সাকিবুর রহমান বাবলা
যুদ্ধ মানেই ধ্বংস, মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক বিপর্যয়। যুদ্ধের ভয়াবহতা পরিমাপ করতে সাধারণত নিহত ও আহত মানুষের সংখ্যা, ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরী ও ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর হিসাব করা হয়। কিন্তু যুদ্ধের আরেকটি নীরব শিকার প্রকৃতি ও পরিবেশ। গোলাবারুদ, রাসায়নিক পদার্থ, তেল নিঃসরণ এবং পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বনভূমি, নদী, সমুদ্র, কৃষিজমি ও বন্যপ্রাণী। অথচ মানুষের জীবন, খাদ্য, পানি ও জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন এই প্রকৃতি। তাই যুদ্ধের ক্ষত শুধু মানুষের শরীরে নয়, পৃথিবীর বুকেও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে।
যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাতে পরিবেশের ধ্বংস ও শোষণ প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতিবছর ৬ নভেম্বর পালিত হয় ‘যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাতে পরিবেশের শোষণ প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক দিবস’। ২০০১ সালের ৫ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ৫৬/৪ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে দিবসটি ঘোষণা করা হয়। পরদিন ৬ নভেম্বর প্রথমবারের মতো দিবসটি পালিত হয়। যুদ্ধের সময় পরিবেশের ওপর সংঘটিত ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করা এবং পরিবেশ সুরক্ষাকে শান্তি ও টেকসই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই দিবসটির মূল লক্ষ্য।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, গত ৬০ বছরে সংঘটিত অভ্যন্তরীণ সংঘাতের অন্তত ৪০ শতাংশের সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদের শোষণ ও নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক রয়েছে। এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে কাঠ, হীরা, সোনা, তেল, পানি ও উর্বর জমি। প্রাকৃতিক সম্পদকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সংঘাতের ক্ষেত্রে শান্তিচুক্তির পর পুনরায় সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কাও অন্যান্য সংঘাতের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এ কারণে সংঘাত প্রতিরোধ, শান্তিরক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার কার্যক্রমে পরিবেশ সুরক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে জাতিসংঘ।
২০১৬ সালের ২৭ মে জাতিসংঘের পরিবেশ পরিষদে সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে সুস্থ বাস্তুতন্ত্র ও প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। কারণ, বন, পানি, কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হলে মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, জীবিকা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হয়। দূষিত পানি ও মাটি রোগের বিস্তার ঘটায়, খাদ্য উৎপাদন কমিয়ে দেয় এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত করে। ফলে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও পরিবেশগত ক্ষতির প্রভাব মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে রাখে।
বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধের ইতিহাসে পরিবেশ ধ্বংসের ভয়াবহ দৃষ্টান্ত রয়েছে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় কুয়েতের প্রায় ৭০০টি তেলকূপে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। কয়েক মাস ধরে জ্বলতে থাকা এসব কূপের কালো ধোঁয়া ও বিষাক্ত পদার্থ বায়ুমণ্ডল দূষিত করে। পারস্য উপসাগরে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ছড়িয়ে পড়ায় সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধেও ডিপ্লিটেড ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ গোলাবারুদের ব্যবহার পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত এজেন্ট অরেঞ্জ নামের রাসায়নিকের কারণে বিস্তীর্ণ বনভূমি ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের ফলে মানুষ ও প্রকৃতির ওপর তেজস্ক্রিয়তার ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রান্সের ‘জোন রুজ’ বা লাল অঞ্চল গোলাবারুদ ও রাসায়নিক দূষণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুদ্ধের বহু বছর পরও সেখানকার কিছু এলাকায় বসবাস ও কৃষিকাজ সীমিত রয়েছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতেও পরিবেশ ধ্বংসের একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ফিলিস্তিনের গাজায় সামরিক হামলায় বিপুল পরিমাণ ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছে। এসব ধ্বংসস্তূপে অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ, অ্যাসবেস্টস ও ক্ষতিকর বর্জ্য পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। কৃষিজমি, গাছপালা, পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি জানিয়েছে, এই পরিবেশগত ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কয়েক দশক সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে সুদানের দারফুরসহ বিভিন্ন সংঘাতকবলিত এলাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের জ্বালানির চাহিদা, বন উজাড়, মরুকরণ ও বন্যপ্রাণী নিধন জীববৈচিত্র্যের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
যুদ্ধের সময় পরিবেশ সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক আইনও রয়েছে। ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনের ১৯৭৭ সালের প্রথম অতিরিক্ত প্রটোকলে পরিবেশের ব্যাপক, দীর্ঘস্থায়ী ও মারাত্মক ক্ষতি ঘটাতে পারে—এমন যুদ্ধপদ্ধতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক আইন কমিশনের ২০২২ সালের ‘সশস্ত্র সংঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবেশ সুরক্ষার নীতিমালা’য় সংঘাতের আগে, চলাকালে ও পরবর্তী সময়ে পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশীদারত্ব এবং সংঘাত-পরবর্তী শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনাবিষয়ক উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস পরিবেশের অবক্ষয় ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক প্রভাব থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
যুদ্ধের ময়দানে মানুষের জীবন রক্ষার পাশাপাশি প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায়ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দায়িত্বশীল হতে হবে। সংঘাতের অবসানের পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশ পুনরুদ্ধার, প্রাকৃতিক সম্পদের ন্যায্য ব্যবহার এবং পরিবেশ ধ্বংসের জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। যুদ্ধ থেমে গেলেই প্রকৃতির ক্ষত সেরে যায় না। তাই পরিবেশ ধ্বংসের দায়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোর পরিবেশ পুনরুদ্ধারে জলবায়ু ও আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে বিশেষ বরাদ্দের ব্যবস্থা করতে হবে। মানুষের জন্য শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পৃথিবী গড়তে প্রকৃতির সুরক্ষার কোনো বিকল্প নেই।