শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কতটা প্রস্তুত

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:০৩ পূর্বাহ্ণ
শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কতটা প্রস্তুত

মো. মামুন হাসান

শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে একজন শিক্ষক সবচেয়ে বেশি যা শেখেন, তা কোনো পাঠ্যবইয়ে লেখা নেই। শেখেন শিক্ষার্থীর চোখের ভাষা পড়তে। যে ছেলেটি গত মাস পর্যন্ত সবার আগে হাত তুলত, সে আজ জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। যে মেয়েটি ছিল প্রাণবন্ত, সে এখন খাতায় শুধু আঁকিবুকি কাটে। আমরা শিক্ষকেরা এসব দেখি, কিন্তু অনেক সময় বুঝে উঠতে পারি না কী করা উচিত। এই অসহায়তাই আজকের লেখার সূচনা।

নীরব সংকটের বাস্তবতা

বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা এখনো অনেকটাই ঢাকা পড়ে থাকে। কিন্তু সংকট যে বাড়ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। পরীক্ষার ফল, চাকরির অনিশ্চয়তা, পারিবারিক প্রত্যাশা, সামাজিক মাধ্যমের তুলনা আর অর্থনৈতিক চাপ মিলিয়ে একজন তরুণ শিক্ষার্থী প্রতিদিন এমন এক বোঝা বহন করে, যার কথা সে হয়তো কাউকে বলতেই পারে না। সংবাদপত্রের পাতায় মাঝেমধ্যে শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর আসে। আমরা কিছুদিন শোক করি, প্রশ্ন তুলি, তারপর আবার সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। অথচ প্রতিটি খবরের পেছনে থাকে অসংখ্য অপ্রকাশিত নীরব লড়াই।

পলিটেকনিকের মতো কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই চাপের কিছু নিজস্ব রূপ আছে। এখানে আসা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আসে গ্রামীণ ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে। তাদের অনেকেই পরিবারের প্রথম প্রজন্ম, যারা উচ্চশিক্ষার পথে পা রেখেছে। পরিবারের আশা থাকে, চার বছর পর ছেলে বা মেয়ে একটি ভালো চাকরি নিয়ে ঘরে ফিরবে। সেই আশার ভার শিক্ষার্থীর কাঁধে অদৃশ্য পাথরের মতো চেপে বসে। ব্যবহারিক কাজের চাপ, ধারাবাহিক মূল্যায়ন, শিক্ষানবিশির অনিশ্চয়তা এবং ডিপ্লোমা শেষে কর্মসংস্থানের দুশ্চিন্তা যোগ হয়ে মানসিক চাপকে আরও তীব্র করে তোলে।

আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু

এবার সেই মূল প্রশ্নে আসা যাক। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কতটা প্রস্তুত? সত্যি কথা বলতে গেলে, উত্তরটা স্বস্তিদায়ক নয়।

প্রথমত, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর নেই। যেখানে একজন কাউন্সেলরের কথা কাগজে আছে, সেখানে বাস্তবে হয়তো একটি কক্ষও নেই, কিংবা আছে এমন একজন শিক্ষক, যিনি নিজের পাঠদানের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এই কাজটি করেন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা একটি বিশেষায়িত দক্ষতা। শুধু সদিচ্ছা দিয়ে এই কাজ হয় না।

দ্বিতীয়ত, আমাদের শিক্ষকদের বড় অংশ মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ পাননি। আমি নিজে একজন শিক্ষক হিসেবে স্বীকার করছি, বিষণ্নতার লক্ষণ চিনতে পারা, একজন সংকটে থাকা শিক্ষার্থীর সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয় এবং কখন তাকে পেশাদার সহায়তার কাছে পাঠাতে হয়, এসব আমাদের শিক্ষক প্রশিক্ষণের কোনো নিয়মিত অংশ নয়। ফলে আমরা অনেক সময় ভালো উদ্দেশ্য নিয়েও ভুল করে ফেলি। হয়তো উপদেশ দিয়ে ব্যাপারটা সহজ করে ফেলি, কিংবা বলি, “এত ভেঙে পড়ার কী আছে?” এই এক বাক্য একজন শিক্ষার্থীকে আর কখনো মুখ খুলতে না দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

