সব চাওয়া পূরণ হলেই কি মানুষ সুখী হয়?
সচিচ্চদানন্দ দে সদয়
মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত তার আকাক্সক্ষা। জন্মের পর থেকেই মানুষ কিছু না কিছু চায়। শৈশবে খেলনা, কৈশোরে সাফল্য, যৌবনে প্রতিষ্ঠা, মধ্যবয়সে সম্পদ, আর বার্ধক্যে নিরাপত্তা। একটি চাওয়া পূরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আরেকটি চাওয়া জন্ম নেয়। যেন চাওয়ার কোনো শেষ নেই। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়Ñমানুষের সব চাওয়া যদি পূরণ হয়, তবে কি সে সত্যিই সুখী হয়ে ওঠে? আজকের বিশ্বে উন্নয়নের পরিমাপ অনেকটাই অর্থ, ভোগ এবং বাহ্যিক সাফল্যের ওপর নির্ভরশীল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিংবা অন্যের সাফল্য দেখে আমরা নিজের জীবনকে অসম্পূর্ণ মনে করি।
প্রতিবেশীর বড় বাড়ি, সহকর্মীর দামি গাড়ি কিংবা পরিচিত কারও দ্রুত উন্নতি আমাদের মনে নতুন নতুন চাহিদার জন্ম দেয়। ফলে যা আছে, তার আনন্দ হারিয়ে যায়; যা নেই, তার অভাবই হয়ে ওঠে জীবনের প্রধান অনুভূতি। কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। ইতিহাস, সাহিত্য এবং সমাজÑসবখানেই দেখা যায়, সীমাহীন প্রাপ্তি সব সময় সুখ বয়ে আনে না। বরং অনেক সময় অতিরিক্ত সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা আরাম মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে দেয়। অহংকার বাড়ায়, সম্পর্কের উষ্ণতা কমায়, প্রতিযোগিতা ও অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলে। যে সম্পদ একসময় নিরাপত্তা দেওয়ার কথা ছিল, সেটিই কখনো কখনো উদ্বেগ, ভয় এবং একাকীত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে অভাব বা সীমাবদ্ধতা সব সময় দুর্ভাগ্যের প্রতীক নয়। জীবনের অনেক বড় শিক্ষা আসে অপূর্ণতা থেকে। যে মানুষ সংগ্রাম করেছে, প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়েছে, অপেক্ষা করতে শিখেছেÑসে সাধারণত জীবনের মূল্যও বেশি বোঝে। অল্প প্রাপ্তির আনন্দ তার কাছে অনেক গভীর হয়। কারণ সে জানে, প্রতিটি অর্জনের পেছনে রয়েছে শ্রম, ধৈর্য এবং সময়। জীবনের এই বাস্তবতাকে বোঝাতে একটি সাধারণ পারিবারিক উদাহরণই যথেষ্ট। একটি শিশু অসুস্থ। সে তার প্রিয় মিষ্টি খেতে চায়। কিন্তু মা তাকে তা দেন না।
শিশুটি হয়তো কাঁদে, অভিমান করে, মনে করে মা তাকে ভালোবাসেন না। অথচ সত্য সম্পূর্ণ উল্টো। মা জানেন, এই মুহূর্তে সেই মিষ্টি শিশুর জন্য ক্ষতিকর। তাই সাময়িক কষ্ট দিয়ে তিনি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি থেকে সন্তানকে রক্ষা করেন। এই ঘটনাটি কেবল পারিবারিক সম্পর্কের উদাহরণ নয়; এটি জীবনেরও একটি গভীর সত্য। মানুষ অনেক সময় তাৎক্ষণিক ইচ্ছাকে প্রয়োজন মনে করে। কিন্তু বাস্তবতা সব সময় সেই ইচ্ছার সঙ্গে একমত হয় না। আজ যে সুযোগটি হাতছাড়া হয়েছে বলে আমরা হতাশ, কয়েক বছর পর হয়তো বুঝতে পারিÑসেই ব্যর্থতাই আমাদের অন্য একটি ভালো পথের দিকে নিয়ে গেছে।
আবার যে সাফল্য একসময় জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে হয়েছিল, সেটিই হয়তো পরে নতুন সংকটের কারণ হয়েছে। মনোবিজ্ঞানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা রয়েছেÑহেডোনিক অ্যাডাপটেশন। অর্থাৎ মানুষ নতুন প্রাপ্তির সঙ্গে খুব দ্রুত মানিয়ে নেয়। নতুন বাড়ি, নতুন গাড়ি কিংবা উচ্চ বেতনÑপ্রথমে এগুলো আনন্দ দেয়, কিন্তু কিছুদিন পর সেগুলোই স্বাভাবিক হয়ে যায়। তখন আবার নতুন কিছুর আকাক্সক্ষা তৈরি হয়। অর্থাৎ সুখের উৎস যদি কেবল বাহ্যিক অর্জনের ওপর নির্ভর করে, তবে সেই সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই প্রকৃত সুখের ভিত্তি বাহ্যিক নয়, অভ্যন্তরীণ। কৃতজ্ঞতা, আত্মসংযম, ধৈর্য, সম্পর্কের উষ্ণতা এবং অর্থপূর্ণ জীবনবোধÑএসবই মানুষের মানসিক শান্তির প্রধান উপাদান।
গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা প্রতিদিন নিজের প্রাপ্তির জন্য কৃতজ্ঞ থাকতে পারেন, তাঁদের মানসিক চাপ তুলনামূলক কম থাকে এবং জীবনের প্রতি সন্তুষ্টিও বেশি হয়। দুর্ভাগ্য জনক ভাবে আমরা এমন একটি সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষের মূল্যায়ন অনেক ক্ষেত্রেই তার চরিত্র দিয়ে নয়, সম্পদ দিয়ে করা হয়। একটি শিশুকেও ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়Ñপ্রথম হতে হবে, বেশি উপার্জন করতে হবে, অন্যকে ছাড়িয়ে যেতে হবে। কিন্তু খুব কম মানুষই শেখায়Ñনিজেকে জানো, নিজের সীমা বোঝো, যা আছে তার মর্যাদা দাও এবং অন্যের সুখ দেখে নিজের জীবনকে ছোট করে দেখো না।
অতিরিক্ত ভোগের সংস্কৃতি মানুষকে আরও অস্থির করে তুলছে। বিজ্ঞাপন প্রতিনিয়ত আমাদের বোঝায়Ñএই পণ্যটি কিনলে তুমি সুখী হবে, ওই বাড়িটি পেলে জীবন সফল হবে, আরও বেশি অর্থ উপার্জন করতে পারলেই শান্তি মিলবে। কিন্তু বাস্তব জীবনের পরিসংখ্যান ভিন্ন ছবি তুলে ধরে। অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ অনেক সমাজেই উদ্বেগ, বিষণœতা, নিঃসঙ্গতা ও মানসিক অবসাদের হার বেড়েই চলেছে। অর্থাৎ সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই সুখের একমাত্র উৎস নয়। এর অর্থ এই নয় যে মানুষ উচ্চাকাক্সক্ষী হবে না বা উন্নতির চেষ্টা করবে না।
উন্নতির আকাক্সক্ষা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি এবং সমাজের অগ্র গতিরও চালিকাশক্তি। কিন্তু সেই আকাক্সক্ষা যদি সীমাহীন লোভে পরিণত হয়, তবে তা মানুষকে ক্লান্ত করে। তখন প্রাপ্তির আনন্দের চেয়ে অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা বড় হয়ে ওঠে। বরং জীবনের প্রতি একটি ভারসাম্য পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। চেষ্টা থাকবে, স্বপ্ন থাকবে, পরিশ্রম থাকবেÑকিন্তু সেই সঙ্গে থাকবে ধৈর্য, সংযম এবং ফলাফলকে গ্রহণ করার মানসিক শক্তি। কারণ মানুষ তার প্রচেষ্টাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু সব ফলাফলকে নয়। আমরা প্রায়ই জীবনের ঘটনাগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে বিচার করি।
চাকরি না পাওয়া, ব্যবসায় ক্ষতি, কাক্সিক্ষত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি না হওয়া কিংবা কোনো সম্পর্ক ভেঙে যাওয়াকে আমরা জীবনের শেষ বলে মনে করি। অথচ সময়ের ব্যবধানে দেখা যায়, সেই ঘটনা গুলোই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। জীবনের অনেক সিদ্ধান্তের প্রকৃত মূল্য তখনই বোঝা যায়, যখন আমরা কিছুটা দূরত্ব থেকে ফিরে তাকাই। আজকের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্যের যে সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে, তার অন্যতম কারণ এই অবিরাম তুলনা।
অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে করার প্রবণতা আমাদের সুখ কেড়ে নিচ্ছে। অথচ প্রত্যেক মানুষের জীবন আলাদা, বাস্তবতা আলাদা, সুযোগ-সুবিধাও আলাদা। তাই অন্যের সাফল্যকে নিজের ব্যর্থতার মানদ- বানানো কোনো ভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। প্রকৃত শিক্ষা হলোÑযা আছে, তার সর্বোত্তম ব্যবহার করা; যা নেই, তার জন্য নিরন্তর হাহাকার না করা। কারণ মানুষের চরিত্র গড়ে ওঠে প্রাপ্তি দিয়ে নয়, প্রাপ্তিকে কীভাবে ব্যবহার করছে এবং অপ্রাপ্তিকে কীভাবে গ্রহণ করছে, তার ওপর। শেষ পর্যন্ত সুখ কোনো গন্তব্য নয়; এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি।
যে মানুষ সীমিত সম্পদের মধ্যেও কৃতজ্ঞ থাকতে পারে, সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়, সততা ও সংযমকে জীবনের ভিত্তি বানায় এবং প্রতিটি অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে, তার জীবনেই শান্তি বেশি। সব চাওয়া পূরণ হওয়াই জীবনের সাফল্য নয়। বরং কখন থামতে হবে, কোন আকাক্সক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং কোন প্রাপ্তির জন্য কৃতজ্ঞ হতে হবেÑএই বোধই একজন মানুষকে পরিণত করে। কারণ জীবনের প্রকৃত সমৃদ্ধি সম্পদের পরিমাণে নয়, মনের প্রশান্তিতে। আর সেই প্রশান্তি আসে তখনই, যখন মানুষ বুঝতে শেখেÑসব অপ্রাপ্তি ক্ষতি নয়, সব প্রাপ্তিও আশীর্বাদ নয়।
লেখক: সংবাদকর্মী






