শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

সামাজিক পর্যটন: ভ্রমণের অধিকার থেকে সামাজিক ন্যায়বিচারের পথে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ
সামাজিক পর্যটন: ভ্রমণের অধিকার থেকে সামাজিক ন্যায়বিচারের পথে

মো: মামুন হাসান

পর্যটনকে আমরা সাধারণত অবকাশ যাপন, বিনোদন কিংবা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচনা করি। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে পর্যটনের ধারণা অনেক দূর বিস্তৃত হয়েছে। এটি এখন কেবল ভ্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, মানবিক মর্যাদা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং নাগরিক অধিকারের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। এই বাস্তবতায় সামাজিক পর্যটন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ধারণা হিসেবে বিশ্বব্যাপী নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর মূল দর্শন হলো, ভ্রমণ কেবল বিত্তবানদের বিশেষ সুবিধা নয়; এটি সমাজের সকল মানুষের জন্য উন্মুক্ত একটি মানবিক অধিকার।

 

বিশ্বজুড়ে পর্যটন শিল্প যখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে এই উন্নয়নের সুফল কি সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে? বাস্তবতা বলছে, তা নয়। নিম্ন আয়ের পরিবার, শ্রমজীবী মানুষ, প্রবীণ নাগরিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পর্যটন এখনো অনেকাংশে অধরাই রয়ে গেছে। ফলে পর্যটনের যে আনন্দ, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও মানসিক প্রশান্তি, তা সমাজের একটি বড় অংশ থেকে কার্যত বঞ্চিত হচ্ছে। সামাজিক পর্যটনের ধারণা এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক অবস্থান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইউরোপে সামাজিক পর্যটনের বিকাশ মূলত কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। তখন উপলব্ধি করা হয় যে, কর্মজীবী মানুষের বিশ্রাম, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক বিকাশ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ। ফ্রান্স, স্পেন, বেলজিয়াম, পর্তুগালসহ বহু দেশে সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে স্বল্প আয়ের মানুষ, শিক্ষার্থী এবং প্রবীণদের জন্য ভর্তুকিযুক্ত ভ্রমণ কর্মসূচি চালু করা হয়। এর সুফল ছিল বহুমাত্রিক। একদিকে মানুষের জীবনমান উন্নত হয়েছে, অন্যদিকে পর্যটন শিল্পও সারা বছর সচল থেকেছে। মৌসুমি পর্যটনের সীমাবদ্ধতা কমেছে, কর্মসংস্থান বেড়েছে এবং স্থানীয় অর্থনীতি নতুন প্রাণ পেয়েছে।

 

বাংলাদেশের বাস্তবতায় সামাজিক পর্যটনের গুরুত্ব আরও বেশি। দেশের অর্থনীতি দ্রুত এগোলেও অবকাশ ও ভ্রমণের সুযোগ এখনো জনসংখ্যার একটি বড় অংশের নাগালের বাইরে। অনেক পরিবার আছে, যারা জীবনে কখনো সমুদ্র দেখেনি, পাহাড়ে যায়নি কিংবা দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাগুলো ঘুরে দেখার সুযোগ পায়নি। এটি শুধু অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার প্রশ্ন নয়; বরং সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও একটি বৈষম্যের প্রতিফলন।

 

অথচ বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সামাজিক পর্যটন বিকাশের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। কক্সবাজার, সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, হাওর অঞ্চল, চরাঞ্চল, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা এবং গ্রামীণ জনপদকে কেন্দ্র করে স্বল্প ব্যয়ের সামাজিক পর্যটন কর্মসূচি গড়ে তোলা সম্ভব। শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষামূলক ভ্রমণ, শ্রমজীবী মানুষের জন্য বিশেষ অবকাশ প্যাকেজ, প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যবান্ধব পর্যটন এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে পর্যটন হবে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক।

 

সামাজিক পর্যটনের সবচেয়ে বড় শক্তি এর সামাজিক প্রভাব। একটি দেশের নাগরিক যখন নিজের দেশকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পায়, তখন তার মধ্যে জাতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের প্রতি নতুন উপলব্ধি তৈরি হয়। এক অঞ্চলের মানুষ অন্য অঞ্চলের জীবনধারা সম্পর্কে জানতে পারে। এতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং জাতীয় সংহতি শক্তিশালী হয়। ভ্রমণ মানুষকে কেবল নতুন স্থান দেখায় না; এটি নতুন চিন্তা, নতুন অভিজ্ঞতা এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দেয়।

 

বর্তমান সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়। নগরজীবনের চাপ, কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মানুষের মানসিক সুস্থতার ওপর ক্রমবর্ধমান প্রভাব ফেলছে। এমন পরিস্থিতিতে ভ্রমণকে বিলাসিতা নয়, বরং মানবিক সুস্থতার একটি উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সামাজিক পর্যটন সেই সুযোগকে আরও বিস্তৃত ও গণমুখী করতে পারে।

 

তবে সামাজিক পর্যটন বাস্তবায়নের জন্য শুধু নীতিগত স্বীকৃতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগ। সরকার পর্যটন উন্নয়ন নীতিতে সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। শিক্ষার্থী, প্রবীণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পরিবহন ও আবাসনে বিশেষ সুবিধা চালু করা যেতে পারে। করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সামাজিক পর্যটন তহবিল গঠনে অংশ নিতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ও কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করে স্বল্প ব্যয়ের কমিউনিটি ভিত্তিক পর্যটন মডেল গড়ে তোলা যেতে পারে।

 

বাংলাদেশে পর্যটন নিয়ে আলোচনায় সাধারণত অবকাঠামো, বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বিষয়গুলোই বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু পর্যটনের একটি মানবিক ও সামাজিক মাত্রাও রয়েছে, যা প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে। সামাজিক পর্যটন সেই উপেক্ষিত মাত্রাটিকেই সামনে নিয়ে আসে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; বরং সুযোগের ন্যায়সঙ্গত বণ্টনও।

 

ভ্রমণ মানুষের দৃষ্টিকে প্রসারিত করে, মনকে উদার করে এবং সমাজকে কাছাকাছি নিয়ে আসে। তাই সামাজিক পর্যটনকে কেবল পর্যটন নীতির একটি অংশ হিসেবে নয়, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের কৌশল হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন। যে সমাজ তার সকল নাগরিককে দেশকে জানার, দেখার এবং অনুভব করার সুযোগ দেয়, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে উন্নত, সচেতন ও আত্মবিশ্বাসী সমাজে পরিণত হতে পারে।

মো: মামুন হাসান, শিক্ষক ও কলাম লেখক।

Ads small one

জাকারিয়ার রক্তের দায়/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৩০ অপরাহ্ণ
জাকারিয়ার রক্তের দায়/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

মানুষের বিপদে মানুষ এগিয়ে যাবেÑসভ্য সমাজের এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। বিপদে পড়া কাউকে সাহায্য করা, দুই পক্ষের বিবাদ থামানোর চেষ্টা করা কিংবা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সামাজিক মূল্যবোধেরই অংশ। কিন্তু জাকারিয়ার মৃত্যু সেই স্বাভাবিক মানবিকতার সামনে এক কঠিন প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছেÑঅন্যের বিপদে এগিয়ে গিয়ে যদি নিজের জীবনই দিতে হয়, তাহলে আগামী দিনে মানুষ কি আর কারও বিপদে এগিয়ে আসবে? জাকারিয়া এগিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য কী ছিল-একটি বিবাদ থামানো, বিপদগ্রস্ত কাউকে সহায়তা করা, নাকি পরিস্থিতি শান্ত করা-তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: তিনি আর বেঁচে নেই। অন্যের বিপদের মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানোর পরিণতিতে তাঁকে প্রাণ হারাতে হয়েছে। একটি পরিবারের স্বজন, একজন মানুষের জীবন এবং একটি পরিবারের ভবিষ্যতের স্বপ্ন-সবকিছুই মুহূর্তে বদলে গেছে।

 

জাকারিয়ার মৃত্যু তাই শুধু একটি হত্যাকা- নয়; এটি আমাদের সামাজিক সম্পর্ক, পারস্পরিক আস্থা এবং মানবিক মূল্যবোধ নিয়েও ভাবতে বাধ্য করে। একসময় পাড়া-মহল্লা বা গ্রামে কারও বিপদ হলে মানুষ ছুটে যেত। কারও বাড়িতে আগুন লাগলে সবাই মিলে আগুন নেভাত, কেউ অসুস্থ হলে কয়েকজন মিলে হাসপাতালে নিয়ে যেত, দুই পক্ষের বিবাদ হলে এলাকার প্রবীণরা এগিয়ে এসে তা থামানোর চেষ্টা করতেন। প্রতিবেশীর বিপদকে নিজের বিপদ মনে করার এই সংস্কৃতিই ছিল আমাদের সামাজিক শক্তি। আজ সেই জায়গায় পরিবর্তন এসেছে। মানুষ ক্রমেই ব্যক্তি কেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তার ভয়। অন্যের সমস্যায় জড়িয়ে গিয়ে নিজেই বিপদে পড়ার আশঙ্কা অনেককে পিছিয়ে দেয়। জাকারিয়ার মতো মানুষের করুণ পরিণতি সেই ভয়কে আরও গভীর করতে পারে। আজ একজন ভাববেন, ‘আমি কেন যাব?’ কাল আরেকজন বলবেন, ‘নিজের জীবন আগে।’