তৃতীয়ত, কলঙ্কের প্রশ্ন। আমাদের সমাজে মানসিক সমস্যাকে এখনো দুর্বলতা, এমনকি লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। শিক্ষার্থী ভাবে, সে কাউন্সেলরের কাছে গেলে সহপাঠীরা কী বলবে। অভিভাবকেরা ভাবেন, এ আবার কেমন সমস্যা, একটু পড়ালেখায় মন দিলেই তো সব ঠিক হয়ে যাবে। এই মনোভাব যতদিন থাকবে, সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থাও অকার্যকর থেকে যাবে।

চতুর্থত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোই অনেক সময় চাপ সৃষ্টির কারণ। ফলাফলকেন্দ্রিক মূল্যায়ন, জিপিএর প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব এবং ব্যর্থতাকে কলঙ্ক হিসেবে দেখার সংস্কৃতি শিক্ষার্থীকে এমন এক জায়গায় ঠেলে দেয়, যেখানে একটি খারাপ ফল মানে যেন পুরো জীবনের পরাজয়। শেখার আনন্দের চেয়ে নম্বরের ভয় সেখানে বড় হয়ে ওঠে।

শিক্ষক হিসেবে যা দেখি

আমার নিজের বিভাগের কথা বলি। ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে মানুষের সঙ্গে আচরণই পেশার প্রধান শক্তি। আতিথেয়তা শিল্পে সফল হতে হলে একজনকে হাসিমুখে অন্যের সেবা করতে জানতে হয়। কিন্তু যে তরুণ নিজের ভেতরের কষ্ট সামলাতে পারছে না, সে কীভাবে অন্যকে প্রশান্তি দেবে? আমি প্রায়ই শিক্ষার্থীদের বলি, ভালো হোস্ট হওয়ার প্রথম শর্ত নিজের সঙ্গে ভালো থাকা। এই কথাটা শুধু পেশাগত নয়, জীবনেরও।

আমি লক্ষ করেছি, শিক্ষার্থীরা সাধারণত সরাসরি নিজের কষ্টের কথা বলে না। তারা বলে অন্যভাবে। হঠাৎ অনুপস্থিতি বেড়ে যায়, ব্যবহারিক ক্লাসে আগ্রহ কমে আসে, বন্ধুদের সঙ্গ এড়িয়ে চলে, অথবা অল্প কারণেই রেগে ওঠে। এগুলো আসলে সাহায্যের নীরব আহ্বান। যে শিক্ষক এই সংকেত চিনতে পারেন, তিনিই হতে পারেন একজন শিক্ষার্থীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। কিন্তু সেই চোখ তৈরি করতে হলে প্রশিক্ষণ লাগে, সময় লাগে, আর লাগে প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন।

কী করা যায়

সমস্যা চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়। সমাধানের পথও ভাবতে হবে, এবং আমার মতে তা অসম্ভব নয়।

প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে প্রতিটি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত একজন প্রশিক্ষিত মনোসামাজিক কাউন্সেলর নিয়োগ। শুরুতে সব প্রতিষ্ঠানে সম্ভব না হলে জেলা পর্যায়ে একটি সমন্বিত সেবাকেন্দ্র করা যেতে পারে, যেখানে আশপাশের প্রতিষ্ঠানগুলো সহায়তা পাবে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষক প্রশিক্ষণের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রাথমিক সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। সংকটের লক্ষণ চেনা, সহানুভূতির সঙ্গে শোনা এবং সঠিক জায়গায় পাঠানো, এই তিনটি দক্ষতা প্রতিটি শিক্ষকের থাকা উচিত। তাঁকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হতে হবে না, কিন্তু একজন সংবেদনশীল প্রথম সাড়াদাতা হতে হবে।

তৃতীয়ত, সমবয়সী সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা অনেক সময় শিক্ষকের চেয়ে বন্ধুর কাছে সহজে মন খোলে। প্রশিক্ষিত শিক্ষার্থী স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি করা গেলে সহায়তার একটি স্বাভাবিক পথ খোলে, যেখানে সাহায্য চাওয়া কোনো লজ্জার বিষয় থাকে না।

চতুর্থত, মূল্যায়ন ব্যবস্থায় মানবিকতা আনতে হবে। ব্যর্থতাকে শেখার অংশ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি গড়তে হবে। পরীক্ষার সময় বাড়তি চাপ কমাতে নিয়মিত অভিযোজনমূলক ক্লাস, খোলামেলা আলোচনা ও সৃজনশীল কার্যক্রম রাখা যেতে পারে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও সামাজিক কাজ মানসিক সুস্থতার বড় সহায়ক, অথচ আমরা এগুলোকে প্রায়ই অপ্রয়োজনীয় বিলাস ভেবে সরিয়ে রাখি।

পঞ্চমত, অভিভাবকদের সঙ্গে সংলাপ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারকে একই পাশে দাঁড়াতে হবে। অভিভাবক সভায় শুধু ফলাফল নয়, শিক্ষার্থীর মানসিক ও সামাজিক বিকাশ নিয়েও কথা বলার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সন্তানের ওপর প্রত্যাশা থাকা দোষের নয়, কিন্তু সেই প্রত্যাশা যেন তার শ্বাস আটকে না দেয়, এই বোধ পরিবারকেও অর্জন করতে হবে।

নীতির দায়িত্ব ও সমাজের ভূমিকা

এসব উদ্যোগ টেকসই করতে হলে নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছা অপরিহার্য। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর যদি মানসিক স্বাস্থ্যকে শিক্ষানীতির স্পষ্ট অংশ করে, বাজেটে বরাদ্দ রাখে এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট নির্দেশিকা বাস্তবায়নের তদারকি করে, তাহলেই পরিবর্তন সম্ভব। অন্যথায় ভালো ভালো ঘোষণা কাগজেই থেকে যাবে।

গণমাধ্যমেরও এখানে বড় ভূমিকা আছে। আত্মহত্যার খবর পরিবেশনে সংবেদনশীলতা, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা এবং সাহায্য চাওয়ার পথ সম্পর্কে তথ্য দেওয়া সমাজের মনোভাব বদলাতে সহায়তা করতে পারে।

শেষ কথা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু জ্ঞান বিতরণের কেন্দ্র নয়, এটি একটি মানুষ গড়ার জায়গা। একজন শিক্ষার্থী যদি সনদ নিয়ে বের হয় কিন্তু ভেতরে ভেঙে পড়ে, তবে আমরা তাকে সফল বলতে পারি না। আমাদের সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত, কতজন শিক্ষার্থী নিজেকে নিরাপদ, মূল্যবান ও শোনা হয়েছে বলে অনুভব করল।

আজ আমাদের প্রস্তুতি অপর্যাপ্ত, এ কথা স্বীকার করাই প্রথম পদক্ষেপ। দ্বিতীয় পদক্ষেপ হলো, শুরু করা। একজন কাউন্সেলর, একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালা, একটি খোলামেলা আলোচনা সভা, এই ছোট ছোট শুরুই একদিন বড় পরিবর্তনের ভিত্তি হবে।

পরেরবার যখন কোনো শিক্ষার্থীকে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে দেখব, আমি আশা করি, তখন শুধু ক্লাস চালিয়ে যাব না। কাছে গিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করব, “কেমন আছ?” কারণ কখনো কখনো এই একটি প্রশ্নই একজন মানুষের কাছে পৌঁছানোর সবচেয়ে বড় সেতু হয়ে ওঠে।

মো. মামুন হাসান,বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

Ads small one

তালার ধানদিয়ায় প্রায় দুই লাখ টাকার গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ
তালার ধানদিয়ায় প্রায় দুই লাখ টাকার গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিনিধি: দেশে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে বৃক্ষরোপণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার ধানদিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ঝড়গাছা-পানপাড়া গ্রামের নিমাই কৃষ্ণ ঘোষের তিন ছেলেÑপ্রণব ঘোষ, সন্ন্যাসী কুমার ঘোষ ও সুমন ঘোষের পৈতৃক সম্পত্তিতে লাগানো ১৫ বছরের পুরোনো দুটি বড় শীলকড়া গাছ জোরপূর্বক কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।

একই এলাকার সুধীর ঘোষের ছেলে ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু ঘোষ এবং রবীন ঘোষসহ তাঁদের সন্ত্রাসী বাহিনী বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে এই গাছগুলো কেটে ফেলে।

ভুক্তভোগী প্রণব ঘোষ, সন্ন্যাসী কুমার ঘোষ ও সুমন ঘোষ জানান, তাঁদের না জানিয়ে প্রভাবশালী পিন্টু ঘোষ ও তাঁর লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে জোরপূর্বক গাছ দুটি কেটে নেন, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় দুই লাখ টাকা। এ সময় গাছ কাটার ফলে ওই স্থানে থাকা অসংখ্য বাঁশঝাড় ও ফলজ গাছেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

