শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কতটা প্রস্তুত
মো. মামুন হাসান
শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে একজন শিক্ষক সবচেয়ে বেশি যা শেখেন, তা কোনো পাঠ্যবইয়ে লেখা নেই। শেখেন শিক্ষার্থীর চোখের ভাষা পড়তে। যে ছেলেটি গত মাস পর্যন্ত সবার আগে হাত তুলত, সে আজ জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। যে মেয়েটি ছিল প্রাণবন্ত, সে এখন খাতায় শুধু আঁকিবুকি কাটে। আমরা শিক্ষকেরা এসব দেখি, কিন্তু অনেক সময় বুঝে উঠতে পারি না কী করা উচিত। এই অসহায়তাই আজকের লেখার সূচনা।
নীরব সংকটের বাস্তবতা
বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা এখনো অনেকটাই ঢাকা পড়ে থাকে। কিন্তু সংকট যে বাড়ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। পরীক্ষার ফল, চাকরির অনিশ্চয়তা, পারিবারিক প্রত্যাশা, সামাজিক মাধ্যমের তুলনা আর অর্থনৈতিক চাপ মিলিয়ে একজন তরুণ শিক্ষার্থী প্রতিদিন এমন এক বোঝা বহন করে, যার কথা সে হয়তো কাউকে বলতেই পারে না। সংবাদপত্রের পাতায় মাঝেমধ্যে শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর আসে। আমরা কিছুদিন শোক করি, প্রশ্ন তুলি, তারপর আবার সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। অথচ প্রতিটি খবরের পেছনে থাকে অসংখ্য অপ্রকাশিত নীরব লড়াই।
পলিটেকনিকের মতো কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই চাপের কিছু নিজস্ব রূপ আছে। এখানে আসা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আসে গ্রামীণ ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে। তাদের অনেকেই পরিবারের প্রথম প্রজন্ম, যারা উচ্চশিক্ষার পথে পা রেখেছে। পরিবারের আশা থাকে, চার বছর পর ছেলে বা মেয়ে একটি ভালো চাকরি নিয়ে ঘরে ফিরবে। সেই আশার ভার শিক্ষার্থীর কাঁধে অদৃশ্য পাথরের মতো চেপে বসে। ব্যবহারিক কাজের চাপ, ধারাবাহিক মূল্যায়ন, শিক্ষানবিশির অনিশ্চয়তা এবং ডিপ্লোমা শেষে কর্মসংস্থানের দুশ্চিন্তা যোগ হয়ে মানসিক চাপকে আরও তীব্র করে তোলে।
আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু
এবার সেই মূল প্রশ্নে আসা যাক। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কতটা প্রস্তুত? সত্যি কথা বলতে গেলে, উত্তরটা স্বস্তিদায়ক নয়।
প্রথমত, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর নেই। যেখানে একজন কাউন্সেলরের কথা কাগজে আছে, সেখানে বাস্তবে হয়তো একটি কক্ষও নেই, কিংবা আছে এমন একজন শিক্ষক, যিনি নিজের পাঠদানের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এই কাজটি করেন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা একটি বিশেষায়িত দক্ষতা। শুধু সদিচ্ছা দিয়ে এই কাজ হয় না।
দ্বিতীয়ত, আমাদের শিক্ষকদের বড় অংশ মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ পাননি। আমি নিজে একজন শিক্ষক হিসেবে স্বীকার করছি, বিষণ্নতার লক্ষণ চিনতে পারা, একজন সংকটে থাকা শিক্ষার্থীর সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয় এবং কখন তাকে পেশাদার সহায়তার কাছে পাঠাতে হয়, এসব আমাদের শিক্ষক প্রশিক্ষণের কোনো নিয়মিত অংশ নয়। ফলে আমরা অনেক সময় ভালো উদ্দেশ্য নিয়েও ভুল করে ফেলি। হয়তো উপদেশ দিয়ে ব্যাপারটা সহজ করে ফেলি, কিংবা বলি, “এত ভেঙে পড়ার কী আছে?” এই এক বাক্য একজন শিক্ষার্থীকে আর কখনো মুখ খুলতে না দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
