আশাশুনিতে সোনালি ধানের মাঠে ব্যস্ততা, তবু দুশ্চিন্তায় কৃষক
সচ্চিদানন্দ দে সদয়, আশাশুনি: সাতক্ষীরা-আশাশুনি উপজেলার বিস্তীর্ণ গ্রামীণ জনপদে এখন বোরো ধান কাটার ভরা মৌসুম। ভোরের আলো ফোটার আগেই মাঠে নেমে পড়ছেন কৃষক-কৃষাণিরা। কাস্তের টুংটাং শব্দ, ধান মাড়াইয়ের ঘূর্ণি আর শ্রমিকদের হাঁকডাকে মুখর চারপাশ। কোথাও মাথায় করে, কোথাও ভ্যানে, আবার কোথাও ট্রলি করে যাচ্ছে সোনালি ফসল-মাঠ থেকে ঘর পর্যন্ত এখন একটিই দৃশ্য, ব্যস্ততার।
এবারের মৌসুমে বোরো ধানের ফলন তুলনামূলক ভালো হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে প্রথমদিকে কিছুটা স্বস্তি দেখা দিয়েছিল। অনেকেই আশা করেছিলেন, ভালো ফলন মানেই সংসারে স্বস্তি ফিরবে, ঋণের বোঝা কমবে। কিন্তু ধান ঘরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই সেই আশায় ভাটা পড়েছে। মাঠপর্যায়ে ধানের দামের অস্থিরতা আর ফড়িয়া-সিন্ডিকেটের প্রভাব এখন কৃষকের প্রধান দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাজারে যেখানে শুকনো ধানের দাম তুলনামূলক বেশি, সেখানে মাঠ থেকেই কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক কৃষক। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক এবং শ্রমিক মিলিয়ে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে গড়ে ৮৫০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত খরচ পড়ছে। অথচ অনেক কৃষককে ১১০০/১২০০ টাকার মধ্যেই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।
ফলে ভালো ফলনের পরও অনেক কৃষকের মুখে হাসি নেই, বরং বাড়ছে চাপা উদ্বেগ। উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, অনেক কৃষক ঋণ পরিশোধ ও নগদ টাকার প্রয়োজনে ধান ঘরে না তুলে সরাসরি মাঠেই বিক্রি করছেন। দালাল ও ফড়িয়ারা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কম দামে ধান কিনে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কৃষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “এবার ধান ভালো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু লাভ হচ্ছে না।
সার, শ্রমিক আর ঋণের টাকা দিতে গিয়ে বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করছি। হাতে টাকা না থাকলে উপায়ও নেই।” একই গ্রামের আরেক কৃষক হাসানুর রহমান বলেন, “আমরা বছরের পর বছর কষ্ট করে ফসল ফলাই। কিন্তু বাজারে আমাদের জন্য কোনো নিরাপত্তা নেই। সরকার যদি সরাসরি ধান কিনতো, তাহলে আমরা অন্তত ন্যায্যমূল্য পেতাম।” ধান কাটা শ্রমিকরাও বলছেন, কৃষকের মুখে স্বস্তির পরিবর্তে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। শ্রমিক শিউলি বেগম জানান, “কাজের চাপ অনেক, কিন্তু কৃষকদের অবস্থা ভালো না।
দাম কম পাওয়ায় তারা খুব চিন্তায় আছে।” এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বোরো ধানের ফলন সন্তোষজনক হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কৃষকের প্রকৃত লাভ নির্ভর করছে বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরকারি ক্রয় কার্যক্রমের ওপর। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, সরকারি ক্রয় কার্যক্রম আরও সক্রিয় হলে কৃষকরা কিছুটা হলেও ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমবে। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সচেতন করাও চলছে বলে তিনি জানান।
সব মিলিয়ে আশাশুনির গ্রামীণ জনপদে এখন একদিকে সোনালি ধান ঘরে তোলার ব্যস্ততা, অন্যদিকে বাজারদরের অনিশ্চয়তায় কৃষকের চোখে চাপা হতাশা। ভালো ফলনের আনন্দ যেন পুরোপুরি পরিণত হতে পারছে না স্বস্তিতে। কৃষকের প্রত্যাশা-এই সোনালি মৌসুম যেন শেষ পর্যন্ত তাদের ঘরে নিয়ে আসে ন্যায্যমূল্যের হাসি, না যে শুধু পরিশ্রমের হিসাব।






