প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা (খুলনা): বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের জরাজীর্ণ পৈতৃক বাড়ি সংস্কারের কাজ শুরু করেছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। খুলনার পাইকগাছা উপজেলার রাড়ুলী গ্রামে কপোতাক্ষ নদের তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক বাড়িটির আংশিক সংস্কারের পর নতুন রূপ ফুটে উঠতে শুরু করেছে। তবে বিজ্ঞানীর স্মৃতি ও অবদান যথাযথভাবে সংরক্ষণে পুরো স্থাপনাটির সংস্কার ও আধুনিকায়নের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, দর্শনার্থী ও গবেষকেরা।
বাঙালি রসায়নচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ এবং বেঙ্গল কেমিক্যালসের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের জন্মভিটাটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা ও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে ছিল। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে বাড়িটির মূল ভবনের কিছু অংশ সংস্কার করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সদর মহল বা প্রধান ভবনের কয়েকটি অংশের ভগ্নদশা দূর করার কাজ চলছে। তবে অন্দরমহল, মন্দির ও সীমানাপ্রাচীরসহ অন্যান্য স্থাপনা এখনো পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের অপেক্ষায় রয়েছে।
খুলনা আঞ্চলিক প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বাড়িটির সংস্কারকাজের জন্য ৩৭ লাখ ৮১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডোমেইন এন্টারপ্রাইজ কাজটি বাস্তবায়ন করছে। চলতি বছর উত্তর পাশের দোতলা ভবনের পাঁচটি কক্ষ ও দুটি বারান্দা সংস্কার, বাইরের পলেস্তারা মেরামত এবং ভবনের চারপাশে রং করার কাজ করা হবে। তবে দরজা-জানালা এ পর্যায়ের সংস্কারকাজের আওতায় নেই। পরবর্তী সময়ে বাড়ির ভেতরের ভবন ও মন্দির সংস্কার করা হবে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, আগামী চার থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে চলমান সংস্কারকাজ শেষ হতে পারে।
খুলনা আঞ্চলিক প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মহিদুল ইসলাম বলেন, রসায়নশাস্ত্রের পথিকৃৎ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের জরাজীর্ণ জন্মভিটা সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। বাড়িটির মূল নকশা ও স্থাপত্যশৈলী অক্ষুণ্ন রেখে সংস্কার করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে পুরো বাড়ি সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ ও একটি প্রদর্শনী কক্ষ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে এসব কাজ শুরু করা হবে।
১৮৬১ সালের ২ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন স্যার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। তিনি উপমহাদেশে আধুনিক রসায়ন গবেষণার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মার্কিউরাস নাইট্রেট আবিষ্কার এবং বেঙ্গল কেমিক্যালস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিজ্ঞান ও শিল্পায়নে অসামান্য অবদান রাখেন তিনি। তাঁর জন্মভিটা বাঙালির বিজ্ঞানচর্চা ও জাতীয় গৌরবের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।
স্থানীয়দের মতে, বাড়িটির পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ও সংরক্ষণ করা গেলে এটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। সুন্দরবনগামী অনেক পর্যটক যাতায়াতের পথে বাড়িটি পরিদর্শন করেন। যথাযথ অবকাঠামো ও পর্যটনসুবিধা গড়ে তোলা হলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এ ঐতিহাসিক স্থানকে আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞান ঐতিহ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবিও উঠেছে। এ জন্য বিজ্ঞান জাদুঘর, গবেষণাগার, ডিজিটাল প্রদর্শনী গ্যালারি ও মিলনায়তন নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের স্মৃতি ও অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে তাঁর জন্মভিটার পূর্ণাঙ্গ সংস্কার, সংরক্ষণ এবং পরিকল্পিত উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।