সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

আন্তর্জাতিক চন্দ্র দিবস: মহাকাশ গবেষণার আলোকবর্তিকা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬, ৭:০৬ অপরাহ্ণ
আন্তর্জাতিক চন্দ্র দিবস: মহাকাশ গবেষণার আলোকবর্তিকা

সাকিবুর রহমান বাবলা

মানবসভ্যতার ইতিহাসে ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক। নাসার অ্যাপোলো-১১ মিশনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মানুষ চাঁদের মাটিতে পদার্পণ করে এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও মহাকাশ অনুসন্ধানে নতুন যুগের সূচনা করে। নভোচারী নিল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন চাঁদের বুকে পদচারণা করেন এবং মাইকেল কলিন্স কমান্ড মডিউলে থেকে কক্ষপথে অবস্থান করেন। এই ঐতিহাসিক সাফল্যকে সম্মান জানাতে এবং মহাকাশ গবেষণার অগ্রগতিকে তুলে ধরতে প্রতি বছর ২০ জুলাই বিশ্বব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক চন্দ্র দিবস’ পালিত হয়।

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে, চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র স্থায়ী প্রাকৃতিক উপগ্রহ এবং সৌরজগতের পঞ্চম বৃহত্তম উপগ্রহ। প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর সঙ্গে এক বিশাল বস্তুর সংঘর্ষে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষ থেকে এর জন্ম। প্রায় ৩,৪৭৪ কিলোমিটার ব্যাসের এই উপগ্রহটির নিজস্ব কোনো আলো নেই; এটি সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে এবং এর মহাকর্ষীয় টানের ফলে পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা সংঘটিত হয়। পৃথিবী থেকে গড়ে প্রায় ৩,৮৪,৪০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চাঁদ প্রায় ২৭.৩ দিনে পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করে, আর এক পূর্ণ চন্দ্রকলার চক্র সম্পন্ন করতে সময় লাগে প্রায় ২৯.৫ দিন।

পবিত্র আল-কোরআনের বর্ণনায় চাঁদ সৃষ্টিকর্তার এক অনন্য সৃষ্টি ও তাঁর ক্ষমতার নিদর্শন। মানবজাতির সময় গণনার সুবিধার্থে চাঁদকে বর্ধনশীল ও ক্ষয়িষ্ণু বিভিন্ন পর্যায়ে পরিচালিত করা হয়েছে, যার ভিত্তিতে চন্দ্রবর্ষ, মাস এবং হজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের সময় নির্ধারিত হয়। চাঁদ একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথ ও সুনির্দিষ্ট নিয়মে আবর্তিত হয়, যার প্রভাবে পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা সৃষ্টি হয় এবং মহাজাগতিক ভারসাম্য বজায় থাকে। কোরআনে চাঁদকে ‘নূর’ বা প্রতিফলিত আলো হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; এর নিজস্ব আলো নেই, বরং এটি সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে। হাদিসেও নতুন চাঁদ দেখে ইসলামি মাস ও ইবাদতের সময় নির্ধারণের নির্দেশনা রয়েছে, যা সময়ানুবর্তিতা, কৃতজ্ঞতা, জ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞান গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরে।

১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই কমান্ডার নিল আর্মস্ট্রং এবং লুনার মডিউল পাইলট বাজ অলড্রিন ‘ইগল’ নামক যান নিয়ে চাঁদের ‘সি অব ট্রাঙ্কুইলিটি’ অঞ্চলে অবতরণ করেন। প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদের মাটিতে পা রেখে আর্মস্ট্রং বলেছিলেন: “মানুষের জন্য এটি একটি ছোট পদক্ষেপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য এক বিরাট লাফ।” ১৬ জুলাই কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে শুরু হওয়া এই মিশনটি চার দিন পর সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরে আসে, যা মানুষের সাহস ও উদ্ভাবনী সক্ষমতার অনন্য নজির। আর্থার সি ক্লার্ক- (বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনী লেখক) এর ভাষায়: “নক্ষত্রদের পথে হাঁটার প্রথম মাইলফলক হলো চাঁদ।”

চাঁদে মানুষের প্রথম পদার্পণের এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্বীকৃতি দিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০২১ সালের ৯ ডিসেম্বর A/RES/76/76 প্রস্তাবের মাধ্যমে ২০ জুলাইকে ‘আন্তর্জাতিক চন্দ্র দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। মুন ভিলেজ অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে ২০২২ সালে প্রথম এই দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়। দিবসটির লক্ষ্য হলো মহাকাশ অনুসন্ধান সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, চন্দ্রপৃষ্ঠের সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত শিক্ষায় উৎসাহিত করা।

