বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

বিশ্ব আয়োডিন ঘাটতিজনিত ব্যাধি প্রতিরোধ দিবস

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৩৬ অপরাহ্ণ
বিশ্ব আয়োডিন ঘাটতিজনিত ব্যাধি প্রতিরোধ দিবস
সাকিবুর রহমান বাবলা
মানবদেহের সুস্থতা, শিশুর মেধাবিকাশ এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে আয়োডিনের ভূমিকা অপরিসীম। পরিমাণে অতি সামান্য প্রয়োজন হলেও এই অপরিহার্য অণুপুষ্টি উপাদানের অভাবে দেখা দিতে পারে গুরুতর শারীরিক, মানসিক ও হরমোনজনিত সমস্যা। প্রতি বছর ২১ অক্টোবর বিশ্ব আয়োডিন ঘাটতিজনিত ব্যাধি প্রতিরোধ দিবস পালনের উদ্দেশ্য হলো আয়োডিনের গুরুত্ব তুলে ধরা, ঘাটতিজনিত রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সবার জন্য পর্যাপ্ত আয়োডিন নিশ্চিত করা। প্রতিরোধযোগ্য এই পুষ্টিসংকট মোকাবিলায় ব্যক্তি, পরিবার, সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।
১৯৮০-এর দশক থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ এবং আয়োডিন ঘাটতিজনিত ব্যাধি প্রতিরোধে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিশ্বব্যাপী সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করে। পরবর্তী সময়ে ২১ অক্টোবর দিবসটি পালনের মাধ্যমে আয়োডিনের ঘাটতি প্রতিরোধের গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য সর্বজনীন লবণ আয়োডিনযুক্তকরণ, যাতে মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যের মাধ্যমে সহজে প্রয়োজনীয় আয়োডিনের জোগান নিশ্চিত করা যায়।
আয়োডিন একটি রাসায়নিক মৌল। এর প্রতীক I, পারমাণবিক সংখ্যা ৫৩ এবং এটি পর্যায় সারণির ১৭তম গ্রুপের হ্যালোজেন পরিবারের সদস্য। সাধারণ তাপমাত্রায় এটি চকচকে কালচে-বেগুনি কঠিন পদার্থ; উত্তপ্ত হলে সরাসরি বেগুনি বাষ্পে পরিণত হতে পারে, যা ঊর্ধ্বপাতন নামে পরিচিত। শিল্পকারখানায় প্রাকৃতিক ব্রাইন বা লবণাক্ত ভূগর্ভস্থ পানি এবং চিলির কিছু খনিজ আকরিক থেকে আয়োডিন উৎপাদন করা হয়। পরে খাদ্যোপযোগী লবণে নির্দিষ্ট মান অনুযায়ী পটাশিয়াম আয়োডেট বা উপযুক্ত আয়োডিন যৌগ মিশিয়ে আয়োডিনযুক্ত লবণ তৈরি করা হয়। উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি পর্যায়ে এর মান নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
মানবদেহ নিজে আয়োডিন তৈরি করতে পারে না। গলার সামনের দিকে অবস্থিত থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত থাইরক্সিন (টি৪) ও ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন (টি৩) হরমোন তৈরির অপরিহার্য উপাদান হলো আয়োডিন। টি৪-তে চারটি এবং টি৩-তে তিনটি আয়োডিন পরমাণু থাকে। এসব হরমোন শরীরের বিপাকক্রিয়া, শক্তি উৎপাদন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, কোষের বৃদ্ধি, প্রোটিন সংশ্লেষণ এবং মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আয়োডিনের প্রাকৃতিক উৎসের মধ্যে সমুদ্রের পানি, সামুদ্রিক শৈবাল, মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক খাবার উল্লেখযোগ্য। সমুদ্র থেকে বাষ্পীভবন ও বায়ুমণ্ডলীয় পরিবহনের মাধ্যমে আয়োডিন স্থলভাগে পৌঁছায় এবং বৃষ্টির সঙ্গে মাটিতে ফিরে আসে। তবে সমুদ্র থেকে দূরবর্তী অঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা এবং বন্যায় মাটির উপরিভাগ ক্ষয়প্রাপ্ত অঞ্চলে আয়োডিনের প্রাপ্যতা কম হতে পারে। ফলে সেসব অঞ্চলের মাটি ও খাদ্যশস্য থেকে পর্যাপ্ত আয়োডিন না-ও পাওয়া যেতে পারে। এ কারণে খাদ্যোপযোগী লবণ আয়োডিনযুক্ত করা জনস্বাস্থ্যের একটি কার্যকর ও সাশ্রয়ী কৌশল।
আয়োডিনের ঘাটতিজনিত রোগসমষ্টিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে আয়োডিন ডেফিশিয়েন্সি ডিসঅর্ডার্স (আইডিডি) বলা হয়। শরীরে আয়োডিন কমে গেলে থাইরয়েড গ্রন্থি পর্যাপ্ত হরমোন তৈরি করতে পারে না। রক্তে হরমোনের মাত্রা কমে গেলে মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে থাইরয়েড-উদ্দীপক হরমোন-এর নিঃসরণ বাড়তে পারে। এর প্রভাবে থাইরয়েড গ্রন্থির কোষ বৃদ্ধি পেয়ে গ্রন্থিটি ফুলে যায়; এ অবস্থাকে গলগণ্ড বা ঘ্যাগ রোগ বলা হয়। দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতিতে হাইপোথাইরয়েডিজম দেখা দিতে পারে। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে ক্লান্তি, অলসতা, শীত শীত ভাব, শুষ্ক ত্বক, কোষ্ঠকাঠিন্য ও ওজন বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য।
