বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

পাইকগাছায় আমন আবাদ ভালো হলেও নানা প্রতিকূলতায় লক্ষ্যমাত্রা পুরণ হয়নি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৪৯ অপরাহ্ণ
পাইকগাছায় আমন আবাদ ভালো হলেও নানা প্রতিকূলতায় লক্ষ্যমাত্রা পুরণ হয়নি

প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা (খুলনা): খুলনার পাইকগাছায় চলতি মৌসুমে রোপা আমন ধানের আবাদ ভালো হলেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। বৈরি আবহাওয়, অতিবৃষ্টিতে বীজতলা নষ্ট হওয়া, চারা রোপণের সময় বৃষ্টির ঘাটতি, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতার কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১৫০ হেক্টর জমিতে কম আবাদ হয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ১৩ হাজার ৩৩০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে নানা প্রতিকুলতার মধ্য দিয়ে আবাদ হয়েছে ১৩ হাজার ১৮০ হেক্টর জমিতে। লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৫০ হেক্টর জমিতে আবাদ কম হয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ে বীজতলা তৈরি করা হলেও অতিবৃষ্টিতে কয়েক দফায় সেগুলো পানিতে ডুবে নষ্ট হয়। এতে নতুন করে চারা উৎপাদনের প্রয়োজন দেখা দেয়। পরে চারা রোপণের সময় বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় অনেক জমিতে সময়মতো রোপণ করা সম্ভব হয়নি। কোথাও লাগানো চারা মারা যাওয়ায় জমি অনাবাদি থেকে গেছে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও আবহাওয়া জনিত কারণে উপকূল এলাকায় কৃষির মৌসুম দেরিতে শুরু হয়। লবণাক্ত উপকূল এলাকার পানি ও মাটি আমন চাষের জন্য লবনমুক্ত তৈরী করতে কিছুটা সময় বেশি লাগে। মাটি থেকে অতিরিক্ত লবণ দূর করে চাষ উপযোগী ও লবণমুক্ত হলে চারা রোপন করা হয়। তাছাড়া মৎস্য লীজ ঘের গুলো কিছুটা নিচু হওয়ায় আমন চাষের উপযোগি করতে আরো বেশি সময় লাগে। সে কারণে উপকূলের এ অঞ্চলে কৃষির আবাদ অন্যান্য এলাকা থেকে ১৫ থেকে এক মাস পরে আবাদ শুরু হয়।

আবহাওয়াজনিত প্রতিকূলতার পাশাপাশি জমির ব্যবহার পরিবর্তনের বিষয়টিও আমন আবাদের ওপর প্রভাব ফেলছে। কৃষির জন্য আবহাওয়ার পাশাপাশি জমিতে পানির সঠিক ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে চারা রোপণ ব্যাহত হয়। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় বৃস্টির অভাবে নতুন চারা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। উপকূলীয় এলাকায় মাটির লবণাক্ততাও ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করতে পারে। পাইকগাছায় এসব প্রতিকূলতা আমন আবাদে প্রভাব ফেলেছে ।

পাইকগাছা গদাইপুর ইউনিয়ানের হিতামপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহিম বলেন, খারাপ আবহাওয়া ও অতিবৃস্টির কারণে বীজ তলার চারা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অধিক দামে চারা কিনে আবাদ করায় খরচ বেড়ে গেছে। তা ছাড়া জমি চাষ, চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার ও রোগবালাই দমনে সার কিট নাশক প্রয়োগ, ধান কাটার জন্য অধিক দামে শ্রমিক নিয়ে কাজ করতে হয়। কিন্তু উৎপাদিত ধানের ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকতে হয়।

উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাব অনুযায়ী, পাইকগাছার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় আমন ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে দেলুটি ইউনিয়নে সর্বাধিক ৩ হাজার ৭৪৫ হেক্টর, গড়ইখালী ইউনিয়নে ২ হাজার ৩১৫ হেক্টর, চাঁদখালী ইউনিয়নে ১ হাজার ৯০০ হেক্টর, কপিলমুনি ইউনিয়নে ৮৮০ হেক্টর, লতা ইউনিয়নে ৮৭০ হেক্টর, লস্কর ইউনিয়নে ৮২০ হেক্টর, হরিঢালী ইউনিয়নে ৮১৫ হেক্টর, গদাইপুর ইউনিয়নে ৫৯০ হেক্টর, সোলাদানা ইউনিয়নে ৫৮০ হেক্টর, রাড়ুলী ইউনিয়নে ৫২৫ হেক্টর ও পৌরসভায় ১৪০ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ হয়েছে।

পাইকগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ একরামুল হোসেন বলেন, চলতি মৌসুমে অতিবৃষ্টিতে কয়েক দফায় বীজতলা নষ্ট হয়েছে। পরে চারা রোপণের সময় বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দেওয়ায় অনেক জমিতে সময়মতো চারা লাগানো সম্ভব হয়নি। কিছু জমিতে রোপণ করা চারাও মারা গেছে। এ ছাড়া উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতার সমস্যাও রয়েছে। এসব কারণে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৫০ হেক্টর জমিতে কম আবাদ হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও কৃষকরা যাতে ভালো ফলন পান, সেজন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। জমির ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত জাত নির্বাচন, সুষম সার প্রয়োগ, রোগবালাই দমন ও পানি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিতে মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

Ads small one

আশাশুনিতে পুলিশের অভিযানে সন্ত্রাসবিরোধী ও ধর্ষণ মামলার আসামিসহ গ্রেপ্তার চার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৩৮ অপরাহ্ণ
আশাশুনিতে পুলিশের অভিযানে সন্ত্রাসবিরোধী ও ধর্ষণ মামলার আসামিসহ গ্রেপ্তার চার

বিএম আলাউদ্দীন, আশাশুনি: আশাশুনিতে পুলিশের বিশেষ অভিযানে সন্ত্রাসবিরোধী আইন মামলার আসামি, ধর্ষণ মামলার আসামিসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বুধবার (১৪ অক্টোবর) উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরে গ্রেপ্তারকৃতদের পুলিশি পাহারায় বিজ্ঞ আদালতে পাঠানো হয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন-আশাশুনি উপজেলার বালিয়াপুর গ্রামের মৃত ছৈলুদ্দীন সরদারের ছেলে মো. জলিল সরদার (৬৪)। তিনি সাতক্ষীরা জেলা মৎস্যজীবী লীগের সহসভাপতি হিসেবে পরিচিত। তাঁর বিরুদ্ধে আশাশুনি থানার মামলা নং-২২, তারিখ ২১ জুন ২০২৬, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬/৭/ ৮/৯/ ১০/১১/ ১২/১৩ ধারায় মামলা রয়েছে।

দ্বিতীয়জন বেউলা গ্রামের মো. শাহাজান আলীর ছেলে মো. রায়হানুজ্জামান। তিনি পি.ডি. নং-২৬৮/২৫ মামলায় তিন মাসের বিনাশ্রম সাজাপ্রাপ্ত আসামি।

তৃতীয়জন উত্তর চাপড়া গ্রামের মো. জেনারুল সরদারের ছেলে মো. আল আমিন (২৪)। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা আশাশুনি থানার মামলা নং-১৫, তারিখ ১৪ অক্টোবর ২০২৬, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২৫)-এর ৯(খ) ধারার মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

চতুর্থজন আশাশুনি সদরের মৃত মো. জাকাত আলীর ছেলে আব্দুল মজিদ। তিনি সিআর নং-৩৪০/২৬ মামলার আসামি।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওসি শাহিদুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আইনানুগ প্রক্রিয়া শেষে চারজনকেই পুলিশি পাহারায় বিজ্ঞ আদালতে পাঠানো হয়েছে।

সাতক্ষীরায় জলবায়ু বাস্তুচ্যুত ৭৪.৯% মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায়: খানি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:২৭ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় জলবায়ু বাস্তুচ্যুত ৭৪.৯% মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায়: খানি

নিজস্ব প্রতিনিধি: ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে সাতক্ষীরা শহরের বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া জলবায়ু বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর ৭৪.৯ শতাংশ মানুষ বর্তমানে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক (খানি)-র গবেষণায় দেখা যায়, দুর্যোগের মুখে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর ৪১.১১ শতাংশ মানুষ তাঁদের আবাদি কৃষিজমি হারিয়েছেন। চরম খাদ্যাভাবের কারণে এসব পরিবারের ৫২.২ শতাংশ মানুষকে পুরো একদিন না খেয়ে কাটাতে হয়েছে। তা সত্ত্বেও মাত্র ৭.৫ শতাংশ পরিবার সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আসতে পেরেছে।

‘অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জাতীয় কৌশলপত্র ২০২১’ গ্রহণের পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও এর অঙ্গীকার ও সুফল বস্তিবাসীদের দৈনন্দিন জীবনে পৌঁছায়নি। ফলে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো নিরাপদ আবাস, পর্যাপ্ত খাবার, নিয়মিত কর্মসংস্থান এবং সরকারি সামাজিক সুরক্ষা ভাতা থেকে চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকাল ১০টায় সাতক্ষীরার রয়েল গ্লাস কনভেনশন হল রুমে অনুষ্ঠিত ‘সহনশীলতার সূচনা নিজের ঘর থেকেই’ (Where does resilience start for those without a home?) শীর্ষক এক বহুপাক্ষিক সংলাপে এসব উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক (খানি), পার্টিসিপেটরি RESEARCH অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (প্রান) এবং উন্নয়ন সংগঠন ‘স্বদেশ’ যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন খানি-র বিভাগীয় প্রতিনিধি। অনুষ্ঠানের আগে একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালি বের হয়, যা সাতক্ষীরার প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে এসে শেষ হয়।

সংলাপে বক্তারা বলেন, সিডর ও আইলার মতো ভয়াবহ দুর্যোগের পর বিপুল সংখ্যক মানুষ তাদের সবকিছু হারিয়ে আশ্রয়হীন হয়ে সাতক্ষীরা শহরে এসে মাথা গুঁজে আছেন। বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, “বাস্তুচ্যুতির পরবর্তী খাদ্য অনিরাপত্তা কোনো সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়; এটি প্রকৃতপক্ষে দুর্যোগ ঝুঁকি প্রশমনের একটি প্রতিরোধযোগ্য ব্যর্থতা।”

অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তারা আশ্বাস দিয়ে জানান, বস্তিবাসীদের মধ্যে যারা এখনো বয়স্ক বা বিধবা ভাতার আওতায় আসেননি, তাদের তালিকা প্রদান করা হলে দ্রুত ভাতার ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া পৌরসভার বাইরের ভূমিহীনরা আবেদন করলে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি পরিবারকে ২ একর পর্যন্ত কৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।

উন্নয়ন সংগঠন ‘স্বদেশ’-এর নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্তের সভাপতিত্বে এবং বিশিষ্ট উন্নয়ন গবেষক ও সিইপিআর-এর নির্বাহী পরিচালক গৌরাঙ্গ নন্দীর সঞ্চালনায় সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রশাসক শেখ মঈনুল ইসলাম মঈন।

এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার অর্ণব দত্ত, সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান, সমাজ উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান, জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন নাহার, জেলা নির্বাচন অফিসার মো. হযরত আলী এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মো. জাহিদ পারভেজ।

সংলাপে বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরা মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আব্দুল হামিদ, সিনিয়র সাংবাদিক ও ‘ডেইলি স্টার’-এর সাতক্ষীরা প্রতিনিধি কল্যাণ ব্যানার্জি, দক্ষিণের মশাল’-এর সম্পাদক আশেক এ ইলাহী,  সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মমতাজ আহমেদ বাপী,  সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম কামরুজ্জামান ও মিজানুর রহমান, সাবেক শিক্ষা অফিসার কিশোরী মোহন সরকার, নাগরিক নেতা আলী নুর খান বাবুল, ‘এখন টেলিভিশনের আহসান রাজীব, বাংলা ট্রিবিউনের আসাদুজ্জামান সরদার, ভোরের বাণী’-র মো. মোকাররাম বিল্লাহ ইমনসহ স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী, জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস: স্বীকৃতি, সমতা ও টেকসই উন্নয়নে নারীর অগ্রযাত্রা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:১৪ অপরাহ্ণ
আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস: স্বীকৃতি, সমতা ও টেকসই উন্নয়নে নারীর অগ্রযাত্রা

সাকিবুর রহমান বাবলা

বিশ্বের প্রতিটি জনপদের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে গ্রামীণ নারীদের শ্রম, মেধা ও স্বপ্ন গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে কৃষিকাজে ব্যস্ত হয়ে পড়া, পরিবারের জন্য খাদ্য উৎপাদন, গবাদিপশু পালন, সন্তানদের লালন-পালন কিংবা লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ-সব ক্ষেত্রেই তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ সমাজ ও অর্থনীতির ভিত গড়ে তোলা এই নারীদের অনেকের শ্রমই যথাযথ স্বীকৃতি পায় না। তাঁদের অধিকার, মর্যাদা ও উন্নয়নের প্রশ্নকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতেই প্রতিবছর ১৫ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস।

১৯৯৫ সালে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনের প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ নারীদের অবদানকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি আরও জোরালো হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত ৬২/১৩৬ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে ১৫ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়। এর মূল লক্ষ্য কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে নারীদের ভূমিকার স্বীকৃতি, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, দারিদ্র্য বিমোচন এবং গ্রামীণ নারীদের আর্থসামাজিক ক্ষমতায়ন।

দিবসটি কেবল আনুষ্ঠানিক উদ্যাপনের উপলক্ষ নয়; বরং গ্রামীণ নারীদের অধিকার, সুযোগ ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্র, সমাজ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশ গ্রামীণ নারী। ২০২৩ সালের বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুসারে, কৃষিশ্রমশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশই নারী; আফ্রিকা ও এশিয়ার কিছু অঞ্চলে এই হার আরও বেশি। বীজ সংরক্ষণ, চারা রোপণ, ফসলের পরিচর্যা, ফসল কাটা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণ-কৃষির প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই তাঁদের অংশগ্রহণ রয়েছে।

কৃষির বাইরেও হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন, মৎস্যচাষ, হস্তশিল্প, কুটিরশিল্প এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে তাঁরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পারিবারিক আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখেন। উৎপাদিত খাদ্য পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত করে; আর উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রি থেকে অর্জিত অর্থ সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করে। এভাবেই গ্রামীণ নারীদের শ্রম স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখার পাশাপাশি দারিদ্র্য হ্রাস ও টেকসই উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করে।

গ্রামীণ নারীরা শুধু অর্থনীতির কর্মী নন, তাঁরা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারকও। লোকগান, লোকশিল্প, নকশিকাঁথা, ঐতিহ্যবাহী খাদ্য প্রস্তুত, বীজ সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় তাঁদের অভিজ্ঞতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। বিশেষত আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরা নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও প্রথাগত জ্ঞান সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

পরিবারের শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ সদস্যদের পরিচর্যা, স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তাঁদের অবদান অপরিসীম। কিন্তু রান্না, পানি ও জ্বালানি সংগ্রহ, সন্তান লালন-পালন এবং পরিবারের সদস্যদের সেবার মতো অবৈতনিক কাজ অর্থনৈতিক হিসাবের বাইরে থেকে যায়। ফলে তাঁদের প্রকৃত শ্রম ও অবদান অনেক সময় অদৃশ্যই থেকে যায়।

অবদানের তুলনায় গ্রামীণ নারীরা এখনো ভূমির মালিকানা, ঋণ, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও বাজারসুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছেন। জাতিসংঘের তথ্যমতে, বিশ্বে কৃষিজমির মালিকদের মধ্যে নারীর অংশ প্রায় ১৫ শতাংশ। কৃষি খাতে মজুরিভিত্তিক কাজে নিয়োজিত নারীরা পুরুষদের প্রতি এক ডলারের বিপরীতে গড়ে প্রায় ৮২ সেন্ট আয় করেন। অর্থাৎ সমান সুযোগ ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।

এ ছাড়া বাল্যবিবাহ, শিক্ষার সীমিত সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে কম অংশগ্রহণ এবং সামাজিক কুসংস্কার তাঁদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে কৃষি, জীবিকা ও পারিবারিক খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক গ্রামীণ নারীদের জন্য এই সংকট মোকাবিলা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধান ও সবজি চাষ, বীজ সংরক্ষণ, ফসল-পরবর্তী প্রক্রিয়াজাতকরণ, হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্যচাষ এবং কুটিরশিল্পে তাঁদের অংশগ্রহণ গ্রামীণ পরিবারের জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ও ঘূর্ণিঝড়, হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা এবং নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় বসতভিটা ও জীবিকা হারানোর ঝুঁকি তাঁদের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে।

তাই গ্রামীণ নারীদের উন্নয়নে জমি ও সম্পত্তির অধিকার কার্যকর করা, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, সহজ শর্তে ঋণ ও কৃষি উপকরণ সরবরাহ, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গ্রামীণ নারীদের উন্নয়ন কোনো বিচ্ছিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি নয়; এটি ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব, দারিদ্র্য বিমোচন, লিঙ্গসমতা এবং পরিবেশগত স্থিতিশীলতা অর্জনের অপরিহার্য শর্ত। ২০২৬ সাল জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক নারী কৃষক বর্ষ হওয়ায় কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় নারীদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

গ্রামীণ নারীদের কেবল পরিশ্রমী কর্মী হিসেবে নয়, অধিকারসম্পন্ন নাগরিক, উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক ও নেতৃত্বদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য, সম্পদের ওপর অধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবাই উপকৃত হবে। যে সমাজ তার গ্রামীণ নারীদের মর্যাদা দেয়, সেই সমাজই সমতা, মানবিকতা ও টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে।

গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়ন মানে শুধু নারীর অগ্রগতি নয়; এটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের অঙ্গীকার।