 

এভাবে একসময় বিপদগ্রস্ত মানুষ চারপাশে অনেক মানুষ দেখেও কাউকে পাশে নাও পেতে পারেন। এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর দিক। কারণ অপরাধ শুধু একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না; কখনো কখনো একটি সমাজের সাহসও কেড়ে নেয়। মানুষ যদি অন্যায়ের সামনে দাঁড়াতে ভয় পায়, বিপদে কাউকে সাহায্য করতে ভয় পায়, তাহলে অপরাধী আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আর সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে নীরব দর্শকে পরিণত হয়।

 

নীরবতা তখন শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থাকে না, তা সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়।আমরা নিশ্চয়ই এমন সমাজ চাই না। তবে মানবিকতার অর্থ নিজের জীবনকে অযথা ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া নয়। সশস্ত্র বা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া কোনো সমাধান হতে পারে না। এমন অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে খবর দেওয়া, আহত ব্যক্তিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা কিংবা প্রয়োজনীয় সহায়তা সংগঠিত করাও মানবিক দায়িত্বের অংশ। কিন্তু এসব কাজ করার নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সেখানেই জাকারিয়ার মৃত্যুর পর গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন সামনে আসে।

 

একটি বিরোধ কীভাবে প্রাণঘাতী হয়ে উঠল? এর আগে কোনো বিরোধ বা উত্তেজনা ছিল কি? স্থানীয়ভাবে তা মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগে কোনো তথ্য পেয়েছিল কি না? এমন ঘটনা ঠেকাতে আগে থেকে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। কারণ শুধু হত্যাকারী শনাক্ত করলেই একটি ঘটনার বিচার সম্পূর্ণ হয় না; ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা কীভাবে প্রতিরোধ করা যাবে, সেই শিক্ষাটিও বের করে আনতে হয়। জাকারিয়া হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য। অপরাধীর পরিচয়, সামাজিক অবস্থান বা প্রভাব যেন তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে না পারে। শুধু গ্রেপ্তার নয়, যথাযথ তদন্ত শেষে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ ন্যায়বিচার এখানে শুধু জাকারিয়ার পরিবারের দাবি নয়; এটি সামাজিক আস্থার প্রশ্ন।

 

মানুষ যখন দেখে অপরাধের দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার হয়, তখন আইনের ওপর আস্থা বাড়ে। বিপরীতে অপরাধী প্রভাব বা সময়ের সুযোগে পার পেয়ে গেলে মানুষের মধ্যে জন্ম নেয় ভয় ও হতাশাÑআইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান? এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকে তার কার্যকর কর্মকা-ের মাধ্যমে দিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ প্রতিরোধের ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে। ছোট বিরোধ বড় সংঘর্ষে রূপ নেওয়ার আগেই তা শনাক্ত করতে হবে। জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসন, সমাজের প্রবীণ ব্যক্তি ও নাগরিক প্রতিনিধিদের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। কোথাও উত্তেজনা তৈরি হলে সেটিকে ‘স্থানীয় ব্যাপার’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ ছোট একটি বিরোধ কখন যে প্রাণঘাতী সংঘাতে পরিণত হবে, তার নিশ্চয়তা নেই।

 

জাকারিয়ার পরিবার আজ যে শূন্যতার মধ্যে পড়েছে, কোনো বিচারই তা পূরণ করতে পারবে না। একজন মানুষের মৃত্যু মানে শুধু একজন স্বজনকে হারানো নয়; একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা বোধও বদলে যায়। তাই তাঁদের প্রতি সহমর্মিতার পাশাপাশি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই হবে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। জাকারিয়ার মৃত্যু আমাদের সামনে দুটি পথের প্রশ্ন রেখেছে। আমরা কি এমন সমাজের দিকে যাব, যেখানে মানুষ অন্যের বিপদ দেখেও নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকবে? নাকি এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলব, যেখানে মানবিকতার সঙ্গে মানুষের নিরাপত্তারও নিশ্চয়তা থাকবে? উত্তরটি আমাদের সামাজিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

