পাঁচবার ট্রাম্পের ধমক খেয়ে কী করেছিলেন নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পুরো রাজনৈতিক ক্যারিয়ারই টিকে থাকার লড়াইয়ের এক অদ্ভুত গল্প। দুর্নীতি মামলার গ্যাঁড়াকল, মিত্রদের ত্যাগ কিংবা আদালতের নিন্দা; কোনো কিছুই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেনি। তার টিকে থাকার মূল সঞ্জীবনী শক্তি হলো যুদ্ধ। এই যুদ্ধ কোনও বিজয় বা নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরানের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত আসা ধ্বংসের হুমকিকে জিইয়ে রাখা। যতদিন ইসরায়েল একের পর এক নৃশংস হামলা চালিয়ে যাবে, ততদিনই নেতানিয়াহুর প্রধানমন্ত্রিত্ব নিশ্চিত।
কারণ, যেই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরে আসবে, ঠিক সেই মুহূর্তে নেতানিয়াহুকে তার নিজের দেশের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। এই একটি হিসাব দিয়েই সবকিছু ব্যাখ্যা করা সম্ভব—কেন যুদ্ধবিরতি বারবার ভেঙে পড়ে, কেন চুক্তিগুলো কর্পূরের মতো উড়ে যায় এবং কেন মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা বারবার খালি হাতে ফিরে আসেন। হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে পাঁচবার তীব্র ধমক খাওয়ার পরও নেতানিয়াহু প্রতিবারই ট্রাম্পকে বোকা বানিয়েছেন। কারণ, জেল এড়াতে নেতানিয়াহুর এই যুদ্ধগুলো চালিয়ে যাওয়া বড্ড প্রয়োজন।
নিচে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার সেই পাঁচ দ্বন্দ্বের বিবরণ তুলে ধরা হলো:
১ জুন, ২০২৬: ‘তুমি কি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছ?’
গত ১ জুন দুই নেতার মধ্যকার সব কূটনৈতিক সৌজন্য ভেঙে পড়ে। ইসরায়েল বৈরুতে বোমা হামলার হুমকি দিলে ইরান আলোচনা থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ফোন করেন, যাকে মার্কিন কর্মকর্তারা ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্যতম ‘সবচেয়ে খারাপ ফোনালাপ’ বলে বর্ণনা করেছেন।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ফোনে চিৎকার করে বলেন, ‘তুমি কি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছো? আমি না থাকলে তুমি এতদিনে জেলে থাকতে। আমি তোমার পিঠ বাঁচাচ্ছি। আর এখন এই সব কাণ্ডের জন্য সবাই তোমাকে ঘৃণা করে। পুরো বিশ্ব এখন ইসরায়েলকে ঘৃণা করছে।’
ট্রাম্প তাঁকে দুর্নীতির মামলার সময় নিজের ব্যক্তিগত সমর্থনের কথা মনে করিয়ে দেন এবং বৈরুতে হামলা চালালে ইসরায়েল বিশ্বজুড়ে আরও একঘরে হয়ে পড়বে বলে সতর্ক করেন। এক কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্পের এমন প্রচণ্ড চাপের মুখে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, শুধু নিশ্চিত করো যেন সবকিছু সামলে নেওয়া হয়।’
কিন্তু পরক্ষণেই জনসমক্ষে ভিন্ন বিবৃতি দিয়ে নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানায়, ‘আমাদের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।’ গাজায় যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়ে দেন, হিজবুল্লাহ না থামলে বৈরুতে হামলা হবেই।
মে, ২০২৬: ‘মাথায় আগুন’
গত মে মাসে ট্রাম্প যখন ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত, যা সফল হলে নেতানিয়াহুর যুদ্ধ জিইয়ে রাখার সবচেয়ে বড় অজুহাতটি হাতছাড়া হয়ে যেত। ২০ মে’র সেই ফোনালাপকে সূত্রগুলো ‘কঠিন’ বলে বর্ণনা করেছে। এক সূত্র অ্যাক্সিওসকে জানায়, ফোনের পর নেতানিয়াহুর ‘মাথায় আগুন’ ধরে গিয়েছিল। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চুক্তি হতে যাচ্ছে শুনে প্রচণ্ড শঙ্কিত হয়ে পড়েন নেতানিয়াহু। তিনি প্রকাশ্য ট্রাম্পের অবাধ্য না হলেও পর্দার আড়ালে লবিস্টদের দিয়ে চুক্তিটি ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা চালান। অথচ ট্রাম্প জনসমক্ষে জোর দিয়ে বলছিলেন, ‘নেতানিয়াহু তা-ই করবেন, যা আমি করতে বলব।’ জুনের ঘটনাপ্রবাহ ট্রাম্পের সেই দাবিকে ভুল প্রমাণ করে।
