বিশ্ব প্রাণি দিবস: প্রাণের বৈচিত্র্য রক্ষায় মানুষের দায়িত্ব
সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রাণি প্রকৃতির অলংকার নয়, প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বন, নদী, সমুদ্র, পাহাড়, জলাভূমি ও মানুষের জীবনÑসবকিছুর সঙ্গে প্রাণিজগতের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ক, প্রাণির প্রতি মানুষের দায়িত্ব এবং তাদের কল্যাণ ও সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দিতে প্রতি বছর ৪ অক্টোবর বিশ্ব প্রাণি দিবস পালিত হয়। দিনটি প্রাণিদের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির একটি আন্তর্জাতিক উপলক্ষ।
বিশ্ব প্রাণি দিবসের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জার্মান প্রাণি-সুরক্ষা আন্দোলনকর্মী, লেখক ও প্রকাশক হাইনরিখ জিমারম্যানের নাম। তাঁর উদ্যোগে ১৯২৫ সালের ২৪ মার্চ জার্মানির বার্লিনের স্পোর্ট প্যালেসে প্রথম বিশ্ব প্রাণি দিবসের আয়োজন হয়; এতে ৫ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেন। ১৯২৯ সালে দিবসটি প্রথমবারের মতো ৪ অক্টোবর পালিত হয়। পরে ১৯৩১ সালের মে মাসে ইতালির ফ্লোরেন্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রাণি-সুরক্ষা সংগঠনগুলোর কংগ্রেসে ৪ অক্টোবরকে বিশ্ব প্রাণি দিবস হিসেবে সর্বজনীনভাবে পালনের প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। ৪ অক্টোবর ক্যাথলিক ঐতিহ্যে প্রাণি ও পরিবেশের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত সেন্ট ফ্রান্সিস অব আসিসির ভোজোৎসবের দিন।
এই দিবসের মূল লক্ষ্য শুধু প্রাণিপ্রেমের কথা বলা নয়; প্রাণির কল্যাণের মান উন্নত করা, নিষ্ঠুরতা রোধ করা, দায়িত্বশীল আচরণে উৎসাহ দেওয়া এবং প্রাণি সুরক্ষায় ব্যক্তি ও সংগঠনের উদ্যোগকে উৎসাহিত করা। ‘তাদের চোখ দিয়ে বিশ্বকে দেখো’ ২০২৬ এই প্রতিপাদ্য নিয়ে বিশ্ব প্রাণি দিবসের আন্তর্জাতিক আয়োজনগুলোতে সচেতনতা কর্মসূচি, আলোচনা, শিক্ষা, তহবিল সংগ্রহ, প্রাণিকল্যাণ কার্যক্রম এবং স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
জীববিজ্ঞানে প্রাণীজগৎ অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। কশেরুকী প্রাণির পাশাপাশি পৃথিবীতে রয়েছে বিপুলসংখ্যক অমেরুদ-ী প্রাণিÑকীটপতঙ্গ, মাকড়সা, শামুক, কাঁকড়া, চিংড়ি, কেঁচো, জেলিফিশ, প্রবাল, স্পঞ্জসহ অসংখ্য প্রাণি। ক্যাটালগ অব লাইফ-এর ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর
এক্সটেন্ডেড রিলিজÑঅ্যানিমেলিয়াতে প্রায় ১৭ লাখ ৯৬ হাজার ৯০০ প্রজাতি তালিকাভুক্ত রয়েছে। তবে এটি পৃথিবীর সব প্রাণি প্রজাতির চূড়ান্ত সংখ্যা নয়; ক্যাটালগ অব লাইফ নিজেই জানায় যে বৈশ্বিক প্রজাতির তালিকা এখনও অসম্পূর্ণ এবং এতে সংশোধনের প্রয়োজন থাকতে পারে।
প্রাণির বৈচিত্র্য শুধু সংখ্যার বিষয় নয়। পরাগায়ন, বীজ বিস্তার, খাদ্যশৃঙ্খল, মাটির উর্বরতা, জলজ পরিবেশের ভারসাম্য এবং বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রাণিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটি প্রজাতির বিলুপ্তি অনেক সময় তার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য জীব ও পরিবেশের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রাণি সংরক্ষণ মূলত জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সংরক্ষণেরই অংশ।
বর্তমান পৃথিবীতে প্রাণিজগতের ওপর নানা চাপ রয়েছে। আবাসস্থল ধ্বংস, বন উজাড়, অতিরিক্ত শিকার ও আহরণ, অবৈধ বন্যপ্রাণি বাণিজ্য, দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন অনেক প্রজাতির অস্তিত্বকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। আইইউসিএন-এর ২০২৬-১ সংস্করণে ৪৯,৫০০-এর বেশি প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে; তবে আইইউসিএন একই সঙ্গে সতর্ক করেছে যে সব প্রাণি ও সব শ্রেণির প্রজাতি সমানভাবে মূল্যায়িত হয়নি।
