হাজার বছরের পথ বেয়ে সুন্দরবনের দুয়ারে
পত্রদূত ডেস্ক: প্রথম শ্রেণীর এক স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। শনিবার বিকেল তিনটার দিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঝাউডাঙা ইউনিয়নের ওয়ারিয়া গ্রামের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের বাড়ির ছাদে এ ঘটনা ঘটে। ধর্ষকের নাম- মোশাররফ হোসেন(৫৫)। তিনি সদর উপজেলার পাথরঘাটা গ্রামের আছিদুর রহমান খান চৌধুরীর ছেলে।
ধর্ষিতা স্কুল ছাত্রীর মা জানান, স্বামী তাকে তালাক দেওয়ার পর তিনি যশোরের শার্মা থানাধীন বাগআঁচড়া গ্রামে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এরপর থেকে তার মেয়ে দাদী ও চাচীর কাছে থেকে স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করতো।
তিনি আরো জানান, শনিবার বিকেল তিনটার দিকে তার মেয়ে বাড়ির পাশে কয়েকজন বন্ধুর সাথে খেলতে যায়। কিছুক্ষণ পর বন্ধুরা ফিরে এলেও তার মেয়ে ফিরে না আসায় দাদী ও চাচী খুঁজতে বের হয়। একপর্যায়ে তাকে রফিকুল চেয়ারম্যানের বাড়িতে রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।
মোশাররফ তাকে খাওয়ার দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ছাদে নিয়ে ধর্ষণ করেছে বলে দাদী ও চাচীকে জানায়। একপর্যায়ে বিষয়টি কাউকে না জানানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। বাধ্য হয়ে তিনি সাতক্ষীরা মেডিকেলে ভর্তি করাতে না পেরে রবিবার মেয়েকে নিয়ে বাগআঁচড়ায় নিয়ে আসেন। পরে পুলিশ এসে মেয়েকে নিয়ে সোমবার সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করে।
এ ব্যাপারে মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে তার দুলা ভাই রফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনা সত্য নয়। আগামি ইউপি নির্বাচনকে ঘিরে তার সুনাম নষ্ট করার জন্য এ ধরণের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ শফিকুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় ওই স্কুল ছাত্রীর মা বাদি হয়ে মঙ্গলবার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২০০০ সালের সংশোধিত ২০০৩ এর ৯(১) ধারায় থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় মোশাররফ হোসেনকে আসামী করা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। উপপরিদর্শক শাহারিয়ারকে মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সাতক্ষীরা আদালতের পুলিশ পরিদর্শক নাজমুল হক জানান, ধর্ষিতার ডাক্তারি পরীক্ষা শেষে মঙ্গলবার বিচারিক হাকিম তনিমা ম-ল তার ২২ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণ করেছেন।
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
কিশোর বয়স স্বপ্ন দেখার, নিজেকে গড়ে তোলার এবং ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার সময়। অথচ এই বয়সেই যখন কেউ মাদক, চাঁদাবাজি, ছিনতাই কিংবা সহিংসতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তখন উদ্বিগ্ন না হয়ে উপায় থাকে না। শহরের অলিগলি থেকে গ্রামের হাটবাজার, পাড়া-মহল্লা থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশÑকিশোরদের দলবদ্ধ অপরাধ প্রবণতা এখন সমাজের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, শিক্ষাব্যবস্থা, সামাজিক পরিবেশ এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন।
