তর্কে হেরে গিয়ে জীবনে জেতার আনন্দ
তারিক ইসলাম
প্রায় দুই হাজার বছর আগের কথা। তখন পৃথিবীজুড়ে রোমান সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন সম্রাট মার্কাস অরিলিয়াস। দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর এই মানুষটির জীবন দর্শনের একটি মূল কথাই ছিল—সব যুদ্ধে জেতার কোনো দরকার নেই। বিশেষ করে পরিবার, আপনজন আর বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে অনেক তর্কে বা বিবাদে জিতলেও মানুষ আসলে ভেতরে ভেতরে হেরে যায়। তাই ইচ্ছা করেই কিছু তর্কে হেরে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এই উপলব্ধি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বর্তমান ব্যস্ত ও যান্ত্রিক সময়ে আমরা প্রতিনিয়त নানা সম্পর্ক ও তর্কের মুখোমুখি হই। কর্মব্যস্ততার ক্লান্তি, সামাজিক চাপ কিংবা ব্যক্তিগত হতাশা—সবকিছু মিলিয়ে আমাদের সহনশীলতা দিন দিন কমে আসছে। ফলস্বরূপ, ছোটখাটো মতপার্থক্য মুহূর্তেই তীব্র তর্কে রূপ নেয়। স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, সন্তান কিংবা দীর্ঘদিনের বন্ধু—কাউকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা আজ যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রত্যেকেই প্রমাণ করতে চায় যে সে-ই সঠিক।
কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, এই জয় আসলে কার? স্বামী-স্ত্রীর কোনো তুচ্ছ ঝগড়ায় আপনি আপনার যুক্তির মারপ্যাচে সঙ্গীকে চুপ করিয়ে দিলেন। সাময়িকভাবে আপনার অহংকার হয়তো তৃপ্তি পেল, কিন্তু সঙ্গীটির মনে জমে উঠল কষ্টের এক অদৃশ্য পাহাড়। রক্তের সম্পর্কের আপনজনদের সঙ্গে তর্কে জিতে গেলেও দিন শেষে সম্পর্কগুলো বিবর্ণ হয়ে যায়। সম্পর্কের মূল ভিত্তি তো ভালোবাসা, বিশ্বাস আর ছাড় দেওয়ার মানসিকতা। সেখানে যুক্তির জয় মানেই ভালোবাসার পরাজয়।
মনোবিজ্ঞানীরাও বলেন, সম্পর্কে ‘জিততে চাওয়ার’ প্রবণতা দূরত্ব তৈরি করে। প্রতিটি মানুষের ভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাসের জগৎ আলাদা। তাই সব বিষয়ে একমত হওয়া অসম্ভব। যখন আমরা প্রতিটি তর্কে নিজের মত প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তখন আসলে আমরা অপরপক্ষকে কোণঠাসা করে ফেলি। এতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট হয়। এর চেয়ে অনেক সময় চুপ থাকা, প্রতিপক্ষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং প্রয়োজনে পরিস্থিতি শান্ত রাখতে তর্কে হার মেনে নেওয়া অনেক বেশি পরিপক্বতার পরিচয়।
মার্কাস অরিলিয়াসের এই দর্শন আমাদের শেখায়, জীবনের সব লড়াইয়ে জেতার প্রয়োজন নেই। কিছু যুদ্ধ থেকে সসম্মানে সরে দাঁড়ানোই বীরত্ব। ইচ্ছাকৃতভাবে প্রিয়জনদের সঙ্গে তর্কে হেরে যাওয়া মানে নিজের পরাজয় নয়, বরং সম্পর্ককে জয় করে নেওয়া। যখন আপনি সঙ্গীকে বা বন্ধুকে বলবেন, “আচ্ছা, তোমার কথাই ঠিক হলো,” তখন হেরে গিয়েও আপনি আসলে জিতে গেলেন—অর্জিত হলো একটি অমূল্য সম্পর্ক এবং মনের দীর্ঘস্থায়ী শান্তি।
তাই আসুন, প্রতিদিনের ছোটখাটো অহংকার আর তর্কের জেদ বিসর্জন দিই। আপনজনদের হাসিমুখে জায়গা করে দিই হৃদয়ে। কারণ দিন শেষে নিখুঁত যুক্তি বা বিজয়ের চেয়ে ভালোবাসার মানুষগুলোর সান্নিধ্য অনেক বেশি মূল্যবান। তর্কে হেরে গিয়েই হোক জীবনের আসল জয়।
লেখক : তারিক ইসলাম, সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।