বাংলাদেশের চিত্রও উদ্বেগমুক্ত নয়। আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের জাতীয় প্রাণি লাল তালিকায় সাতটি প্রাণিগোষ্ঠীর ১,৬১৯টি প্রজাতি মূল্যায়ন করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৩৯০টি প্রজাতি হুমকির মুখে এবং ৩১টি প্রজাতি বাংলাদেশ থেকে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়। মূল্যায়িত প্রাণিগুলোর মধ্যে ছিল ১৩৮টি স্তন্যপায়ী, ৫৬৬টি পাখি, ১৬৭টি সরীসৃপ, ৪৯টি উভচর, ২৫৩টি স্বাদুপানির মাছ, ১৪১টি ক্রাস্টেশিয়ান ও ৩০৫টি প্রজাপতি।
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণির মধ্যে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে সুন্দরবনে ২০১৫ সালে ১০৬টি, ২০১৮ সালে ১১৪টি এবং ২০২৪ সালে ১২৫টি বাঘ পাওয়া যায়। বাঘের পাশাপাশি হাতি, গাঙ্গেয় শুশুক, হুলক গিবন, কচ্ছপ, ঘড়িয়ালসহ বিভিন্ন প্রাণির আবাসস্থল রক্ষা করাও জরুরি।
প্রাণি রক্ষার দায়িত্ব শুধু বন বিভাগ বা সংরক্ষণ সংস্থার নয়। বন ও জলাভূমি রক্ষা, অবৈধ শিকার ও বন্যপ্রাণি বাণিজ্য প্রতিরোধ, দূষণ কমানো, প্রাণির প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধ করা এবং আহত বা বিপদগ্রস্ত প্রাণিকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়াÑএসব ক্ষেত্রেই নাগরিকের দায়িত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, নিয়মিত প্রজাতি পর্যবেক্ষণ, সংরক্ষিত এলাকার কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ সংরক্ষণকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
প্রাণি সম্পর্কে মানুষের নৈতিক ধারণার সঙ্গে ধর্মীয় মূল্যবোধেরও যোগ রয়েছে। ইসলামী দৃষ্টিতে প্রাণি আল্লাহর সৃষ্টির অংশ। কুরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ সব জীবন্ত প্রাণিকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের চলাচলের বিভিন্ন ধরন উল্লেখ করেছেন। আবার সূরা আল-আনআমের ৩৮ নম্বর আয়াতে প্রাণীদেরও “তোমাদের মতো বিভিন্ন সম্প্রদায়” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামী ঐতিহ্যে প্রাণির প্রতি দয়া ও অকারণে কষ্ট না দেওয়ার শিক্ষা রয়েছে। অন্য ধর্মীয় ও নৈতিক দর্শনেও অহিংসা, করুণা ও জীবের প্রতি সহমর্মিতার মূল্যবোধ দেখা যায়।
বিজ্ঞান প্রাণির গঠন, জীবনপ্রক্রিয়া, বিবর্তন, পরিবেশগত সম্পর্ক ও বিলুপ্তির কারণ অনুসন্ধান করে; ধর্ম ও নৈতিক দর্শন মানুষের দায়িত্ব ও আচরণের প্রশ্ন সামনে আনে। দুটি ক্ষেত্রের আলোচনার ধরন ভিন্ন হলেও প্রাণির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ ও প্রকৃতির প্রতি যতেœর প্রয়োজনীয়তা মানবসমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
বিশ্ব প্রাণি দিবস তাই কেবল প্রাণিদের জন্য একটি বিশেষ দিন নয়; এটি মানুষের নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবার দিন। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণি কোনো না কোনোভাবে জীবনের বৃহৎ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। একটি নিরাপদ আবাসস্থল, নির্মল পানি, খাদ্য ও মানুষের সহনশীল আচরণ অনেক প্রাণির টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণিকে ভালোবাসা মানে শুধু পোষা প্রাণির যতœ নেওয়া নয়Ñবন্যপ্রাণি, পাখি, জলজ প্রাণি, কীটপতঙ্গসহ সমগ্র প্রাণিজগতের অস্তিত্বের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া।
৪ অক্টোবরের এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñপ্রাণি রক্ষা মানে প্রকৃতি রক্ষা, আর প্রকৃতি রক্ষা মানে মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষা। তাই সচেতনতা, বিজ্ঞানভিত্তিক সংরক্ষণ, আইন প্রয়োগ এবং মানবিক আচরণের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে প্রাণি ও মানুষের জন্য আরও নিরাপদ পৃথিবী। ‘প্রাণি বাঁচলে বাঁচবে প্রকৃতি, রক্ষা পাবে বিশ্ব চরাচর। আসুন-বাড়িয়ে দিই ভালোবাসার হাত, নিরাপদ হোক ওদের ঘর।









