মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

সাতক্ষীরা সদরের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও দক্ষতা উন্নয়নের বাস্তবচিত্র

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬, ৯:৫৩ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরা সদরের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও দক্ষতা উন্নয়নের বাস্তবচিত্র

সম্ভাবনা, সংকট ও ভবিষ্যৎ পথরেখা

শেখ সিদ্দিকুর রহমান

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জনপদ সাতক্ষীরা সদর উপজেলা আজ বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। একসময় কৃষিনির্ভর অঞ্চল হিসেবে পরিচিত এই জনপদ বর্তমানে কৃষি, মৎস্য, আমদানি-রপ্তানি, ক্ষুদ্র শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, দুগ্ধ শিল্প এবং প্রবাসী আয়ের সমন্বয়ে এক নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণ করছে। বিশেষ করে ভোমরা স্থলবন্দর, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, আধুনিক কৃষির বিস্তার এবং তরুণদের তথ্যপ্রযুক্তিমুখী আগ্রহ সাতক্ষীরা সদরের অর্থনীতিকে নতুন গতিশীলতা দিয়েছে।

সম্প্রতি পরিচালিত এক বিস্তৃত জরিপে সাতক্ষীরা সদরের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিল্প কাঠামো, দক্ষতা উন্নয়ন, যুবসমাজের বাস্তবতা এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা নিয়ে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা কেবল একটি উপজেলার অর্থনৈতিক চিত্র নয়; বরং সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সম্ভাবনা ও সংকটেরও প্রতিফলন।

বর্তমানে সাতক্ষীরা সদরের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে প্রধানত চারটি বড় খাতে ভাগ করা যায়Ñ ১. ব্যবসা-বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানি, ২. মৎস্য ও কৃষিভিত্তিক উৎপাদন, ৩. ফল চাষ ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ৪. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প

সাতক্ষীরা সদরের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি বর্তমানে ভোমরা স্থলবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাণিজ্য ব্যবস্থা। ভারতের কলকাতার সাথে দূরত্ব তুলনামূলক কম হওয়ায় এই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি ও রপ্তানি হচ্ছে।

পাথর, পেঁয়াজ, ফল, শিল্প কাঁচামাল, খাদ্যপণ্য, রাসায়নিক দ্রব্যসহ নানা ধরনের পণ্য প্রতিনিয়ত এই বন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে। এর ফলে সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসা, কাস্টমস ক্লিয়ারিং, ট্রাক পরিবহন, গুদামজাতকরণ, শ্রমিক কার্যক্রম এবং লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনায় বিশাল কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।

শুধু সরাসরি ব্যবসায়ী নয়, বন্দরকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার শ্রমিক, পরিবহন কর্মী, হোটেল ব্যবসায়ী, দোকানদার, হিসাবরক্ষক, দালাল, সহকারী এবং অস্থায়ী শ্রমজীবী মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন।

ভোমরা স্থলবন্দর এখন কেবল একটি সীমান্তবন্দর নয়; এটি সাতক্ষীরা সদরের অর্থনীতির স্পন্দিত হৃদপি-।
সাতক্ষীরা সদর এখনও একটি কৃষি সমৃদ্ধ অঞ্চল। তবে কৃষির ধরন এখন অনেকটাই বদলে গেছে। আগে যেখানে শুধুই ধান চাষ ছিল মূল ভরসা, এখন সেখানে বাণিজ্যিক কৃষি, ফল চাষ এবং উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে।

লবণাক্ততা সহনশীল বোরো ও আমন ধানের চাষ এখানে ব্যাপকভাবে হয়। পাশাপাশি শীতকালীন সবজি, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন ও বারোমাসি সবজি উৎপাদনে এখানকার কৃষকরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, সাতক্ষীরা সদর দেশের অন্যতম উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।

সাতক্ষীরার আম এখন দেশের গ-ি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও সুনাম অর্জন করেছে। বাংলাদেশ থেকে প্রথম যে আম ইউরোপে রপ্তানি হয়েছিল, তার অন্যতম উৎস ছিল সাতক্ষীরা। ল্যাংড়া, হিমসাগর, আম্রপালি, ফজলি ও গোপালভোগ আম এখন স্থানীয় অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি। বর্তমানে শুধু আম উৎপাদন নয়, আম প্যাকেজিং, গ্রেডিং, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং রপ্তানিভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থার সাথে হাজারো মানুষ জড়িত। আম মৌসুমে গ্রামাঞ্চলে এক ধরনের উৎসবমুখর কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।

