দেশের বিভিন্ন সীমান্তে পুশ-ইনের চেষ্টা প্রতিহত করছে বিজিবি, তারপর অনেকে ‘নিখোঁজ’
ন্যাশনাল ডেস্ক: বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টা করা মানুষগুলো কোথাও শূন্যরেখায় আটকে পড়েছে, আবার কোথাও তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী। গত দুইদিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, লালমনিরহাট, মেহেরপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও যশোর ও শেরপুরসহ কমপক্ষে আটটি জেলার সীমান্তে এমন ঘটনা ঘটেছে। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) বাধার মুখে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর ও নওগাঁর সাপাহার সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশইনের শিকার শিশু ও নারীসহ অন্তত ৪৫ জন দুই দিন খোলা আকাশের নিচে অবস্থানের পর ‘নিখোঁজ’ হয়েছেন।
শনিবার (৬ জুন) ভোর ও রাতের কোনো এক সময় তারা সীমান্ত এলাকা থেকে উধাও হয়ে যান। তবে সীমান্তে তাদের ব্যবহৃত পোশাক, ব্যাগ ও রান্নার সামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে গভীর উৎকণ্ঠা ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রের ধারণা, তাদের কঠোর নজরদারির মুখে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পেরে বিএসএফই রাতের আঁধারে তাদের ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তে পুশইনের চেষ্টার পর বিজিবির প্রতিরোধের মুখে ২৮ জন বাংলাদেশি দুই দিন খোলা আকাশের নিচে জঙ্গলের মধ্যে অনাহারে-অর্ধাহারে অবস্থান করছিলেন। শনিবার সকাল থেকে ওই স্থানে তাদের আর দেখা যাচ্ছে না। তবে নো ম্যান্স ল্যান্ডের ওই স্থানে তাদের ব্যবহৃত পোশাক ও ব্যাগগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পুশইনের শিকার ওই ২৮ জনকে বিএসএফ ফিরিয়ে নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিএসএফ আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশক (বিজিবি) কিছু না জানালেও শনিবার ভোরে ওই এলাকা ফাকা পাওয়া যায়।
বিজিবির ১৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম এক প্রেস নোটে জানান, সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে নো ম্যান্স ল্যান্ডের ভারতীয় অংশের ৫০ গজ অভ্যন্তরে অবস্থান করছিলেন ওই ২৮ জন। কিন্তু শনিবার ভোর থেকে তাদের আর দেখা যাচ্ছে না। ধারণা করা হচ্ছে, রাতের কোনো একসময় বিএসএফ তাদেরকে ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিয়েছে। ১৬ ব্যাটালিয়নের আওতাধীন পুরো সীমান্ত এলাকায় বিজিবির সার্বক্ষণিক নজরদারি ও টহল জোরদার রয়েছে।
এদিকে নওগাঁর সাপাহার সীমান্তে বিজিবি ও বিএসএফের পতাকা বৈঠকেও সমাধান না হওয়ায় শুক্রবার সারাদিন শূন্য রেখায় মানবেতর দিন কাটিয়েছেন পুশইন হওয়া শিশু ও নারী-পুরুষসহ ১৭ জন। তবে রাতের আঁধারে তারা কোথায় গেছেন, তা স্থানীয়রা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। বিজিবির করমুডাঙ্গা বিওপির নায়েব সুবেদার মিজানুর রহমান মৌখিকভাবে জানিয়েছেন, শনিবার রাত দুইটার দিকে তাদের ভারতে পুশব্যাক (ফিরিয়ে দেওয়া) করা হয়েছে।
শুক্রবার (৫ জুন) সকাল আটটার দিকে সাপাহারের হাঁপানিয়া সীমান্তের ২৩৮/এমপি সীমান্ত পিলার দিয়ে ভারতের ৮৮ বিএসএফ পান্নাছড়া ক্যাম্পের সদস্যরা ওই ১৭ জনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জোর করে প্রবেশ করায়।
বিজিবি সদর দপ্তর জানায়, আন্তর্জাতিক আইন ও প্রচলিত কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করার কোনো প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হবে না। সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা হয়েছে এবং যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিহত করতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ৩টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তের ২০৩/৬-আর পিলার দিয়ে ২৮ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। খবর পেয়ে বিজিবি সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের প্রবেশে বাধা দেয়। এতে ১২ জন পুরুষ, ১০ নারী ও ছয় শিশুসহ ২৮ জন শূন্যরেখায় অবস্থান নেয়। এ ঘটনায় দুই দফা পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সমাধান হয়নি। প্রায় দুইদিন শূন্যরেখায় অবস্থানের পর গতকাল বিএসএফ তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়।
নওগাঁ সীমান্তে ১৯ ঘণ্টার চেষ্টাও ব্যর্থ: শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সাপাহার উপজেলার হাঁপানিয়া সীমান্তের ২৩৮/এমপি পিলার দিয়ে ১৭ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে কড়া অবস্থান নেয় বিজিবি।
নওগাঁ ব্যাটালিয়নের (১৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, ‘খবর পাওয়ার পর ওই স্থানে বিজিবির টহল বাড়ানো হয়। মানবিক দিক বিবেচনা করে শুরুতে শূন্যরেখায় থাকতে দিলেও সন্ধ্যার পর তাদের নো-ম্যান্স ল্যান্ডে পাঠিয়ে দেয়া হয়। রাত ১টার দিকে বিএসএফ সদস্যরা সীমান্তের লাইট বন্ধ করে দেন। এরপর রাতের আঁধারে তারা পুশ-ইনের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ভারতে ফিরিয়ে নিয়েছেন বলে ধারণা করা যাচ্ছে।’
লালমনিরহাটে ৩৩ জনকে সরিয়ে নেয় বিএসএফ: গত শুক্রবার ভোরে লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা, পাটগ্রাম ও আদিতমারী উপজেলার পাঁচটি সীমান্ত এলাকা দিয়ে ৩৩ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে বিএসএফ।
