বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩

গাছ কাটছি মানে আমরা নিজেদেরই হত্যা করছি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ
গাছ কাটছি মানে আমরা নিজেদেরই হত্যা করছি

নিকোলাস বিশ্বাস
প্রতিদিন শহর, নগর ও গ্রামীণ এলাকায় উন্নয়নের নামে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। রাস্তা, ভবন, শিল্পকারখানা, আবাসন ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের জন্য বনভূমি উজাড় করা হচ্ছে। আমরা প্রায়ই এসব কর্মকা-কে অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে দেখি। কিন্তু এই উন্নয়নের বিনিময়ে আমরা কী হারাচ্ছি, তা খুব কমই বিবেচনা করি। বাস্তবে, আমরা পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অবকাঠামো-গাছ ও বনভূমি-ধীরে ধীরে ধ্বংস করছি।
গাছ কেবল আমাদের চারপাশের সৌন্দর্য বাড়ায় না। তারা জীবন্ত ব্যবস্থা, যা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য সেবা দিয়ে যায়। গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ ও কার্বন সঞ্চয় করে, জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং বায়ুম-লে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব কমাতে ভূমিকা রাখে। গাছপালা বায়ুর মান উন্নত করে, পরিবেশ ঠান্ডা রাখে, মাটির গুণাগুণ বজায় রাখে, জীববৈচিত্র্যকে সহায়তা করে এবং প্রতিবেশব্যবস্থাকে আরও সহনশীল করে তোলে।
গাছ হলো প্রাকৃতিক অবকাঠামো
অবকাঠামো বলতে আমরা সাধারণত রাস্তা-ঘাট, সেতু, নিষ্কাশনব্যবস্থা, বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক ও ভবনের কথা বুঝি। কিন্তু প্রাকৃতিক ব্যবস্থাও অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গাছ তার অন্যতম মূল্যবান অংশ।
গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, বায়ুর দূষণ কমাতে সাহায্য করে এবং ছায়া ও প্রাকৃতিক শীতলীকরণের মাধ্যমে শহরের তাপমাত্রা কমায়। তারা বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করে এবং মাটিকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করে। বন, পার্ক ও একক গাছও পাখি, কীটপতঙ্গ এবং অসংখ্য জীবের আবাসস্থল।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা, খরা ও চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে গাছ ধ্বংস করা মানে নিজেদের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিনষ্ট করা।
উন্নয়নের গোপন মূল্য
উন্নয়ন কোন সমস্যা নয়। মানুষের বাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল, রাস্তা-ঘাট, ব্যবসা ও কর্মসংস্থান প্রয়োজন। সমস্যা হয় যখন উন্নয়নের পরিকল্পনায় প্রকৃতির মূল্যকে উপেক্ষা করা হয়।
একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ তার পরিবেশগত সক্ষমতায় পৌঁছাতে কয়েক দশক সময় নিতে পারে, অথচ সেটি কেটে ফেলতে কয়েক মিনিটই যথেষ্ট। একটি ছোট চারা লাগালেই সেই পুরোনো গাছের পরিবেশগত সেবা তাৎক্ষণিকভাবে ফিরে আসে না। নতুন গাছকে ছায়া, কার্বন সঞ্চয়, আবাসস্থল ও অন্যান্য সুবিধা দিতে বহু বছর সময় লাগে। ফলে একটি অদৃশ্য পরিবেশগত ঋণ তৈরি হয়।
গাছের সংখ্যা কমে গেলে রাস্তা ও শহর আরও উত্তপ্ত হতে পারে, বায়ুর মান খারাপ হতে পারে, পানি জমা ও ভূমিক্ষয় বাড়তে পারে এবং জীববৈচিত্র্য চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। এর পরিণতিতে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার, স্বাস্থ্যঝুঁকি, বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ও পরিবেশগত অবক্ষয়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ব্যয়ও অনেক বাড়ে।
শহরে আগের চেয়ে বেশি গাছ প্রয়োজন
নগরায়ন দ্রুত বাড়ছে। শহরগুলো কংক্রিট, কালো পিচ-ঢালা পথ ও কাঁচে তৈরী ভৌত অবকাঠামোয় ভরে যাচ্ছে, যা তাপ শোষণ ও ধরে রাখে এবং নগরে তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে তাপবলয় সৃষ্টি করে।
গাছ এই সমস্যার একটি প্রাকৃতিক সমাধান। তাদের ছায়া মানুষ ও ভবনকে সরাসরি সূর্যের আলো থেকে রক্ষা করে এবং উদ্ভিদের বাষ্পমোচন পরিবেশকে ঠান্ডা করতে সাহায্য করে। গাছঘেরা রাস্তা হাঁটা ও বসবাসের জন্য আরামদায়ক। পার্ক ও নগর-বন মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ দেয়। তাই ঘনবসতিপূর্ণ শহরে গাছকে ঐচ্ছিক সৌন্দর্যবর্ধক উপাদান নয়, বরং অপরিহার্য নগর অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
বন শুধু গাছের সমষ্টি নয়
বন কেবল অনেকগুলো গাছের সমষ্টি নয়; এটি একটি জটিল প্রতিবেশব্যবস্থা, যেখানে গাছ, উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীব, মাটি ও পানি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
বন ধ্বংস হলে আমরা শুধু গাছ হারাই না। পাখি হারায় বাসা বাঁধার স্থান, কীটপতঙ্গ হারায় খাদ্যের উৎস এবং বন্যপ্রাণী হারায় আশ্রয়। মাটি ক্ষয়ের ঝুঁকিতে পড়ে এবং পানি ব্যবস্থাও বিঘিœত হয়। জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি প্রতিবেশব্যবস্থার সহনশীলতা দুর্বল করে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশ পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
আমাদের অক্সিজেন কারখানা ধ্বংস হচ্ছে
“আমরা নিজেরাই আমাদের অক্সিজেন কারখানা ধ্বংস করছি” -এই বক্তব্যটি আধুনিক সমাজের একটি বড় বৈপরীত্য তুলে ধরে। আমরা জীবনের জন্য প্রকৃতির ওপর নির্ভর করি, অথচ সেই জীবনধারণের পরিবেশ টিকিয়ে রাখা প্রাকৃতিক ব্যবস্থাগুলোই আমরা ক্রমান্বয়ে ধ্বংস করছি।
গাছ বৈশ্বিক কার্বন ও অক্সিজেন চক্রের অংশ। তবে বনের গুরুত্ব শুধু অক্সিজেন উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়। তারা কার্বন সঞ্চয় করে, স্থানীয় জলবায়ুকে প্রভাবিত করে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে, মাটি সংরক্ষণ করে এবং পানি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। একটি প্রাচীন বন ধ্বংস করে হটাৎ পরিবেশগত কার্যক্রম প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
প্রকৃতি কোনো ঐচ্ছিক সুবিধা নয়
অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার পূরণের পর প্রকৃতি রক্ষা করা যাবে – এমন ধারণা মৌলিকভাবে ভুল। কারণ অর্থনীতিও প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল।
কৃষি নির্ভর করে মাটি, পানি, পরাগায়নকারী জীব ও স্থিতিশীল জলবায়ুর ওপর। শহর নির্ভর করে কার্যকর পানি ও নিষ্কাশনব্যবস্থার ওপর। মানুষ নির্ভর করে শ্বাসযোগ্য বায়ু ও সহনীয় তাপমাত্রার ওপর। ব্যবসা ও অবকাঠামো নির্ভর করে বন্যা, ঝড় ও তাপপ্রবাহ মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর। তাই প্রাকৃতিক ব্যবস্থা অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেকে আলাদা নয়। বরং এটি অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি ও পরিপূরক।
গাছ লাগানোর পাশাপাশি গাছ রক্ষা করতে হবে
গাছ লাগানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি পরিবেশ পুনরুদ্ধার ও সবুজ এলাকা সম্প্রসারণে সহায়তা করে। কিন্তু শুধু নতুন চারা লাগালেই সমস্যার সমাধান হবে না। বিদ্যমান পূর্ণবয়স্ক গাছ ও বনভূমিও রক্ষা করতে হবে।
একটি বড় গাছ কেটে অন্য কোথাও একটি চারা লাগানোকে সমতুল্য পরিবেশগত বিনিময় বলা যায় না। তাই বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি সংরক্ষণও জরুরি।
একটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সাফল্য শুধু কতগুলো চারা বিতরণ করা হয়েছে তা দিয়ে নয়, বরং কতগুলো গাছ বেঁচে আছে, বেড়ে উঠেছে এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশে অবদান রাখছে- তা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত।
উন্নয়ন-এর নতুন সংজ্ঞা