 

বাগান পরিচর্যা, ফল পাড়া, ঝুড়ি তৈরি, গাড়ি পরিবহন, বাজারজাতকরণ—সব মিলিয়ে এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক শৃঙ্খল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরিষা চাষের পাশাপাশি কাঠের বাক্স বসিয়ে বাণিজ্যিকভাবে মধু সংগ্রহের প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অনেক তরুণ এখন আধুনিক মৌচাষে যুক্ত হচ্ছেন। সরিষা ফুলের মধু দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে। এটি একদিকে কৃষকের অতিরিক্ত আয় নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করছে।

সাতক্ষীরা বলতেই একসময় যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হতো, তা হলো চিংড়ি শিল্প। “হোয়াইট গোল্ড” নামে পরিচিত এই খাত এখনও গুরুত্বপূর্ণ হলেও গত কয়েক বছরে এর অবস্থা কিছুটা সংকুচিত হয়েছে। বাগদা ও গলদা চিংড়ি চাষ এখনও বহু মানুষের জীবিকার উৎস। সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ছোট-বড় অসংখ্য ঘের রয়েছে। এছাড়া মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, ডিপো, বরফকল এবং পরিবহন ব্যবস্থার সাথে বিপুল জনগোষ্ঠী জড়িত। তবে গত কয়েক বছরে ভাইরাস আক্রমণ, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, পানির গুণগত মানের অবনতি এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে অনেক চাষি লোকসানের মুখে পড়েছেন।

বিশেষ করে ভিয়েতনাম, ভারত ও ইকুয়েডরের তুলনামূলক কম দামের চিংড়ির সাথে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের বাগদা চিংড়ি পিছিয়ে পড়ছে। অনেক চাষি এখন চিংড়ির পরিবর্তে সাদা মাছ, কাঁকড়া অথবা ধান চাষের দিকে ঝুঁকছেন। গত পাঁচ বছরে সাতক্ষীরা সদরে সবচেয়ে দ্রুত বিকাশমান খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দুগ্ধ শিল্প।
বর্তমানে অসংখ্য আধুনিক ডেইরি খামার গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হচ্ছে।

 

দুধ উৎপাদন, সংগ্রহ, পরিবহন, গোখাদ্য তৈরি, ভেটেরিনারি সেবা এবং দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে এই খাত বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণও এই খাতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাতক্ষীরা বিসিক শিল্পনগরী স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। রাইস মিল, প্লাস্টিক পণ্য, হালকা প্রকৌশল, কাঠের কাজ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কুটির শিল্পের মাধ্যমে স্থানীয় উদ্যোক্তারা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছেন।

 

ধান উৎপাদন বেশি হওয়ায় এখানে স্বয়ংক্রিয় রাইস মিল গড়ে উঠেছে। এছাড়া ফল ও সবজি সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা কৃষকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাড়িয়েছে। বর্তমানে সাতক্ষীরা সদরের কর্মসংস্থানের মূল ভিত্তি তিনটিÑ কৃষি ও মৎস্য, বন্দর ও বাণিজ্য ও প্রবাসী আয়। ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, ইজিবাইক, মোটরসাইকেলভিত্তিক পরিবহন খাতে হাজারো যুবক কর্মরত। শহর সম্প্রসারণের ফলে রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, টাইলস মিস্ত্রি ও কাঠমিস্ত্রিদের চাহিদা দ্রুত বেড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কাজ এখন সাতক্ষীরা সদরের তরুণদের নতুন স্বপ্ন। অনেক তরুণ ঘরে বসে গ্রাফিক ডিজাইন, ডিজিটাল বিপণন, তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তা এবং অনলাইনভিত্তিক কাজ করছেন।

