এইচএসসির ফল বিপর্যয়: আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি কোথায়?
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় গড় পাসের হার গত বছরের ৫৮.৮৩ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৫২.১২ শতাংশে। সারা দেশে জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী। এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদানের দুর্বলতাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে পাসের হারের পতনে। সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পাসের হার নেমে এসেছে ৫১.৬২ শতাংশে, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে শূন্য পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩৯টিতে। এই ফলাফল মনে করিয়ে দেয়, নম্বর বাড়িয়ে ভালো ফল দেখানোর প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে আমরা এখন শিক্ষার প্রকৃত মান নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।
এবারের ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে বাধ্যতামূলক বিষয়, বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অকৃতকার্যতার বিষয়টি সামনে এসেছে। শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদানের অভাব, দুর্বল পাঠ্যক্রম এবং প্রশ্নপদ্ধতির পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হতে পারে।
পাশাপাশি, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কোচিংনির্ভর মুখস্থবিদ্যার সংস্কৃতিও উদ্বেগজনক। প্রশ্ন সামান্য ঘুরিয়ে বা বিশ্লেষণধর্মী করে উপস্থাপন করা হলে মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল শিক্ষার্থীরা অনেক সময় উত্তর দিতে পারে না। ফলে তাদের প্রকৃত দক্ষতা ও বোঝার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পায়। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে, শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার প্রস্তুতি নয়, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও অনুধাবনশক্তি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ফলাফলের এই বিপর্যয়ের পর শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ঘাটতির কথা স্বীকার করেছেন এবং অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এক মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এই পদক্ষেপকে পূর্ণাঙ্গ সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীরা দুই বছরে যে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি, তা মাত্র কয়েক সপ্তাহে কতটা আয়ত্ত করতে পারবে? যথাযথ প্রস্তুতি ও সহায়তা ছাড়া পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দিলে অনেকে হয়তো প্রশ্নব্যাংক মুখস্থ করার দিকে ঝুঁকবে। এতে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সমস্যার সমাধান হবে না।
বর্তমানে আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাস্তবতার মধ্যে বাস করছি। এ সময়ে জটিল সমস্যা সমাধান, বিশ্লেষণী চিন্তা, সৃজনশীলতা ও বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা অর্জন অত্যন্ত জরুরি। অথচ আমাদের মূল্যায়নপদ্ধতির বড় একটি অংশ এখনো মুখস্থনির্ভর। ফলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলেও বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়তে পারে।
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার খারাপ ফলাফলকে কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত মেধার ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে শিক্ষাদান পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা, শিক্ষকসংকট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বৈষম্য এবং শিক্ষার মান নিশ্চিত করার ঘাটতির মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকর সংস্কার। শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা, ইংরেজি ও গণিতের ভিত্তি মজবুত করা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রশ্নপদ্ধতিতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে অনুধাবন ও দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি, যেসব প্রতিষ্ঠানে পাসের হার শূন্য বা অত্যন্ত কম, সেসব প্রতিষ্ঠানের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
এইচএসসির ফল বিপর্যয়কে কেবল একটি খারাপ খবর হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং এটিকে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার শুরুর একটি সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের ওপর দায় চাপিয়ে নয়, বরং শিক্ষার পরিবেশ, পাঠদান ও মূল্যায়নপদ্ধতির উন্নয়নের মধ্য দিয়েই এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে।
(লেখকের নিজস্ব মতামত)।









