শেখ সিদ্দিকুর রহমান
সুন্দরবনকে আমরা সাধারণত বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসভূমি এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিসেবে চিনি। কিন্তু সুন্দরবন শুধু গাছপালা, নদী-খাল আর বাঘ-হরিণের সমষ্টি নয়। এর মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে মানুষের বসতির ইতিহাস, প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ, মৃৎপাত্র, ব্যবহার্য সামগ্রী এবং হারিয়ে যাওয়া জনপদের স্মৃতি। ফলে সুন্দরবনকে যতই জানা যায়, ততই মনে হয়-এটি একই সঙ্গে প্রকৃতির সৃষ্টি, মানুষের ইতিহাস এবং হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার এক বিশাল জীবন্ত আর্কাইভ।
সুন্দরবনের সৃষ্টি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের একটি ঘটনা নয়। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী বহন করে আনা বিপুল পলি যুগের পর যুগ বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জমা হয়েছে। নদীর স্্েরাত, জোয়ার-ভাটা, বন্যা, পলি সঞ্চয় ও ভূমিক্ষয়ের অবিরাম প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠেছে বদ্বীপের নতুন নতুন চর ও দ্বীপ। পরে লবণাক্ত পরিবেশে অভিযোজিত উদ্ভিদ সেখানে বিস্তার লাভ করে এবং ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে ম্যানগ্রোভ বন। ইউনেসকো সুন্দরবনকে বদ্বীপ গঠন, জোয়ারের প্রভাব এবং নতুন সৃষ্ট ভূমিতে উদ্ভিদের বিস্তারের চলমান প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বাংলাদেশের অংশে সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৩৮ বর্গকিলোমিটার বনভূমি এবং প্রায় ১ হাজার ৮৭৪ বর্গকিলোমিটার নদী, খাল ও অন্যান্য জলাভূমি। পুরোনো বন-তথ্যেও ৬০১৬.৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের হিসাব পাওয়া যায়।
ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে বৃহত্তর সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। এর প্রায় ৬০ শতাংশ বাংলাদেশে এবং অবশিষ্ট অংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য নথিতে বাংলাদেশের সুন্দরবনের তিনটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যসহ প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ হেক্টর এলাকা বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
সুন্দরবনের প্রাণপ্রকৃতির বৈচিত্র্যও বিস্ময়কর। বিভিন্ন সরকারি ও আন্তর্জাতিক নথিতে সংখ্যায় কিছু পার্থক্য থাকলেও বন বিভাগের ইকোট্যুরিজম তথ্য অনুযায়ী এখানে ৪০৩ প্রজাতির পাখি, ১২০ প্রজাতির মাছ, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৮ প্রজাতির উভচর রয়েছে। অন্যদিকে ইউনেসকোর নথিতে ৪৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৫৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর, ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া এবং ৪৩ প্রজাতির মলাস্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাখির প্রজাতির হিসাবও বিভিন্ন জরিপে ২৬০ থেকে ৩১৫-এর মধ্যে পাওয়া যায়। অর্থাৎ জরিপের সময়, এলাকা ও শ্রেণিবিন্যাসের পার্থক্যের কারণে সংখ্যায় কিছু তারতম্য স্বাভাবিক।
এই জীববৈচিত্র্যের সবচেয়ে প্রতীকী প্রাণী রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সুন্দরবন পৃথিবীর একমাত্র বৃহৎ ম্যানগ্রোভ আবাসভূমি যেখানে বাঘের স্বাভাবিক জনসংখ্যা টিকে আছে। বাঘের পাশাপাশি চিত্রা হরিণ, বন্য শূকর, বানর, উদবিড়াল, লবণপানির কুমির, গোসাপ, অজগর, কিং কোবরা, গাঙ্গেয় ও ইরাবতী ডলফিনসহ অসংখ্য স্থলজ ও জলজ প্রাণী এখানে বাস করে। ইউনেসকো সুন্দরবনের জলজ, স্থলজ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যকে এর অসামান্য বৈশ্বিক মূল্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
তবে সুন্দরবনের প্রকৃত প্রাণ হলো তার নদী ও খাল। প্রায় ৪৫০টি বড়-ছোট নদী, খাল ও জলপ্রবাহ সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জালের মতো ছড়িয়ে আছে। এসব জলপথের সম্মিলিত দৈর্ঘ্য নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটারের হিসাব পাওয়া যায়। বন বিভাগের গবেষণা নথিতেও প্রায় ৪৫০টি নদী ও খালের কথা বলা হয়েছে।
সুন্দরবনের প্রধান নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে পশুর, শিবসা, বলেশ্বর, রায়মঙ্গল, হাড়িয়াভাঙ্গা, মালঞ্চ, কপোতাক্ষ, অরপাঙ্গাশিয়া, ভোলা, কুঙ্গা, ভদ্রা, সুতারখালী, শেলা, কালিন্দী, কোলপেটুয়া ও আড়পাঙ্গাশিয়া। পশ্চিমে রায়মঙ্গল-হাড়িয়াভাঙ্গা-কালিন্দী নদীপ্রণালী এবং পূর্বদিকে বলেশ্বর সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ সীমানা তৈরি করেছে; দক্ষিণে উন্মুক্ত বঙ্গোপসাগর।
এর মধ্যে পশুর নদী সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান জলপথ। নদীটি উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে সুন্দরবনের অভ্যন্তরের বহু খাল ও জলপ্রবাহকে সংযুক্ত করেছে। শিবসা ও বলেশ্বরও শুধু নদী নয়—সুন্দরবনের পরিবেশ, পলি পরিবহন, মাছের প্রজনন, নৌযাতায়াত এবং মানুষের জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত জলপথ।
সুন্দরবনের নদীগুলোকে অনেকটা মানুষের শরীরের ধমনির সঙ্গে তুলনা করা যায়। নদীতে জোয়ার আসে, ভাটা যায়; মিঠা ও লোনা পানির মিশ্রু ঘটে; পলি আসে, আবার গ্রোতে কোথাও পলি সরে যায়। এই জলপ্রবাহই সুন্দরবনের চরিত্রকে প্রতিনিয়ত বদলে দেয়। কোথাও ভূমি তৈরি হয়, কোথাও নদী গিলে নেয় পুরোনো ভূখণ্ড। ফলে সুন্দরবন কোনো স্থির বন নয়—এটি প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল একটি জীবন্ত ভূপ্রকৃতি।
আর এই পরিবর্তনশীল ভূপ্রকৃতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ইতিহাসের আরেক বিস্ময়।
একসময় মনে করা হতো সুন্দরবন বুঝি চিরকালই জনমানবহীন গভীর বন ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রতœতাত্ত্বিক অনুসন্ধান সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সুন্দরবনের পাঁচটি স্থানে প্রায় দেড় হাজার বছর আগের বসতির চিহ্ন পাওয়ার কথা প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে মৃৎপাত্র, ব্যবহার্য সামগ্রী এবং স্থাপনার চিহ্নও পাওয়া গেছে।
এই অনুসন্ধানের সঙ্গে গবেষক ইসমে আজমের নাম বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তিনি প্রায় সাত বছর ধরে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকায় বাঘের গণনা ও সংরক্ষণ-সংক্রান্ত কাজের সূত্রে ঘুরে বেড়ানোর সময় এসব ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পান। পরে মাটি ক্ষয়ে যাওয়ার ফলে বনভূমির নিচে চাপা থাকা স্থাপনার অংশগুলো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। প্রতœতত্ত্ববিদদের অনুসন্ধানেও এসব স্থাপনার বয়স আনুমানিক এক হাজার থেকে এক হাজার দুইশ বছরের মধ্যে হতে পারে বলে ধারণা প্রকাশ করা হয়েছে। ইটের আকৃতি ও নির্মাণশৈলী দেখে এগুলো পাল আমলের সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলেও বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
এই আবিষ্কার সুন্দরবনের ইতিহাসকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে। কারণ প্রশ্ন উঠছে-যেখানে আজ বাঘের চলাচল, জোয়ার-ভাটা আর ঘন ম্যানগ্রোভ, সেখানে এক হাজার বছর আগে মানুষ কীভাবে বসবাস করত?