প্রশ্ন হলো, যে বয়সে কিশোরদের হাতে থাকার কথা বই, খেলাধুলার সরঞ্জাম আর নতুন কিছু করার স্বপ্ন, সেই বয়সে তাদের কেউ কেউ অপরাধের পথে যাচ্ছে কেন? তাদের এই বিচ্যুতির দায় কি শুধু তাদের নিজেদের, নাকি এর পেছনে রয়েছে আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা? কিশোর গ্যাংয়ের যাত্রা অনেক সময় শুরু হয় সাধারণ বন্ধুত্ব ও আড্ডা থেকে। কয়েকজন কিশোর একসঙ্গে চলাফেরা করে, নিজেদের একটি দল তৈরি করে। একপর্যায়ে সেই দলের মধ্যে তৈরি হয় আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা। কে বেশি প্রভাবশালী, কে কাকে ভয় দেখাতে পারে, কার কথায় এলাকায় অন্যরা চলবেÑএমন মানসিকতা থেকে সংঘাতের জন্ম হয়। পরে সেই সংঘাত মাদক, মারামারি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই কিংবা গুরুতর অপরাধে রূপ নিতে পারে।
তবে সব কিশোরের দলই অপরাধী দল নয়। বন্ধুত্ব, খেলাধুলা কিংবা সামাজিক কর্মকা-ের জন্য কিশোরদের দলবদ্ধ হওয়া স্বাভাবিক। সমস্যা তখনই, যখন দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অন্যকে ভয় দেখানো, আইন অমান্য করা এবং অপরাধকে শক্তির প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। অনেক কিশোরের কাছে গ্যাং হয়ে ওঠে পরিচিতি ও প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম। পরিবারে গুরুত্ব না পাওয়া, সামাজিকভাবে অবহেলিত বোধ করা কিংবা বন্ধুদের কাছে নিজেকে প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা তাদের ভুল পথে নিতে পারে।
অপরাধী দলের সদস্যরা তাদের এমন একটি ধারণা দেয় যে, ভয় দেখাতে পারলেই সম্মান পাওয়া যায়। অথচ ভয় আর সম্মান এক জিনিস নয়। এই পার্থক্যটি বুঝতে না পারার সুযোগই নেয় অপরাধপ্রবণ গোষ্ঠী। একটি শিশুর বেড়ে ওঠায় পরিবারের ভূমিকার বিকল্প নেই। কিন্তু সন্তানকে খাবার, পোশাক ও শিক্ষার ব্যবস্থা করে দিলেই অভিভাবকের দায়িত্ব শেষ হয় না। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী নিয়ে ভাবছে এবং কোনো মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর দিতে হয়।
বর্তমানে অনেক পরিবারে অভিভাবক ও সন্তানের মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতি দেখা যায়। কেউ কর্মব্যস্ততায় সন্তানকে সময় দিতে পারেন না, কেউ আবার সন্তানের সঙ্গে কথা বলার পরিবর্তে শুধু পড়াশোনা ও ফলাফলের ওপর গুরুত্ব দেন। ফলে কিশোরের অভিমান, হতাশা কিংবা সমস্যার কথা শোনার মানুষটি পরিবারে না থাকলে সে বাইরের মানুষের কাছে আশ্রয় খোঁজে। সেই আশ্রয় যদি ভুল সঙ্গের মধ্যে হয়, তাহলে বিপদের আশঙ্কা বাড়ে। অবশ্য কিশোর অপরাধের সব দায় পরিবারকে দেওয়া যাবে না।
অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক বৈষম্য, মাদকের সহজলভ্যতা, অপরাধীদের প্রভাব এবং নিরাপদ বিনোদনের অভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। একটি এলাকায় খেলার মাঠ নেই, পাঠাগার নেই, সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের সুযোগ নেই; অথচ কিশোরদের অবসর সময় কাটানোর বিকল্পও তৈরি করা হয়নিÑএমন পরিস্থিতিতে তাদের গঠনমূলক কাজে যুক্ত রাখার দায়িত্ব কে নেবে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজ শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই পড়ানো ও পরীক্ষায় ভালো ফল করানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
একজন শিক্ষার্থীর আচরণ, মানসিক অবস্থা, বন্ধুত্বের ধরন এবং সামাজিক বিকাশের প্রতিও শিক্ষকদের নজর দেওয়া প্রয়োজন। কোনো শিক্ষার্থী হঠাৎ নিয়মিত ক্লাস ফাঁকি দিলে, সহপাঠীদের ভয় দেখালে, মারামারিতে জড়িয়ে পড়লে কিংবা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। তাকে সঙ্গে সঙ্গে খারাপ ছেলে হিসেবে চিহ্নিত না করে তার আচরণের কারণ খুঁজতে হবে। প্রয়োজনে অভিভাবকের সঙ্গে আলোচনা, কাউন্সেলিং এবং বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা, বিতর্ক, সংগীত, নাটক, পাঠচক্র ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকা-ের সুযোগ বাড়ানো দরকার।