এই খাত এখন “ডিজিটাল রেমিট্যান্স” হিসেবে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে। জরিপ অনুযায়ী, সাতক্ষীরা সদরের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ যুবক-যুবতী বর্তমানে কর্মসংস্থান, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। এটি উদ্বেগজনক হলেও সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করলে এই জনগোষ্ঠীকেই দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব।
স্থানীয় নিয়োগকর্তারা প্রধানত চারটি দক্ষতা ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছেনÑ ১. তথ্যপ্রযুক্তি দক্ষতার অভাব, ২. যোগাযোগ ও ভাষাগত দুর্বলতা, ৩. কারিগরি জ্ঞানের ঘাটতি,

 

৪. আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বন্দর ব্যবস্থাপনায় বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাব
বিশেষ করে আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনা, ডিজিটাল বিপণন, গ্রাহকসেবা এবং ইংরেজি যোগাযোগে দক্ষ কর্মীর সংকট প্রকট। বর্তমানে নারীদের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেÑ তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন ব্যবসা, বিউটি ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা, হস্তশিল্প ও কুটির শিল্প, ডেইরি ও প্রাণিসম্পদ ও স্বাস্থ্যসেবা।
ঘরে বসে আয় করা যায়—এমন পেশাগুলোর প্রতি নারীদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। একসময় সুলতানপুর চামড়া বাজার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বড় কেন্দ্র ছিল। কিন্তু ট্যানারি স্থানান্তর, মূল্য সংকট ও বকেয়া অর্থের কারণে এই খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্লাস্টিক ও ধাতব পণ্যের আগ্রাসনে ঐতিহ্যবাহী মাটির শিল্প প্রায় বিলুপ্তির পথে।

চীন থেকে আসা কমদামী কাপড় এবং বড় ব্র্যান্ডের বাজার দখলের ফলে স্থানীয় তাঁত ও হোসিয়ারি শিল্প টিকে থাকার সংগ্রাম করছে। সাতক্ষীরা উপকূলীয় জেলা হওয়ায় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও বন্যা এখানকার মানুষের নিত্য বাস্তবতা। এই পরিস্থিতিতে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কাজ, আধুনিক ডেইরি খামার এবং বন্দরভিত্তিক ব্যবসাকে তুলনামূলক দুর্যোগ সহনশীল খাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সাতক্ষীরা সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিগরি ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ পরিচালনা করছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ কর্মী তৈরির জন্য শিক্ষানবিশ কর্মসূচিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সম্ভাবনার সাতক্ষীরা, প্রস্তুতির এখনই সময়। সাতক্ষীরা সদর আজ পরিবর্তনের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে কৃষি, মৎস্য, বন্দর ও ব্যবসা এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে; অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তি, ডেইরি শিল্প, আধুনিক কৃষি ও তরুণ উদ্যোক্তারা তৈরি করছেন নতুন ভবিষ্যৎ। তবে এই সম্ভাবনাকে টেকসই রূপ দিতে হলে প্রয়োজনÑ আধুনিক দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ, বাজার সংযোগ বৃদ্ধি, জলবায়ু সহনশীল অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ।

সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে সাতক্ষীরা সদর কেবল একটি সীমান্তবর্তী উপজেলা হিসেবেই নয়, বরং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে।

লেখক: সাবেক ব্যাংকার

 

 

 

 

 

Ads small one

এআই ‘ভয়েস ক্লোনিং’ প্রতারণা থেকে বাঁচবেন কীভাবে?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬, ১২:৪০ পূর্বাহ্ণ
এআই ‘ভয়েস ক্লোনিং’ প্রতারণা থেকে বাঁচবেন কীভাবে?

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার এক মা চলতি মাসে তার মেয়ের কান্নাকাটি ও বিপদে পড়ার একটি ফোন কল পেয়ে কয়েক হাজার ডলার খুইয়েছেন। যদিও পরে তিনি বুঝতে পারেন যে, এটি আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা একটি নকল বা ক্লোন করা কণ্ঠস্বর ছিল। তিনি একা নন, হালের ‘ভয়েস ক্লোনিং’ বা কণ্ঠ নকল করার প্রতারণার শিকার অনেকেই হচ্ছেন। বর্তমানের এআই টুলগুলো ব্যবহার করে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের অডিও রেকর্ড থেকেই যেকোনও মানুষের হুবহু কণ্ঠের অবিকল নকল সংস্করণ তৈরি করা সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ভয়েস ক্লোনিং, এআই-জেনারেটেড ফিশিং ইমেইল এবং রোমান্স স্ক্যামসহ এআই-সম্পর্কিত জালিয়াতির কারণে আমেরিকানরা ৮৯ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ হারিয়েছেন। জালিয়াতি চক্র পরিবার ও বন্ধু-বান্ধব থেকে শুরু করে সহকর্মী বা পেশাদার সেবা প্রদানকারীদের কণ্ঠও নকল করছে।