সম্ভবত তখন ভূপ্রকৃতি আজকের মতো ছিল না। নদীর গতিপথ ছিল ভিন্ন, কোথাও ভূমি ছিল উঁচু, কোথাও ছিল নদীবন্দর বা বাণিজ্যকেন্দ্র। নদীপথ ধরে মানুষের যাতায়াত ও বাণিজ্যের সুযোগ ছিল। মাটি ও পানির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোনো কোনো জনপদ পরিত্যক্ত হয়েছে, আবার প্রকৃতি ধীরে ধীরে সেই পরিত্যক্ত ভূমিকে গ্রাস করেছে।
সুন্দরবনের শেখেরটেক এ ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ইউনেসকোর নথিতে সুন্দরবনের গভীরে ১৮ শতকের একটি মন্দিরের অস্তিত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার এলাকায় মাটির নিচে স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ থাকার প্রাথমিক প্রমাণও পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ আজকের সুন্দরবনের গাছের শিকড়ের নিচে কোথাও হয়তো রয়েছে মানুষের পায়ের চিহ্ন, কোথাও ইটের দেয়াল, কোথাও ভাঙা মৃৎপাত্র, কোথাও কোনো প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনার স্মৃতি। প্রকৃতি তার নিজের নিয়মে মানুষের তৈরি জগতকে ঢেকে দিয়েছে। কিন্তু সময়ের কোনো এক মুহূর্তে নদীর ভাঙন কিংবা মাটির ক্ষয়ে সেই ইতিহাস আবার চোখের সামনে উঠে এসেছে।
সাতক্ষীরার ঈশ্বরীপুর-ধূমঘাট-বংশীপুর অঞ্চলও সুন্দরবনসংলগ্ন ইতিহাস ও পুরাকীর্তির দিক থেকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ঈশ্বরীপুরের হাম্মামখানা, টেংগা শাহি মসজিদ, বংশীপুর গড় এবং বুরুজপোতার মতো প্রতœস্থানের সঙ্গে এ অঞ্চলের মধ্যযুগীয় বসতির ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ইউনেসকোর বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রতœতাত্ত্বিক স্থানের তালিকায় বংশীপুর-ঈশ্বরীপুর-ধূমঘাটকে ১৫ থেকে ১৮ শতকের মধ্যযুগীয় বসতির গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
স্থানীয় ইতিহাস ও লোককথায় এসব স্থানের সঙ্গে রাজা প্রতাপাদিত্যের নামও জড়িয়ে আছে। তবে লোককথা আর প্রতœতাত্ত্বিক প্রমাণকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। ইতিহাসের সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন প্রতœতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, শিলালিপি, স্থাপত্যের ধরন, মুদ্রা, মৃৎপাত্র এবং অন্যান্য বস্তুগত প্রমাণের সমন্বিত বিশ্লেষণ।
সুন্দরবনের ইতিহাসের সঙ্গে বাগেরহাটের সম্পর্কও গভীর। খান জাহান আলীর নেতৃত্বে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার বন ও জলাভূমি পরিষ্কার করে জনবসতি, কৃষি ও নগরজীবনের বিস্তার ঘটেছিল। আজকের বাগেরহাটের ঐতিহাসিক মসজিদ নগরী সেই মধ্যযুগীয় সম্প্রসারণের এক অনন্য স্মারক। ১৯৮৫ সালে বাগেরহাট ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়।
সুন্দরবনের ইতিহাস আবার শুধু প্রতœতাত্ত্বিক ইট-পাথরের ইতিহাস নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বনবিবি, দক্ষিণ রায়, গাজী পীর, মৌয়াল, বাওয়ালি, জেলে ও বনজীবী মানুষের লোকবিশ্বাস। শত শত বছর ধরে যারা মধু সংগ্রহ করতে, মাছ ধরতে কিংবা গোলপাতা ও অন্যান্য বনজ সম্পদ আহরণ করতে বনে প্রবেশ করেছেন, তাঁদের জীবনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি।
বাঘের ভয়, কুমিরের ভয়, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, অচেনা নদী ও গভীর বনের বিপদের মধ্যে মানুষ আশ্রয় নিয়েছে বিশ্বাসে। বনবিবির কাহিনি থেকে শুরু করে নানা দোয়া, মন্ত্র ও লোকাচার—সবই সুন্দরবনের জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। এখানে ধর্মীয় বিশ্বাস ও স্থানীয় লোকসংস্কৃতি বহু ক্ষেত্রে পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেছে।
কিন্তু এই অসাধারণ বন আজ নানা সংকটের মুখোমুখি। নদী ও খালের নাব্যতা কমে যাওয়া, পলি জমা, লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, অবৈধ শিকার, অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ এবং দূষণ সুন্দরবনের জন্য ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ। প্রায় ৪৫০টি নদী-খালের এই জটিল জলজালিকা শুধু সুন্দরবনের সৌন্দর্যের অংশ নয়; এটি বনটির পরিবেশগত ভারসাম্যের অন্যতম ভিত্তি। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও বন বিভাগের সূত্রে নদী-খালগুলোর অনেকগুলোতে পলি জমে জলধারণ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কথা উঠে এসেছে।
সুন্দরবন রক্ষার অর্থ তাই শুধু বাঘ রক্ষা নয়। এর নদী রক্ষা করতে হবে, খালগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে হবে, পলি ও জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক গতিশীলতা বুঝতে হবে, ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের বৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে এবং একই সঙ্গে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা প্রতœসম্পদও সংরক্ষণ করতে হবে।
কারণ সুন্দরবনের একটি নদী শুকিয়ে গেলে শুধু একটি জলপথ হারায় না; তার সঙ্গে বদলে যায় মাছের আবাস, কাঁকড়ার প্রজননক্ষেত্র, পাখির খাদ্যচক্র এবং বনজীবীদের জীবন। আবার একটি প্রাচীন প্রতœস্থল হারিয়ে গেলে হারিয়ে যায় আমাদের ইতিহাসের একটি অজানা অধ্যায়।
সুন্দরবনের মাটির নিচে তাই শুধু অতীত নেই-আছে আমাদের অজানা ইতিহাসের সম্ভাবনা। আজ যে ভূমিতে সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া ও গোলপাতা জন্মেছে, সেই ভূমির কোনো কোনো অংশে একদিন মানুষের ঘর ছিল, বাজার ছিল, হয়তো বন্দর ছিল, ধর্মীয় স্থাপনা ছিল, ছিল নদীকেন্দ্রিক জীবন ও বাণিজ্য।
এই কারণেই সুন্দরবনকে কেবল একটি বন হিসেবে দেখা তার প্রতি অবিচার। এটি একদিকে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ প্রতিবেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ, অন্যদিকে নদী ও পলিতে গড়ে ওঠা এক পরিবর্তনশীল ভূগোল; আবার একই সঙ্গে এটি প্রাচীন জনপদ, লোকবিশ্বাস ও হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার এক বিশাল ভান্ডার।
সুন্দরবনের প্রতিটি নদী যেন ইতিহাসের একটি রেখা, প্রতিটি খাল যেন কোনো বিস্মৃত জনপদের পথ, প্রতিটি পুরোনো ইট যেন হারিয়ে যাওয়া মানুষের একটি বাক্য। ম্যানগ্রোভের শিকড়ের নিচে চাপা পড়ে থাকা সেই বাক্যগুলো আমাদের পড়তে হবে-বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে, প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণায় এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর দায়িত্ববোধ নিয়ে।
সুন্দরবনকে বাঁচানো মানে শুধু একটি বনকে বাঁচানো নয়; এর সঙ্গে বাঁচিয়ে রাখতে হবে একটি বদ্বীপের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস, অসংখ্য প্রাণীর আবাস, নদী-খালের জটিল জীবনব্যবস্থা এবং দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার স্মৃতিও।
সুন্দরবন যত রহস্য লুকিয়ে রেখেছে, তার চেয়েও বড় কথা-সেই রহস্যের অনেকটাই এখনো আমরা জানিই না।
লেখক: কবি, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মী।