কলারোয়ার ৫০০ বছরের প্রাচীন কোঠাবাড়ি নিয়ে কিছু কথা
জুলফিকার আলী
সাতক্ষীরার কলারোয়ায় অবস্থিত ৫০০ বছরের পুরোনো এক প্রাচীন কোঠাবাড়িকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন। রোগবালাই থেকে মুক্তি ও মনের আশা পূরণের (মানত) বিশ্বাসে প্রতি শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হিন্দু ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের শত শত মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন এই ঐতিহাসিক স্থানে। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েও যারা সুস্থ হননি, তাদের অনেকেরই দাবি—এখানে এসে তারা অলৌকিক রোগমুক্তি লাভ করেছেন। সাধারণ মানুষের এই উপচে পড়া ভিড় এখন স্থানীয়দের অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
বটবৃক্ষ, কালো পাথর ও অলৌকিক বিশ্বাস: সরেজমিনে দেখা যায়, এই প্রাচীন কোঠাবাড়িটি ঘিরে রয়েছে ৫০০ বছরের পুরোনো এক বিশাল বটগাছ। কোঠার ঠিক সামনেই রয়েছে দুটি অলৌকিক কালো পাথর, যা নিয়ে জনমনে রয়েছে তীব্র কৌতূহল। স্থানীয়দের অনেকের ধারণা, পাথর দুটি মূল্যবান কষ্টিপাথর হতে পারে। আগত দর্শনার্থীরা এই পাথরের ওপর পানি ও তেল ঢেলে রাখেন এবং পরে তা রোগমুক্তির আশায় সেবন করছেন।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হিসেবে ভক্তরা দাবি করছেন, তারা যখন পাথরের ওপর কোনো খালি মাদুলি রাখছেন, তখন মুহূর্তের মধ্যেই সেটি অলৌকিক উপায়ে ভরে যাচ্ছে। এই বিশ্বাস থেকে প্রতি শুক্রবার এখানে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনেকেই কোঠার সামনে মানত পূরণের উদ্দেশ্যে রান্নাবান্না ও খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করেন। আবার কেউ কেউ মানত হিসেবে হাঁস, মুরগি কিংবা ছাগল এনে এখানে ছেড়ে দেন।
অলৌকিক ইতিহাস ও লোকমুখে প্রচলিত গল্প: কোঠাবাড়িটিকে ঘিরে স্থানীয়দের মাঝে নানা রহস্যময় লোককাহিনী প্রচলিত রয়েছে। এলাকার প্রবীণ মুরব্বিদের মতে, এই কোঠাবাড়িটি অলৌকিকভাবে মাত্র এক রাতের মধ্যে তৈরি হয়েছিল। তবে ঠিক কী কারণে এবং কার দ্বারা এটি নির্মিত হয়েছিল, তার সঠিক ইতিহাস কেউ বলতে পারেন না।
এই কোঠার পাথর নিয়ে এলাকায় একটি গা শিউরে ওঠা গল্প প্রচলিত আছে। কথিত আছে, অতীতে এক ব্যক্তি এই কোঠা থেকে একটি কালো পাথর চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পাথরটি চুরির পর পরই রহস্যজনকভাবে সেই ব্যক্তির মৃত্যু হয়। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত কেউ ভুল করেও এই পাথর স্পর্শ বা চুরির কথা মুখে আনেন না।
সেবামূলক অবকাঠামো ও সংরক্ষণের দাবি: প্রতি শুক্রবার শত শত মানুষের সমাগম ঘটলেও এখানে আগত দর্শনার্থীদের জন্য ন্যূনতম কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। খোলা আকাশের নিচে দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসুস্থ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এলাকাবাসী ও আগত ভক্তদের দাবি—জরুরি ভিত্তিতে এখানে একটি টিনশেড ঘর, পর্যাপ্ত শৌচাগার (বাথরুম) এবং বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য একটি নলকূপ (পানির কল) স্থাপন করা প্রয়োজন।
এই ঐতিহাসিক ও প্রাচীন স্থাপনাটিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং এর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে কোঠাটি সরকারিভাবে সংরক্ষণের জোর দাবি তুলেছেন এলাকাবাসী। একই সাথে, সামগ্রিক বিষয়টি তদারকি ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা উপজেলা প্রশাসনের জরুরি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। লেখক: গণমাধ্যমকর্মী









