বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩

কলারোয়া সীমান্তে বিজিবি’র অভিযান, দেড় লক্ষাধিক টাকার ভারতীয় পণ্য আটক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:৩৯ অপরাহ্ণ
কলারোয়া সীমান্তে বিজিবি’র অভিযান, দেড় লক্ষাধিক টাকার ভারতীয় পণ্য আটক

পত্রদূত ডেস্ক: সাতক্ষীরা সীমান্তে চোরাচালান বিরোধী বিশেষ অভিযান চালিয়ে দেড় লক্ষাধিক টাকা মূল্যের ভারতীয় মালামাল জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বৃহস্পতিবার কলারোয়া উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে এসব শাড়ি ও ইলেকট্রনিক পণ্য জব্দ করা হয়।
বিজিবি সূত্র জানায়, সাতক্ষীরা ব্যাটালিয়ন (৩৩ বিজিবি) এর অধীনস্থ চান্দুরিয়া, মাদরা ও কাকডাঙ্গা বিওপির টহল দল এই অভিযান পরিচালনা করে। উদ্ধারকৃত মালামালের মধ্যে রয়েছে ভারতীয় শাড়ি ও ‘জয় সুপার’ ব্র্যান্ডের টর্চ লাইট।
বিজিবি জানায়, চান্দুরিয়া বিওপির একটি দল কলারোয়া থানার গোয়ালপাড়া মাঠ এলাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় শাড়ি উদ্ধার করে। অন্যদিকে, মাদরা বিওপির সদস্যরা শ্মশান ঘাট এলাকা থেকে ১৭ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যের ভারতীয় টর্চ লাইট আটক করেন।
সবচেয়ে বড় চালানটি ধরা পড়ে গেড়াখালি এলাকায়। সেখানে কাকডাঙ্গা বিওপির সদস্যরা ১ লাখ ৫ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় শাড়ির একটি চালান জব্দ করতে সক্ষম হন। অভিযানে জব্দ করা মালামালের মোট বাজারমূল্য প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ টাকা।

Ads small one

বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস: সচেতনতা, অধিকার ও সুস্থ জীবন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:০১ অপরাহ্ণ
বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস: সচেতনতা, অধিকার ও সুস্থ জীবন

সাকিবুর রহমান বাবলা

প্রতি বছর ৪ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস। যৌন স্বাস্থ্য, যৌন অধিকার, ন্যায়বিচার এবং সবার জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ যৌন কল্যাণ নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরতেই এ দিবসের সূচনা। বর্তমান বিশ্বে স্বাস্থ্য, মানবাধিকার ও সামাজিক উন্নয়নের আলোচনায় যৌন স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও অনেক সমাজে এটি এখনও সংকোচ, কুসংস্কার এবং ভুল তথ্যের আড়ালে রয়ে গেছে। ফলে এই দিবসের গুরুত্ব দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস প্রথম উদযাপিত হয় ২০১০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন ফর সেক্সুয়াল হেলথ’ এ দিবসটির প্রবর্তন করে। প্রথম বছরের প্রতিপাদ্য ছিল “আসুন এটি নিয়ে কথা বলি”, যার মূল লক্ষ্য ছিল যৌনতা সম্পর্কিত সামাজিক ভয়, সংকোচ ও ট্যাবু ভাঙা। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে “এভরি বডি”, যা প্রত্যেক মানুষের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বার্তা বহন করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যৌন স্বাস্থ্য বলতে কেবল যৌন রোগ বা শারীরিক সমস্যার অনুপস্থিতিকে বোঝায় না; বরং এটি যৌনতার সঙ্গে সম্পর্কিত শারীরিক, মানসিক, আবেগগত এবং সামাজিক সুস্থতার একটি ইতিবাচক ও সমন্বিত অবস্থা। অর্থাৎ যৌন স্বাস্থ্য মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা বলে যেখানে ব্যক্তি জোর-জবরদস্তি, বৈষম্য ও সহিংসতা থেকে মুক্ত থেকে নিরাপদ, সম্মানজনক ও দায়িত্বশীল সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যৌন স্বাস্থ্যের প্রধান কয়েকটি ভিত্তি রয়েছে। শারীরিক সুস্থতাÑযেখানে প্রজননতন্ত্রের সঠিক কার্যকারিতা, হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য এবং রোগমুক্ত অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক ও আবেগগত সুস্থতাÑযেখানে নিজের শরীর ও যৌনতা সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব, আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক স্বস্তি প্রয়োজন। সামাজিক সুস্থতাÑযেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মতি এবং সুস্থ যোগাযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অধিকার ও নিরাপত্তাÑযেখানে ব্যক্তি তার শরীর ও প্রজননসংক্রান্ত বিষয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পায় এবং সহিংসতা ও বৈষম্য থেকে সুরক্ষা লাভ করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, পৃথিবীতে প্রতিদিন ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষ ক্ল্যামাইডিয়া, গনোরিয়া, সিফিলিস ও ট্রাইকোমোনিয়াসিসের মতো যৌনবাহিত সংক্রমণে আক্রান্ত হন এবং এইচপিভি সংক্রমণের কারণে নারীদের জরায়ুমুখের ক্যান্সার হয়, যা সঠিক সময়ে টিকাদান ও স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য। গবেষণায় দেখা যায়, অনিরাপদ যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের কারণে নারীদের সামগ্রিক অসুস্থতার ২০% এবং পুরুষদের ১৪% ঘটে থাকে, পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩১% পুরুষ ও ৪৩% নারী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে যৌন কার্যকারিতাজনিত সমস্যার মুখোমুখি হন; যা প্রমাণ করে যৌন স্বাস্থ্য কোনো ব্যক্তিগত বা সীমিত বিষয় নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ইস্যু।