আয়োডিনের অভাবের সবচেয়ে গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে গর্ভস্থ শিশু ও শৈশবের বিকাশে। গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে তীব্র ঘাটতি থাকলে ভ্রূণের মস্তিষ্ক ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক গঠন ব্যাহত হতে পারে। ফলে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি, ব্যবহার করতে হবে; তবে বেশি লবণ খেয়ে আয়োডিনের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা যাবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক লবণ গ্রহণ পাঁচ গ্রামের কম রাখার পরামর্শ দেয়। লবণ শুকনো, পরিষ্কার ও ঢাকনাযুক্ত পাত্রে আর্দ্রতা থেকে দূরে রাখতে হবে। রান্নার তাপে আয়োডিনের কিছু অংশ নষ্ট হতেশেখার ক্ষমতা, শ্রবণশক্তি, কথা বলা এবং চলাফেরার বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। গুরুতর ক্ষেত্রে জন্মগত হাইপোথাইরয়েডিজম ও ঐতিহাসিকভাবে ক্রিটিনিজম নামে পরিচিত গুরুতর বিকাশগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি গর্ভপাত, মৃত সন্তান প্রসব এবং অন্যান্য গর্ভকালীন জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
গর্ভধারণ থেকে শিশুর জীবনের প্রথম দুই বছর মস্তিষ্কের বিকাশের অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। এ সময় আয়োডিনের তীব্র ঘাটতিতে মস্তিষ্কের যে ক্ষতি হয়, তা পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণভাবে পূরণ করা সম্ভব নাও হতে পারে। শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি, হাড়-পেশির বিকাশ, ভাষা শেখা, মনোযোগ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা বজায় রাখতে পর্যাপ্ত থাইরয়েড হরমোন অপরিহার্য। বড়দের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি কর্মক্ষমতা, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে এসব সমস্যার অন্যান্য কারণও রয়েছে; তাই উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ সর্বজনীন লবণ আয়োডিনযুক্তকরণকে আয়োডিন ঘাটতিজনিত ব্যাধি প্রতিরোধের প্রধান কৌশল হিসেবে সুপারিশ করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে প্রায় ১৮০ কোটি মানুষের অপর্যাপ্ত আয়োডিন গ্রহণের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে; তবে পরিসংখ্যানটি প্রতিবেদন ও সময়ভেদে পরিবর্তিত হয়। সাধারণভাবে দৈনিক আয়োডিনের চাহিদা শিশুদের ক্ষেত্রে বয়সভেদে প্রায় ৯০–১২০ মাইক্রোগ্রাম এবং কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ১৫০ মাইক্রোগ্রাম। গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীদের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক নির্দেশিকায় দৈনিক মোট গ্রহণের প্রায় ২৫০ মাইক্রোগ্রামের সুপারিশ রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশে ১৯৮৯ সালে আয়োডিন ঘাটতিজনিত রোগ প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করা হয় এবং ১৯৯৪ সালে এ-সংক্রান্ত বাস্তবায়নবিধি চালু হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের বহুমাত্রিক ক্লাস্টার জরিপে পরিবারের রান্নার লবণে আয়োডিনের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়েছে। আইন ও কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও মানসম্মত আয়োডিনযুক্ত লবণের ব্যবহার, উৎপাদন পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রণ, বাজার তদারকি এবং ভোক্তা সচেতনতা নিশ্চিত করা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত কম দামের কারণে খোলা ও আয়োডিনবিহীন লবণ কেনার প্রবণতা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
আয়োডিনের অন্যান্য খাদ্য উৎস হলো সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি, দুধ, দই ও ডিম। তবে এসব খাবারে আয়োডিনের পরিমাণ উৎস ও উৎপাদনপদ্ধতিভেদে পরিবর্তিত হয়। দৈনিক চাহিদা পূরণে অনুমোদিত আয়োডিনযুক্ত লবণ পারে, তাই সঠিক সংরক্ষণ ও প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে আয়োডিনের ঘাটতি মূল্যায়নে রক্তের টি‌এস‌এইচ ও ফ্রি টি৪ পরীক্ষা, প্রয়োজনে অন্যান্য থাইরয়েড পরীক্ষা এবং থাইরয়েড গ্রন্থির আল্ট্রাসনোগ্রাফি ব্যবহার করা হয়। প্রস্রাবে আয়োডিনের মাত্রা জনগোষ্ঠীর পুষ্টিগত অবস্থা নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক; তবে একবারের প্রস্রাব পরীক্ষায় ব্যক্তির দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি নিশ্চিত করা যায় না। চিকিৎসায় ঘাটতির কারণ ও তীব্রতা অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস সংশোধন, চিকিৎসকের পরামর্শে আয়োডিন সম্পূরক এবং হাইপোথাইরয়েডিজম হলে লেভোথাইরক্সিন দেওয়া হতে পারে। গলগণ্ড বড় হয়ে শ্বাস বা খাবার গিলতে সমস্যা সৃষ্টি করলে কিংবা অন্য চিকিৎসাগত কারণ থাকলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। অতিরিক্ত আয়োডিনও থাইরয়েডের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে; তাই নিজে থেকে সম্পূরক গ্রহণ করা উচিত নয়।
বিশ্ব আয়োডিন ঘাটতিজনিত ব্যাধি প্রতিরোধ দিবসের মূল বার্তা হলো—প্রতিরোধযোগ্য এই পুষ্টিসংকট মোকাবিলায় সচেতনতাই সবচেয়ে বড় শক্তি। মানসম্মত আয়োডিনযুক্ত লবণের ব্যবহার, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত জনস্বাস্থ্য জরিপ এবং গর্ভবতী মা ও শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার মাধ্যমে ঘাটতিজনিত রোগের বোঝা কমানো সম্ভব। সামান্য আয়োডিনের যথাযথ জোগান একটি শিশুর মেধা, একটি পরিবারের সুস্থতা এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