উন্নয়ন বলতে আমরা কী বুঝি, তা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কংক্রিটে ভরা কিন্তু গাছহীন শহরকে সবসময় সফল বলা যায় না। প্রাকৃতিক নিষ্কাশনব্যবস্থা ধ্বংসের কারণে যে জনগোষ্ঠী বন্যার ঝুঁকিতে থাকে, তাকে সহনশীল বলা যায় না। যেমন কিছুদিন আগে চট্রগ্রাম শহর সহ অন্যান্য অঞ্চলে বহু ভবনের নীচতলা বন্যায় ডুবে যায়। পরিবেশ ধ্বংস করে যে অর্থনীতি গড়ে ওঠে, তা আগামী দিনের জন্য বিশাল ব্যয়ের ঝূঁকি তৈরি করে।
প্রকৃত অগ্রগতি হওয়া উচিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশগত স্থায়িত্বের সমন্বয়ে। রাস্তা-ঘাট, সেতু ও ভবনের পাশাপাশি বন, জলাভূমি, নদী, পার্ক ও গাছকেও অবকাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। উন্নয়নের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রকৃতির সঙ্গে কাজ করা, প্রকৃতিকে ক্রমাগত প্রতিস্থাপন করা নয়।
প্রতিটি গাছের একটি গল্প আছে
পরেরবার কোনো গাছ লাগানো, রক্ষা বা সংরক্ষণ করার সময় শুধু তার ছায়ার কথা ভাববেন না। ভাবুন-সে কতটা কার্বন সঞ্চয় করবে, কীভাবে বায়ু পরিষ্কার করতে সাহায্য করবে, কীভাবে তাপ কমাবে এবং মাটির গুণাগুণ রক্ষা করবে। ভাবুন – কত পাখি, কীটপতঙ্গ ও অন্যান্য জীব তার ওপর নির্ভর করবে। ভাবুন – ভবিষ্যতে কোনো শিশু হয়তো তার ছায়ায় বসবে। একটি গাছ শুধু জমি দখল করে থাকা উদ্ভিদ নয় কিংবা বিভিন্ন আসবাবপত্র তৈরীর জন্য নয়। বরং এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি উত্তম বিনিয়োগ।
নেপালের বন্যা ও আমাদের শিক্ষা
প্রাকৃতিক বিপর্যয় মানুষের জীবন ও সম্পদের জন্য বড় হুমকি। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, ভূমিধস ও খরার মতো দুর্যোগে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরই ভয়াবহ উদাহরণ দেখা গেছে গত ২৬ আগস্ট ২০২৬, নেপালে। হিমালয় অঞ্চলে বরফ ও পাথরের বিশাল ধসের পর আকস্মিক বন্যা নেপালের রসুয়া ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। বন্যার স্রোতে ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বহু মানুষ নিহত ও নিখোঁজ হন। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা, পরিবেশ সুরক্ষা, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
উপসংহার: মানুষ একদিকে প্রাকৃতিক অবকাঠামো ধ্বংস করবে, অন্যদিকে সেই ক্ষতি পূরণে কৃত্রিম ব্যবস্থা তৈরিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করবে – এভাবে চলতে পারে না। গাছ ও বনভূমির ক্ষেত্রে আমাদের মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে।
সরকারকে বিদ্যমান বন ও গাছপালা রক্ষায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শহর পরিকল্পনায় সবুজ অবকাঠামোকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। জনগণকে গাছ রক্ষা ও পুনরুদ্ধারে অংশ নিতে হবে। গাছ লাগানো ও পরিচর্যা করা শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ নয়- এটি একটি নিরাপদ ও সহনশীল ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন।
গাছের সেবা অপরিহার্য, নিরবচ্ছিন্ন এবং অধিকাংশ সময় অদৃশ্য। গাছের মূল্য শুধু কাঠ বা জমির দামের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না। এগুলো প্রাকৃতিক অবকাঠামো, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল এবং জলবায়ু সুরক্ষার অংশ।
গাছ কেটে উন্নয়ন করা কোন বিবেচনাপ্রসূত কাজ নয়। বরং আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত: আমরা যদি অক্সিজেন তৈরীর এই প্রাকৃতিক কারখানাটিকে ক্রমাগত ধ্বংস করতেই থাকি, তাহলে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা কেমন ভবিষ্যৎ রেখে যাব! এই প্রশ্নই আজ আমাদের সকলের কাছে! লেখক: নিকোলাস বিশ্বাস একজন মিডিয়া ফ্রীল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (টঘঋচঅ) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত

Ads small one

সম্পাদকীয়/ কপোতাক্ষের খালে পাট পচন: জলাশয় রক্ষা ও মৎস্যজীবীদের বাঁচাতে দরকার টেকসই সমাধান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ কপোতাক্ষের খালে পাট পচন: জলাশয় রক্ষা ও মৎস্যজীবীদের বাঁচাতে দরকার টেকসই সমাধান

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার কৃষ্ণনগর-সেনেরগাঁতী খালের সুুইসগেট বন্ধ রেখে দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিমভাবে পানি আটকে পাট পচানো হচ্ছে। এতে খালের পানি বিষাক্ত ও দূষিত হয়ে যেমন ব্যাপক হারে মাছ মারা যাচ্ছে, তেমনি তীব্র দুর্গন্ধে হুমকির মুখে পড়েছে স্থানীয় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য। সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে স্থানীয় মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের ওপর—যাঁরা জীবন-জীবিকার জন্য বহু বছর ধরে এই জলাশয়ের মাছের ওপর নির্ভরশীল। খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ রুদ্ধ হওয়ায় আজ তাঁরা কর্মহীন, ফলে বাধ্য হয়ে এনজিওর ঋণ ও দেনার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে বহু পরিবার।
কৃষিপ্রধান আমাদের এই অঞ্চলে পাট উৎপাদন ও পাট পচানো কৃষকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক কর্মকা-, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কৃষির একটি খাতকে রক্ষা করতে গিয়ে যদি কপোতাক্ষ নদসংলগ্ন খালের স্বাভাবিক ইকোসিস্টেম বা পরিবেশ ধ্বংস করা হয় এবং অন্য একটি পেশাজীবী সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ নিস্ব ও উপবাসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়, তবে তা কোনোভাবেই টেকসই বা গ্রহণযোগ্য উন্নয়ন হতে পারে না।
প্রভাবশালী মহলের সুবিধার্থে খালের ওপর নির্মিত কপোতাক্ষের পানির কপাট বা সুইচগেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত কেবল ব্যক্তিস্বার্থই চরিতার্থ করে, অথচ তা সামগ্রিক জনস্বার্থ ও সরকারি জলাশয় ব্যবস্থাপনার মূলনীতির পরিপন্থী। উন্মুক্ত জলাধারে এভাবে পানিপ্রবাহ আটকে রাখা এবং পরিবেশদূষণ ঘটানো পরিবেশ আইন ও মৎস্য সুরক্ষা আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
এই সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। কৃষ্ণনগর খালের সুইচগেটটি খুলে দিয়ে দ্রুত কপোতাক্ষের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ চালু করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে দূষিত পানি সরে গিয়ে পরিবেশ তার স্বাভাবিক ভারসাম্য ফিরে পায়। পাশাপাশি, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক পদ্ধতিতে পাট পচানোর ব্যবস্থা জোরদার করতে কৃষি বিভাগকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু তা-ই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত ও দেনাগ্রস্ত জেলে পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনে জরুরি সহায়তা প্রদান করা সরকারের দায়িত্ব। জলাশয় সবার, একে ব্যক্তিস্বার্থে জিম্মি করে পরিবেশ ও জনজীবন বিপন্ন করার সংস্কৃতি এখনই বন্ধ করতে হবে।

 

 

 

শ্যামনগরে সালিসে হত্যার হুমকির অভিযোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ
শ্যামনগরে সালিসে হত্যার হুমকির অভিযোগ

শ্যামনগর প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জমিজমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আয়োজিত সালিস বৈঠকে পুলিশের উপস্থিতিতেই অভিযোগকারীকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মো. মোকসেদ আলী নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ২৬ আগস্ট বিকেলে শ্যামনগর সদরে এ ঘটনা ঘটে।
অভিযোগকারী নকিপুর গ্রামের বাসিন্দা সুজা মাহমুদ জানান, তাঁদের কেনা ও দীর্ঘদিনের ভোগদখলীয় জমিতে গত ২৫ আগস্ট চাষাবাদ করতে গেলে মোকসেদ আলীসহ কয়েকজন বাধা দেন এবং মারধরের হুমকি দেন। এ নিয়ে স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তি ও দুই পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে সালিস বৈঠক বসে। অভিযোগকারীর দাবি, সালিসে মোকসেদ আলী জমির কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। উল্টো সালিস চলাকালেই তিনি সুজা মাহমুদকে জমিতে গেলে প্রাণনাশের হুমকি দেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মো. মোকসেদ আলী নিজেকে ‘ভূমিহীন নেতা’ দাবি করে বলেন, জমিটি সরকারি খাসজমি এবং তা ভূমিহীনদের বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
আইনজীবী এসএম বিপ্লব হোসেন বলেন, জমিটি খাস নাকি বন্দোবস্ত দেওয়াÑতা সরকারি খতিয়ান ও নথি দেখে নির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা হুমকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সাতক্ষীরায় রেল লাইন ও সম্ভাবনা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ
সাতক্ষীরায় রেল লাইন ও সম্ভাবনা