খবর পেয়ে বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। দিনভর শূন্যরেখায় আটকে রাখার পর রাতের আঁধারে সীমান্তের লাইট নিভিয়ে তাদের নিজ ভূখন্ডে ফিরিয়ে নেয় বিএসএফ। লালমনিরহাট ব্যাটালিয়নের (১৫ বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদী ইমাম বলেন, ‘সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করা মানুষদের নিজ ভূখন্ডে সরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ। যেকোনো পুশ-ইন বা অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। সর্বদাই সীমান্তে কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে।’
মেহেরপুরে গ্রামবাসীর প্রতিরোধ: শুক্রবার ভোরে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্তের ১৪০/৫ এস আন্তর্জাতিক পিলারের কাছে ছয়জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসীর প্রতিরোধের মুখে তারা বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকতে পারেনি। স্থানীয়দের দাবি, বিএসএফ কাঁটাতারের একটি অংশ খুলে দিয়ে তাদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। পরে তারা শূন্যরেখায় অবস্থান নেয়। তেঁতুলবাড়িয়া বিওপির কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার হাবিবুর রহমান বলেন, ‘পুশ-ইনকৃতদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য বিএসএফকে হ্যান্ড মাইকের মাধ্যমে আহ্বান জানানো হচ্ছে। অবৈধ কোনো অনুপ্রবেশ কিংবা পুশ-ইন বাংলাদেশ মেনে নেবে না। সীমান্তে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।’
পঞ্চগড়ে ২৪ ঘণ্টা পরও শূন্যরেখায় ১০ জন: শুক্রবার ভোরে পঞ্চগড় সদর উপজেলার দক্ষিণ প্রধানপাড়া সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবি বাধা দিলে তারা বাংলাদেশের ভূখন্ডে প্রবেশ করতে পারেনি এবং ভারতের অভ্যন্তরে শূন্যরেখার কাছে অবস্থান করতে থাকে। এ নিয়ে কোম্পানি ও ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে একাধিক পতাকা বৈঠক হলেও কোনো সমাধান হয়নি। নীলফামারী ব্যাটালিয়নের (৫৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘যেহেতু তারা ভারতের অভ্যন্তরে ছিল, আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করে ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের (আইসিপি) মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠানো উচিত। রাতের অন্ধকারে সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে এভাবে ফেলে দেয়া গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো ধরনের পুশ-ইন বাংলাদেশ গ্রহণ করবে না। যদি তারা বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাদের ফেরত পাঠাতে হবে।’
ঠাকুরগাঁওয়ে শিশুসহ ১১ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা: শুক্রবার ভোরে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্ত দিয়ে শিশুসহ ১১ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। দায়িত্ব পালনকালে বিজিবি সদস্যরা সীমান্তের ওপারে সন্দেহজনক গতিবিধি দেখে সতর্ক অবস্থান নেন। বিজিবির কঠোর অবস্থানের মুখে ওই ১১ জন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেনি এবং ভারতের অভ্যন্তরে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। দিনাজপুর ব্যাটালিয়নের (৪২ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মঈন হাসান বলেন, ‘মশালগাঁও সীমান্তে ১১ জনকে পুশ-ইনের একটি চেষ্টা বিজিবি সফলভাবে প্রতিহত করেছে। সীমান্তে আমাদের সদস্যরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। বর্তমানে ওই ব্যক্তিরা ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশ-ইনের চেষ্টা সফল হতে দেয়া হবে না। দেশের সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি সর্বদা দায়িত্বশীল, পেশাদার ও তৎপর রয়েছে।’
শেরপুরে পুশ-ইনের চেষ্টা ব্যর্থ: গত শুক্রবার জুমার নামাজের সময় শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রকুড়া সীমান্তের কাঁটাতারবিহীন এলাকা দিয়ে পাঁচ-ছয়জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিত সতর্কতায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি তারা। বিজিবি সূত্র জানায়, সীমান্ত পিলার ১১১৮-এর নিকটবর্তী এলাকায় শূন্যরেখা থেকে প্রায় ৪০০ গজ ভেতরে ভারতের চেরাংপাড়া এলাকায় ওই ব্যক্তিদের জড়ো করে রাখা হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, মেঘালয় থেকে নিয়ে আসা এসব ব্যক্তিকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল বিএসএফ। ঘটনার পর ৩৯ বিজিবির সব বিওপিতে জনবল বাড়ানো হয়েছে। সম্ভাব্য পুশ-ইন পয়েন্টগুলোতে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে মাইকিং ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের (৩৯ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ নুরুল আমিন বায়েজীদ বলেন, ‘ময়মনসিংহ ও শেরপুর জেলার আন্তর্জাতিক সীমানা রক্ষায় এবং যেকোনো অবৈধ কার্যক্রম প্রতিরোধে বিজিবি দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে। সীমান্তে মাদক, চোরাচালান এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশ-ইন রোধে বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে।’