Ads small one

সম্পাদকীয়/সুন্দরবনে অপরাধের দৌরাত্ম্য: দরকার কঠোর নজরদারি ও প্রশাসনিক সততা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩২ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়/সুন্দরবনে অপরাধের দৌরাত্ম্য: দরকার কঠোর নজরদারি ও প্রশাসনিক সততা

বিশ্ব ঐতিহ্য ও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যুহ সুন্দরবন আবারও সংবাদের শিরোনামে এসেছে। তবে কোনো ইতিবাচক অর্জনে নয়, বরং অপরাধচক্রের লাগামহীন তৎপরতার খবরে। সম্প্রতি প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে জানা গেছে, অবৈধভাবে পাচারের সময় সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের ভোলা নদী থেকে ২৩০ টন কয়লাবোঝাই কার্গোসহ ৯ জনকে আটক করেছে বন বিভাগ। এর পাশাপাশি খুলনা রেঞ্জের বানিয়াখালী স্টেশনের আওতাধীন ময়দাপাশা খাল এলাকা থেকে হরিণের খণ্ডিত অংশ ও শিকারের সরঞ্জামসহ এক শিকারিকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই দুটি ঘটনা আলাদা হলেও উভয়ের মূল বার্তা একই—সুন্দরবনের ভেতরে অসাধু চক্রের বিচরণ ও অবৈধ কার্যক্রম চরম উদ্বেগের পর্যায়ে পৌঁছেছে।

