শিক্ষা বাঁচলে দেশ বাঁচবে
প্রভাষক ওবায়দুল্লাহ
শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড বলা হয়। একটি উন্নত ও স্বনির্ভর জাতি গঠনের মূল ভিত্তি হলো মানসম্মত শিক্ষা। কিন্তু বর্তমানে আমাদের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে এক চরম উদ্বেগ ও হতাশার চিত্র ফুটে ওঠে। শ্রেণিভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আজ কোচিং সেন্টারের বাণিজ্যিক দাপটে মারাত্মকভাবে কোণঠাসা। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত, যখন শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজের শ্রেণিকক্ষে থাকার কথা, তখন তাদের দেখা যায় বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের গাদাগাদি পরিবেশে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার এই অবক্ষয় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। আধুনিক শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ, ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ এবং বিনা মূল্যে কোটি কোটি পাঠ্যপুস্তক বিতরণের মতো বিশাল কর্মযজ্ঞ চালানো হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। উদ্দেশ্য একটাই—আমাদের নতুন প্রজন্ম যেন শ্রেণিকক্ষেই সঠিক ও মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে। অথচ বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। সম্প্রতি প্রকাশিত উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফলের দিকে চোখ বুলালে বিষয়টি শিক্ষানুরাগী ও সচেতন মহলসহ সমগ্র দেশবাসীর কাছে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ শিক্ষা খাতে ব্যয় করার পরও বোর্ড পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া কিংবা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পাওয়া একটি কঠোর বার্তা দিচ্ছে। সরকারের এত বড় আর্থিক ব্যয় ও সরকারি অবকাঠামো শেষ পর্যন্ত কতটুকু কাজে আসছে, তা নিয়ে আজ বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই শ্রেণিকক্ষের নিয়মিত পাঠদান এড়িয়ে চলছে। স্কুল-কলেজ চলাকালীন সময়েই তাদের মূল ব্যস্ততা দেখা যায় বিভিন্ন একাডেমিক কোচিং সেন্টারে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক অনুশাসন নষ্ট হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে সহপাঠীদের সঙ্গে সম্মিলিত আলোচনা, শিক্ষকদের সরাসরি সান্নিধ্য ও পাঠ্যক্রমবহির্ভূত কার্যক্রম থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে।
কোচিং সংস্কৃতির কারণে অভিভাবকদের ওপর বাড়ছে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে তীব্র প্রতিযোগিতা ও মানসিক চাপ। মেধা বিকাশের পরিবর্তে মুখস্থনির্ভরতা এবং নোটের ওপর নির্ভর করে পরীক্ষায় পাস করার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
শিক্ষাব্যবস্থাকে রক্ষা করা ও দেশে কার্যকর শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে আমরা নিম্নলিখিত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি—
১. স্কুল-কলেজ চলাকালীন কোচিং বন্ধে কঠোর আইন: প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সব ধরনের একাডেমিক কোচিং সেন্টারের কার্যক্রম আইনগতভাবে কঠোর হস্তে বন্ধ ঘোষণা করতে হবে এবং তা নিশ্চিত করতে হবে।
২. শতভাগ উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা: মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
৩. বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত: কোনো শিক্ষার্থী যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয়সংখ্যক দিন উপস্থিত না থাকলে তাকে কোনো অবস্থাতেই বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া যাবে না।
৪. কোচিং সেন্টার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তদারকি: প্রতিটি উপজেলার শিক্ষা অফিস এবং সরকার কর্তৃক গঠিত পরিদর্শক দলের মাধ্যমে প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় স্থানীয় কোচিং সেন্টারগুলোতে নিয়মিত ও আকস্মিক অভিযান চালাতে হবে। স্কুল-কলেজ চলাকালীন সময়ে কোনো কোচিং সেন্টারের কার্যক্রম চলমান থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মাসিক তদারকি ও ডিজিটাল নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা চালুর ওপর জোর দিতে হবে।
৫. শ্রেণিকক্ষেই মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা: শিক্ষক সমাজকে আরও দায়িত্বশীল ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। শ্রেণিকক্ষেই যেন পাঠ্যসূচি সম্পূর্ণরূপে আয়ত্ত করা যায়, সে জন্য যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের মাধ্যমে আকর্ষণীয় পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে।
৬. সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি: অভিভাবক-শিক্ষক সমাবেশ সক্রিয় করে অভিভাবকদের এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে, যেন তাঁরা সন্তানদের স্কুল-কলেজ চলাকালীন সময়ে কোচিংয়ে না পাঠিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শ্রেণিকক্ষে পাঠাতে উৎসাহী হন।
পরিশেষে বলব, শিক্ষা খাত কেবল একটি খাত নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের প্রধান হাতিয়ার। যদি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তার স্বকীয়তা ও আভিজাত্য হারিয়ে ফেলে, তবে আমাদের উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়বে। কোটি কোটি টাকার সরকারি ব্যয় তখনই সার্থক হবে, যখন একজন শিক্ষার্থী তার নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষ থেকেই প্রকৃত শিক্ষা ও মূল্যবোধ লাভ করবে। তাই এখনই সময় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে উদ্ধার করার। অনতিবিলম্বে এ-সংক্রান্ত কঠোর নীতি প্রয়োগ ও কার্যকর তদারকির মাধ্যমে শিক্ষা ও দেশকে রক্ষায় সব পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক: প্রভাষক, সাতক্ষীরা আলিয়া কামিল মাদ্রাসা।