তৃতীয়ত, কলঙ্কের প্রশ্ন। আমাদের সমাজে মানসিক সমস্যাকে এখনো দুর্বলতা, এমনকি লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। শিক্ষার্থী ভাবে, সে কাউন্সেলরের কাছে গেলে সহপাঠীরা কী বলবে। অভিভাবকেরা ভাবেন, এ আবার কেমন সমস্যা, একটু পড়ালেখায় মন দিলেই তো সব ঠিক হয়ে যাবে। এই মনোভাব যতদিন থাকবে, সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থাও অকার্যকর থেকে যাবে।
চতুর্থত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোই অনেক সময় চাপ সৃষ্টির কারণ। ফলাফলকেন্দ্রিক মূল্যায়ন, জিপিএর প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব এবং ব্যর্থতাকে কলঙ্ক হিসেবে দেখার সংস্কৃতি শিক্ষার্থীকে এমন এক জায়গায় ঠেলে দেয়, যেখানে একটি খারাপ ফল মানে যেন পুরো জীবনের পরাজয়। শেখার আনন্দের চেয়ে নম্বরের ভয় সেখানে বড় হয়ে ওঠে।
শিক্ষক হিসেবে যা দেখি
আমার নিজের বিভাগের কথা বলি। ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে মানুষের সঙ্গে আচরণই পেশার প্রধান শক্তি। আতিথেয়তা শিল্পে সফল হতে হলে একজনকে হাসিমুখে অন্যের সেবা করতে জানতে হয়। কিন্তু যে তরুণ নিজের ভেতরের কষ্ট সামলাতে পারছে না, সে কীভাবে অন্যকে প্রশান্তি দেবে? আমি প্রায়ই শিক্ষার্থীদের বলি, ভালো হোস্ট হওয়ার প্রথম শর্ত নিজের সঙ্গে ভালো থাকা। এই কথাটা শুধু পেশাগত নয়, জীবনেরও।
আমি লক্ষ করেছি, শিক্ষার্থীরা সাধারণত সরাসরি নিজের কষ্টের কথা বলে না। তারা বলে অন্যভাবে। হঠাৎ অনুপস্থিতি বেড়ে যায়, ব্যবহারিক ক্লাসে আগ্রহ কমে আসে, বন্ধুদের সঙ্গ এড়িয়ে চলে, অথবা অল্প কারণেই রেগে ওঠে। এগুলো আসলে সাহায্যের নীরব আহ্বান। যে শিক্ষক এই সংকেত চিনতে পারেন, তিনিই হতে পারেন একজন শিক্ষার্থীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। কিন্তু সেই চোখ তৈরি করতে হলে প্রশিক্ষণ লাগে, সময় লাগে, আর লাগে প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন।
কী করা যায়
সমস্যা চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়। সমাধানের পথও ভাবতে হবে, এবং আমার মতে তা অসম্ভব নয়।
প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে প্রতিটি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত একজন প্রশিক্ষিত মনোসামাজিক কাউন্সেলর নিয়োগ। শুরুতে সব প্রতিষ্ঠানে সম্ভব না হলে জেলা পর্যায়ে একটি সমন্বিত সেবাকেন্দ্র করা যেতে পারে, যেখানে আশপাশের প্রতিষ্ঠানগুলো সহায়তা পাবে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষক প্রশিক্ষণের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রাথমিক সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। সংকটের লক্ষণ চেনা, সহানুভূতির সঙ্গে শোনা এবং সঠিক জায়গায় পাঠানো, এই তিনটি দক্ষতা প্রতিটি শিক্ষকের থাকা উচিত। তাঁকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হতে হবে না, কিন্তু একজন সংবেদনশীল প্রথম সাড়াদাতা হতে হবে।
তৃতীয়ত, সমবয়সী সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা অনেক সময় শিক্ষকের চেয়ে বন্ধুর কাছে সহজে মন খোলে। প্রশিক্ষিত শিক্ষার্থী স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি করা গেলে সহায়তার একটি স্বাভাবিক পথ খোলে, যেখানে সাহায্য চাওয়া কোনো লজ্জার বিষয় থাকে না।
চতুর্থত, মূল্যায়ন ব্যবস্থায় মানবিকতা আনতে হবে। ব্যর্থতাকে শেখার অংশ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি গড়তে হবে। পরীক্ষার সময় বাড়তি চাপ কমাতে নিয়মিত অভিযোজনমূলক ক্লাস, খোলামেলা আলোচনা ও সৃজনশীল কার্যক্রম রাখা যেতে পারে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও সামাজিক কাজ মানসিক সুস্থতার বড় সহায়ক, অথচ আমরা এগুলোকে প্রায়ই অপ্রয়োজনীয় বিলাস ভেবে সরিয়ে রাখি।
পঞ্চমত, অভিভাবকদের সঙ্গে সংলাপ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারকে একই পাশে দাঁড়াতে হবে। অভিভাবক সভায় শুধু ফলাফল নয়, শিক্ষার্থীর মানসিক ও সামাজিক বিকাশ নিয়েও কথা বলার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সন্তানের ওপর প্রত্যাশা থাকা দোষের নয়, কিন্তু সেই প্রত্যাশা যেন তার শ্বাস আটকে না দেয়, এই বোধ পরিবারকেও অর্জন করতে হবে।
নীতির দায়িত্ব ও সমাজের ভূমিকা
এসব উদ্যোগ টেকসই করতে হলে নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছা অপরিহার্য। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর যদি মানসিক স্বাস্থ্যকে শিক্ষানীতির স্পষ্ট অংশ করে, বাজেটে বরাদ্দ রাখে এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট নির্দেশিকা বাস্তবায়নের তদারকি করে, তাহলেই পরিবর্তন সম্ভব। অন্যথায় ভালো ভালো ঘোষণা কাগজেই থেকে যাবে।
গণমাধ্যমেরও এখানে বড় ভূমিকা আছে। আত্মহত্যার খবর পরিবেশনে সংবেদনশীলতা, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা এবং সাহায্য চাওয়ার পথ সম্পর্কে তথ্য দেওয়া সমাজের মনোভাব বদলাতে সহায়তা করতে পারে।
শেষ কথা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু জ্ঞান বিতরণের কেন্দ্র নয়, এটি একটি মানুষ গড়ার জায়গা। একজন শিক্ষার্থী যদি সনদ নিয়ে বের হয় কিন্তু ভেতরে ভেঙে পড়ে, তবে আমরা তাকে সফল বলতে পারি না। আমাদের সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত, কতজন শিক্ষার্থী নিজেকে নিরাপদ, মূল্যবান ও শোনা হয়েছে বলে অনুভব করল।
আজ আমাদের প্রস্তুতি অপর্যাপ্ত, এ কথা স্বীকার করাই প্রথম পদক্ষেপ। দ্বিতীয় পদক্ষেপ হলো, শুরু করা। একজন কাউন্সেলর, একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালা, একটি খোলামেলা আলোচনা সভা, এই ছোট ছোট শুরুই একদিন বড় পরিবর্তনের ভিত্তি হবে।
পরেরবার যখন কোনো শিক্ষার্থীকে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে দেখব, আমি আশা করি, তখন শুধু ক্লাস চালিয়ে যাব না। কাছে গিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করব, “কেমন আছ?” কারণ কখনো কখনো এই একটি প্রশ্নই একজন মানুষের কাছে পৌঁছানোর সবচেয়ে বড় সেতু হয়ে ওঠে।