 

মানুষের বিপদে মানুষ এগিয়ে আসবে-এই ন্যূনতম সামাজিক আস্থাটুকু যেন আমরা হারিয়ে না ফেলি। এ জন্য জাকারিয়া হত্যার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে দ্রুত শনাক্ত করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে; স্থানীয় বিরোধ ও সংঘাতের আগাম ঝুঁকি চিহ্নিত করে কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে; এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এমনভাবে সক্রিয় রাখতে হবে, যাতে কোনো বিবাদ সহিংসতায় রূপ নেওয়ার আগেই তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জন্যও নিরাপদভাবে সহায়তা করার পথ তৈরি করতে হবে। জাকারিয়ার মৃত্যু যেন মানুষের মানবিকতাকে ভীত করে পিছু হটিয়ে না দেয়; বরং তাঁর হত্যার দ্রুত বিচার, সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবেÑঅন্যের পাশে দাঁড়ানো কোনো মানুষের জন্য মৃত্যুফাঁদ হতে পারে না।

লেখক: সংবাদকর্মী

প্রবীণরা সমাজের অমূল্য সম্পদ, তাঁদের অভিজ্ঞতা রাষ্ট্র গঠনে কাজে লাগাতে হবে: জেলা প্রশাসক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:২১ অপরাহ্ণ
প্রবীণরা সমাজের অমূল্য সম্পদ, তাঁদের অভিজ্ঞতা রাষ্ট্র গঠনে কাজে লাগাতে হবে: জেলা প্রশাসক

নিজস্ব প্রতিনিধি: সাতক্ষীরায় আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে র‍্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’- এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে শনিবার সকালে সাতক্ষীরা স্টেডিয়াম সংলগ্ন জেলা প্রবীণ কল্যাণ সংস্থার নিজস্ব কার্যালয়ে এই সভার আয়োজন করা হয়। সংগঠনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. সুশান্ত কুমার ঘোষের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক মিজ্ কাউসার আজিজ।

সংগঠনের নির্বাহী সদস্য শহীদুর রহমানের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য রাখেন জেলা সহকারী সমাজসেবা কর্মকর্তা রোকনুজ্জামান, প্রফেসর আব্দুল হামিদ, ফজলুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার আবিদুর রহমান, রোকেয়া রহমান, কাজী আবু হেলাল প্রমুখ।

প্রধান অতিথি তাঁর বক্তব্যে বলেন, প্রবীণরা সমাজের মূল ভিত্তি এবং আমাদের এক অমূল্য সম্পদ। তাঁদের দীর্ঘদিনের অর্জিত অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন ও নীতি নির্ধারণে কাজে লাগানো অত্যন্ত জরুরি। তাঁদের সুচিন্তিত মতামত ও দিকনির্দেশনা নতুন প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে এবং সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বর্তমানে বয়স্ক ভাতার কভারেজ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই সাথে মানুষের জীবনযাত্রার মান ও চিকিৎসা সেবার উন্নতির ফলে গড় আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে দেশের মানুষের গড় আয়ু পুরুষের ক্ষেত্রে ৭৩ বছর এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৭৭ বছরেরও বেশি; অথচ আশির ও নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু ছিল মাত্র ৫০ বছরের কাছাকাছি।

তিনি আরও বলেন, প্রবীণদের বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনা পেলে তা স্বাস্থ্য সেবা সচিবের কাছে প্রেরণ করা হবে। এছাড়া প্রবীণদের কল্যাণে জেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন, কার্যপদ্ধতি  নির্ধারণ এবং জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কমিটিতে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।

প্রাণসায়র খালের সৌন্দর্য বর্ধন ও ওয়াকওয়ে নির্মাণের কথা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, ইতিমধ্যেই ওয়াকওয়ে নির্মাণের অর্থ সংস্থান হয়েছে, অর্থ ছাড় পেলেই পৌরসভা কাজ শুরু করবে। তবে খালের ভেতরের প্রতিবন্ধকতা বা বাধা দূর করে কাজ এগিয়ে নিতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রবীণসহ সবার বিনোদন ও হাঁটার সুবিধার জন্য ‘ডিসি ইকো পার্ক’-এ ওয়াকওয়ে, বিশ্রামাগার ও রেস্টুরেন্টসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজ চলছে, যা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

