যখন ছবিটা সময় পেরিয়েও থেকে যাবে, সাফল্য তখনই: শঙ্খ দাসগুপ্ত
নির্মাতা শঙ্খ দাশগুপ্ত পরিচালিত চরকি অরিজিনাল ফিল্ম ‘চা গরম’ বেশ আলোচিত এবং প্রশংসা পাচ্ছে। যারা দেখেছেন, সবাই ভালো বলছেন। নির্মাতার সাফল্য হয়তো এটাই? কিন্তু না শঙ্খ দাশগুপ্তের কাছে এটাই চূড়ান্ত সাফল্য নয়। তাহলে কখন নিজেকে সফল মনে হবে শঙ্খর?
তার উত্তর, “সবাই ভালো বলছে এটা নিশ্চয়ই ভালো লাগার। কিন্তু এটাকে চূড়ান্ত সাফল্য বলব না। আমার কাছে সাফল্য তখনই, যখন ছবিটা সময় পেরিয়েও থেকে যাবে, বা কেউ আবার ফিরে এসে দেখবে। আর সবচেয়ে বড় কথা পরের কাজে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পারলে, সেটাই আসল সাফল্য।”
শঙ্খ দাশগুপ্তের কথার মিল খুঁজতে একটু পেছনে যেতে হবে। তার পরের কাজটা কী, সেটা এখনও প্রকাশিত না। কিন্তু ‘চা গরম’– এর আগের কাজ বা তার আগের কাজগুলো দেখে আসলে হয়তো শঙ্খর নিজেকে আবিষ্কারের চর্চাটি বোঝা যেতে পারে।
‘চা গরম’–এর আগে শঙ্খ নির্মাণ করেছেন তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘প্রিয় মালতী’ তার আগে তিনি নির্মাণ করেছেন চরকি অরিজিনাল সিরিজ ‘গুটি’। এসব কনটেন্টের বিষয়বস্তু এবং নির্মাণে নির্মাতা নিজেকে ভাঙতে বা আবিষ্কার যেমন করতে চেয়েছেন আবার কিছু সাদৃশ্যও রেখে গেছেন।
‘গুটি’, ’প্রিয় মালতী’ এবং এখনকার ‘চা গরম’– তিনটি কনটেন্টেই নির্মাতা আশ্রয় করেছেন নারী চরিত্রকে। অর্থাৎ গল্পগুলো এগিয়ে নিয়ে গেছেন কোনো নারী চরিত্র বা নারী চরিত্রকে সামনে রেখে সমস্যা এবং সম্ভাবনা দেখানোর চেষ্টা আছে। এটা সচেতনভাবেই করেলন কী শঙ্খ দাশগুপ্ত?
তার উত্তর, ‘নারী চরিত্রকে সামনে আনা কোনো স্টেটমেন্ট দেয়ার চেষ্টা নয়। বাস্তবে অনেক সময় নারীরাই নীরবে সবচেয়ে বড় চাপ, দ্বন্দ্ব আর পরিবর্তনের জায়গাগুলো বহন করে। ‘গুটি’, ‘প্রিয় মালতী’ বা ‘চা গরম’-এও সেই বাস্তবতাটাই ধরতে চেয়েছি! সমস্যা যেমন আছে, সম্ভাবনাও আছে।”
নাকি শঙ্খ নারী কেন্দ্রীক বা নারীর ক্ষমতায়নের গল্প বলতে ভালোবাসেন?
“‘ওম্যান সেন্ট্রিক গল্প বলতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু যদি গল্প নিজে থেকেই সেই দিকে নিয়ে যায়, আমি থামাই না। আমার কাছে চরিত্রটাই আগে, সে নারী না পুরুষ, সেটা পরে।” পরিষ্কার করলেন তিনি।
‘গুটি’, ‘প্রিয় মালতী’, ‘চা গরম’– শঙ্খর তিন কাজেই রাজনীতি ও ধর্মীয় কিছু দৃষ্টিভঙ্গি আছে। যারা দেখেছেন, বুঝতে পারবেন। নির্মাণে এসব স্পর্শকাতর বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখান নি নির্মাতা। এগুলো যেহেতু বাস্তবতা সেহেতু তার নির্মাণে থাকতেই পারে। কিন্তু এটাও কি একটা প্যাটার্ন হয়ে যাচ্ছে কি না তার কাজে?
শঙ্খ মনে করেন, “রাজনীতি বা ধর্ম এগুলো আলাদা করে ঢোকানোর কিছু নেই, এগুলো আমাদের জীবনের অংশ। তাই গল্পে এলে সেটাকে এড়িয়ে যাওয়া কৃত্রিম লাগে। তবে প্যাটার্ন হয়ে যাচ্ছে কিনা এই প্রশ্নটা আমার কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে বারবার ভাঙার চেষ্টা করছি।”
কিন্তু এই ভাঙার চেষ্টা করেও নিজের শেষ তিন কাজে একটা ঢং ভাঙতে পারেননি শঙ্খ দাশগুপ্ত। কোনো এক কারণে তার শেষ তিন কাজের প্রতিটিতেই মূল চরিত্রের পাশাপাশি আরেকটি চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দর্শকরা তাদের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশে অনেক সময় প্রোটাগনিস্টের চেয়ে ‘সাইড ক্যারেক্টার’–এর প্রতি রাগ বা ভালোবাসা বেশি দেখিয়েছেন।
যেমন বলা যায়, ‘গুটি’তে শাহরিয়ার নাজিম জয়, ‘প্রিয় মালতী’–তে রিজভী রিজু, শাহজাহান সম্রাট দর্শকদের নজর কেড়েছেন। ‘চা গরম’–এ রবিন চাঁদ মুর্মূ চরিত্রটি তো এক কাঠি সরেস।
শঙ্খ জানালেন, তিনি আসলে ‘হিরো’–‘নায়ক’ এসব বানাতে আগ্রহী নন। তিনি মানুষ–চরিত্র বানাতে আগ্রহী। তাই অনেক সময় মূল চরিত্র না হয়েও অন্য চরিত্রগুলো বেশি স্পেস পেয়ে যেতে পারে বা বেশি মনে থাকে। নির্মাতা বলেন, ‘জীবনেও তো তাই হয়! সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটা সবসময় কেন্দ্রের মানুষটা হয় না।’
শঙ্খ দাশগুপ্তের কাজে বিষয়বস্তু, চিত্রায়ণের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংলাপ। ছোট ছোট সংলাপে খুবই গুরুত্পূর্ণ তথ্য বা ইঙ্গিত দিয়ে থাকেন তিনি। মনোযোগী দর্শক না হলে সেগুলো বের করা কঠিনই বটে। কিন্তু এই কঠিন কাজটা করতে গিয়ে পুরো বিষয়টাই গুরুগম্ভীর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
শঙ্খ বিষয়টি যেভাবে দেখেন, “হ্যাঁ, সংলাপ নিয়ে আমি সচেতন। কারণ আমার কাছে সংলাপ শুধু তথ্য দেয় না, একটা ইমেজ তৈরি করে। তবে গুরুগম্ভীর হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে এটা ঠিক। সেই ব্যালান্সটাই খোঁজার চেষ্টা করি সবসময়।”
শেষবারের মতো ’চা–গরম’–এ ফেরা যাক। চা বাগানের থেকে, সেখানকার মানুষের সঙ্গে মিশে ‘চা গরম’ করেছেন শঙ্খ দাশগুপ্ত। চা বাগানের শ্রমিকদের নানা বিষয় জাতীয় ইস্যু হতেও দেখা গেছে। তেমন একটি বিষয় নিয়ে নির্মাণ করতে গিয়ে শঙ্খ যে পরিসরে সিনেমাটি নির্মাণ করলেন বা যে পরিমিতি তিনি দেখালেন সেটা কী পর্যাপ্ত বা ঠিক মনে হলো?
শঙ্খ দাশগুপ্ত বললেন, “জাতীয় ইস্যু বলেই আমি এটাকে বড় করে বলার চেষ্টা করিনি। বরং ছোট পরিসর, নির্দিষ্ট মানুষ আর তাদের দৈনন্দিনতার ভেতর দিয়ে বলেছি। আমার বিশ্বাস- গল্পটা যখন ব্যক্তিগত হয়, তখনই সেটা আসলে বড় হয়ে ওঠে। তাই টোনটা ইচ্ছাকৃতভাবেই সংযত।”
গত ১৪ এপ্রিল চরকিতে মুক্তি পেয়েছে ’চা গরম’ ফিল্মটি। সাইফুল্লাহ রিয়াদের গল্প ও চিত্রনাট্যে এতে অভিনয় করেছেন সাফা কবির, রেজওয়ান পারভেজ, সারাহ জেবীন অদিতি, পার্থ শেখ , এ কে আজাদ সেতু।