আশাশুনির নবাগত সমাজসেবা কর্মকর্তার প্রথম অনুষ্ঠানেই অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ
আশাশুনির নবাগত সমাজসেবা কর্মকর্তার প্রথম অনুষ্ঠানেই অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

আশাশুনি প্রতিনিধি: আশাশুনি উপজেলায় নবাগত সমাজসেবা কর্মকর্তা এস এম দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালনের মধ্য দিয়ে তিনি প্রথম কোনো সরকারি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। তবে উপজেলা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ এই সরকারি অনুষ্ঠানটিতে প্রবীণদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ও জনসমাগম ছিল না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে উপজেলা পরিষদ ভবনের সামনে থেকে একটি সংক্ষিপ্ত র‌্যালি বের করা হয়, যা মাত্র ২০-৩০ হাত এগিয়ে ফটোসেশনের মাধ্যমেই শেষ করা হয়। আমন্ত্রিত অতিথি ও কয়েকজন আধা প্রবীণ এবং যুবকদের নিয়ে এই র‌্যালি সম্পন্ন হয়। এরপর উপজেলা পরিষদ সভা কক্ষে ২০-৩০ জনের অংশগ্রহণে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে হাতেগোনা কয়েকজন প্রবীণ উপস্থিত থাকলেও তাঁদের কোনো বক্তব্য বা অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয়নি। এমনকি এনজিও প্রতিনিধি ও উপস্থিত সাংবাদিকদেরও কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। সংক্ষিপ্ত পরিসরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সমাজসেবা কর্মকর্তা এবং দুজন রাজনৈতিক ব্যক্তি বক্তব্য দিয়ে অনুষ্ঠান সমাপ্ত করেন।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে সরকারিভাবে আর্থিক বরাদ্দ থাকার পরও সমাজসেবা কর্মকর্তা অনুষ্ঠান খরচের অজুহাতে উপজেলার ছয়টি এনজিওর কাছ থেকে চাঁদা আদায় করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অনুষ্ঠানে বিতরণ করা ব্যানারে ফ্রেন্ডশিপ, উত্তরণ, ইএসডিও, বারসিক, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স, ন্যাজারিন মিশন ও আইডিয়াল এনজিওর নাম ও মনোগ্রাম ব্যবহার করা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ব্যানার ও নাশতা বাবদ মোট খরচ হয়েছে ৪ হাজার ৯৬০ টাকা, যা এনজিওদের কাছ থেকে তোলা চাঁদার মাধ্যমেই মূলত পূরণ করা হয়েছে। এর ফলে সরকারি বরাদ্দের টাকা আত্মসাতের পথ উন্মুক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ সচেতন মহলের। এ বিষয়ে সচেতন নাগরিকরা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে উপজেলা সমাজসেবা অফিসের ইউনিয়ন সমাজকর্মী মৃণাল স্বর্ণকার জানান, এনজিওদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হয়েছে এবং মোট ৪,৯৬০ টাকা খরচ হয়েছে; পরবর্তীতে তিনটি অনুষ্ঠানের জন্য ২৫ হাজার টাকার বরাদ্দ পাওয়া যাবে। তবে অভিযুক্ত উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এস এম দেলোয়ার হোসেন সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সরাসরি জবাব না দিয়ে অফিসে গিয়ে কথা বলার পরামর্শ দেন।

 

শরতের আলতো ছোঁয়ায় গুড়পুকুর মেলা: ঐতিহ্য, আনন্দ ও জীবিকার মেলবন্ধন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ
শরতের আলতো ছোঁয়ায় গুড়পুকুর মেলা: ঐতিহ্য, আনন্দ ও জীবিকার মেলবন্ধন

0-0x0-0-0#

মিলন বিশ্বাস: নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা আর কাশের দোলায় মোড়ানো শরতের শান্ত বিকেলে অনন্য এক প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে সাতক্ষীরার শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে। শৈশবের সোনালি স্মৃতি, প্রিয়জনদের সান্নিধ্য আর খেটে খাওয়া মানুষের জীবিকার আলোÑসবকিছুর মোহনীয় সংমিশ্রণ ঘটে চলেছে ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুর মেলায়। দুই বছরের দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে প্রায় তিন শ বছরের প্রাচীন এ মেলা যেন এক নতুন ভোরে জেগে উঠেছে। মেলার দশম দিনে উৎসবমুখর আবহের মাঝে আগত দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় দায়িত্বশীল পুলিশ প্রশাসনের কর্মতৎপরতাও ছিল লক্ষণীয়।

মেলার তোরণ পেরিয়ে ভেতরে পা রাখতেই নজরে আসে সব বয়সের মানবের মিলনমেলা। পরিবারের হাত ধরে খুদে পথচলা, সন্তানের হাসিমুখের জন্য খেলনার বায়না মেটানো আর কেনাকাটার নানা আয়োজনে চারপাশটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। নাগরদোলার দোলাচল, দূর থেকে ভেসে আসা পথশিশুদের রেলগাড়ির হুইসেল, রকমারি মিষ্টির সুবাস আর গৃহস্থালি পণ্যের ঝলকানিÑসব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ।

মেলা প্রাঙ্গণে বিরাজ করছিল এক স্নিগ্ধ ও স্বাভাবিক সুর। দর্শনার্থীরা যখন আনন্দ উদযাপনে মগ্ন, তখন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে মেলার বিভিন্ন কোণে ঘুরে নজরদারি চালাচ্ছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তাঁদের এমন পদচারণায় নিশ্চিত নিরাপদ পরিবেশ পেয়ে আগতদের চোখেমুখে ছিল স্বস্তির ছাপ।

কেবল কেনাকাটার ধুম নয়, এই গুড়পুকুর মেলার ধূলিকণায় মাখানো রয়েছে সাতক্ষীরার প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতিচিহ্ন ও আবেগ। বয়সের ভারে নয়ে পড়া প্রবীণদের কাছে এই মেলা যেন দূর শৈশবের দিনগুলো নতুন করে ছুঁয়ে দেখার এক সুযোগ, আর নবীনদের কাছে আনন্দ ও অভিজ্ঞতার দিগন্ত ছোঁয়ার রঙিন প্রান্তর। ছোটদের উচ্ছ্বল চোখের তারা আর মা-বাবার মমতাময় হাত ধরে ঘেঁষে হাঁটার দৃশ্যটি ছিল অনবদ্য।
উৎসবের এই আবহের অন্তরালে রয়েছে বহু শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম ও স্বপ্নপূরণের গল্প। দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা পসরা সাজিয়ে বসেছেন। জামাকাপড়, প্রসাধনী, শিশুদের খেলার সামগ্রী কিংবা খাবারÑসব দোকানঘিরেই মানুষের উপচে পড়া ভিড়। শরতের এই মেলার বেচাকেনা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি কিছু উপার্জনের এক বড় পথ খুলে দিয়েছে। তাই তো ক্রেতাদের উপস্থিতিতে ফুটে ওঠে তাঁদের আশাজাগানিয়া হাসি।

পণ্য বিক্রির মিষ্টি হাঁকডাক, ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম আর নিষ্পাপ শিশুদের খিলখিল হাসিতে এক মোহময় আবহের সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রাঙ্গণ আর কেবল বেচাকেনায় সীমাবদ্ধ নেই, পরিণত হয়েছে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার এক মানবিক উদ্যানে। শিকড় আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্য আগামীতেও যেন স্বমহিমায় টিকে থাকে, সে প্রত্যাশাই স্থানীয়দের।

এদিকে দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে মেলার সময়সীমা আরও দুই ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। মেলা কমিটির সদস্য হাসান শিকদার জানান, নতুন সময়সূচি অনুযায়ী প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে। সময় বাড়ায় কেনাকাটা ও ভ্রমণের জন্য পর্যাপ্ত অবকাশ পাবেন দর্শনার্থীরা।
জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার সার্বিক তত্ত্বাবধানে শহরতলির শহীদ আবদুর রাজ্জাক পার্কে ১ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ২০ দিনব্যাপী এই মিলনমেলা চলবে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত। শিশু-কিশোরের আনন্দ-হাসি, প্রবীণদের স্মৃতিমেদুরতা আর খেটে খাওয়া মানুষের বেঁচে থাকার প্রেরণা নিয়ে গুড়পুকুর মেলা শরতের হাওয়ায় ডানা মেলেছে অনন্য এক রূপ নিয়ে।