জাতিসংঘের বাহ্যিক মহাকাশ বিষয়ক দপ্তর UNOOSA-এর তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক চন্দ্র দিবস উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেমিনার, মহাকাশ প্রদর্শনী ও আকাশ পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। একই সঙ্গে নাসার ‘আর্টেমিস’ মিশনসহ বিভিন্ন দেশের নতুন চন্দ্রাভিযান প্রমাণ করছে যে, চাঁদকে ঘিরে গবেষণা ও অনুসন্ধান এখনো অব্যাহত রয়েছে। এই দিবস কেবল চাঁদে মানুষের প্রথম অবতরণের স্মারক নয়, বরং বিজ্ঞান, অনুসন্ধিৎসা ও বৈশ্বিক সহযোগিতার এক অনুপ্রেরণামূলক আহ্বান। চাঁদে পা রেখেই আর্মস্ট্রং তাঁর বিখ্যাত উক্তিটি করেছিলেন: “That’s one small step for [a] man, one giant leap for mankind.” (এটি একজন মানুষের জন্য ছোট একটি পদক্ষেপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য এক বিশাল বড় লাফ।)

 

Ads small one

সম্পাদকীয়/প্রসঙ্গ: নদী-খাল দখলমুক্ত করার উদ্যোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬, ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়/প্রসঙ্গ: নদী-খাল দখলমুক্ত করার উদ্যোগ

সাতক্ষীরা জেলার দীর্ঘস্থায়ী ও অভিশাপতুল্য জলাবদ্ধতা সংকটের মূল উৎস নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ হওয়া। কপোতাক্ষ, ইছামতি ও বেতনার মতো প্রবাহমান নদীসহ অসংখ্য সরকারি খাল বছরের পর বছর ধরে প্রভাবশালী দখলদারদের পেটে চলে গেছে। নদী ও খালের জমি গিলে খেয়ে গড়ে তোলা হয়েছে ইটভাটা, শিল্পকারখানা, মাছের ঘের এবং পাকা বসতবাড়ি। এর মাশুল গুণতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে—সামান্য বৃষ্টিতেই জলজটে অচল হয়ে পড়ে জীবনযাত্রা, দেখা দেয় তীব্র মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়। এই বাস্তবতায় জেলা প্রশাসন কর্তৃক ৩০২ জন অবৈধ দখলদারের চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত এবং ৫০ দিনের বিশেষ ‘ক্র্যাশ’ অভিযানের পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, সদর উপজেলার বাবুলিয়া মৌজায় নদী দখল করে গড়ে ওঠা ইটভাটা কিংবা বিনেরপোতায় বেতনা নদীর সীমানার ভেতরে নির্মাণাধীন বিনোদন ও প্রক্রিয়াজাত অবকাঠামো স্পষ্ট করে দেয়, কী পরিমাণ বেপরোয়াভাবে নদীকে লুণ্ঠন করা হয়েছে। কোথাও কোথাও সরকারি খালের অস্তিত্বই মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার উপক্রম। সাতক্ষীরাবাসীর বহুদিনের দাবি ছিলÑপানির প্রবাহ সুগম করতে এই ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
তবে আশঙ্কার জায়গাটি হলো অতীতেও এমন বহু তালিকা প্রণয়ন ও অভিযানের উদ্যোগ আমরা দেখেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ছত্রছায়া, আইনি জটিলতা কিংবা অদৃশ্য প্রভাবে সেই অভিযানগুলো ছোটখাটো দখলদারদের ওপর দিয়ে গিয়েই শেষ হয়ে গেছে; ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে প্রভাবশালী শ্রেণি। ফলে এবার জেলা প্রশাসনের এই অভিযান যেন আর ১০টি ‘লোকদেখানো’ উদ্যোগের মতো মুখ থুবড়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। আইনের প্রয়োগ হতে হবে সার্বজনীন ও বৈষম্যহীন।
অভিযানের পাশাপাশি কিছু বাস্তবভিত্তিক চ্যালেঞ্জও সামনে আসবে। বিশেষ করে লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং খাসের জমিতে বাস করা প্রকৃত ভূমিহীন পরিবারগুলোর টেকসই পুনর্বাসনের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে হবে। ভূমিহীনদের অজুহাতে যেন কোনো শিল্পপতি বা প্রভাবশালী পার না পায়, আবার অভিযান চালাতে গিয়ে যেন কোনো হতদরিদ্র পরিবারকে আশ্রয়হীন করা না হয়Ñএই ভারসাম্যের প্রতি সংবেদনশীল থাকা প্রয়োজন।
নদী ও খাল বাঁচলে সাতক্ষীরা বাঁচবে। তাই নদী রক্ষা কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ক্র্যাশ অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করার মাধ্যমে কপোতাক্ষ, বেতনা ও ইছামতিকে মুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগে শুধু সাময়িক উচ্ছেদ নয়, উচ্ছেদকৃত জমি যাতে পুনরায় হাতছাড়া না হয়, তার জন্য স্থায়ী তদারকি ও সীমানা নির্ধারণ প্রয়োজন। সাতক্ষীরার লাখ লাখ মানুষ জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছেন; জেলা প্রশাসন এবার তাদের প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়নে দৃঢ় ও আপসহীন থাকবেÑএটাই আমাদের প্রত্যাশা।

