বিশ্ব মান দিবস: মানসম্মত উৎপাদন, নিরাপদ ব্যবহার
সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রতিবছর ১৪ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব মান দিবস। পণ্য ও সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়নে মানদ-ের গুরুত্ব তুলে ধরাই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য। আধুনিক বিশ্বে উৎপাদন, প্রযুক্তি, যোগাযোগ, জ্বালানি ও পরিবেশ সুরক্ষাসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক মানের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
বিশ্ব মান দিবসের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও প্রমিতকরণ ব্যবস্থার বিকাশ। ১৯৪৬ সালের ১৪ অক্টোবর লন্ডনে ২৫টি দেশের প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণের জন্য একটি সমন্বিত সংস্থা গঠনের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছান। সেই ঐতিহাসিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক মান সংস্থাÑআইএসও। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক মানের গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বাড়াতে ১৯৭০ সাল থেকে ১৪ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব মান দিবস পালন শুরু হয়।
বর্তমানে বিশ্বের তিনটি প্রধান আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণকারী সংস্থাÑআন্তর্জাতিক মান সংস্থা, আন্তর্জাতিক ইলেক্ট্রোটেকনিক্যাল কমিশন এবং আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নÑযৌথভাবে দিবসটি উদযাপন করে। বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক মান প্রণীত হয়। তাঁদের এই অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং মানভিত্তিক উন্নয়নের গুরুত্ব তুলে ধরা দিবসটির অন্যতম তাৎপর্য।
মান বা স্ট্যান্ডার্ড বলতে কোনো পণ্য, সেবা, প্রক্রিয়া কিংবা ব্যবস্থার গুণগত বৈশিষ্ট্য, নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নির্ধারণের স্বীকৃত মানদ-কে বোঝায়। একটি পণ্য দেখতে আকর্ষণীয় হলেই তা মানসম্মত হয় না; সেটি নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, কার্যকর এবং নির্ধারিত গুণগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের ফলে বিভিন্ন দেশের উৎপাদক ও সেবাদাতারা অভিন্ন প্রযুক্তিগত নির্দেশনা মেনে কাজ করতে পারেন। এতে পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখা, উৎপাদন ব্যয় ও অপচয় কমানো, প্রযুক্তিগত সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে নি¤œমানের বা অনিরাপদ পণ্যের কারণে ভোক্তাদের ক্ষতির ঝুঁকি কমে। ফলে মানদ- শুধু শিল্প ও বাণিজ্যের বিষয় নয়; এটি জননিরাপত্তা, ভোক্তা অধিকার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
বিশ্বে মানসম্মত ও উচ্চমানের পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে জার্মানি বিশেষভাবে পরিচিত। বৈশ্বিক সমীক্ষা, যেমন মেড ইন কান্ট্রি ইনডেক্স অনুযায়ী, ‘মেড ইন জার্মান’ লেবেলটি গুণগত মান, স্থায়িত্ব ও নির্ভরযোগ্যতার জন্য বিশ্বজুড়ে সুনাম অর্জন করেছে। এ ছাড়া, সুইজারল্যান্ড ঘড়ি, চকলেট, ওষুধ ও সূক্ষ্ম প্রকৌশলবিদ্যা; জাপান উন্নত প্রযুক্তি, গাড়ি ও ইলেকট্রনিক্স; এবং যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও মহাকাশ গবেষণার সরঞ্জামের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তবে পণ্যের মান সংশ্লিষ্ট পণ্য, প্রস্তুতকারক ও মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপরও নির্ভরশীল।
আন্তর্জাতিক মান প্রণয়নে বিশেষজ্ঞদের স্বেচ্ছাসেবী অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের জ্ঞান, গবেষণা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তৈরি মানদ- বিভিন্ন দেশের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতা বাড়ায়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা হ্রাস পায় এবং পণ্য ও সেবার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।
২০২৬ সালে দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য ‘উন্নত বিশ্বের জন্য সম্মিলিত অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি’। এবারের বিশেষ গুরুত্ব জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৭Ñসাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি। পরিচ্ছন্ন ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির নিরাপদ, দক্ষ ও সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানদ- অপরিহার্য। এসব মান জ্বালানি অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা, প্রযুক্তিগত সামঞ্জস্য ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা বাড়ায় এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, পরিবেশদূষণ হ্রাস ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, শিল্পায়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পণ্যের মান নির্ধারণ, পরীক্ষণ, সনদ প্রদান এবং মানসম্পর্কিত সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের মান অবকাঠামোকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। অন্যদিকে ভেজাল পণ্য প্রতিরোধ বা আধুনিক ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
তবে মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব কেবল নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের নয়। উৎপাদককে মানসম্মত পণ্য তৈরি করতে হবে, ব্যবসায়ীকে সঠিক তথ্য দিতে হবে, ভোক্তাকে সচেতনভাবে পণ্য নির্বাচন করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মানদ-ের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসারে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ এবং পরীক্ষণব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
বিশ্ব মান দিবসের তাৎপর্য তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানসম্মত উৎপাদন, নিরাপদ ভোগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং টেকসই উন্নয়নের অঙ্গীকারকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্যের আলোকে আন্তর্জাতিক মানের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রসার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্য অর্জন আরও বাস্তবসম্মত হবে। সম্মিলিত উদ্যোগ, দায়িত্বশীল উৎপাদন ও মানভিত্তিক উন্নয়নের মাধ্যমেই গড়ে উঠতে পারে নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও টেকসই বিশ্ব।