যুক্তরাজ্যের স্টার্লিং ব্যাংক এবং কমনওয়েলথ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যে তাদের গ্রাহকদের এই ভয়েস ক্লোনিং জালিয়াতি নিয়ে সতর্ক করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই-এর তৈরি কণ্ঠস্বর এখন এতটাই বাস্তবসম্মত যে সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল মানুষের কণ্ঠ থেকে তা আলাদা করা প্রায় অসম্ভব।

এআই-জেনারেটেড মিডিয়া বিশেষজ্ঞ হেনরি আজডার বলেন, সাধারণ মানুষের কাছে এটা ধরা পড়ার আশা করা মোটেও ঠিক নয়। আমি নিজেই এটা আলাদা করতে হিমশিম খাই, আর বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই তা-ই হয়।

কীভাবে কাজ করে এআই ভয়েস স্ক্যাম?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা এর আগে করা কোনও প্রতারণামূলক ফোন কল থেকে গোপনে রেকর্ড করা সামান্য একটু অডিও ব্যবহার করেই প্রতারকরা যে কারও কণ্ঠের এআই রেপ্লিকা তৈরি করে ফেলে। এরপর তারা ভুক্তভোগীর কোনও প্রিয়জন সেজে ফোন করে দাবি করে যে সে অপহরণের শিকার হয়েছে কিংবা জেলে আছে এবং তাকে মুক্ত করতে জরুরি ভিত্তিতে টাকা পাঠাতে হবে।

ফিলাডেলফিয়ার একজন আইনজীবী গ্যারি শিল্ডহর্ন তার ছেলের কণ্ঠ নকল করা এমন এক স্ক্যামের শিকার হয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, তখন চিন্তা করার কোনও সময় ছিল না। আমার মাথায় কেবল এটাই ঘুরছিল যে আমার ছেলেকে সাহায্য করতে হবে, সে বিপদে পড়েছে।

কিছু ক্ষেত্রে এটি কেবল একটি একক রেকর্ড করা বার্তা নয়, বরং আরও জটিল হতে পারে। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা প্রতারকরা ‘টেক্সট-টু-স্পিচ’ টুল বা ‘ভয়েস স্কিনিং’ ব্যবহার করে রিয়েল-টাইমে জালিয়াতের কণ্ঠকে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির কণ্ঠে রূপান্তর করে ফেলে। এর ফলে হ্যাকাররা সরাসরি ভুক্তভোগীর সঙ্গে সাধারণ মানুষের মতো কথোপকথন চালিয়ে যেতে পারে, যা প্রতারণাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। তা ছাড়া, ‘কলার আইডি স্পুফিং’ কৌশলের মাধ্যমে তারা পরিচিত কোনও নম্বর থেকেও কলটি করতে পারে। ফলে আপনার ফোনে মায়ের নম্বর ভেসে উঠলেই যে ওপাশে আপনার মা-ই আছেন, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

এই প্রতারণা থেকে বাঁচার উপায়

আগে মনে করা হতো, ফোনে অদ্ভুত কোনও বিরতি বা কণ্ঠের ওঠানামা থাকলে তা এআই-এর তৈরি কণ্ঠ হতে পারে। কিন্তু এআই-এর আধুনিক অগ্রগতির ফলে এই লক্ষণগুলো এখন আর নাও থাকতে পারে। ইউসি বার্কলের অধ্যাপক এবং গেটরিয়েল সিকিউরিটির প্রধান বিজ্ঞানী হ্যানি ফরিদ বলেন, ওপাশের কণ্ঠটি আসল কি না তা নিশ্চিত করার চেষ্টা না করে বরং জালিয়াতির সাধারণ লক্ষণগুলোর দিকে খেয়াল রাখা উচিত। যেমন, ওপাশের ব্যক্তিটি কি কোনও নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে তাড়াহুড়ো করছে? সে কি এই ঘটনাটি অন্য কাউকে জানাতে নিষেধ করছে? সে কি অস্বাভাবিক উপায়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাঠাতে বলছে? বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের প্রশ্নগুলো মাথায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।

এই ধরনের ফোন কল পেলে তৎক্ষণাৎ অন্য কোনও উপায়ে, যেমন, অন্য কোনও ফোনে ক্ষুদ্রে বার্তা বা টেক্সট মেসেজ পাঠিয়ে বা সেই প্রিয়জন যেখানে থাকতে পারে এমন কারও সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য যাচাই করা উচিত। ক্যালিফোর্নিয়ার সেই ভুক্তভোগী মা ডেবোরা ডেল মাস্ত্রো জানান, প্রতারকদের টাকা পাঠানোর পরই কেবল তিনি তার মেয়েকে ফোন করেছিলেন। ফোন করতেই মেয়ে সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করে এবং জানায় যে সে শান্তিতে অফিসেই কাজ করছে!

এ ছাড়া পরিবার বা সহকর্মীদের মধ্যে একটি সুরক্ষামূলক ‘কোড ওয়ার্ড’ বা গোপন শব্দ ঠিক করে রাখা যেতে পারে, যা কেবল সেই পরিবারের মানুষেরাই জানবে এবং যা ইন্টারনেটে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কোনও বিপদের সময় জরুরি ফোন কলে পরিচয় নিশ্চিত করতে এই কোড জানতে চাওয়া যেতে পারে।

সূত্র: সিএনএন

রুশ হামলার পর ট্রাম্পের কাছে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র চাইলেন জেলেনস্কি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ
রুশ হামলার পর ট্রাম্পের কাছে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র চাইলেন জেলেনস্কি

ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র চেয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।

মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেলেনস্কি লিখেছেন, এটি একটি বড় ধরনের হামলা এবং রাশিয়ার একেবারে স্পষ্ট ঘোষণা। ইউক্রেনকে যদি ব্যালিস্টিক ও অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে সুরক্ষা দেওয়া না হয়, তাহলে এসব হামলা চলতেই থাকবে। ইউরোপের নিজস্ব অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন। আর প্যাট্রিয়টের মতো ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা অবশ্যই দরকার।

ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, রাতভর দেশটিতে ৭৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৬৫৬টি ড্রোন ছুড়েছে রাশিয়া। এর মধ্যে আটটি ছিল দ্রুতগতির জিরকন ক্ষেপণাস্ত্র। প্রধান লক্ষ্য ছিল রাজধানী কিয়েভ, মধ্যাঞ্চলের ডিনিপ্রো ও জাপোরিজ্জিয়া এবং পূর্বাঞ্চলের পোলতাভা ও খারকিভ।

জেলেনস্কি দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসছে। শত্রুদের দ্রুতগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে এটিই ইউক্রেনের একমাত্র কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। মঙ্গলবারের হামলায় ইউক্রেন প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করলেও ৩০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।

গত সপ্তাহে জেলেনস্কি সরাসরি হোয়াইট হাউস ও কংগ্রেসের কাছে সহায়তা চেয়ে চিঠি পাঠান। তিনি প্যাট্রিয়টকে মানুষের জীবন রক্ষার জন্য অত্যাবশ্যকীয় একটি উপকরণ বলে বর্ণনা করেন।

তবে এখন পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন তার এ অনুরোধে সাড়া দেয়নি। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের সময় শত শত ব্যয়বহুল প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল।

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেন, সর্বশেষ হামলা প্রমাণ করে ভ্লাদিমির পুতিনের বিকল্প ফুরিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেন দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করে রাশিয়ার তেল শোধনাগার, বন্দর ও অধিকৃত দক্ষিণ ইউক্রেন ও ক্রিমিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থলপথে হামলা চালিয়েছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

পাঁচবার ট্রাম্পের ধমক খেয়ে কী করেছিলেন নেতানিয়াহু

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ
পাঁচবার ট্রাম্পের ধমক খেয়ে কী করেছিলেন নেতানিয়াহু

