সাতক্ষীরার উন্নয়নে নতুন ভাবনা
মো. মামুন হাসান
বাংলাদেশের উন্নয়ন আলোচনায় উপকূলের কথা উঠলেই ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, নদীভাঙন আর বেড়িবাঁধের দুর্বলতার চিত্র সামনে আসে। অথচ এই উপকূলের মধ্যেই লুকিয়ে আছে কৃষি, মৎস্য, পর্যটন, জীববৈচিত্র্য, বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য এবং নীল অর্থনীতির বিপুল সম্ভাবনা। সাতক্ষীরা সেই সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সুন্দরবনের অংশবিশেষ, বিস্তীর্ণ নদীব্যবস্থা, চিংড়িশিল্প, কৃষি, স্থলবন্দর এবং ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মিলিয়ে জেলাটির রয়েছে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ভিত্তি। প্রশ্ন হলো, সাতক্ষীরা কি শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে টিকে থাকবে, নাকি পরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের উপকূলীয় অর্থনীতির নতুন উন্নয়ন মডেল হয়ে উঠবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই উন্নয়নের প্রচলিত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। উন্নয়ন মানে শুধু সড়ক, সেতু, ভবন কিংবা অবকাঠামো নির্মাণ নয়। প্রকৃত উন্নয়ন হলো স্থানীয় সম্পদকে উৎপাদনশীল সম্পদে রূপান্তর, মানুষের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা। অর্থনীতির অন্তর্জাত প্রবৃদ্ধি তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে তার নিজস্ব জ্ঞান, দক্ষতা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও মানবসম্পদের ওপর। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সাতক্ষীরার উন্নয়নের ভিত্তি হতে পারে স্থানীয় সম্পদ, স্থানীয় উদ্যোক্তা এবং স্থানীয় মানুষের দক্ষতা।
সাম্প্রতিক বাস্তবতা অবশ্য যথেষ্ট উদ্বেগজনক। ২৭ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাতক্ষীরায় প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। লবণাক্ততা, সুপেয় পানির সংকট, নদীভাঙন, কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং ঘূর্ণিঝড় মানুষের জীবন ও জীবিকাকে অনিশ্চিত করে তুলছে। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় সাতক্ষীরার ২৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ এলাকাকে লবণাক্ততা প্রবেশের উচ্চ ও অতি উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, সাতক্ষীরার উন্নয়ন পরিকল্পনায় জলবায়ু সহনশীলতাকে আলাদা কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটিকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রেই রাখতে হবে।
এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন সমন্বিত উপকূলীয় অঞ্চল ব্যবস্থাপনা বা ইন্টিগ্রেটেড কোস্টাল জোন ম্যানেজমেন্ট। এই ধারণার মূল কথা হলো, নদী, কৃষি, মৎস্য, বন, বসতি, পর্যটন ও অবকাঠামোকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। সাতক্ষীরায় নদী খনন করা হলো, কিন্তু পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা হলো না; বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হলো, কিন্তু নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পলি ব্যবস্থাপনা বিবেচনায় নেওয়া হলো না; চিংড়ি উৎপাদন বাড়ল, কিন্তু কৃষিজমি ও সুপেয় পানির সংকট তৈরি হলো। এভাবে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সাতক্ষীরার অর্থনীতির অন্যতম শক্তি হতে পারে কৃষি ও মৎস্যের সমন্বিত বিকাশ। চিংড়ি এই জেলার গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য হলেও একটি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়ায়। প্রয়োজন পরিবেশবান্ধব চিংড়ি চাষ, কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ, লবণসহিষ্ণু ধান, সূর্যমুখী, তরমুজ, সবজি এবং জলাবদ্ধ এলাকায় পানিফল চাষের সম্প্রসারণ। একই সঙ্গে চিংড়ি ও কাঁকড়ার প্রক্রিয়াজাতকরণ, হিমাগার, মান নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তুলতে হবে। এতে কাঁচামাল বিক্রির পরিবর্তে স্থানীয় পর্যায়েই মূল্য সংযোজন সম্ভব হবে।
এখানে অর্থনীতির ভ্যালু চেইন বা মূল্য সংযোজন শৃঙ্খল তত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ। একটি পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, পরিবহন, বিপণন ও রপ্তানি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নতুন অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি হয়। সাতক্ষীরার চিংড়ি যদি শুধু কাঁচামাল হিসেবে বিক্রি না হয়ে স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত ও ব্র্যান্ডিং করা যায়, তাহলে আয় ও কর্মসংস্থান—দুটিই বাড়বে।
দ্বিতীয় বড় সম্ভাবনা পর্যটন। সুন্দরবন, মুন্সীগঞ্জ, শ্যামনগর, কালীগঞ্জ, যশোরেশ্বরী মন্দির, গুর পুকুরের মেলা এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত পর্যটন অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব। তবে পর্যটন মানে শুধু হোটেল, রিসোর্ট কিংবা পর্যটক পরিবহন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে স্থানীয় খাবার, নৌভ্রমণ, হস্তশিল্প, সংস্কৃতি, প্রশিক্ষিত পর্যটন গাইড, হোমস্টে, পরিবেশবান্ধব পরিবহন এবং স্থানীয় পণ্য বিপণন।
এ ক্ষেত্রে কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটন মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে। অর্থাৎ, পর্যটনের আয় যেন শুধু বাইরের বিনিয়োগকারীর হাতে না গিয়ে স্থানীয় মানুষের কাছেও পৌঁছায়। সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনে স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষিত গাইড, নৌযান পরিচালনাকারী, আতিথেয়তা ব্যবস্থাপক এবং উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পর্যটনের ধারণক্ষমতা ও পরিবেশগত সীমা মেনেই পর্যটন সম্প্রসারণ করতে হবে।
