সম্পাদকীয়/ উপকূলের লোনাজলে নতুন স্বপ্ন
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব ও বিশ্ব উষ্ণায়নের এই যুগে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল ক্রমেই তীব্র সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। জমিতে লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধি, মিষ্টি পানির অভাব এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপকূলীয় এলাকার প্রথাগত কৃষিব্যবস্থাকে এক চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। তবে সেই প্রতিকূলতা ও স্থবিরতাকে মেনে নিয়ে থমকে যাননি সাতক্ষীরার কৃষককুল। বরং বিজ্ঞানের উদ্ভাবন আর নিজেদের অমূল্য অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা প্রকৃতির এই বিরূপতার বিরুদ্ধে নতুন এক লড়াই গড়ে তুলেছেন। লোনা পানির মাছের ঘেরের অনাবাদি আইলে অসময়ে তরমুজ ও নানাবিধ সবজি ফলিয়ে তাঁরা জলবায়ু অভিযোজনের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন।
একসময় চৈত্র-বৈশাখ মাসে যখন উপকূলের মাটিতে লবণাক্ততার পরাকাষ্ঠা থাকত, তখন ঘেরের আশপাশের আইলগুলো পতিত হিসেবেই পড়ে থাকত। কিন্তু বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা জেলায় অসময়ের তরমুজ চাষ প্রায় ১৪১ হেক্টর জমিতে বিস্তৃত হয়েছেÑযা গত মৌসুমের চেয়ে বহুগুণ বেশি। ঘেরের পানিতে সাঁতার কাটছে মাছ আর ওপরের আইল বা মাচায় শোভা পাচ্ছে সুপ্রিম হানি, ব্ল্যাক বেবি, তৃপ্তির মতো প্রজাতি ও আধুনিক প্রযুক্তিতে ফলানো রকমারি সবজি। দেবহাটা কিংবা তালার প্রান্তিক কৃষকদের এই সফলতা কেবল ব্যক্তিগত আয়ের নতুন উৎস তৈরি করেনি, বরং স্থানীয় অর্থনীতি ও পুষ্টি নিরাপত্তায় এক দারুণ প্রভাব ফেলছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই নতুন কৃষিধারায় ঘরের নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় দিনমজুরদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হওয়া নিঃসন্দেহে গ্রামীণ অর্থনীতির এক আশাব্যঞ্জক দিক।
তবে কৃষকদের এই বিস্ময়কর সাফল্যকে কোনোভাবেই চিরস্থায়ী ধরে নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ নেই। এই সম্ভাবনাময় উদ্যোগটির সামনে এখনো কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট। এর মধ্যে প্রধান সংকট হলো সেচের উপযোগী মিষ্টি পানির তীব্র অভাব, আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত। চারা টিকিয়ে রাখতে কিংবা ফলন ভালো রাখতে কৃষকদের যে অতিরিক্ত শ্রম ও খরচ মেটাতে হয়, তা অনেক সময় তাঁদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
উপকূলীয় কৃষকদের এই ব্যক্তিগত ও আঞ্চলিক উদ্যোগকে জাতীয় পর্যায়ে একটি টেকসই কৃষিমডেল হিসেবে রূপ দিতে হলে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে জোরদার কৌশলগত পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রথমত, সেচসুবিধা নিশ্চিত করার জন্য বৃষ্টিসংরক্ষণ প্রযুক্তি ও উপকূলীয় পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী সমাধান বের করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ুসহিষ্ণু ও লবণাক্ততাসহিষ্ণু বীজের সহজলভ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে আধুনিক কৃষিতথ্যের তদারকি আরও জোরদার করা জরুরি।
সাতক্ষীরার লোনা পানির ঘেরে কৃষকদের হাত ধরে তরমুজের যে মৃদু হাসি ফুটে উঠেছে, তা কেবল একটি ফসলের ফলন নয়Ñতা প্রতিকূল প্রকৃতিকে জয় করে বেঁচে থাকার এক বলিষ্ঠ প্রতীক। সরকারি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি, কার্যকর নীতিমালা এবং নিরবচ্ছিন্ন সহায়তার সুযোগ পেলে উপকূলীয় এলাকার এই সবুজ বিপ্লব দেশের সার্বিক কৃষিখাত ও খাদ্য নিরাপত্তায় যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।