 

শ্যামল শীল
১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর দর্শনা-জগতি রেললাইন নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথম রেলওয়ের সূচনা হয়। সেন্ট্রাল রেলওয়ে নামে পরিচিত বনগাঁ-যশোর-খুলনা ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণ করা হয় ১৮৮২-৮৪ সালে । এ সময় নাভারনে রেলওয়ে স্টেশনও নির্মাণ করা হয়। ১৯১৪ সালে ভাইসরয় অব বৃটিশ ইন্ডিয়া কলকাতা থেকে নাভারণ হয়ে সাতক্ষীরার মধ্য দিয়ে সুন্দরবন পর্যন্ত রেল লিংক স্থাপনের নির্দেশ দেন এবং সেটি অনুমোদনও করেন। ১৯৫৮ সালে সাতক্ষীরা ভেটখালী সড়ক নির্মাণের সময়েও রেলের জায়গা রেখে জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা নেওয়ার কথা শোনা যায়। কালেক্রমে দেশে ২ হাজার ৮৭৭ কি. মি. রেল লাইন নির্মাণ করা হয়। রেল নেটওয়ার্কে দেশের ৪৪টি জেলা সংযুক্ত হয়। কিন্তু সাতক্ষীরা থেকে যায় অবহেলিত।
দেশের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এবং বাণিজ্য নির্ভর ও অর্থনীতির সুতিকাগার হিসেবে সাতক্ষীরা বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত করেছে। জেলার বিশলক্ষাধীক মানুষের যাতায়াত এবং যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম সড়ক পথ আর তাই জেলাবাসির দীর্ঘদিনের দাবী প্রত্যাশা আর বাস্তবতার নিরিখে যথাযথ প্রত্যাশা রেলপথ, রেল যোগাযোগ। এই মাধ্যমটি যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে খরচ অনেকাংশে কম, সাতক্ষীরা বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘনিষ্ট ভাবে সম্পৃক্ত। এবং অভ্যন্তরীন বানিজ্য নির্ভর। এই জেলায় উৎপাদিত চিংড়ী বিশ্ব বাজারে রপ্তানীর মাধ্যমে দেশ প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করে, এই চিংড়ী পণ্য পরিবহনে রেল যোগাযোগ, রেলপথ কাঙ্খিত ভূমিকা পালন করতে পারে বিশেষত পণ্য পরিবহনে খরচ কম সহ হিমায়িত বিষয় গুলোতে সুবিধা পাবে। দেশের অন্যতম স্থল বন্দর সাতক্ষীরার ভোমরায় অবস্থিত। দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা ভোমরা বন্দর ব্যবহারে বিশেষ উৎসাহিত হতো যদি জেলায় রেলপথ থাকতো। আর এ ক্ষেত্রে আমদানী ও রপ্তানী কৃত পণ্য সামগ্রী ট্রাকের পরিবর্তে রেলে নিলে পণ্য পরিবহন খরচ অনেকাংশে হ্রাস পাবে। বেনাপোল সহ দেশের অপরাপর বন্দর গুলো রেলযোগাযোগ সুবিধা পেয়ে আসছে। সাতক্ষীরা কৃষি প্রধান এলাকা এই জেলাকে শস্য ভান্ডার বলা হয়। কৃষক তার ক্ষেতে উৎপাদিত পণ্য ট্রাকের পরিবর্তে রেলে আনা নেওয়া করলে পণ্য পরিবহন খরচ অনেকাংশে কমবে। অন্যদিকে সাধারন ব্যবসায়ীরা আড়ৎদার ও পাইকারী ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন যাবৎ রাজধানী ঢাকা বা অন্যান্য শহর হতে পণ্য সামগ্রী ট্রান্সপোর্টের মাধ্যমে আনা নেওয়া করে থাকে যা অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়। সাম্প্রতিক সময় গুলোতে ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ীরা পণ্য সামগ্রী আনা নেওয়া ক্ষেত্রে কোন কোন ক্ষেত্রে নিজেদের খেয়াল খুশি মত মূল্য নির্ধারন করে গ্রাহকদের অস্বস্তিতে ফেলছে। রেলগাড়ী দৃশ্যতঃ বিপুল সংখ্যক যাত্রী এবং ব্যাপক ভিত্তিক পণ্য সামগ্রী বহনে