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পুরো রাজনৈতিক ক্যারিয়ারই টিকে থাকার লড়াইয়ের এক অদ্ভুত গল্প। দুর্নীতি মামলার গ্যাঁড়াকল, মিত্রদের ত্যাগ কিংবা আদালতের নিন্দা; কোনো কিছুই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেনি। তার টিকে থাকার মূল সঞ্জীবনী শক্তি হলো যুদ্ধ। এই যুদ্ধ কোনও বিজয় বা নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরানের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত আসা ধ্বংসের হুমকিকে জিইয়ে রাখা। যতদিন ইসরায়েল একের পর এক নৃশংস হামলা চালিয়ে যাবে, ততদিনই নেতানিয়াহুর প্রধানমন্ত্রিত্ব নিশ্চিত।

কারণ, যেই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরে আসবে, ঠিক সেই মুহূর্তে নেতানিয়াহুকে তার নিজের দেশের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। এই একটি হিসাব দিয়েই সবকিছু ব্যাখ্যা করা সম্ভব—কেন যুদ্ধবিরতি বারবার ভেঙে পড়ে, কেন চুক্তিগুলো কর্পূরের মতো উড়ে যায় এবং কেন মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা বারবার খালি হাতে ফিরে আসেন। হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে পাঁচবার তীব্র ধমক খাওয়ার পরও নেতানিয়াহু প্রতিবারই ট্রাম্পকে বোকা বানিয়েছেন। কারণ, জেল এড়াতে নেতানিয়াহুর এই যুদ্ধগুলো চালিয়ে যাওয়া বড্ড প্রয়োজন।

নিচে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার সেই পাঁচ দ্বন্দ্বের বিবরণ তুলে ধরা হলো:

১ জুন, ২০২৬: ‘তুমি কি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছ?’

গত ১ জুন দুই নেতার মধ্যকার সব কূটনৈতিক সৌজন্য ভেঙে পড়ে। ইসরায়েল বৈরুতে বোমা হামলার হুমকি দিলে ইরান আলোচনা থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ফোন করেন, যাকে মার্কিন কর্মকর্তারা ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্যতম ‘সবচেয়ে খারাপ ফোনালাপ’ বলে বর্ণনা করেছেন।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ফোনে চিৎকার করে বলেন, ‘তুমি কি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছো? আমি না থাকলে তুমি এতদিনে জেলে থাকতে। আমি তোমার পিঠ বাঁচাচ্ছি। আর এখন এই সব কাণ্ডের জন্য সবাই তোমাকে ঘৃণা করে। পুরো বিশ্ব এখন ইসরায়েলকে ঘৃণা করছে।’

ট্রাম্প তাঁকে দুর্নীতির মামলার সময় নিজের ব্যক্তিগত সমর্থনের কথা মনে করিয়ে দেন এবং বৈরুতে হামলা চালালে ইসরায়েল বিশ্বজুড়ে আরও একঘরে হয়ে পড়বে বলে সতর্ক করেন। এক কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্পের এমন প্রচণ্ড চাপের মুখে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, শুধু নিশ্চিত করো যেন সবকিছু সামলে নেওয়া হয়।’

কিন্তু পরক্ষণেই জনসমক্ষে ভিন্ন বিবৃতি দিয়ে নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানায়, ‘আমাদের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।’ গাজায় যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়ে দেন, হিজবুল্লাহ না থামলে বৈরুতে হামলা হবেই।

মে, ২০২৬: ‘মাথায় আগুন’

গত মে মাসে ট্রাম্প যখন ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত, যা সফল হলে নেতানিয়াহুর যুদ্ধ জিইয়ে রাখার সবচেয়ে বড় অজুহাতটি হাতছাড়া হয়ে যেত। ২০ মে’র সেই ফোনালাপকে সূত্রগুলো ‘কঠিন’ বলে বর্ণনা করেছে। এক সূত্র অ্যাক্সিওসকে জানায়, ফোনের পর নেতানিয়াহুর ‘মাথায় আগুন’ ধরে গিয়েছিল। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চুক্তি হতে যাচ্ছে শুনে প্রচণ্ড শঙ্কিত হয়ে পড়েন নেতানিয়াহু। তিনি প্রকাশ্য ট্রাম্পের অবাধ্য না হলেও পর্দার আড়ালে লবিস্টদের দিয়ে চুক্তিটি ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা চালান। অথচ ট্রাম্প জনসমক্ষে জোর দিয়ে বলছিলেন, ‘নেতানিয়াহু তা-ই করবেন, যা আমি করতে বলব।’ জুনের ঘটনাপ্রবাহ ট্রাম্পের সেই দাবিকে ভুল প্রমাণ করে।

এপ্রিল, ২০২৬: লেবানন যখন সংকটে

গাজায় অবিরাম বোমাবর্ষণের মধ্যেই নেতানিয়াহু লেবাননে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলেন, যেখানে ইসরায়েলি হামলায় একদিনেই ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়। ৯ এপ্রিল ট্রাম্প ফোন করে ইসরায়েলি হামলা কমাতে চাপ দেন। এক ইসরায়েলি সূত্র জানায়, নেতানিয়াহু বুঝতে পেরেছিলেন তিনি যদি লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুরু না করেন, তবে ট্রাম্প তাকে ছাড়াই একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে দেবেন। এই ভয়ে নেতানিয়াহু আলোচনায় রাজি হলেও কয়েক দিন পরই দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান আরও জোরদার করেন।

তার কার্যালয় এই উত্তপ্ত ফোনালাপের খবরকে ‘ভুয়া খবর’ এবং আলোচনাকে ‘বন্ধুসুলভ’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে।

অক্টোবর, ২০২৫: ‘নৈরাশ্যবাদী বুড়ো’

গাজায় বেসামরিক মানুষের ওপর কয়েক মাসের নৃশংসতার পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে ট্রাম্প দ্বিতীয় গাজা যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেন। হামাসের পক্ষ থেকে চুক্তির ইতিবাচক সাড়া আসার পর ৪ অক্টোবর ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ফোন করেন। কিন্তু নেতানিয়াহু একে ‘প্রত্যাখ্যান’ ও ‘অর্থহীন’ বলে উড়িয়ে দিতে চান। অ্যাক্সিওসের তথ্যমতে, ট্রাম্প তখন ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ‘আমি বুঝি না তুমি কেন সব সময় এমন ধেড়ে নৈরাশ্যবাদীর মতো কথা বলো। এটি একটি বিজয়, একে গ্রহণ করো।’

পরে টাইম ম্যাগাজিনকে ট্রাম্প বলেন, তিনি নেতানিয়াহুকে বলেছিলেন, ‘বিবি, তুমি পুরো বিশ্বের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারো না।’ চাপের মুখে নেতানিয়াহু নরম হয়ে দ্বিতীয় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের শর্ত মানেননি। হামাসও সাফ জানিয়ে দিয়েছে, প্রথম দফার শর্ত সম্পূর্ণ না মানলে নিরস্ত্রকরণের কোনও আলোচনা হবে না।

জানুয়ারি, ২০২৫: ‘তোমার কোনও উপায় নেই’

২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই ট্রাম্প তার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মাধ্যমে নেতানিয়াহুকে গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে নিতে চাপ দেন। জো বাইডেনের দল যে ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করেছিল, এটি ছিল সেটাই। নেতানিয়াহু আপত্তি জানালে ট্রাম্প স্পষ্ট বলে দেন, ‘তোমার আর কোনও উপায় নেই, আমার সঙ্গে তোমাকে ঠিক থাকতেই হবে।’ চুক্তিটি কার্যকর হয় এবং জিম্মিরাও ফিরতে শুরু করে। কিন্তু মাত্র ছয় সপ্তাহের মাথায়, মার্চ মাসে নেতানিয়াহু একতরফাভাবে চুক্তি ভেঙে গাজায় নতুন করে ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করেন। ট্রাম্প প্রশাসন নিজেদের ভাবমূর্তি বাঁচাতে তখন হামাসকে দায়ী করলেও পর্দার আড়ালে নেতানিয়াহু তার চিরচেনা রূপই দেখান–ক্যামেরার সামনে চাপ মেনে নেওয়া এবং ক্যামেরা সরে গেলেই চুক্তি লঙ্ঘন করা।

সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড