মাইকেলের বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে কয়েক পংক্তি
জিএম এমদাদ
উনিশ শতকের বাংলায় জন্মে ছিলেন বহু খ্যাতিমান বাঙ্গালী- তাদের কেউ, দেশকে এগিয়ে দিয়েছেন আধুনিকতার পথে, কেউ এগিয়ে দিয়েছেন বাংলাভাষা এবং সাহিত্যকে, কেউ সূত্রপাত করেছে ধর্ম সংস্কারের, কেউবা সংগীত এবং পর্যটনকে এগিয়ে দিয়ে আজও অমর হয়ে আছেন কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো বর্ণাঢ্য চরিত্রের আর কেউই ছিলেন না। যে তার একটি রচনাও পড়েনি, সেও শুনেছে তার নাম। বনফুলের নাটকে অথবা প্রমথনাথ বিশীর মাইকেল জবিনের রুপরেখায় যে মাইকেলকে আমরা দেখি, সত্যি বলতে কি তা আমাদের অবাকই করে।
যে মাইকেল বাঙ্গালী হয়ে বাংলা ভুলে যান, ইংরেজীতে কবিতা লেখেন; যে মাইকেল একই সঙ্গে ডিকটেশন দেন, তিনটি কাব্যের, যে মাইকেল এক মোহর দিয়ে চুল ছাঁটিয়ে গর্ব করেন; যে মাইকেল স্ব-সমাজ ত্যাগ করে খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে; যে মাইকেল ব্যারিষ্টার হয়ে আয় করেন প্রচুর, কিন্তু ব্যয় করেন তার চেয়েও বেশি, যে মাইকেল দু’দু’জন ইংরেজ নারীর সঙ্গে প্রেম করে তাদের বিয়ে করেন; যে মাইকেল নিজে মাতাল হন ও অন্যকে মাতাল করেন; যে মাইকেল একই সঙ্গে মহাকাব্য লেখেন, সনেট লেখেন, নাটক লেখেন, একেবারে নতুন ছন্দ নির্মাণ করেন। জানা যায়, মাইকেলের পিতা আদৌ এটা চাননি যে, ধর্ম্ম যাজক হওয়ার শর্তে মাইকেল বিশপস্ কলেজে ভর্তি হন। তাই তিনি সেখানে পুত্রকে ভর্তি করান মাসে ৬৬ টাকা বেতন দেওয়ার অঙ্গীকার করে।
দিয়েও ছিলেন প্রায় তিন বছর। আশাছিল প্রায়চিত্ত করে পুত্র একদিন ফিরে আসতে পারে হিন্দু ধর্মের পরিধিতে কিন্তু পুত্র হিন্দু ধর্মের তুলনায় খ্রীষ্ট ধর্ম্মের এমন কিছু উদারাতা ও আধুনিকতা লক্ষ্য করেছিলেন যে, খ্রীষ্ট ধর্মকে শ্রেষ্ট বলে বিশ্বাস করেছিলেন। তাছাড়া তিনি খ্রীষ্ট ধর্ম ও ইউরোপীয় সভ্যতাকে সম্ভবত এক করে দেখে ছিলেন। ফলে তিনি আর হিন্দু ধর্মে ফিরে আসার কথা ভাবেননি। এতে পিতা তাকে সম্পত্তিচ্যুত করার ভয় দেখান কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি।
১৮৪৭ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে পিতা-পুত্রের বিরোধ এমনই দানা বাঁধল যে, রাজ নারায়ন পুত্রকে টাকা দেওয়া বন্ধ করলেন এবং মাইকেলের বিশপস্ কলেজের ত্যাগ করতে পারতেন কিন্তু অসময়ে কলেজ ছাড়তে হলো বলে অতঃপর তিনি চাকরীর আশায় কলকাতায় নয়, ধারে কাছের কোন জায়গাতেও নয়, যাত্রা করলেন একেবারে সুদূর মাদ্রাজে ১৮৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে। মাইকেলের বন্ধু ভাগ্যও ভালো ছিল। বেশ কয়েকজন বন্ধু ছিলেন তাঁর। তাঁদের সঙ্গে মাইকেলের সম্পর্ক ছিল গলায় গলায় কিন্তু তার স্বভাব এমন ছিলনা যে, তিনি কাউকে পরিবার বা হাঁড়ির খবর বললেন। তাছাড়া স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে যখন তার পারিবারিক জীবন গড়ে ওঠে। সেই গুরুত্বপূর্ণ সময়ের ১২ বছর তিনি কাটিয়েছেন বন্ধুদের দৃষ্টি সীমার অনেক দূরে মাদ্রাজে ও ইউরোপে।
মাইকেলের বাবা-মা মাঝ বয়সেই মারা যান। মধু সূদনের কোন ভাই-বোন ছিলনা। তার পিতৃকূলের আত্মীয়রা বসবাস করতেন যশোরের সাগরদাঁড়ি গ্রামে। আর পিতা মাতার সঙ্গে তিনি বাস করতেন কলকাতায়। তার উপর তিনি মাত্র ১৯ বছর বয়সে খ্রীষ্টান হলেন তখন তার পরিবার এবং আত্মীয় স্বজন এমনকি সমাজ থেকে তিনি ছিটকে পড়লেন অনেক দূরে। তাছাড়া ২৪ থেকে ৩২ বছর বয়স অবধি তিনি দৈহিকভাবেও বাস করেন বন্ধু বান্ধব এবং সমাজ থেকে অনেক দূরে মাদ্রাজে। সেই মাদ্রাজেই জীবনের প্রথম চাকরি করেন। প্রেম করে বিয়ে করেন। সেখানেই জন্ম নেয় তার চার সন্তান। সেই সন্তান ও তাদের মায়ের সাথে মাইকেলের সম্পর্ক ও ছিন্ন হয় এই মাদ্রাজে।
এখানেই গড়ে উঠে তার বিবাহ বহির্ভূত প্রণয় সম্পর্ক। মাদ্রাজ ছাড়া তিনি ইউরোপেও বাস করেন সাড়ে চার বছর। সে জন্য সাহিত্যের কারণে তিনি বিখ্যাত লোক হলেও তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন খুব কম লোকেই, এবং সে জন্য সবার কাছে ব্যক্তি তিনি ছিলেন কমবেশি অপরিচিত। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন, নদী সামনের দিকে সোজা চলতে চলতে হঠাৎ বাঁক নেয় তখন সেই বাঁকটাকেই বলতে হয মর্ডান। বাংলায় বলা যাক আধুনিক। এই আধুনিকতা সময় নং, বরং মর্জি নিয়ে।
জীবনানন্দ দাশের মতেও এই মর্জিটাই আসল। তিনি আধুনিকতাকে গন্ডিবদ্ধ না করে এর আপেক্ষিকতা স্বীকার করে নিয়েছেন। কারণ এক অর্থে আধুনিক শব্দটাই আপেক্ষিক। একে অতিক্রম করেই জীবনানন্দ দাশ উচ্চারণ করেন; বাংলা কাব্যে বা কোন দেশের কাব্যে আধুনিকতা শুধু জীবনানন্দ দদ দাশ উচ্চারণ করেন; বাংলা কাব্যে বা কোন দেশের কাব্যে আধুনিকতা শুধু আজকের কবিতায় আছে, অন্যত্র নয়-এ কথা ঠিক নয়। এ বিচার বিশ্লেষণেও মধুসুধন আধুনিক। বস্তুতঃপ্রতি যুগেই নতুন কবিকে পরনো ঐতিহ্যের বিরুদ্ধ্যে বিদ্রোহ করতে হয় সন্ধ্যান করতে হয় নতুন পথের, এবং নতুন ঐতিহ্য গড়ে তোলার।
বলা বাহুল্য মধুসূদনের একটা বড় গুণ বা বৈশিষ্ট ছিল কেবল খাওয়া দাওয়া ও আচার আচরণে সীমাবদ্ধ, কিন্তু দাতের খোশামোদ করা তিনি একেবারেই বরদাস্ত করতে পারতেন। ইংরেজদের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে ও তিনি সরাসরি প্রতিবাদ করতেন। রেখে ঢেকে কোন কথা বলতেন না। একটা ঘটনার কথা বলি, বিশপস কলেজে একটা নিয়ম ছিল ইংরেজ ছাত্ররা এক রকম চাকানো টুপি পরতেন, যাকে কলেজ ক্যাপ বলা হত। দেশী ছাত্রদের জন্যে কিন্তু ঐ ধরনের টুপি যাবহার নিষিদ্ধদ ছিল। মধু-সুখন এই নিষেধ মানলেন না বরং তার জবাব ছিল একই কলেজের ছাত্রদের দই নিয়ম কিছুতেই চলতে পারে না।
দেশী হোক বিদেশী হোক একই ধরনের পোষাক সবাই ব্যবহার করবে। এই পর্যন্তই ছিল মধু সূদনের সামাজিক আচরণগত বিদ্রোহ। শিক্ষকতা ছাড়া সাংবাদিকতাও করেছিলেন মাইকেলমধু সূদন। পত্রিকার সঙ্গে তার প্রথম যোগাযোগ কবিতা প্রকাশের উদ্দ্যেশে। এ যোগাযোগ ঘটেছিল ম্যাড্রাস সার্কুলেটরের সঙ্গে কিন্তু সাংবাদিকতায় তিনি জড়িয়ে পড়েন ভিন্ন পথে। মাইকেল তার প্রথম কাব্য’ক্যাপটিড’ লেডি’ জপিয়ে দেনার দায়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন। গৌর