স্বামী বলেছিলেন শুটিংয়ে, ২৪ ঘণ্টা পর মিলেছিল নায়িকার বস্তাবন্দি দ্বিখণ্ডিত লাশ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৩৬ অপরাহ্ণ
স্বামী বলেছিলেন শুটিংয়ে, ২৪ ঘণ্টা পর মিলেছিল নায়িকার বস্তাবন্দি দ্বিখণ্ডিত লাশ

১৬ জানুয়ারি ২০২২। সকাল ৭টা। পরিবারের কাছে বলা হয়েছিল, শুটিংয়ের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়েছেন চিত্রনায়িকা রাইমা ইসলাম শিমু। পরে তার স্বামী খন্দকার সাখাওয়াত আলীম নোবেলও জানান, শিমু শুটিংয়ে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হয়েছেন। কিন্তু সেদিন তিনি শুটিংয়ের নির্ধারিত স্থানে পৌঁছাননি। ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না।

সময় গড়ালো, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হলো। তবু শিমুর কোনো খোঁজ পাওয়া গেলো না। পরদিন সকালে তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। এর মধ্যেই কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ব্রিজের কাছে ঝোপের মধ্যে পড়ে থাকা একটি বস্তার খবর পায় পুলিশ। বস্তা খুলে উদ্ধার করা হয় এক নারীর খণ্ডিত লাশ। পরে শিমুর ভাই শহিদুল ইসলাম গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন।

নিখোঁজ হওয়ার পরদিনই সামনে আসে চিত্রনায়িকা রাইমা ইসলাম শিমুর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। এরপর তদন্তে পুলিশ যে বর্ণনা দেয়, তাতে সকাল ৭টায় শিমু শুটিংয়ে বের হওয়ার তথ্যের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সময় ও স্থান নিয়ে ভিন্ন একটি চিত্র উঠে আসে।

থিয়েটার থেকে চলচ্চিত্রে

রাইমা ইসলাম শিমুর অভিনয়জীবন শুরু হয়েছিল থিয়েটার দিয়ে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত নির্মাতা কাজী হায়াতের নজরে আসেন তিনি। তার প্রতিভা দেখে ১৯৯৮ সালে ‘বর্তমান’ চলচ্চিত্রে তাকে সুযোগ দেন কাজী হায়াত। এটিই ছিল শিমুর প্রথম চলচ্চিত্র।

এরপর ২০০২ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৫টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। পাশাপাশি মঞ্চেও সক্রিয় ছিলেন। প্রায় ৫০টি নাটকে অভিনয় করে টেলিভিশনেও পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। তার অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র ‘জামাই শ্বশুর’ মুক্তি পায় ২০০২ সালে।

বিনোদন জগতে কাজ করার সময় ঢাকার ব্যবসায়ী শাখাওয়াত আলী নোবেলের সঙ্গে পরিচয় হয় শিমুর। প্রেমের সম্পর্কের পর ২০০৪ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

বিয়ের পর চলচ্চিত্র থেকে কিছুটা দূরে সরে গেলেও টেলিভিশনে কাজ চালিয়ে যান শিমু। একাধিক অনুষ্ঠান প্রযোজনা করেন, নিজস্ব প্রোডাকশন হাউস গড়ে তোলেন এবং একটি বেসরকারি টেলিভিশনের বিপণন বিভাগেও দায়িত্ব পালন করেন। গ্রিন রোডের বাসায় দুই সন্তানকে নিয়ে ছিল তাদের সংসার।

সকাল ৭টার পর কী ঘটেছিল

১৬ জানুয়ারি সকালে শিমুর বড় মেয়ে অজিহা আলিম রিদ বাসা থেকে বের হওয়ার পর হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে বেডরুমে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় শিমুকে। অর্থাৎ, পরিবারের কাছে শিমুর সকাল ৭টায় শুটিংয়ে যাওয়ার যে তথ্য দেওয়া হয়েছিল, তদন্তের বর্ণনায় হত্যাকাণ্ডের সময় তার সঙ্গে মিল পাওয়া যায় না।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দেওয়া বর্ণনায় বলা হয়, তখন শিমুর ছোট ছেলে বাসার অন্য একটি কক্ষে ছিল এবং ঘুম থেকে ওঠেনি।

স্ত্রীর লাশের পাশে বসে নোবেল তার বাল্যবন্ধু এস এম আব্দুল্লাহ ফরহাদকে ফোন করেন বলে তদন্তে বলা হয়। ফরহাদ বাসায় আসার পর দুজন মিলে লাশটি বস্তায় ভরেন। এরপর গৃহপরিচারিকাকে বাইরে নাস্তা কিনতে পাঠানো হয়। তদন্তের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই সময় লাশটি দুই টুকরো করা হয় এবং নাইলনের দড়ি দিয়ে বস্তাটি সেলাই করা হয়। সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে বড় মেয়ে রিদ বাসায় ফেরার আগেই লাশ গাড়িতে তুলে নোবেল ও ফরহাদ বাসা থেকে বের হন।

গাড়িতে লাশ নিয়ে তারা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেছেন বলেও তদন্তের বর্ণনায় বলা হয়। উদ্দেশ্য ছিল লাশ গুম করা। সকালে সেই সুযোগ না পেয়ে তারা বাসায় ফিরে আসেন। পরে আবার কেরানীগঞ্জের দিকে যান।

তবে শিমুর নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার সময় পরিবারের কাছে যে তথ্য ছিল, তা ছিল ভিন্ন। শিমুর বোন ফাতিমা নিশা ফোনে তাকে না পেয়ে নোবেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। নোবেল জানান, শিমু সকাল ৭টায় শুটিংয়ের উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন। এরপর আর তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। যেখানে শুটিং করার কথা ছিল, সেখানেও তিনি পৌঁছাননি।

শিমুর নিখোঁজের ঘটনায় থানায় জিডি করা হয়। ১ নম্বর বর্ণনায় বলা হয়েছে, ১৭ জানুয়ারি সকালে ফাতিমা নিশা প্রথমে জিডি করেন এবং নোবেল পরে আরেকটি জিডি করেন। ২ নম্বর বর্ণনায় আবার বলা হয়েছে, নোবেল আগের রাতেই থানায় জিডি করেছিলেন। ফলে জিডি করার সুনির্দিষ্ট সময় নিয়ে বর্ণনাগুলো এক নয়। তবে উভয় বর্ণনাতেই নোবেলের পক্ষ থেকে নিখোঁজের ঘটনায় থানায় যাওয়ার তথ্য রয়েছে।

বস্তার ভেতর থেকে তদন্তের মোড়

১৭ জানুয়ারি সকালে কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ব্রিজের কাছে একটি বস্তা পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ। বস্তা খুলে খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে সেটি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালে পাঠানো হয়। তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে পুলিশ লাশের পরিচয় শনাক্ত করে। এরপর শিমুর গ্রিন রোডের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি চালানো হয়। তল্লাশি করা হয় নোবেলের গাড়িতেও।

গাড়িতে পাওয়া কিছু আলামত তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয় বলে কর্মকর্তারা জানান। সেই সময় তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, ‘কেরানীগঞ্জে লাশটি উদ্ধারের পর তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে তার পরিচয় বের করা হয়। এরপর পুলিশ তার গ্রিন রোডের বাসায় আসে। বাসার সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পাশাপাশি বাসায় তল্লাশি করে। শিমুর স্বামীর গাড়িও তল্লাশি করা হয়। লাশ গুম করতে দুটো বস্তা যে প্লাস্টিকের সুতা দিয়ে সেলাই করা হয়েছিল, সেই সুতারই হুবহু এক বান্ডিল শিমুর স্বামী নোবেলের গাড়িতে পাওয়া যায়। গাড়িটি ধোয়া ছিল, দুর্গন্ধ দূর করতে ব্লিচিং পাউডার ছিটানো ছিল। তাৎক্ষণিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নোবেলকে আটক করে পুলিশ। এরপর সে হত্যার কথা স্বীকার করে।’

আরেক বর্ণনায় বলা হয়েছে, গাড়িতে ব্লিচিং পাউডারের তীব্র গন্ধ পাওয়া যায় এবং নাইলনের দড়িও পাওয়া যায়। লাশ রাখা বস্তা সেলাইয়ে ব্যবহৃত দড়ির সঙ্গে গাড়িতে পাওয়া দড়ির মিল ছিল বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান।

লাশ গুমের বর্ণনা

পুলিশের তদন্ত বিবরণী অনুযায়ী, ১৬ জানুয়ারি সকাল ৭টার সময় শিমু শুটিংয়ের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হননি। ওই সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয় বলে তদন্তে বলা হয়েছে। পরে সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে শিমুকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।