কয়লা পাচারের ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ চোরাচালান নয়; এর পেছনের মাত্রা বেশ ব্যাপক। মোংলার জয়মনি এলাকায় নোঙর করা মাদার ভেসেল থেকে বাজারমূল্যে প্রায় ৫০ লাখ টাকার এত বড় অঙ্কের কয়লা অবৈধভাবে খালাস করে সুন্দরবনের মতো একটি সংরক্ষিত ও সংবেদনশীল নদীপথ দিয়ে নির্বিঘ্নে পরিবহনের দুঃসাহস কীভাবে তৈরি হলো, তা এক বড় প্রশ্ন। সুন্দরবনের ভেতরে কোনো বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল বা অবৈধ অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে যে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকার কথা, এই ঘটনা সেখানে গলদের বিষয়টিই স্পষ্ট করে। বন বিভাগের টহল দল অভিযান চালিয়ে এটি ধরেছে—যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়; কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, এমন কোনো বড় চক্র বা প্রভাবশালী মহল কি এর নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে?

অন্যদিকে, সুন্দরবনের ঐতিহ্য ও অন্যতম মূল আকর্ষণ চিত্রা হরিণ শিকারের ঘটনাটি আরও নির্মম ও স্থায়ী ক্ষতির কারণ। ৭০ মিটার দীর্ঘ ছিটকা ফাঁদ, ধারালো অস্ত্র ও জবাই করা হরিণের অবশিষ্টাংশসহ শিকারি আটকের ঘটনা প্রমাণ করে, বন বিভাগের নানামুখী নিষেধাজ্ঞা ও কঠোরতার পরও বনে চোরাশিকারিদের রমরমা বাণিজ্য থেমে নেই। একশ্রেণির সুযোগসন্ধানী স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রের চাহিদার কারণে সুন্দরবনের প্রাণীবৈচিত্র্য আজ মারাত্মক হুমকির মুখে।

সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ঢাল। আর এই বনের বাস্তুতন্ত্র (ইকোসিস্টেম) টিকে থাকে এর বন্যপ্রাণী এবং জলপথের বিশুদ্ধতার ওপর। বনের সংরক্ষিত অঞ্চলে অননুমোদিত কার্গো চলাচল, কয়লা বা জ্বালানির মতো ক্ষতিকর পদার্থের পরিবহন কিংবা বন্যপ্রাণী হত্যা কেবল বনের আইন লঙ্ঘন নয়, বরং পুরো উপকূলীয় পরিবেশের ওপর এক মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনে।
বন বিভাগ শরণখোলা ও কয়রা থানায় পৃথক মামলা দায়ের করেছে এবং আসামিদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলা হওয়া অবশ্যই আইনি প্রক্রিয়ার প্রাথমিক ধাপ, কিন্তু কেবল চুনোপুঁটি শ্রমিক বা দু-একজন শিকারিকে ধরে এই ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়। কয়লা পাচারের পেছনে আসল মদদদাতা বা ক্রয়-বিক্রয়ের অসাধু সিন্ডিকেট কে বা কারা, তা নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্তের মাধ্যমে বের করতে হবে। পাশাপাশি হরিণ শিকারের ক্ষেত্রেও মাংস বিক্রির অবৈধ বাজারের শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে।

সুন্দরবন রক্ষায় বন বিভাগের টহল ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর (যেমন ড্রোন নজরদারি ও স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং) করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে বনকর্মী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে কারও অবহেলা বা অসাধু চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীর ওপর এই তাণ্ডব বন্ধ না হলে সুন্দরবন তাঁর স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও সুরক্ষাবলয় হারিয়ে ফেলবে, যার চড়া মাশুল দিতে হবে পুরো দেশকে।

চার মাসের সংসার, প্রথম দুর্গোৎসবেই নববধূর করুণ বিদায়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ১:০৯ পূর্বাহ্ণ
চার মাসের সংসার, প্রথম দুর্গোৎসবেই নববধূর করুণ বিদায়
মিলন বিশ্বাস: বিয়ের মাত্র চার মাস। নতুন সংসারের স্বপ্ন আর বাবার বাড়িতে প্রথম দুর্গোৎসবের আনন্দ সবকিছু যেন এক মুহূর্তেই থমকে গেল। বিজয়া দশমীতে দেবীর কপালে সিঁদুর দিতে গিয়ে আকস্মিক অসুস্থ হয়ে প্রাণ হারালেন তন্নি দে (২০) নামে এক নববধূ। উৎসবের আনন্দঘন মুহূর্ত পরিণত হলো শোক আর কান্নায়। তাঁর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার কুমিরা গ্রামে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় পাটকেলঘাটা থানার কুমিরা বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন সার্বজনীন প্রতিমা বিসর্জনস্থলে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত তন্নি দে কুমিরা গ্রামের মহাদেব দের মেয়ে। চার মাস আগে যশোরের কেশবপুর উপজেলার এক যুবকের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর বাবার বাড়িতে এটাই ছিল তাঁর প্রথম দুর্গোৎসব।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিজয়া দশমীর সন্ধ্যায় ননদের সঙ্গে প্রতিমা বিসর্জনস্থলে যান তন্নি। সেখানে সিঁদুর খেলা ও প্রতিমার কপালে সিঁদুর দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেন তিনি। কিন্তু আনন্দের সেই মুহূর্তেই হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করেন। একপর্যায়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। উপস্থিত স্বজন ও স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো যায়নি।
ঘটনার পরপরই বিসর্জনস্থলের উৎসবমুখর পরিবেশ শোকে স্তব্ধ হয়ে যায়। যে উৎসবে সিঁদুরের রঙে রঙিন হওয়ার কথা ছিল বিজয়ার শেষ বিকেল, সেখানে নেমে আসে কান্নার আবহ। মেয়েকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েন বাবা মহাদেব দেসহ পরিবারের সদস্যরা।
তালা উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক নারায়ণ মজুমদার ও স্থানীয় সূত্রে এ মৃত্যুর খবর জানা গেছে।
পাটকেলঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন জানান, বিসর্জনস্থলে এক নববধূর আকস্মিক মৃত্যুর খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তন্নি হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ বা সন্দেহ না থাকায় তাঁদের লিখিত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ
বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব

Oplus_131072

পত্রদূত ডেস্ক: আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর বিদায়ের করুণ সুরের মধ্য দিয়ে বুধবার (২১ অক্টোবর) শেষ হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। সন্ধ্যায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মর্ত্যলোক থেকে বিদায় নিয়েছেন দেবী দুর্গা। পূজার আনুষ্ঠানিকতা অনুযায়ী, বুধবার সকালে দর্পণ-বিসর্জনের মাধ্যমে দেবীকে বিদায় জানান ভক্তরা। পরে সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মানুষের মনের কাম, ক্রোধ, হিংসা ও লালসার মতো আসুরিক প্রবৃত্তি বিসর্জন দেওয়াই বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য। এসব প্রবৃত্তি ত্যাগ করে পরস্পরের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই এ আয়োজনের প্রধান উদ্দেশ্য।
গত ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী তিথিতে চন্ডীপাঠ, বোধন ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে ‘আনন্দময়ীর’ আগমনে শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা হয়। পরবর্তী ৫ দিন রাজধানীসহ দেশের পূজামন্ডপগুলোতে পূজা অর্চনার মধ্য দিয়ে ভক্তরা দেবী দুর্গার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। দশমী তিথিতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এই উৎসব শেষ হয়।
সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গা মর্ত্যলোক (বাবার বাড়ি) থেকে স্বর্গলোকের কৈলাসে স্বামীর ঘরে ফিরে যান। আগামী বছর শরৎকালে তিনি পুনরায় ধরণীতে ফিরে আসবেন।
এর আগে দুপুরে বিভিন্নস্থানে বের হয় বর্ণাঢ্য বিজয়া শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রা ও বিসর্জনে অংশ নিতে দুপুরের পর থেকেই জেলার বিভিন্ন মন্ডপ থেকে ভ্যান নৌকা ট্রাকসহ বিভিন্ন বাহনে করে প্রতিমা নিয়ে ভক্তরা নদ-নদী জলাশয়ের পাশে জড়ো হতে থাকেন। এবছর জেলায় সর্বোচ্চ ৬১২টি মন্ডপে সুষ্ঠ শান্তিপূর্ণভাবে পূজা অনুষ্ঠিত হয়।