গ্রামীণ অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। খেজুরগাছকে ঘিরে গড়ে ওঠা গাছিদের জীবন-জীবিকা, রস সংগ্রহের প্রাচীন কৌশল এবং গুড় তৈরির অভিজ্ঞতা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

এ ঐতিহ্য রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। গাছিরা যেন তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য পান, খেজুরগাছের সংখ্যা বাড়ে, ভেজালমুক্ত গুড়ের বাজার গড়ে ওঠে এবং নতুন প্রজন্ম এ পেশায় আগ্রহী হয়—সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে যশোরের খেজুরের রস ও গুড়ের ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

লেখক: মোঃ মাসুদ রানা, এমএসসি (পদার্থবিজ্ঞান)