ডাকব্যবস্থার বিবর্তন মানবসভ্যতার অগ্রগতি
প্রকাশ ঘোষ বিধান
ডাকব্যবস্থার বিবর্তন মানবসভ্যতার অগ্রগতির এক অনবদ্য দলিল। প্রাচীনকালে গুহাচিত্র বা ধোঁয়ার সংকেত থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল ইমেইল বা ই-কমার্স লজিস্টিকস-যোগাযোগের এই মাধ্যমটি সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
ডাক ও ডাকব্যবস্থার বিবর্তন মানবসভ্যতার অগ্রগতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেকালের ডাক ব্যবস্থা আর একালের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ডাক ব্যবস্থার মাঝে রয়েছে এক বিরাট রূপান্তর। সময়ের বিবর্তনে মানুষের বার্তা পৌঁছানোর মাধ্যম কীভাবে রানার বা ডাকহরকরা থেকে আজকের ডিজিটাল ই-মেইল কিংবা কুরিয়ার সার্ভিসে রূপান্তর হয়েছে, এটি তারই এক বাস্তব চিত্র।
একসময় খবরের প্রধান মাধ্যম ছিল হাতে লেখা চিঠি, যা কাগজে কলমে লিখে পাঠানো হতো। পিঠে চিঠির ব্যাগ, হাতে লণ্ঠন বা বর্ষা নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে চিঠি পৌঁছে দিতেন ডাকহরকরা বা রানার। সুকান্ত ভট্টাচার্যের রানার কবিতায় এবং তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাক হরকরা গল্পে তাঁদের এই সংগ্রামী ও রোমাঞ্চকর জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে।
হলুদ খাম, পোস্টকার্ড কিংবা ইনল্যান্ড লেটারে মানুষ তার সুখ-দুঃখের কথা লিখে দূর-দূরান্তে পাঠাত। ডাকপিয়নের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করা এবং চিঠি হাতে পেয়ে অশ্রুবিসর্জন কিংবা আনন্দের প্রকাশ ছিল সেকালের চিরাচরিত দৃশ্য।
রাতের অন্ধকারে ডাক নেওয়ার সময় রানারদের হাতের লণ্ঠনের আলো আর ঝুমঝুম ঘণ্টার আওয়াজ ছিল চেনা দৃশ্য। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চিঠি পৌঁছাতে দিন থেকে সপ্তাহ বা মাস পর্যন্ত সময় লাগত। রানারদেরও আগে রাজা-বাদশাদের আমলে প্রশিক্ষিত পায়রা কিংবা দ্রুতগামী ঘোড়া ব্যবহার করে রাজকীয় বার্তা পাঠানো হতো।
১৭শ ও ১৮শ শতকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারিভাবে ডাক বিভাগ গড়ে ওঠে। ১৬৩৫ সালে ইংল্যান্ডে প্রথম সাধারণ জনগণের জন্য ডাকসেবা উন্মুক্ত করা হয়। ১৮৪০ সালে যুক্তরাজ্যে পেনি ব্ল্যাক প্রবর্তনের মাধ্যমে ডাকব্যবস্থায় বিপ্লব আসে। এর ফলে চিঠি পাঠানোর খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসে।
আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে ইন্টারনেট, ই-মেইল, স্মার্টফোন এবং ম্যাসেজিং অ্যাপের যুগে কাগজের চিঠির প্রচলন প্রায় হারিয়ে গেছে। অনেক ডাকঘর এখন আধুনিক পাকা ভবনে রূপান্তরিত হয়েছে, অনেক স্থানে সোলার প্যানেল ও ডিজিটাল সেবা চালু হয়েছে। শুধু চিঠি নয়, বর্তমানে ডাক বিভাগ পার্সেল আদান-প্রদান, ই-কমার্স ডেলিভারি, মানি অর্ডার এবং ব্যাংকিং সেবা দিয়ে থাকে।
রানারদের সেই পায়ে হাঁটা রূপ আজ রূপ নিয়েছে মোটর সাইকেল, ট্রাক ও কার্গোবাহী আধুনিক কুরিয়ার সার্ভিসে। সময়ের পরিবর্তনে চিরাচরিত রানার বা হাতে লেখা চিঠির রূপ বদলালেও, দাপ্তরিক ও জরুরি পার্সেল আদান-প্রদানে ডাকঘর এখনো তার নিজস্ব প্রয়োজনীয়তা নিয়ে টিকে আছে।
সময়ের সাথে সাথে যোগাযোগের গতি বাড়লেও হারিয়ে গেছে চিঠির সেই পুরোনো সুবাস আর রানারের ঘণ্টার চিরচেনা আওয়াজ। প্রযুক্তির এই রূপান্তর মানুষের জীবনকে করেছে অনেক বেশি গতিশীল ও সহজ।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট









