পলাশ কর্মকার, কপিলমুনি (পাইকগাছা): খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ হারুন বলেছেন, স্যার আচার্য প্রফুল¬চন্দ্র রায় ছিলেন উপমহাদেশের বিজ্ঞানচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ। রসায়ন গবেষণায় আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক, শিল্পোদ্যোক্তা, লেখক ও সমাজহিতৈষী। তাঁর জীবন ও কর্ম বাঙালি জাতির জন্য গর্বের বিষয়। ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট খুলনার তৎকালীণ রাড়ুলী-কটিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন প্রফুল¬চন্দ্র রায়। পরবর্তী সময়ে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যান এবং রসায়ন বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণা করেন। দেশে ফিরে তিনি শিক্ষকতা ও গবেষণায় যুক্ত হন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার পাশাপাশি রসায়ন গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি।
খুলনার পাইকগাছায় জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার আচার্য প্রফুল¬চন্দ্র রায়ের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকীর আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি উক্ত কথাগুলো বলেন। রোববার (২ আগস্ট) সকালে বিজ্ঞানীর জন্মভূমি রাড়ুলী গ্রামের জন্মভিটায় আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন খুলনা জেলা প্রশাসক মিস্ হুরে জান্নাত। এতে বক্তারা বিজ্ঞানচর্চা, শিক্ষা, গবেষণা ও মানবকল্যাণে পিসি রায়ের অবদানের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের মধ্যে তাঁর জীবন ও কর্ম ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
এসএফডিএফ কর্মকর্তা জি. এম. জাকারিয়া ও প্রভাষক লৎফা ইসলাম এর সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কানিজ ফাতিমা লিজা, স্বাগত বক্তব্য দেন পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী। বক্তব্য দেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফজলে রাব্বি, প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের উপ-পরিচালক মুহিদুল ইসলাম, সহকারী পুলিশ সুপার (ডি সার্কেল) আমির হামজা, উপজেলা বিএনপির সভাপতি ডা. আবদুল মজিদ, পৌর বিএনপির সভাপতি আসলাম পারভেজ, বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী রুহুল আমিন, ওসি (অপারেশন) জুলফিকার আলী, সিনিয়র সাংবাদিক দিদারুল আলম, সহকারী অধ্যাপক আবদুল মমিন সানা, কাজী সাজ্জাদ আহমেদ মানিক, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক জয়ন্ত কুমার ঘোষ প্রধান শিক্ষক গৌতম ঘোষ প্রমূখ।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, রসায়ন গবেষণায় তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদানের মধ্যে মারকিউরাস নাইট্রাইট নিয়ে গবেষণা বিশেষভাবে আলোচিত। তিনি শুধু গবেষণাগারে বিজ্ঞানচর্চা করেননি, সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা তৈরিতেও কাজ করেছেন। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানবিষয়ক লেখালেখির মাধ্যমে বিজ্ঞানকে মানুষের কাছে সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর রচিত ‘হিন্দু রসায়নের ইতিহাস’ বিজ্ঞান ও ইতিহাসচর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত। বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরতার জন্যও কাজ করেন পিসি রায়।
১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস। দেশীয় শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর এই উদ্যোগ তৎকালীণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিজ্ঞান ও শিল্পকে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর যে চিন্তা তিনি করেছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। পিসি রায়ের জন্মবার্ষিকীর এই আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যেও ছিল আগ্রহ। জন্মভিটায় আয়োজিত আলোচনা সভায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। বক্তারা পিসি রায়ের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং তাঁর জন্মভূমিকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও পরিচিত করে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
স্থানীয়দের মতে, পিসি রায়ের জন্মভূমি রাড়ুলী শুধু পাইকগাছা বা খুলনার নয়, পুরো দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এই এলাকা বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যটন ও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। সাথে সাথে তার মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত উপমহাদেশের দ্বিতীয় ও দেশের প্রথম বালিকা বিদ্যালয় ভূবন মোহিনী বালিকা বিদ্যালয় সরকারি করণ জরুরী।