দাস বসাককে লেখা একাধিক চিঠিতে তিনি তা উল্লেখ করেছেন। তার এই চটি বইটি ছেপে দিয়েছিলেন যিনি তার নাম অ্যাবেল গেন সিনকিন্স। মাইকেলের কাছে প্রাপ্য দেশদু’শ টাকার জন্য সিমকিলের ব্যবসা লাটে উঠার অবস্থা হয়নি কারণ তার একটি নয়, তিন তিনটে প্রেস ছিল মাদ্রাজ নগরীতে। তাছাড়া তিনি একাধিক সাপ্তাহিক পত্রিকারও মালিক ছিলেন কিন্তু সফল ব্যবসায়ী হিসাবে তিনি পাওনা আদায়ের ব্যাপারে পারদর্শী ছিলেন। সিমকিন্স ‘ইউরোশিয়ান’ নামে একটা নতুন পত্রিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। তখনসে দায়িত্ব পান মাইকেল মধুসূদন।
সেই থেকেই সাংবাদিকতায় মাইকেলের হাতে খড়ি। তার চমৎকার নাটিকা ‘রিজিয়া’ তিনি লিখতে শুরু করেছিলেন। এই প্রত্রিকা পাতায়। কৃতিত্বের সাথে প্রায় এক বছর ইউরেশিয়ান পত্রিকা সম্পাদনা করার পর মাইকেল ম্যাড্রাস ক্রনিকেল এর-এবা সম্পাদক নিযুক্ত হন। প্রায় আড়াই বছর তিনি এই পত্রিকার সম্পাদনা করেন। এছাড়া তিনি ১৮৫৫ সালের এপ্রিল থেকে মাদ্রাজের প্রথম দৈনিক ‘স্পেক্টেটর’ পত্রিকার দেশীয় সম্পাদক নিযুক্ত হন। সে পত্রিকা পরিচালনা করতে গিয়েও তিনি যথেষ্ট কৃতিত্ব দেখান। পিতার মৃত্যুর প্রায় এক বছরপর মাইকেল সে খবর পেয়েছিলেন বসাকের চিঠি থেকে। অনেকদিন যোগাযোগ না থাকায় গৌরদাস জানতেন না মাইকেলের ঠিকানা। তাই চিঠিটি তিনি পাঠিয়েছিলেন কৃষ্ণ মোহন বন্দোপদ্যায়ের হাত দিয়ে।
চিঠিটি পড়ে মাইকেল জানতে পারেন যে, তার আত্মীয়রা মিলে তার পৈত্রিক সম্পত্তি দখল করার জন্য লড়াই করছেন কিন্তু কবি সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন না। তার কারণ প্রধানত অর্থনৈতিক। মাদ্রাজ থেকে কলকাতায় যাওয়া রিতিমতো খরচের ব্যাপার পরিবারের খরচ ও কলকাতায় তার নিজের খরচ তাও তাকেই বহন করতে হবে। কলকাতায় গিয়ে সম্পত্তিটা বিক্রি করে দিলে এই তাবৎ ব্যয় উঠে আসবে কিনা কে জানে। ভেবে চিন্তে তাও তিনি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। মধু সূদন সম্ভবত ভেবে ছলেন মাত্র কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের জন্য যাবেন সেখানে কিন্তু কার্যকালে সেটা এতই দীর্ঘ হয়েছিল যে, তার ভাগ্যে আর মাদ্রাজে ফিরে আসা হয়নি। সেখানে তার ভাষায় চমৎকার ইংরেজ স্ত্রী এবং চারটি সন্তান থাকা স্বত্তেও।
মাইকেল যে কয়েক বছর ধরে হেনরিয়েটার সঙ্গে গোপন প্রণয়, সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন সে খবর এসময় জানাজানি হয়ে যায়। যা হোক রেবেকাকে নিয়ে মাদ্রাজে যে, সুখী পরিবার কবি গতে তুলেছিলেন সে খবর এসময় জানাজানি হয়ে যায়। তার গোপন প্রণয়ের খবর এসময় তা ভেঙ্গে তছনছ হয়ে যায়। কলকাতায় এসে বছর আড়াই অপেক্ষা করার পরও যখন সে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর তখন মাইকেল ঘর বাঁধার জন্য কলকাতায় আসার আহবান জানালেন হেনরিয়েটাকে। অতঃপর ১৫ বছর তারা স্বামী স্ত্রী হেনরিয়েটা মারা যান স্বয়ং মাইকেল মারা যাওয়ার তিনদিন আগে।
লেখক : জি, এম, এমদাদ, শিক্ষক, কলামিস্ট, গীতিকার , কপিলমুনি-৯২/৮২, খুলনা