এরপর ফরহাদকে ডেকে আনা হয়। তদন্তের বর্ণনা অনুযায়ী, দুজন মিলে লাশটি বস্তায় ভরে গাড়িতে তোলেন এবং পরে সেটি গুম করার চেষ্টা করেন।

লাশটি গাড়ির ঠিক কোন অংশে রাখা হয়েছিল, সে বিষয়ে দেওয়া বর্ণনায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। এক জায়গায় গাড়ির ট্রাঙ্কের কথা বলা হয়েছে, অন্য বর্ণনায় গাড়ির পেছনের সিট বা পেছনের অংশে রাখার কথা বলা হয়েছে। তাই এ প্রতিবেদনে শুধু গাড়িতে তুলে নেওয়া হয় বলা হচ্ছে।

প্রথম দফায় তারা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ঘোরেন। দিনের বেলায় লাশ ফেলার সুযোগ না পাওয়ায় ফিরে আসেন বলে তদন্তে বলা হয়েছে। পরে রাতে আবার কেরানীগঞ্জের দিকে যান।

হযরতপুর ব্রিজ থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে ঝোপের মধ্যে বস্তাটি ফেলে রেখে ঢাকায় ফেরেন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান। পরে গাড়ি ধুয়ে মুছে ফেলা হয় এবং ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করা হয় বলে তাদের ভাষ্য।

এরপর নোবেল স্ত্রীর নিখোঁজ হওয়ার খবর দেন এবং তাকে খোঁজার কার্যক্রমেও অংশ নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শিমুর ছোট ভাই সাইদুল ইসলাম খোকন ও বোন ফাতেমা বেগম নিশার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় স্ত্রীকে খুঁজতে যান নোবেলও।

তদন্তে চলচ্চিত্র অঙ্গনের লোকজনও

শিমুর লাশ উদ্ধারের পর তদন্তে চলচ্চিত্র শিল্পের লোকজনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সদস্যপদ নিয়ে পুরোনো দ্বন্দ্বের সূত্রে চিত্রনায়ক জায়েদ খানের নাম আসে। জিজ্ঞাসাবাদে জায়েদ খান জানান, প্রায় দুই বছর ধরে শিমুর সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ বা কথা হয়নি।

এরপর পুলিশ শিমুর স্বামী ও গৃহপরিচারিকাকে আবার জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের বক্তব্যে শিমু সকাল ৭টায় শুটিংয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়। তবে গাড়িতে পাওয়া আলামত ও অন্যান্য তদন্তের ভিত্তিতে পুলিশ নোবেল ও তার বন্ধু এস এম আব্দুল্লাহ ফরহাদসহ ছয়জনকে হেফাজতে নেয় এবং রিমান্ডে পাঠায়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে নোবেল স্ত্রীকে হত্যার কথা স্বীকার করেন।

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সরদার সেই সময় জানান, পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় ও দাম্পত্য কলহের জেরে শিমুকে হত্যা করা হয়েছে।

লাশ উদ্ধারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শিমুর স্বামী খন্দকার শাখাওয়াত আলীম নোবেল ও তার বন্ধু এস এম আব্দুল্লাহ ফরহাদকে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় নেওয়া হয় বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।

দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে দুই ধরনের বক্তব্য

তদন্তে শিমু ও নোবেলের দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে যে তথ্য উঠে আসে, তার সবটুকু পরিবারের বক্তব্যের সঙ্গে মেলে না। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, নোবেল শিমুকে নানা বিষয়ে সন্দেহ করতেন এবং তাকে মারধর করতেন। করোনাকালে শিমুর কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নোবেলের ব্যবসায় ক্ষতির কারণে পরিবারটি আর্থিক সংকটে পড়ে। পরে শিমু কাজ শুরু করলে তিনি সংসারের মূল উপার্জনকারী হয়ে ওঠেন এবং এ নিয়ে তাদের দ্বন্দ্ব বাড়ে বলে তদন্তে উঠে আসে।

মৃত্যুর কয়েক মাস আগেও শিমু স্বামীর বিরুদ্ধে পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগ করেছিলেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে শিমুর ভাই শহিদুল ইসলাম খোকন তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে ভিন্ন কথা বলেছিলেন। তিনি সেইসময় বলেন, ‘তাদের মধ্যে তেমন কোনও কলহ ছিল না। ১৮ বছরের সংসার, তারা লাভ ম্যারেজ করেছিল। তারপরও কেন এই হত্যা বুঝতে পারছি না।’

ফলে শিমুর দাম্পত্য জীবনে কলহের মাত্রা বা তার প্রকৃতি নিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের সঙ্গে পরিবারের বক্তব্যের পার্থক্য ছিল। শিমুর গ্রামের বাড়ি বরগুনার তালতলী উপজেলায়। তারা ছোটবেলা থেকেই ঢাকায় থাকেন।

মায়ের মেসেজের অপেক্ষায় মেয়ে

শিমুর বড় মেয়ে ওজিহা আলিম রিদ তখন ১৬ বছরের। চার বছর পর তার বয়স এখন ২০। মাকে হারানোর পর তার জীবনে যে পরিবর্তন এসেছে, তা নিয়ে চলতি বছরের শুরুর দিকে গণমাধ্যমে কথা বলেন শিমুর বোন ফাতেমা বেগম। তিনি জানান, ওজিহার একমাত্র পৃথিবী ছিল তার মা। শিমুকে হারানোর পর সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।

ফাতেমা বেগম বলেন, ‘ও তো এখন বড় হয়েছে, সব বোঝে। ওর মনে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন জাগে, এমন ঘটনা ওর সাথেই কেন হলো? ওজিহা ওর মাকে এতটাই মিস করে যে, আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে। ওর দাদা বাড়ি থেকেও কেউ কোনো খোঁজ নেয় না। সব মিলিয়ে ও মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়েছে।’

মায়ের সঙ্গে যোগাযোগের অভ্যাসও এখনও কাটেনি বলে জানান তিনি। ফাতেমা বেগম বলেন, ‘ওজিহা আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে বলে, “আমি আম্মুকে অনেকবার কল ও মেসেজ দিয়েছি, কিন্তু আম্মু রিপ্লাই দিচ্ছে না কেন? তুমি একটু কল করো না, তোমার কল নিশ্চয়ই ধরবে। আম্মু কল ধরলে আমাকে একটু কথা বলতে বলো প্লিজ।’ ও এখনো প্রতিনিয়ত শিমুর ফেসবুক আইডিতে আর মোবাইল নম্বরে মেসেজ পাঠায়, কলের পর কল দেয়। মায়ের কোনো উত্তর না পেয়ে হাত-পা কাঁপতে থাকে ওর। আমি চেষ্টা করছি ওকে এই ট্রমা থেকে বের করে আনতে।’

শিমুর ছোট ছেলের প্রসঙ্গেও ফাতেমা বেগম বলেন, ঘটনার সময় সে বাসায় ছিল।

তার ভাষ্য, ‘ঘটনার সময় রায়ান রুমে ছিল। ও ঘুম থেকে জেগে একনজর সব দেখেছিল। ও ওর মাকে বলতে শুনেছিল, “রায়ান আমাকে বাঁচাও।” এই শব্দটা ও এখনও ভুলতে পারেনি। ওর বাবা ওকে ধমক দিয়ে শুইয়ে দিয়েছিল। আমরা চেষ্টা করছি ওর মন থেকে এসব স্মৃতি মুছে দিতে।’

বিচার দেখার অপেক্ষা

মেয়েকে হারিয়ে শিমুর মা-ও ভেঙে পড়েছেন বলে জানান ফাতেমা বেগম। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শিমুর প্রিয় খাবারগুলোও তার মা এখন আর খেতে পারেন না। খাবার সামনে এলেই কান্না করেন। মায়ের দ্বিতীয়বার ব্রেন স্ট্রোক হয়েছে।

ফাতেমা বেগম বলেন, ‘আপার প্রিয় খাবারগুলো মা এখন আর খেতে পারেন না। খাবার সামনে এলেই কান্না করেন। মায়ের দ্বিতীয়বার ব্রেন স্ট্রোক হয়েছে। আমাদের একটাই চাওয়া, মা যেন মরার আগে তার মেয়ে হত্যার বিচারটা দেখে যেতে পারেন। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং ন্যায়বিচারের আশায় আছি।’

সর্বশেষ ৫ মার্চ ২০২৬ শিমু হত্যা মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য থাকলেও রাষ্ট্রপক্ষ কোনো সাক্ষী হাজির করতে পারেনি। ওই দিন পর্যন্ত ৩৩ সাক্ষীর মধ্যে ১৯ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। শিমুর স্বামী সাখাওয়াত আলী নোবেল ও তার বন্ধু এস এম ফরহাদ বর্তমানে কারাগারে আছেন।