যৌন স্বাস্থ্য সমস্যার পেছনে শারীরিক সংক্রমণ বা জটিলতার পাশাপাশি মানসিক চাপ, উদ্বেগ, স্থূলতা ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন অন্যতম প্রধান কারণ, যা শরীরবৃত্তীয় হরমোন ও রক্ত সঞ্চালনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে। তাই যেকোনো ধরনের সামাজিক কুসংস্কার বা অপচিকিৎসার ফাঁদে না পড়েÑনিরাপদ যৌন আচরণ, নিয়মিত ব্যায়াম, পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান বর্জন এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখার মাধ্যমে জীবনধারা সংশোধন করা প্রয়োজন; আর যেকোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যায় প্রশিক্ষিত ও নিবন্ধিত চিকিৎসকের সময়োপযোগী পরামর্শ গ্রহণ করাই একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ জীবন গঠনের মূল চাবিকাঠি।

বাংলাদেশে রক্ষণশীল সামাজিক মানসিকতার কারণে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়টি এখনো চরম অবহেলিত, যার ফলে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কিশোর-কিশোরীরা সঠিক দিকনির্দেশনা পাচ্ছে না। শ্রেণীকক্ষে প্রজনন স্বাস্থ্যের অধ্যায় এড়িয়ে যাওয়া, মাসিকসংক্রান্ত কুসংস্কার, বাল্যবিবাহ, অল্প বয়সে গর্ভধারণ এবং প্রান্তিক ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর অপর্যাপ্ত ও সংবেদনশীলতাহীন স্বাস্থ্যসেবা এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করেছে।

যৌন স্বাস্থ্য কেবল স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়; এটি মানবাধিকারের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোতে যৌন স্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক মানুষের নিজের শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে। একইসঙ্গে সহিংসতা, জবরদস্তি ও বৈষম্য থেকে মুক্ত থাকার অধিকারও নিশ্চিত করা জরুরি। সঠিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য পাওয়ার সুযোগ, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা লাভ এবং সম্মানজনক আচরণ পাওয়াও এই অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।

আইনের ক্ষেত্রেও যৌন স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা এবং অন্যান্য যৌন অপরাধ প্রতিরোধে কঠোর আইন বিদ্যমান। পাশাপাশি মাতৃস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা অনেক রাষ্ট্র তাদের জাতীয় নীতিমালার অংশ। তবে এখনও অনেক সমাজে যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা সামাজিক ট্যাবুর কারণে বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে মানুষ প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা থেকে বঞ্চিত হয়, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সামাজিক সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবসের অন্যতম লক্ষ্য হলো এই সামাজিক নীরবতা ভাঙা। যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা, দায়িত্বশীল এবং বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করে, কুসংস্কার দূর করে এবং তরুণ প্রজন্মকে সঠিক তথ্য জানতে সহায়তা করে। একইসঙ্গে এটি পারস্পরিক সম্মান, সমতা, দায়িত্ববোধ এবং নিরাপদ আচরণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং তথ্যপ্রবাহের যুগে সঠিক যৌন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসচেতনতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভুল তথ্য, গুজব এবং সামাজিক সংকোচ অনেক সময় মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। তাই পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বিজ্ঞানসম্মত যৌন স্বাস্থ্য শিক্ষা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে যৌন স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়, বরং মানবকল্যাণ, সামাজিক উন্নয়ন এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি অপরিহার্য উপাদান। একটি সুস্থ, সচেতন, বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ গঠনের জন্য যৌন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান, সম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

নদীদূষণ দখল ভরাট, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৫১ অপরাহ্ণ
নদীদূষণ দখল ভরাট, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

শ্যামল শীল

প্রকৃতি ও পরিবেশ বদলে গেছে। পশু-পাখির জন্য অরণ্য নেই। নদীতে নেই পানি। তারপরও নদী আছে। আছে নদীর জন্য কান্না। একদিকে নদীদূষণ, অন্যদিকে নদী খনন কাজে দক্ষতার অভাবে নদ-নদীগুলোর পলি অপসারণ করার পরপরই নদ-নদীগুলো আবার ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এভাবে বছরের পর বছর নদীতে পলি ও বালু এবং আবর্জনা পড়ে ডুবোচরের সংখ্যা ও দূষণ বেড়েছে। নদী খনন কাজে জবাবদিহি ও পরিকল্পনার অভাবে নদ-নদীগুলোর আজ বেহাল দশা। বাংলাদেশ যখন মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে তখনও আমাদের জানা নেই, আমাদের দেশের অনেক নদীর অস্তিত্ব মানচিত্রে আছে, অথচ বাস্তবে নেই।

অনেকের লোভ-লালসা পড়েছে নদীর ওপর। নদী অবৈধ দখল করে অনেকে মাছ চাষ করছেন, বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করছেন, নদীর জমি দখল করে গড়ে উঠেছে শিল্প প্রতিষ্ঠান, দূষণের জন্য জুড়ে দিয়েছে বর্জ্যরে লাইন। সব ধরনের বর্জ্য গিয়ে পড়ছে নদীতে। আবার কোনো কোনো স্থানে শহরের সিটি করপোরেশনের ময়লা-আবর্জনা গিয়ে পড়ছে নদীতে। শিল্পকারখানার বর্জ্যে নদী সবচেয়ে বেশি দূষিত হচ্ছে। নদ-নদী দূষণ-দখল আর ভরাটের সঙ্গে যারা জড়িত তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী। বিভিন্ন সময় তারা দলের নাম ভাঙিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নদ-নদীগুলোকে ধ্বংসের দিকে ঠৈলে দিচ্ছে। যুগের পর যুগ নদ-নদীগুলো আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সচল রেখেছে। নদীগুলো আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধারণ করে চলেছে। নদীতে বছরের পর বছর অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, উৎসমুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। খাল-বিল, শাখানদী, উপনদীগুলো ধীরে ধীরে মেরে ফেলা হয়েছে। বড় বড় নদ-নদীতে পানি সরবরাহের উৎসে এখন টান পড়েছে। নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হয়েছে এবং হচ্ছে।

 

সরকার বছরের পর বছর নদ-নদী বাঁচাতে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও সেসব অর্থের যথার্থ ব্যবহার হয়নি। সময়মতো নদীগুলো খনন করা হয়নি। নৌপথ ক্রমাগত কমতে কমতে এখন নেমে এসেছে চার হাজার কিলোমিটারে। তথ্য মতে, এখন দেশে নদ-নদীর সংখ্যা প্রায় ২৩০টির মতো। ব্রিটিশ শাসনামলে দেশে নৌপথের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার। পাকিস্তানি আমলে বর্ষা মৌসুমে নৌপথের দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার। আমাদের মতো নদীমাতৃক দেশে নৌপথের সুবিধা অনেক। পরিবহন খরচ কম, জ্বালানি সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ। একজন মানুষের যেমন আইনগত অধিকারের সুযোগ আছে, তেমনি নদ-নদীর সে ধরনের অধিকার আছে। হাইকোর্ট ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন’কে নদ-নদীর অভিভাবক ঘোষণা করেছে। তাই সময় এসেছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে আরও লোকবল, সুযোগ-সুবিধা ও প্রয়োজনীয় স্বাধীন ক্ষমতা দেওয়ার। এছাড়া নদী বিষয়ে আলাদা ট্রাইব্যুনাল করলে তা নদ-নদী রক্ষার্থে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারবে। নদী পুলিশও গঠন করা যেতে পারে। নদ-নদী তথা প্রকৃতির ওপর বছরের পর বছর অত্যাচার করে কোন সভ্যতা টিকেনি। তাই আমাদের সম্পদ, অর্থনৈতিক ক্ষেত্র নদ-নদীগুলোকে সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে হবে।

 

মনে রাখতে হবে, এক একটি নদী এক একটি পর্যটন ক্ষেত্রও বটে। পর্যটনের এ সম্ভাবনার দ্বার যত বেশি সুস্থ থাকবে নদ-নদী রক্ষাসহ পর্যটনের বিকাশ তত ত্বরান্বিত হবে। দেশের সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছে নদ-নদীর গুরুত্ব তুলে ধরে ভবিষ্যৎ রক্ষক হিসেবে তাদের সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ, নদী ঝরনা জলপ্রপাত প্রকৃতির এক অসাধারণ অনুষঙ্গ। মানববসতি গড়ে উঠেছে এ অসাধারণ প্রকৃতি ঘিরে। তবে মানুষ এর ওপর অনাচার করেছে। শত শত বছর ধরে এতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা হয়েছে। বর্তমানে মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করেছে কাজটি ঠিক হয়নি। নদী না থাকলে তাদের জীবন উপভোগ্য ও মসৃণ থাকবে না।

 

ইউরোপে নদীকে জীবন্ত সত্তার মর্যাদা দেয়া হয়েছে। কোনো কোনো দেশে একে প্রাণের আলাদা অস্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আইন করা হয়েছে। আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আদালতও নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করেছেন। একে প্রাণ ফিরিয়ে দিতে রক্ষণাবেক্ষণের তাগিদ দিয়েছেন। বাস্তবে এখনো আমাদের নদ-নদী রক্ষায় কার্যকর কিছু করা যায়নি। প্রতিনিয়ত খবর আসছে সারাদেশের নদীগুলো করুণ অবস্থায় পতিত হচ্ছে। জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নদী জনপদের অধিবাসীদের বহুবিধ উপকারে এসেছে। সেজন্য বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ। মাছে ভাতে বাঙালি- এ প্রবাদটির মূল কারণ এ নদী। এটি ছিল অফুরন্ত মাছের ভা-ার। শুকনো মৌসুমে ফসলের জন্য পানির উৎস ও যোগাযোগের সহজ মাধ্যম। এখন প্রতিনিয়ত খবর প্রকাশ হচ্ছে, নদী মরে যাচ্ছে। এ কারণে মরুকরণের পথে চলছে দেশ। এর পেছনে আমাদের সীমাহীন লোভ-লালসা একদিকে দায়ী; অন্যদিকে দায়ী প্রতিবেশী দেশের একচেটিয়া পানি প্রত্যাহার।

 

প্রভাবশালীরা যারা যেখানে পারছে নদী দখল করছে। এর ওপর নির্মাণ করছে অবৈধ স্থাপনা। কোথাও নদীতে সরাসরি বাঁধ দিয়ে মাছের ঘের তৈরি করা হয়েছে। নদীরক্ষা কমিশন তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না। আরেক দিকে চলছে ভয়াবহ দূষণ। কলকারখানার ক্ষতিকর বর্জ্য ও শহরের পয়ঃনিষ্কাশন হচ্ছে সরাসরি নদীতে। বহু নদীতে পানি থাকলেও এখন আর কোনো মাছ নেই। এসব নদীর পানি ব্যবহার দূরের কথা, রাসায়নিকের প্রভাবে অন্যান্য জলজপ্রাণী এবং উদ্ভিদ নদীতে টিকতে পারছে না।