এসব কার্যক্রম কিশোরদের প্রতিভা বিকাশের পাশাপাশি দলগত দায়িত্ববোধ, সহনশীলতা ও নেতৃত্বের গুণ শেখায়। যে কিশোর নিজের যোগ্যতা প্রকাশের সুযোগ পায়, তাকে অপরাধী দলের কৃত্রিম পরিচয়ের ওপর নির্ভর করতে হয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিশোরদের জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে তারা জ্ঞান অর্জন ও যোগাযোগের সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু সহিংসতার ভিডিও, অস্ত্র প্রদর্শন, অপরাধকে বীরত্ব হিসেবে উপস্থাপন এবং অনলাইনে ভয় দেখানোর প্রবণতা তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শুধু মোবাইল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রয়োজন ডিজিটাল সচেতনতা, দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং অভিভাবকের যথাযথ তদারকি। এর পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কিশোরদের অপরাধে ব্যবহার করছে কারা? কোনো কিশোর মাদক বহন করছে, চাঁদাবাজি করছে কিংবা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেÑএতেই তদন্ত শেষ হয়ে যেতে পারে না। তার পেছনে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী, মাদক ব্যবসায়ী কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছে কি না, তা খুঁজে দেখা জরুরি। যারা কিশোরদের অপরাধে প্ররোচিত করে, অর্থ বা অস্ত্র সরবরাহ করে কিংবা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে সমস্যার শিকড় অক্ষত থেকে যাবে। কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অপরাধ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার দিতে হবে। কিন্তু কিশোরদের ক্ষেত্রে বয়স, অপরাধের ধরন ও পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশোধন এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। একজন কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে মানেই তার ভবিষ্যৎ শেষÑএমন ধারণা বিপজ্জনক। ভুল থেকে ফিরে আসার সুযোগ না দিলে সে আরও গভীরভাবে অপরাধের জগতে ঢুকে পড়তে পারে। তাই সংশোধনমূলক কার্যক্রম, শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ, মানসিক সহায়তা এবং পরিবারে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া কিংবা রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে অপরাধীদের রক্ষা করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি ও সমাজকর্মীদের সমন্বয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
পাড়া-মহল্লায় কিশোরদের ঝুঁকি চিহ্নিত করা, খেলাধুলার সুযোগ তৈরি, মাদকবিরোধী কার্যক্রম এবং অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কোনো কিশোর বিপথে যাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগে থেকেই তাকে সঠিক পথে রাখার উদ্যোগ অনেক বেশি কার্যকর। কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার আমাদের সামনে আয়না ধরেছে। সেখানে শুধু বিপথগামী কিশোরদের দেখা যায় না; দেখা যায় পরিবারে সময়ের অভাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা, সামাজিক উদাসীনতা এবং অপরাধীদের দাপটের চিত্রও। তাই কিশোরদের দোষারোপ করে কিংবা কয়েকটি অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন অপরাধের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান এবং কিশোরদের সুস্থ বিকাশের জন্য বাস্তব উদ্যোগ।