বিদেশি অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ভিয়েতনামের মেকং বদ্বীপে কৃষি, মৎস্য, বন, অবকাঠামো এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকাকে সমন্বিত করে জলবায়ু সহনশীল উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে চিংড়ি চাষের সঙ্গে ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ এবং জনগোষ্ঠীভিত্তিক পর্যটনকে যুক্ত করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের একটি অভিজ্ঞতা বিনিময় প্রতিবেদনে এই মডেলকে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সাতক্ষীরার সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী এমন উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।
অন্যদিকে, নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, পানি নিয়ন্ত্রণ শুধু বাঁধ নির্মাণের বিষয় নয়; বরং পানি ব্যবস্থাপনা, ভূমি ব্যবহার, প্রযুক্তি, কৃষি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সমন্বয়। তাদের পানি ব্যবস্থাপনার দর্শনে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করার পরিবর্তে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বসতি ও অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সাতক্ষীরায়ও শুধু বেড়িবাঁধ উঁচু করার পরিবর্তে নদীর প্রবাহ, জোয়ার-ভাটা, পলি ব্যবস্থাপনা, খাল পুনঃখনন, জলাধার সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকৃতিনির্ভর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, সাতক্ষীরাকে সীমান্ত বাণিজ্য ও লজিস্টিকস অর্থনীতির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। ভোমরা স্থলবন্দরকে ঘিরে পরিবহন, গুদামজাতকরণ, পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হিমায়িত পণ্য পরিবহন ও সংরক্ষণব্যবস্থা, প্যাকেজিং এবং বাণিজ্যিক সেবা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। স্থলবন্দরকে শুধু আমদানি-রপ্তানির প্রবেশদ্বার হিসেবে না দেখে একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিকল্পনা করতে হবে। এর সঙ্গে কৃষি ও মৎস্য রপ্তানির অবকাঠামো যুক্ত করা গেলে স্থানীয় উৎপাদকেরাও সরাসরি উপকৃত হবেন।
চতুর্থত, মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া এই সম্ভাবনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। অর্থনীতির মানবসম্পদ তত্ত্ব অনুযায়ী, শিক্ষা, দক্ষতা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ মানুষের উৎপাদনশীলতা এবং আয় বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান উপায়। সাতক্ষীরায় পর্যটন ও আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনা, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিপ্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, লজিস্টিকস এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নে কারিগরি প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করতে হবে। স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে স্বল্পসুদে ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে এসব পরিকল্পনার ভিত্তি হতে হবে একটি সমন্বিত সাতক্ষীরা উপকূলীয় অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনা। প্রথম দুই বছরে জেলার নদী, খাল, কৃষিজমি, লবণাক্ততা, পর্যটনসম্পদ, শিল্প, বন্দর ও জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক মানচিত্র তৈরি করতে হবে। পরবর্তী তিন বছরে শ্যামনগর ও আশাশুনিতে জলবায়ু সহনশীল কৃষি, পরিবেশবান্ধব মৎস্য এবং কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনের পরীক্ষামূলক অঞ্চল গড়ে তোলা যেতে পারে। একই সঙ্গে ভোমরা স্থলবন্দরকেন্দ্রিক শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থা এবং সাতক্ষীরা সদরে দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা সহায়তা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। পাঁচ বছর পর ফলাফল মূল্যায়ন করে সফল উদ্যোগগুলো পুরো জেলায় সম্প্রসারণ করতে হবে।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল এবং স্থানীয় সরকারের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর সঙ্গে সাতক্ষীরার উন্নয়ন পরিকল্পনার কার্যকর সমন্বয়ও জরুরি। প্রতিটি প্রকল্পে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং বিনিয়োগের সুফল বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে, সাতক্ষীরার উন্নয়নকে কেবল একটি জেলার উন্নয়ন হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে পারে বাংলাদেশের উপকূলীয় অর্থনীতির জন্য একটি পরীক্ষাগার, যেখানে জলবায়ু সহনশীল কৃষি, টেকসই মৎস্য, পরিবেশবান্ধব পর্যটন, সীমান্ত বাণিজ্য এবং দক্ষ মানবসম্পদ একই উন্নয়ন কাঠামোয় যুক্ত হবে। অর্থনীতির অভিঘাত-সহনশীলতার ধারণা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত উন্নয়ন শুধু সংকট মোকাবিলা নয়; সংকটের মধ্যেও নতুন উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সম্ভাবনা তৈরির সক্ষমতা অর্জন।
সাতক্ষীরার সামনে তাই দুটি পথ। একদিকে দুর্যোগের পর ত্রাণ, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত এবং বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীলতা। অন্যদিকে স্থানীয় সম্পদ, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও বিনিয়োগের সমন্বয়ে একটি নতুন অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ। দ্বিতীয় পথটি কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়।
সাতক্ষীরাকে আর শুধু দুর্যোগের মানচিত্রে দেখতে চাই না। দেখতে চাই সম্ভাবনার মানচিত্রে। যে উপকূলকে এত দিন উন্নয়নের ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, সেই উপকূলই হতে পারে বাংলাদেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক শক্তি। প্রশ্ন সাতক্ষীরার সম্ভাবনা কতটুকু, তা নয়; প্রশ্ন হলো, সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ আমরা দেখাতে পারব কি না।
লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট।