 

এগুলো রক্ষায় আইনের অভাব নেই, কিন্তু এর সফল প্রয়োগ দেখা যায় না। আবার অভিন্ন নদীগুলো থেকে একচেটিয়া পানি প্রত্যাহার করছে ভারত। এক ফারাক্কা বাঁধ পরীক্ষামূলক চালু হওয়ার পর সেটি আর বন্ধ হয়নি; বরং নতুন নতুন চ্যানেল করে দেশটি পানি সরিয়ে নিচ্ছে। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে শুধু আলোচনা আছে। এখন সেই আলোচনাও সম্ভবত আর টেবিলে নেই। সরকারি হিসাবে নদ-নদীর সংখ্যা ৭০০ থেকে কমে এখন ৪০০ হয়েছে। বেসরকারি হিসাবে নদী দেড় সহগ্রাধিক ছিল, এখন ২৫০-এর মতো হয়েছে। দেশের আনাচে-কানাচে থাকা ৫৫০টি নদী বিলীন হয়ে গেছে। প্রধান নদীর মধ্যে ৫৯টি আন্তর্জাতিক। এগুলোর মধ্যে আবার ৫৪টি ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নদী-নদীর অবস্থা কেমন সেটি নৌপথের বর্তমান অবস্থা থেকে অনুমান করা যায়।

 

স্বাধীনতার পরপর বিআইডব্লিউটিএর এক জরিপ অনুযায়ী, দেশের নদীপথের দৈর্ঘ্য ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার। এখন কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র সাত হাজার কিলোমিটার। অর্থাৎ ৭০ শতাংশের বেশি সঙ্কুচিত হয়েছে নদীপথ। পরিবেশবাদীদের হিসাবে, গত চার দশকে ৫০ থেকে ৮০টি নদী, শাখা ও উপনদী বিলীন হয়ে গেছে। এর প্রভাব সরাসরি নদীর পাড়ের জনবসতিতে পড়েছে। এর ওপর নির্ভরশীল জেলে ও কৃষকরা হয়েছে বিপন্ন। মানুষ বঞ্চিত সুস্বাদু মিঠা পানির মাছ থেকে। সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে। যা প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট করছে। এভাবে নদী ধ্বংস করে দেয়ার মূল উৎসগুলো চিহ্নিত করে তা মোকাবেলার কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। দখল ও দূষণ রোধে সামান্য কিছু প্রশাসনিক উদ্যোগ বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায়।

 

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক নদীর পানি হিস্যা আদায়ে সরকারের কোনো জোরালো উদ্যোগ বিগত এক যুগে দেখা যায়নি। অথচ সরকার আন্তরিক হলে নদীর জীবন রক্ষায় এগিয়ে আসতে পারে, যা আমাদের প্রাণ ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর হতে পারে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিজ নিজ এলাকার নদী রক্ষার দায়িত্ব বুঝে নিলে ওই এলাকার নদী দখল-দূষণ আর ভরাট করতে কেউ সাহস পাবে না। এছাড়া কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে আর নদী দখল করতে পারবে না। সর্বোপরি, নদীর দখল-দূষণ রোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। ফলে নদী বাঁচবে, মানুষ বাঁচবে। প্রকৃতি বাঁচবে, বাঁচবে আমাদের পরিবেশও।

লেখক: সাবেক জবি শিক্ষার্থী ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা

এআই ডিপফেকের বিষাক্ত রাজনীতি: মিথ্যার ডিজিটাল কারবার বন্ধে চাই কঠোর আইন!

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৪৫ অপরাহ্ণ
এআই ডিপফেকের বিষাক্ত রাজনীতি: মিথ্যার ডিজিটাল কারবার বন্ধে চাই কঠোর আইন!

গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

‎রাজনীতি মানেই মতের ভিন্নতা। গণতন্ত্রে একজনের রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে অন্যজনের মতের অমিল থাকবেই। সরকারের সমালোচনা হবে, বিরোধী দলের সমালোচনা হবে, রাজনৈতিক নেতাদের কর্মকা- নিয়ে প্রশ্ন উঠবে এটাই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্বাভাবিক অংশ।
‎কিন্তু সমালোচনা আর অপপ্রচার এক জিনিস নয়।

‎বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, মিথ্যা তথ্য, চরিত্রহনন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া ছবি, অডিও ও ভিডিও তৈরির প্রবণতা ভয়াবহভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে কোনো রাজনৈতিক নেতা এমন কথা বলেছেন বা এমন কাজ করেছেন বলে দেখানো হচ্ছে বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্বই নেই।

‎এটি শুধু একজন ব্যক্তির সম্মানহানির বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্র, গণতন্ত্র এবং সমাজের তথ্যব্যবস্থার জন্যও একটি বড় হুমকি। রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা রক্ষা কি গণতন্ত্রবিরোধী? কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা জনগণের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। তাঁদের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করার অধিকার জনগণের আছে এবং সেই অধিকার গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সমালোচনার নামে মিথ্যা বক্তব্য বসিয়ে দেওয়া, এআই দিয়ে ভুয়া ভিডিও বানানো, কণ্ঠস্বর নকল করা কিংবা সম্পাদিত ভিডিওকে সত্য হিসেবে প্রচার করা কোনোভাবেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার স্বাভাবিক প্রয়োগ হতে পারে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকা ব্যক্তিদের মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপমানজনক বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণা মোকাবিলায় বিভিন্ন ধরনের আইন রয়েছে। তুরস্কে রাষ্ট্রপতিকে অপমানের জন্য দ-বিধিতে কারাদ-ের বিধান রয়েছে।

 

জার্মানিতেও ফেডারেল প্রেসিডেন্টকে প্রকাশ্যে অপমানের বিরুদ্ধে বিশেষ শাস্তির বিধান রয়েছে। আবার সিঙ্গাপুরে জনস্বার্থ, নির্বাচন বা জনশান্তিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারেÑএমন জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য অনলাইনে ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে। তবে অন্য দেশের আইন হুবহু অনুসরণ করাই সমাধান নয়। বাংলাদেশের বাস্তবতা, সংবিধান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজস্ব কার্যকর আইন প্রণয়নই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

 

বাংলাদেশের জন্য এখনই প্রয়োজন সুস্পষ্ট আইন বাংলাদেশে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অপরাধ মোকাবিলায় ইতোমধ্যে আইনি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরও স্পষ্ট ও কার্যকর বিধান প্রয়োজন। বিশেষ করে রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে অও-নির্মিত ভুয়া ভিডিও, অডিও বা ছবি তৈরি ও প্রচারের ক্ষেত্রে আইনের আওতা, অপরাধের সংজ্ঞা, তদন্তের পদ্ধতি এবং শাস্তির বিষয়টি সুস্পষ্ট হওয়া দরকার।

 

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নিজের দলের নেতাকে নিয়ে কটূক্তি হলে আমরা প্রতিবাদ করি, কিন্তু প্রতিপক্ষের নেতার বিরুদ্ধে একই ধরনের অপপ্রচার হলে অনেক সময় সেটিকে রাজনৈতিক বিনোদন হিসেবে দেখি। এই দ্বিমুখী নীতি বন্ধ করতে হবে। আজ যে প্রযুক্তি দিয়ে একজন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে মিথ্যা ভিডিও তৈরি হচ্ছে, আগামীকাল একই প্রযুক্তি অন্য দলের নেতা, সাংবাদিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধেও ব্যবহার হতে পারে। অতএব, ডিপফেকের বিরুদ্ধে অবস্থান কোনো ব্যক্তি বা দলের পক্ষে অবস্থান নয়; এটি সত্যের পক্ষে অবস্থান।

 

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুরুতর এআই ডিপফেক, পরিকল্পিত অপপ্রচার ও ডিজিটাল চরিত্রহননের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করুন। প্রয়োজনে প্রযুক্তিগত ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করুন। অপরাধ প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় অবস্থান কিংবা ক্ষমতার প্রভাব বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনা। একই সঙ্গে এটিও নিশ্চিত করতে হবে, এই আইন যেন প্রকৃত রাজনৈতিক সমালোচনা, ব্যঙ্গ, মতপ্রকাশ কিংবা সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে অযথা সীমাবদ্ধ করার হাতিয়ার না হয়।