সম্পাদকীয়/ সড়ক যেন মৃত্যুফাঁদ: মৃত্যুর মিছিল থামবে কবে?
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শান্ত উপকূলীয় উপজেলা পাইকগাছায় গত এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৮ জনের মৃত্যু এবং ৪৯ জন আহতের খবর কেবল একটি স্থানীয় পরিসংখ্যান মাত্র নয়; এটি আসলে পুরো দেশের সড়ক ব্যবস্থার এক ভয়াবহ ও করুণ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলায় ২২ অক্টোবর পালিত জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত এ চিত্র দেশের সার্বিক সড়ক নিরাপত্তার দৈন্যদশার কথাই নতুন করে স্মরণে এনে দেয়।
পাইকগাছার মতো একটি মাত্র গ্রামীণ কিংবা আধা-শহুরে এলাকায় এক বছরে ৬৩টি ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটা এবং তাতে এতগুলো তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তবে সারা দেশের চিত্র পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, দুর্ঘটনা ও হতাহতের এই মাত্রা জাতীয় সংকটের রূপ নিয়েছে। জাতীয় মহাসড়ক থেকে শুরু করে দূরবর্তী অঞ্চলের সংযোগ সড়ক—সবখানেই প্রতিদিন বেপরোয়া গতি, হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বেআইনি থ্রি-হুইলার ও নসিমন- করিমন-ভাটিভাটির অবারিত চলাচল এবং সড়ক পারাপারে অসচেতনতার কারণে তাজা প্রাণ ঝরে পড়ছে। এর পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত ওভারটেকিং ও ত্রুটিপূর্ণ সড়ক নকশা সড়ককে এক একটি নিশ্চিত মৃত্যুফাঁদে পরিণত করেছে।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে বিগত বছরগুলোতে শিক্ষার্থীদের অভূতপূর্ব আন্দোলন এবং আইনের খসড়া প্রণয়ন সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকারিতা প্রায় শূন্যের কোঠায়। আইন প্রণয়ন হলেও প্রয়োগের শিথিলতা, বিআরটিএ-এর তদারকির অভাব এবং ট্রাফিক প্রশাসনের চরম উদাসীনতার কারণেই অনাকাঙ্ক্ষিত এই প্রাণহানি রোখা যাচ্ছে না। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয়, আলোচনা-সংবাদ সম্মেলন হয়; কিন্তু কার্যকর প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ কখনোই আলোর মুখ দেখে না।
সড়ক দুর্ঘটনা কোনো অনিবার্য দৈবদুর্বিপাক নয়, এটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণযোগ্য এক কৃত্রিম মহামারি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই। প্রতিটি অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক পয়েন্ট চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। মহাসড়কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও গ্রামীণ সড়কেও অবৈধ, লাইসেন্সহীন ও বিপজ্জনক ট্রাফিক চলাচল অনতিবিলম্বে বন্ধ করা আবশ্যক। পাশাপাশি চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, ট্রাফিক আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং সাধারণ পথচারীদের সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা ও পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ না থাকে। নিরাপদ সড়ক পাওয়া মানুষের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার। সড়ককে নিরাপদ করতে প্রশাসন, পরিবহন মালিক, চালক ও পথচারী—সব পক্ষকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্বশীল হতে হবে। অনভিপ্রেত আর কোনো পঙ্গুত্ব বা স্বজন হারানোর কান্না দেখার আগে কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।












