কালো ধোঁয়া ও প্লাস্টিক বর্জ্যে বিপন্ন সুন্দরবন
তারিক ইসলাম
সুন্দরবন—বাংলার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রাকৃতিক প্রাচীর। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে উপকূলীয় জনপদকে রক্ষায় এই ম্যানগ্রোভ বন যুগ যুগ ধরে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে ভূমিকা রেখে চলেছে। অথচ আজ সেই রক্ষাকবচ নিজেই অস্তিত্বের সংকটে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের কালো ধোঁয়া, তেল ও বর্জ্যদূষণ এবং পর্যটকদের ফেলে যাওয়া পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যে বিপন্ন হয়ে উঠছে বনের অনন্য জীববৈচিত্র্য।
একদিকে মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, অন্যদিকে পর্যটনের নামে অনিয়ন্ত্রিত নৌযানের আনাগোনা এবং পরিবেশগত নজরদারির সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে সুন্দরবন ক্রমেই পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে পড়ছে। আইন ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে চলাচলকারী নৌযান থেকে নিঃসৃত তেল, মবিল ও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য নদ-নদীর পানিতে মিশে জলজ পরিবেশের ক্ষতি করছে। এর প্রভাবে ডলফিন, কুমির, কাঁকড়া ও বিভিন্ন প্রজাতির মাছসহ জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে ইরাবতী ও গাঙ্গেয় ডলফিনের বিচরণক্ষেত্রে জাহাজের শব্দ, পানির কম্পন এবং প্রপেলারের আঘাত তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, জাহাজের কালো ধোঁয়া বায়ুদূষণ বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পর্যটনের নামে পরিবেশদূষণ। প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটকবাহী লঞ্চ ও ট্রলার সুন্দরবনের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াত করছে। অসচেতন পর্যটকদের ফেলে যাওয়া একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের প্লেট, পানির বোতল, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য বনের মাটি ও পানিতে জমা হচ্ছে। এসব বর্জ্য মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ ও জলজ পরিবেশের ক্ষতি করছে। খাদ্যশৃঙ্খলেও তৈরি হচ্ছে বিরূপ প্রভাব। বন্যপ্রাণী এসব প্লাস্টিক খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে, এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিতেও পড়তে পারে। ফলে পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব দূষণ ও অনিয়ম প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক নজরদারি ও জবাবদিহি আরও জোরদার করা জরুরি। পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন বিভাগের সমন্বিত তদারকি, নৌযানের গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম যথাযথভাবে কার্যকর করতে হবে। জাহাজ থেকে নদীতে তেল বা বর্জ্য নিঃসরণের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে দূষণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।
এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, উপকূলের নিরাপত্তা এবং দেশের পরিবেশগত ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুন্দরবন বাঁচলে বাঁচবে দক্ষিণ উপকূল।
করণীয়
১. সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে চলাচলকারী নৌযানের জন্য সুনির্দিষ্ট গতিসীমা নির্ধারণ এবং তা কার্যকরভাবে তদারক করতে জিপিএস ট্র্যাকিংসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
২. অনুমোদনবহির্ভূত নৌযান চলাচল এবং নিষিদ্ধ এলাকায় জাহাজ নোঙর করার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩. পর্যটকদের প্লাস্টিক ও পলিথিন বহন নিরুৎসাহিত ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রতিটি পর্যটকবাহী নৌযানে বর্জ্য সংরক্ষণ ও অপসারণের বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
৪. পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং দূষণকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় বিকল্প নৌপথের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
প্রকৃতির এই অপার দানকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, কঠোর নজরদারি এবং কার্যকর প্রশাসনিক সদিচ্ছা। সুন্দরবন রক্ষা করা কেবল পরিবেশবাদীদের দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের অস্তিত্ব, উপকূলের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অপরিহার্য দায়িত্ব।
লেখক: তারিক ইসলাম, সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।