আজকের কিশোর আগামী দিনের নাগরিক। তাকে অপরাধের পথে ঠেলে দিয়ে পরে তার কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করা যায় না। পরিবারকে সন্তানকে সময় দিতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তার পাশে দাঁড়াতে হবে, সমাজকে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং রাষ্ট্রকে অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কিশোরদের হাতে অস্ত্র উঠলে শুধু একজন কিশোরের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয় না, সমাজের নিরাপত্তাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই দায় চাপানোর প্রতিযোগিতা নয়, এখন দরকার দায়িত্ব পালনের সাহস। যারা কিশোরদের অপরাধে ঠেলে দেয়, তাদের থামাতে হবে; যারা ইতিমধ্যে বিপথে গেছে, তাদের ফিরিয়ে আনার পথ তৈরি করতে হবে। কারণ আজ আমরা কিশোরদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে, আগামীকাল সেই ব্যর্থতার মূল্য দিতে হবে পুরো সমাজকে।
লেখক: সংবাদ কর্মী
তারিক ইসলাম
যে সমাজ তার চিন্তাশীল ও মুক্তবুদ্ধির মানুষকে সম্মান জানাতে জানে না, সে সমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হতে বাধ্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বেগম রোকেয়া এবং সাঁইজি লালন শাহ—তাঁরা কেবল তিনটি ঐতিহাসিক নাম নন; তাঁরা আমাদের মনন, মানবিকতা ও সাংস্কৃতিক সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের চিন্তা আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে সংকীর্ণতা আর কুসংস্কারের দেয়াল ভেঙে মুক্ত আকাশের নিচে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু আফসোস, আজ আমাদের সমাজেই বারবার আক্রমণের শিকার হচ্ছেন এই আলো ছড়ানো মানুষগুলো।
সাম্প্রতিক সময়ে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি লেপন, নারীমুক্তির প্রতীক বেগম রোকেয়ার অবদানকে অস্বীকার করা, আর লালনের দর্শনকে হেয় করে তাঁর আখড়ায় আক্রমণের হুমকি দেওয়া—এসব মোটেও সাধারণ ঘটনা নয়। এগুলো আমাদের সাংস্কৃতিক ও চিন্তার স্বাধীনতার ওপর এক গভীর আঘাত।
যাঁদের চিন্তা আমাদের মানসিক মুক্তি দেয়, তাঁদের ওপরই কেন এই বারবার আঘাত? উত্তরটা সহজ। অন্ধতা ও চরমপন্থার সবচেয়ে বড় ভয় হলো আলো আর যুক্তি। রবীন্দ্রনাথ যখন সর্বজনীন ভালোবাসার কথা বলেন, রোকেয়া যখন অন্ধ সামাজিক প্রথা ভেঙে নারীর শিক্ষার কথা বলেন, আর লালন যখন জাতি-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানবধর্মের গান গান—তখন তা আঘাত করে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কায়েমি স্বার্থে। তারা যুক্তি দিয়ে এই চিন্তাকে মোকাবিলা করতে পারে না, তাই বেছে নেয় অবমাননা আর হিংসার পথ।
একটি সুস্থ সমাজে মতভেদ থাকবেই, সৃষ্টি কিংবা চিন্তা নিয়ে সমালোচনাও হতে পারে। সুস্থ তর্ক-বিতর্কই তো একটা সমাজকে আলোর পথ দেখায়। কিন্তু ভিন্নমতকে একেবারেই মুছে ফেলার চেষ্টা করা, মননশীলতার চর্চাকে অপমান করা কিংবা আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সংকীর্ণতার মাপে বিচার করা কোনো প্রগতিশীল সমাজের লক্ষণ নয়।
আমাদের ভুললে চলবে না, বাংলাদেশ কোনো একক চিন্তার দেশ নয়। এ দেশের প্রাণশক্তিই হলো বহুত্ববাদ, যুক্তি, মানবিকতা ও মুক্তচিন্তা। রবীন্দ্রনাথের সুর আমাদের অনুভূতিকে ভাষা দেয়, রোকেয়ার জীবন আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়, আর লালনের গান আমাদের শেখায় অহিংসা ও সম্প্রীতি।
আমরা এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে রবীন্দ্রনাথের গান, রোকেয়ার প্রশ্ন আর লালনের মানবতাবাদী চেতনা নির্ভয়ে বেঁচে থাকবে—প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। সংস্কৃতির ওপর এই অন্ধকার আঘাত আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে। সংকীর্ণ বিদ্বেষের বদলে জয় হোক উদার মনুষ্যত্বের, সুপ্রতিষ্ঠিত হোক চিন্তার পূর্ণ স্বাধীনতা।
লেখক : তারিক ইসলাম, সভাপতি,সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।