সাতক্ষীরা সদরের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও দক্ষতা উন্নয়নের বাস্তবচিত্র
সম্ভাবনা, সংকট ও ভবিষ্যৎ পথরেখা
শেখ সিদ্দিকুর রহমান
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জনপদ সাতক্ষীরা সদর উপজেলা আজ বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। একসময় কৃষিনির্ভর অঞ্চল হিসেবে পরিচিত এই জনপদ বর্তমানে কৃষি, মৎস্য, আমদানি-রপ্তানি, ক্ষুদ্র শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, দুগ্ধ শিল্প এবং প্রবাসী আয়ের সমন্বয়ে এক নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণ করছে। বিশেষ করে ভোমরা স্থলবন্দর, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, আধুনিক কৃষির বিস্তার এবং তরুণদের তথ্যপ্রযুক্তিমুখী আগ্রহ সাতক্ষীরা সদরের অর্থনীতিকে নতুন গতিশীলতা দিয়েছে।
সম্প্রতি পরিচালিত এক বিস্তৃত জরিপে সাতক্ষীরা সদরের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিল্প কাঠামো, দক্ষতা উন্নয়ন, যুবসমাজের বাস্তবতা এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা নিয়ে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা কেবল একটি উপজেলার অর্থনৈতিক চিত্র নয়; বরং সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সম্ভাবনা ও সংকটেরও প্রতিফলন।
বর্তমানে সাতক্ষীরা সদরের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে প্রধানত চারটি বড় খাতে ভাগ করা যায়Ñ ১. ব্যবসা-বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানি, ২. মৎস্য ও কৃষিভিত্তিক উৎপাদন, ৩. ফল চাষ ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ৪. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প
সাতক্ষীরা সদরের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি বর্তমানে ভোমরা স্থলবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাণিজ্য ব্যবস্থা। ভারতের কলকাতার সাথে দূরত্ব তুলনামূলক কম হওয়ায় এই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি ও রপ্তানি হচ্ছে।
পাথর, পেঁয়াজ, ফল, শিল্প কাঁচামাল, খাদ্যপণ্য, রাসায়নিক দ্রব্যসহ নানা ধরনের পণ্য প্রতিনিয়ত এই বন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে। এর ফলে সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসা, কাস্টমস ক্লিয়ারিং, ট্রাক পরিবহন, গুদামজাতকরণ, শ্রমিক কার্যক্রম এবং লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনায় বিশাল কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।
শুধু সরাসরি ব্যবসায়ী নয়, বন্দরকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার শ্রমিক, পরিবহন কর্মী, হোটেল ব্যবসায়ী, দোকানদার, হিসাবরক্ষক, দালাল, সহকারী এবং অস্থায়ী শ্রমজীবী মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন।
ভোমরা স্থলবন্দর এখন কেবল একটি সীমান্তবন্দর নয়; এটি সাতক্ষীরা সদরের অর্থনীতির স্পন্দিত হৃদপি-।
সাতক্ষীরা সদর এখনও একটি কৃষি সমৃদ্ধ অঞ্চল। তবে কৃষির ধরন এখন অনেকটাই বদলে গেছে। আগে যেখানে শুধুই ধান চাষ ছিল মূল ভরসা, এখন সেখানে বাণিজ্যিক কৃষি, ফল চাষ এবং উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে।
লবণাক্ততা সহনশীল বোরো ও আমন ধানের চাষ এখানে ব্যাপকভাবে হয়। পাশাপাশি শীতকালীন সবজি, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন ও বারোমাসি সবজি উৎপাদনে এখানকার কৃষকরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, সাতক্ষীরা সদর দেশের অন্যতম উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।
সাতক্ষীরার আম এখন দেশের গ-ি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও সুনাম অর্জন করেছে। বাংলাদেশ থেকে প্রথম যে আম ইউরোপে রপ্তানি হয়েছিল, তার অন্যতম উৎস ছিল সাতক্ষীরা। ল্যাংড়া, হিমসাগর, আম্রপালি, ফজলি ও গোপালভোগ আম এখন স্থানীয় অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি। বর্তমানে শুধু আম উৎপাদন নয়, আম প্যাকেজিং, গ্রেডিং, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং রপ্তানিভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থার সাথে হাজারো মানুষ জড়িত। আম মৌসুমে গ্রামাঞ্চলে এক ধরনের উৎসবমুখর কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।
বাগান পরিচর্যা, ফল পাড়া, ঝুড়ি তৈরি, গাড়ি পরিবহন, বাজারজাতকরণ—সব মিলিয়ে এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক শৃঙ্খল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরিষা চাষের পাশাপাশি কাঠের বাক্স বসিয়ে বাণিজ্যিকভাবে মধু সংগ্রহের প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অনেক তরুণ এখন আধুনিক মৌচাষে যুক্ত হচ্ছেন। সরিষা ফুলের মধু দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে। এটি একদিকে কৃষকের অতিরিক্ত আয় নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করছে।
সাতক্ষীরা বলতেই একসময় যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হতো, তা হলো চিংড়ি শিল্প। “হোয়াইট গোল্ড” নামে পরিচিত এই খাত এখনও গুরুত্বপূর্ণ হলেও গত কয়েক বছরে এর অবস্থা কিছুটা সংকুচিত হয়েছে। বাগদা ও গলদা চিংড়ি চাষ এখনও বহু মানুষের জীবিকার উৎস। সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ছোট-বড় অসংখ্য ঘের রয়েছে। এছাড়া মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, ডিপো, বরফকল এবং পরিবহন ব্যবস্থার সাথে বিপুল জনগোষ্ঠী জড়িত। তবে গত কয়েক বছরে ভাইরাস আক্রমণ, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, পানির গুণগত মানের অবনতি এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে অনেক চাষি লোকসানের মুখে পড়েছেন।
বিশেষ করে ভিয়েতনাম, ভারত ও ইকুয়েডরের তুলনামূলক কম দামের চিংড়ির সাথে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের বাগদা চিংড়ি পিছিয়ে পড়ছে। অনেক চাষি এখন চিংড়ির পরিবর্তে সাদা মাছ, কাঁকড়া অথবা ধান চাষের দিকে ঝুঁকছেন। গত পাঁচ বছরে সাতক্ষীরা সদরে সবচেয়ে দ্রুত বিকাশমান খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দুগ্ধ শিল্প।
বর্তমানে অসংখ্য আধুনিক ডেইরি খামার গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হচ্ছে।
দুধ উৎপাদন, সংগ্রহ, পরিবহন, গোখাদ্য তৈরি, ভেটেরিনারি সেবা এবং দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে এই খাত বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণও এই খাতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাতক্ষীরা বিসিক শিল্পনগরী স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। রাইস মিল, প্লাস্টিক পণ্য, হালকা প্রকৌশল, কাঠের কাজ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কুটির শিল্পের মাধ্যমে স্থানীয় উদ্যোক্তারা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছেন।
ধান উৎপাদন বেশি হওয়ায় এখানে স্বয়ংক্রিয় রাইস মিল গড়ে উঠেছে। এছাড়া ফল ও সবজি সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা কৃষকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাড়িয়েছে। বর্তমানে সাতক্ষীরা সদরের কর্মসংস্থানের মূল ভিত্তি তিনটিÑ কৃষি ও মৎস্য, বন্দর ও বাণিজ্য ও প্রবাসী আয়। ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, ইজিবাইক, মোটরসাইকেলভিত্তিক পরিবহন খাতে হাজারো যুবক কর্মরত। শহর সম্প্রসারণের ফলে রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, টাইলস মিস্ত্রি ও কাঠমিস্ত্রিদের চাহিদা দ্রুত বেড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কাজ এখন সাতক্ষীরা সদরের তরুণদের নতুন স্বপ্ন। অনেক তরুণ ঘরে বসে গ্রাফিক ডিজাইন, ডিজিটাল বিপণন, তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তা এবং অনলাইনভিত্তিক কাজ করছেন।
এই খাত এখন “ডিজিটাল রেমিট্যান্স” হিসেবে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে। জরিপ অনুযায়ী, সাতক্ষীরা সদরের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ যুবক-যুবতী বর্তমানে কর্মসংস্থান, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। এটি উদ্বেগজনক হলেও সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করলে এই জনগোষ্ঠীকেই দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব।
স্থানীয় নিয়োগকর্তারা প্রধানত চারটি দক্ষতা ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছেনÑ ১. তথ্যপ্রযুক্তি দক্ষতার অভাব, ২. যোগাযোগ ও ভাষাগত দুর্বলতা, ৩. কারিগরি জ্ঞানের ঘাটতি,
৪. আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বন্দর ব্যবস্থাপনায় বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাব
বিশেষ করে আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনা, ডিজিটাল বিপণন, গ্রাহকসেবা এবং ইংরেজি যোগাযোগে দক্ষ কর্মীর সংকট প্রকট। বর্তমানে নারীদের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেÑ তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন ব্যবসা, বিউটি ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা, হস্তশিল্প ও কুটির শিল্প, ডেইরি ও প্রাণিসম্পদ ও স্বাস্থ্যসেবা।
ঘরে বসে আয় করা যায়—এমন পেশাগুলোর প্রতি নারীদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। একসময় সুলতানপুর চামড়া বাজার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বড় কেন্দ্র ছিল। কিন্তু ট্যানারি স্থানান্তর, মূল্য সংকট ও বকেয়া অর্থের কারণে এই খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্লাস্টিক ও ধাতব পণ্যের আগ্রাসনে ঐতিহ্যবাহী মাটির শিল্প প্রায় বিলুপ্তির পথে।
চীন থেকে আসা কমদামী কাপড় এবং বড় ব্র্যান্ডের বাজার দখলের ফলে স্থানীয় তাঁত ও হোসিয়ারি শিল্প টিকে থাকার সংগ্রাম করছে। সাতক্ষীরা উপকূলীয় জেলা হওয়ায় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও বন্যা এখানকার মানুষের নিত্য বাস্তবতা। এই পরিস্থিতিতে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কাজ, আধুনিক ডেইরি খামার এবং বন্দরভিত্তিক ব্যবসাকে তুলনামূলক দুর্যোগ সহনশীল খাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সাতক্ষীরা সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিগরি ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ পরিচালনা করছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ কর্মী তৈরির জন্য শিক্ষানবিশ কর্মসূচিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সম্ভাবনার সাতক্ষীরা, প্রস্তুতির এখনই সময়। সাতক্ষীরা সদর আজ পরিবর্তনের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে কৃষি, মৎস্য, বন্দর ও ব্যবসা এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে; অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তি, ডেইরি শিল্প, আধুনিক কৃষি ও তরুণ উদ্যোক্তারা তৈরি করছেন নতুন ভবিষ্যৎ। তবে এই সম্ভাবনাকে টেকসই রূপ দিতে হলে প্রয়োজনÑ আধুনিক দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ, বাজার সংযোগ বৃদ্ধি, জলবায়ু সহনশীল অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ।
সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে সাতক্ষীরা সদর কেবল একটি সীমান্তবর্তী উপজেলা হিসেবেই নয়, বরং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে।
লেখক: সাবেক ব্যাংকার









