মাদকমুক্ত ও কিশোর গ্যাংরহিত সাতক্ষীরা চাই
তারিক ইসলাম
একটি সমাজ কতটা সংবেদনশীলতা হারালে সামান্য কথা-কাটাকাটি বা একটি ঝগড়া থামাতে গিয়ে প্রাণ হারাতে হয় সম্ভাবনাময় এক তরুণকে? সম্প্রতি সাতক্ষীরা শহরের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর মোড়ে ঘটে যাওয়া জাকারিয়া খান হত্যার ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের বর্তমান সামাজিক কাঠামোর এক ভয়াবহ ও রক্তাক্ত চিত্র। এই মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, সাতক্ষীরার যুবসমাজ আজ কতটা বিপথগামী এবং জনজীবন কতটা অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।
খবর নিয়ে জানা যায়, গত শুক্রবার রাতে সাতক্ষীরা শহরের একটি চায়ের দোকানে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বিরোধ ও মারামারি শুরু হলে তা থামাতে এগিয়ে যান জাকারিয়া। আর সেই মহৎ উদ্যোগই কাল হলো তার জন্য। বখাটেদের হামলায় তাকে প্রাণ হারাতে হলো। যে বয়সে তরুণের হাতে থাকার কথা বই বা কলম, সেই বয়সের কিছু কিশোরের হাতে ধারালো অস্ত্র কীভাবে ওঠে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বেরিয়ে আসে এক গভীর সামাজিক ও পারিবারিক বিচ্যুতির করুণ গল্প।
সাতক্ষীরার অলিগলি, পার্ক কিংবা ফাঁকা রাস্তাগুলোতে গত কয়েক বছর ধরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে একশ্রেণির কিশোর ও তরুণ অপরাধী চক্র। এদের দিন শুরু হয় বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল রাইডিং, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং ইভটিজিংয়ের মাধ্যমে। সন্ধ্যার পর এদের আড্ডা জমে ওঠে বিভিন্ন মোড়ে বা সীমান্তঘেঁষা ভোমরা এলাকায়, যেখানে চলে মাদক সেবনের আসর। এই মাদকাসক্তি মেটাতে কিংবা নিজেদের তথাকথিত ‘হিরোইজম’ জাহির করতে তারা বেছে নেয় চাঁদাবাজি ও মারামারির পথ। এর সাথে যুক্ত হচ্ছে কিছু উঠতি বয়সি কিশোর-কিশোরীও, যা এক ভয়ংকর ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এ ধরনের অপরাধ একদিনে জন্ম নেয় না। বছরের পর বছর ধরে চলা অনিয়ম, প্রতিকারহীন সংস্কৃতি এবং স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রছায়ায় এই গ্যাংগুলো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের অভাব অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে। যখন দেখা যায় তুচ্ছ অপরাধের বিচার হচ্ছে না বা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন তাদের অপরাধের পরিধি খুনখারাবি পর্যন্ত গড়াতে দ্বিধা করে না। সাতক্ষীরার এই বেহাল দশা থেকে মুক্তি পেতে হলে সর্বপ্রথম প্রশাসনিক দুর্বলতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে হবে।
সাতক্ষীরার বাতাসকে রক্তিম ও ভারী করে তোলা এই কিশোর অপরাধের শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে শক্ত হাতে। এর জন্য প্রয়োজন বহুমুখী ও কঠোর পদক্ষেপ:
১. মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স: কিশোর গ্যাংয়ের মূল জ্বালানি হলো মাদক। ভোমরা সীমান্তসহ জেলার প্রতিটি কোণায় মাদকের বিস্তার রোধে পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
২. প্রশাসনের নিয়মিত টহল ও জবাবদিহিতা: পাড়া-মহল্লায় কিশোরদের সন্দেহজনক আড্ডা, রাতবিরেতে বেপরোয়া বাইক রাইডিং এবং ইভটিজিং রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত টহল বাড়াতে হবে।
৩. রাজনৈতিক ও সামাজিক সদিচ্ছা: অপরাধীদের পেছনে থাকা প্রভাবশালী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তাদের কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক আশ্রয়প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। অপরাধীর পরিচয় কেবল সে অপরাধী।
৪. পারিবারিক সচেতনতা: অভিভাবকদের আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। সন্তান কার সাথে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে-তা মনিটর করার দায়িত্ব পরিবারকেই নিতে হবে।
জাকারিয়া হত্যার পর সাতক্ষীরার বিবেকবান মানুষ শোকে ও ক্ষোভে স্তব্ধ। আমরা এমন একটি সাতক্ষীরা দেখতে চাই না, যেখানে তরুণের বুক চিরে রক্ত ঝরে। একটি সুস্থ, মাদকমুক্ত এবং কিশোর গ্যাং বা অপরাধ সংস্কৃতিমুক্ত সাতক্ষীরা গড়ে তোলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
জাকারিয়া হত্যার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল এই জনপদে আইনের শাসন ও স্বস্তি ফিরে আসতে পারে।
লেখক : তারিক ইসলাম, সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।