 

পরাজিত হলেও প্রতিশ্রুতির ১২ অঙ্গীকার পূরণে কাজ করার ঘোষণা বিএনপি প্রার্থীর

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ১১:৩০ অপরাহ্ণ
পরাজিত হলেও প্রতিশ্রুতির ১২ অঙ্গীকার পূরণে কাজ করার ঘোষণা বিএনপি প্রার্থীর

শ্যামনগর প্রতিনিধি: নির্বাচনে জয়ী হতে না পারলেও উপকূলীয় এলাকার উন্নয়নে দেওয়া প্রাক্-নির্বাচনী ১২টি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ড. মো. মনিরুজ্জামান। সোমবার বেলা ১১টায় শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাব কার্যালয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে ‘উপকূলীয় জনপদ, হতে হবে নিরাপদ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এই কথা বলেন তিনি।
সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান অভিযোগ করে বলেন, সরকারের এক প্রভাবশালী আমলার হস্তক্ষেপের কারণেই নিশ্চিত জয় হাতছাড়া করে তাঁকে আইনসভায় যাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে। ভোটাররা প্রতিপক্ষকে তাঁর চেয়ে যোগ্য মনে করেছেন বলেই জয়ী হয়েছেন—এমন মন্তব্য করলেও তিনি জানান, এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রতিশ্রুতি পূরণে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মনিরুজ্জামান উল্লেখ করেন, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার স্থবিরতা কাটাতে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নতুন ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এই জনপদের যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নে কাজ চলছে। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্প বিকাশ, ফিশ প্রসেসিং সেন্টার ও পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার ব্যাপারেও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় মধু শিল্পের সম্প্রসারণ এবং এলাকার একমাত্র উচ্চমাধ্যমিক নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
প্রেসক্লাবের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক সামিউল মনিরের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা কামালের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সোলায়মান কবির, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক আশেক-ই এলাহী মুন্না ও ডাকসুর সাবেক নেতা অধ্যাপক আবু সাঈদ।

 

সাপ্তাহিক ‘বেগম’: বাঙালি নারীর কণ্ঠস্বর ও জাগরণের প্রতীক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ১১:২৬ অপরাহ্ণ
সাপ্তাহিক ‘বেগম’: বাঙালি নারীর কণ্ঠস্বর ও জাগরণের প্রতীক

সাকিবুর রহমান বাবলা
২০ জুলাই বাংলা সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও নারী জাগরণের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। ১৯৪৭ সালের এই দিনে কলকাতার ওয়েলেসলি স্ট্রিট থেকে প্রকাশিত হয় বাংলা ভাষার প্রথম সচিত্র নারী সাপ্তাহিক ‘বেগম’। দেশভাগের প্রাক্কালে যখন নারীদের শিক্ষা, সাহিত্যচর্চা ও জনজীবনে অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত সীমিত, তখন ‘সওগাত’-এর সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের দূরদর্শী উদ্যোগে প্রকাশিত এই পত্রিকা নারী সমাজের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। তৎকালীন প্রতিকূল সামাজিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মুসলিম নারীদের শিক্ষার আলোয় আনার লক্ষ্যেই ছিল। পত্রিকার প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদে স্থান পেয়েছিল নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ছবি। মাত্র ৫০০ কপি মুদ্রিত চার আনা মূল্যের সেই সংখ্যাই পরবর্তীকালে একটি ঐতিহাসিক আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করে।
পত্রিকাটির প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি ও সমাজনেত্রী বেগম সুফিয়া কামাল। তিনি প্রথম চার মাস সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তখন বিএ শ্রেণির ছাত্রী নূরজাহান বেগম শুরু থেকেই ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল ও লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের একদল তরুণী শিক্ষার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণে গড়ে ওঠে ‘বেগম’-এর প্রাথমিক কর্মপরিসর। পরবর্তীকালে নূরজাহান বেগম সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রায় ছয় দশক ধরে পত্রিকাটিকে সফলভাবে পরিচালনা করেন। সম্পাদকীয় বিভাগে ফজলে লোহানীরও গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা ছিল।
দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে ‘বেগম’-এর কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। সে সময় নারীদের ছবি প্রকাশ করা অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। রক্ষণশীল সমাজে অনেক নারী ছদ্মনামে লিখতেন, কিন্তু ‘বেগম’ তাঁদের নিজস্ব নাম ও ছবিসহ লেখা প্রকাশের জন্য উৎসাহিত করত। এটি ছিল তৎকালীন সময়ে এক বৈপ্লবিক ঘটনা। এর ফলে অসংখ্য নারী প্রথমবারের মতো জনপরিসরে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরার সুযোগ পান।
নারী সাংবাদিকতার বিকাশে ‘বেগম’-এর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৮ ও ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যাগুলোও পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং নারীদের লেখালেখির পরিসর সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখে। এটি শুধু সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রই তৈরি করেনি, বরং নারী সাংবাদিক, সম্পাদক ও সাহিত্যিক তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবেও গড়ে উঠেছিল। সুফিয়া কামাল, শামসুন্নাহার মাহমুদ, জাহানারা আরজু, নীলিমা ইব্রাহিম, রাজিয়া খাতুন, প্রতিভা গাঙ্গুলী, সেলিনা পান্নি এবং পরবর্তীকালে সেলিনা হোসেনসহ বহু বিশিষ্ট লেখকের সাহিত্যজীবনের সঙ্গে ‘বেগম’-এর নিবিড় সম্পর্ক ছিল।
বেগম’ কেবল একটি পত্রিকা ছিল না, বরং তা তৎকালীন পাঠিকাদের কাছে একটি ‘পরিবার’-এর মতো হয়ে উঠেছিল। ডাকযোগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পত্রিকা পৌঁছানো এবং পাঠিকাদের চিঠি ও লেখা প্রকাশের মাধ্যমে এটি শহর ও গ্রামের নারীদের মধ্যে একটি শক্তিশালী যোগাযোগসূত্র গড়ে তোলে, যা ‘বেগম-পাঠিকা সভা’ নামেও পরিচিতি পায়। এই সংযোগ নারীদের একাকীত্ব দূর করে তাঁদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। সাহিত্য ও সামাজিক বিষয়ের পাশাপাশি পরিবার ও জীবনযাপনভিত্তিক নানা বিষয়ও নিয়মিত প্রকাশিত হতো।
১৯৫৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বেগম ক্লাব’। শামসুন্নাহার মাহমুদ ছিলেন এর সভাপতি, নূরজাহান বেগম সেক্রেটারি এবং সুফিয়া কামাল অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন। এটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম নারী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ক্লাব হিসেবে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। ষাট ও সত্তরের দশকে ‘বেগম’ জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে। নারী শিক্ষা, আইনি অধিকার, সামাজিক বৈষম্য, কুসংস্কার দূরীকরণ ও আত্মনির্ভরতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়মিত স্থান পেত এর পাতায়।
বর্তমানে ‘বেগম’ মাসিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে এবং এর প্রচ্ছদমূল্য ৫০ টাকা। নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা ফ্লোরা নাসরিন খান পত্রিকাটির দায়িত্ব পালন করছেন। ডিজিটাল যুগে মুদ্রিত পত্রিকার নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ‘বেগম’ তার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। একই সঙ্গে, সাত দশকের সমৃদ্ধ আর্কাইভ ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা সময়ের দাবি, যা নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা যোগাবে। বাংলা সাংবাদিকতা ও নারী জাগরণের ইতিহাসে ‘বেগম’ কেবল একটি পত্রিকা নয়; এটি নারী আত্মপ্রকাশ, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক অগ্রগতির এক ঐতিহাসিক প্রতীক।