এপ্রিল, ২০২৬: লেবানন যখন সংকটে
গাজায় অবিরাম বোমাবর্ষণের মধ্যেই নেতানিয়াহু লেবাননে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলেন, যেখানে ইসরায়েলি হামলায় একদিনেই ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়। ৯ এপ্রিল ট্রাম্প ফোন করে ইসরায়েলি হামলা কমাতে চাপ দেন। এক ইসরায়েলি সূত্র জানায়, নেতানিয়াহু বুঝতে পেরেছিলেন তিনি যদি লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুরু না করেন, তবে ট্রাম্প তাকে ছাড়াই একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে দেবেন। এই ভয়ে নেতানিয়াহু আলোচনায় রাজি হলেও কয়েক দিন পরই দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান আরও জোরদার করেন।
তার কার্যালয় এই উত্তপ্ত ফোনালাপের খবরকে ‘ভুয়া খবর’ এবং আলোচনাকে ‘বন্ধুসুলভ’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে।
অক্টোবর, ২০২৫: ‘নৈরাশ্যবাদী বুড়ো’
গাজায় বেসামরিক মানুষের ওপর কয়েক মাসের নৃশংসতার পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে ট্রাম্প দ্বিতীয় গাজা যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেন। হামাসের পক্ষ থেকে চুক্তির ইতিবাচক সাড়া আসার পর ৪ অক্টোবর ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ফোন করেন। কিন্তু নেতানিয়াহু একে ‘প্রত্যাখ্যান’ ও ‘অর্থহীন’ বলে উড়িয়ে দিতে চান। অ্যাক্সিওসের তথ্যমতে, ট্রাম্প তখন ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ‘আমি বুঝি না তুমি কেন সব সময় এমন ধেড়ে নৈরাশ্যবাদীর মতো কথা বলো। এটি একটি বিজয়, একে গ্রহণ করো।’
পরে টাইম ম্যাগাজিনকে ট্রাম্প বলেন, তিনি নেতানিয়াহুকে বলেছিলেন, ‘বিবি, তুমি পুরো বিশ্বের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারো না।’ চাপের মুখে নেতানিয়াহু নরম হয়ে দ্বিতীয় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের শর্ত মানেননি। হামাসও সাফ জানিয়ে দিয়েছে, প্রথম দফার শর্ত সম্পূর্ণ না মানলে নিরস্ত্রকরণের কোনও আলোচনা হবে না।
জানুয়ারি, ২০২৫: ‘তোমার কোনও উপায় নেই’
২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই ট্রাম্প তার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মাধ্যমে নেতানিয়াহুকে গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে নিতে চাপ দেন। জো বাইডেনের দল যে ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করেছিল, এটি ছিল সেটাই। নেতানিয়াহু আপত্তি জানালে ট্রাম্প স্পষ্ট বলে দেন, ‘তোমার আর কোনও উপায় নেই, আমার সঙ্গে তোমাকে ঠিক থাকতেই হবে।’ চুক্তিটি কার্যকর হয় এবং জিম্মিরাও ফিরতে শুরু করে। কিন্তু মাত্র ছয় সপ্তাহের মাথায়, মার্চ মাসে নেতানিয়াহু একতরফাভাবে চুক্তি ভেঙে গাজায় নতুন করে ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করেন। ট্রাম্প প্রশাসন নিজেদের ভাবমূর্তি বাঁচাতে তখন হামাসকে দায়ী করলেও পর্দার আড়ালে নেতানিয়াহু তার চিরচেনা রূপই দেখান–ক্যামেরার সামনে চাপ মেনে নেওয়া এবং ক্যামেরা সরে গেলেই চুক্তি লঙ্ঘন করা।
সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড









