ইলিশের উৎপাদন হ্রাস: সংরক্ষণ কৌশল নিয়ে নতুন ভাবনা জরুরি
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। নদী, প্রকৃতি, অর্থনীতি ও বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে এই মাছের সম্পর্ক গভীর। ইলিশের স্বাদ ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি দেশের লাখো জেলে ও মৎস্যজীবীর জীবন-জীবিকাও এর ওপর নির্ভরশীল। তাই ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো এবং প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত করা দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রের মৎস্য ব্যবস্থাপনার অন্যতম লক্ষ্য। এ উদ্দেশ্যে প্রতিবছর মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা এবং জাটকা সংরক্ষণে মাছ ধরার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে নেওয়া এসব উদ্যোগের সুফলও একসময় পাওয়া গেছে। গত দুই দশকে দেশে ইলিশের উৎপাদন দ্বিগুণের বেশি হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই অগ্রগতির ধারায় ছেদ পড়েছে। পরপর দুই অর্থবছরে উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, ইলিশ সংরক্ষণে প্রচলিত কৌশল কতটা কার্যকর হচ্ছে?
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৩৯ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ মেট্রিক টনে। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে হয় ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ মেট্রিক টন। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে প্রায় ৫ লাখ মেটিক টনে নেমেছে। উৎপাদনের এই নিম্নমুখী প্রবণতা কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদীর পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রজননক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা।
প্রশ্ন হচ্ছে, এত বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা, অভিযান ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনার পরও উৎপাদন কমছে কেন? নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। মা ইলিশকে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়া এবং জাটকাকে বড় হওয়ার সময় করে দেওয়া ইলিশের বংশবৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। গবেষণায় দেখা গেছে, অমাবস্যা ও পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে ইলিশের ডিম ছাড়ার প্রবণতা বাড়ে। সেই বিবেচনায় প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। তবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাই সংরক্ষণের শেষ কথা নয়। এর যথাযথ বাস্তবায়নের পাশাপাশি মাছের জীবনচক্রের পরবর্তী পর্যায়গুলোও সুরক্ষিত রাখা জরুরি।
চাঁদপুরের নদীতীরবর্তী এলাকায় নিষেধাজ্ঞা চলাকালে অভিযান পরিচালনার বাস্তব চিত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে। নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড, জেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স অভিযান চালালেও বিশাল নদী এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করা কঠিন। সুযোগ পেলেই একশ্রেণির অসাধু জেলে নদীতে নামছেন। নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে মাছ ধরার অভিযোগও রয়েছে। কোথাও কোথাও অভিযানসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহযোগিতায় অবৈধভাবে মাছ ধরার অভিযোগ উঠেছে। পর্যাপ্ত জনবল, নৌযান ও অর্থের অভাবে ২৪ ঘণ্টা অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নিষেধাজ্ঞার সুফল প্রত্যাশিত মাত্রায় পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে জেলেদের শুধু অপরাধী হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। নিষেধাজ্ঞার সময় তাঁদের উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। অথচ সংসারের খরচ, ঋণের কিস্তি ও দৈনন্দিন প্রয়োজন থেমে থাকে না। অনেক জেলে মাছ ধরার নৌকা ও জাল কেনার জন্য ঋণ নেন। নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারি সহায়তা তাঁদের কাছে যথাসময়ে পৌঁছায় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সহায়তা অপর্যাপ্ত হলে জীবিকার তাগিদে কেউ কেউ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করতে পারেন। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জেলেদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যসহায়তা, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। জেলেদের সম্পৃক্ত না করে ইলিশ সংরক্ষণের উদ্যোগ দীর্ঘ মেয়াদে সফল করা কঠিন।
অন্যদিকে, ইলিশের উৎপাদন কমার পেছনে নদীর পরিবেশগত পরিবর্তনও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ইলিশের জীবনচক্র নদী ও সমুদ্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, পলি জমা, দূষণ, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং লবণাক্ততার পরিবর্তন মাছের বিচরণ ও প্রজননে প্রভাব ফেলতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির তাপমাত্রা ও নদীর প্রবাহেও পরিবর্তন ঘটছে। এসব পরিবর্তনের ফলে ইলিশের খাদ্য, চলাচল ও ডিম ছাড়ার উপযোগী পরিবেশ বিঘ্নিত হতে পারে।
দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীর পরিস্থিতি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার উপকূলীয় নদীগুলোতে নাব্যতা সংকট, লবণাক্ততা, দূষণ ও স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। নদীর সঙ্গে সমুদ্রের সংযোগ এবং মোহনার পরিবেশ ইলিশের জীবনচক্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে কিংবা প্রজননক্ষেত্রের পরিবেশ নষ্ট হলে শুধু মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। তাই ইলিশ সংরক্ষণের আলোচনায় নদী খনন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ দখল বন্ধ এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইলিশের প্রজনন মৌসুমেও পরিবর্তন এসেছে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, একসময় ইলিশের প্রজননের গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল সেপ্টেম্বর মাস। পরে পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে সেই সময়ে পরিবর্তন এসেছে। এ জন্য গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে মা ইলিশ রক্ষার অভিযান অক্টোবর মাসে পরিচালনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ ইলিশের প্রজনন আচরণ ও পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে সংরক্ষণ কর্মসূচির সময় নির্ধারণের বিষয়টি যুক্ত। এ কারণে পুরোনো তথ্যের ওপর নির্ভর না করে নিয়মিত গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞার সময় ও এলাকা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
আরেকটি বিষয় হলো, নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেই ইলিশের জীবনচক্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। ডিম থেকে জন্ম নেওয়া পোনা, জাটকা এবং বড় ইলিশে পরিণত হওয়ার প্রতিটি পর্যায়ে সুরক্ষা প্রয়োজন। অভয়াশ্রমে অবৈধ মাছ ধরা, ছোট ইলিশ আহরণ এবং নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ করা না গেলে প্রজনন মৌসুমে নেওয়া উদ্যোগের সুফল নষ্ট হতে পারে। পাশাপাশি বাজারে ছোট ইলিশের চাহিদা ও বেচাকেনা নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। শুধু নদীতে অভিযান চালিয়ে বাজারের অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব নয়।
এ অবস্থায় ইলিশ সংরক্ষণে প্রচলিত ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। প্রথমত, ইলিশের প্রজনন, বিচরণ ও খাদ্যগ্রহণের পরিবর্তিত ধরন নিয়ে নিয়মিত গবেষণা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিষেধাজ্ঞার সময় নদীতে নজরদারি বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত নৌযান ও জনবল নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, জেলেদের সহায়তা যথাসময়ে তাঁদের হাতে পৌঁছাতে হবে। চতুর্থত, ইলিশের অভয়াশ্রম ও প্রজননক্ষেত্রের পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পঞ্চমত, নদীদূষণ, অবৈধ দখল ও নাব্যতা সংকট দূর করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।
এখানে আরও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। ইলিশের উৎপাদন কমেছে বলেই নিষেধাজ্ঞা ব্যর্থ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। উৎপাদনের ওঠানামার পেছনে একাধিক প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণ থাকতে পারে। তাই উৎপাদন হ্রাসের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করতে নদীভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ, মাছের প্রজনন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং নিষেধাজ্ঞার আগে-পরে উৎপাদনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। কোন এলাকায় ইলিশ কমছে, কোথায় প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং কোন ব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর গবেষণার ভিত্তিতেই খুঁজতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, ইলিশ সংরক্ষণকে শুধু মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে নদী ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জেলেদের জীবন-জীবিকা সরাসরি যুক্ত। তাই সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।
ইলিশ আমাদের জাতীয় সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন, অভিযানও প্রয়োজন। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন ইলিশের নিরাপদ প্রজনন ও বেড়ে ওঠার উপযোগী নদী-সমুদ্রের পরিবেশ নিশ্চিত করা। গত দুই দশকে উৎপাদন বৃদ্ধির যে অর্জন তৈরি হয়েছিল, তা ধরে রাখতে হলে সংরক্ষণ কৌশলে সময়োপযোগী পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ ইলিশ রক্ষার অর্থ শুধু মাছ ধরা বন্ধ রাখা নয়; ইলিশের জীবনচক্রকে নিরাপদ রাখা, নদীকে বাঁচিয়ে রাখা এবং জেলেদের জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। নদী বাঁচলে ইলিশ বাঁচবে, আর ইলিশ বাঁচলে বাঁচবে উপকূলের অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকা।
লেখক: সংবাদকর্মী