ও পরিবহনে প্রস্তুত বিধায় যাতায়াত যোগাযোগের ক্ষেত্রে রেল গাড়ীর বিকল্প কেবলই রেলগাড়ী। সাতক্ষীরা মুন্সিগঞ্জ টু বেনাপোল, যশোর, খুলনা রেল যোগাযোগের বিষয়টি যেমন সময়ের দাবী অনুরুপ ভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দাবীর যৌক্তিকতার সাথে সহমত ও পোষন করেছে। সরকারের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ সহ একনেকের বৈঠকেও রেল যোগাযোগ তথা সাতক্ষীরা রেলপথে আনার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিন্তু এখনও পর্যন্ত দৃশ্যতঃ কোন কাজ শুরু হইনি। জেলাবাসি আশা অবিলম্বে রেললাইন নির্মান কাজ শুরু হোক। সাতক্ষীরার অর্থনীতি এবং ব্যবসা বানিজ্যের নবদিগন্তের ক্ষেত্র নিশ্চিত করবে রেলপথ অন্যদিকে রেলপথের অভাব হেতু সাতক্ষীরার কাঙ্খিত উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়েছে। রেলযোগাযোগ কেবল যাতায়াত যোগাযোগ এবং অর্থনীতির গতিশীলতা বিনির্মান করবে তা নয় নগরায়ন, সভ্যতা, নতুন নতুন হাট বাজার ও মোকাম সৃষ্টি করবে, গ্রামের মেঠো পথ নগরায়নের ছোয়া পাবে, আলোকিত হবে গ্রামীন জনপথ সব মিলে রেলপথ সংযুক্ত সাতক্ষীরা হবে আধুনিক, উন্নয়ন নির্ভর ব্যবসা সফল আর অর্থনীতির আলোকিত সাতক্ষীরা। কিন্তু সেই সুসময় সম্ভব কেবল মাত্র রেল পথের মাধ্যমেই। সাতক্ষীরার বিশলক্ষাধীক মানুষের আশার প্রতীক রেল পথ কতদূর?
১১১ বছর পূর্ব থেকে সাতক্ষীরার মানুষ রেলের স্বপ্ন দেখছে। কৃষি উৎপাদন, মৎস্য চাষ, সুন্দরবন ও পর্যটন, ভারতের সাথে ব্যবসা—বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সাতক্ষীরার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এখানকার মোট কৃষি জমির এক—তৃতীয়াংশের বেশি জমিতে বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষ হয়। জেলায় মাছের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত প্রায় ৯০ হাজার মেট্রিক টন মাছের এর একাংশ বিদেশে রপ্তানি এবং অবশিষ্ট মাছ দেশের অন্যান্য এলাকায় সরবরাহ হয়। সাতক্ষীরার আম এখন বিশ্ববাজারে জনপ্রিয়, কুল, ধানসহ শাক সবজির ক্ষেত্রেও সাতক্ষীরা জেলা উদ্বৃত্ত খাদ্য শস্য উৎপাদন করে। এই উদ্বৃত্ত খাদ্য শস্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা হয়। যার একটা বড় অংশ দেশের বিভিন্নস্থান ছাড়াও দেশের বাইরে রপ্তানী হয়। সড়ক পথে সুন্দরবন ভ্রমনের একমাত্র সুযোগ রয়েছে সাতক্ষীরা জেলায়। ঢাকা বা দেশের অন্যান্য স্থান থেকে যে কোন যানবাহনে সাতক্ষীরা শহরের উপর দিয়ে শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ পৌছালেই চুনকড়ি নদীর ওপারে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। পর্যটনে কক্সবাজারের পরেই সুন্দরবন হতে পারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্পট। বাংলাদেশ—ভারতের মধ্যকার ২৭২কি.মি. সীমান্ত রয়েছে সাতক্ষীরা জেলায়। এখানকার ভোমরা স্থল বন্দর থেকে মাত্র ৮০কি.মি. দূরত্বে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতা শহর অবস্থিত। কোলকাতা সমুদ্র বন্দরের সবচেয়ে নিকটে রয়েছে অধুনালুপ্ত সাতক্ষীরার বসন্তপুর নৌবন্দর। এটিই বাংলাদেশ ভারতের মধ্যকার ব্যবসা—বানিজ্যের সেতুবন্ধনকারী একমাত্র নৌবন্দর। এবছর সাতক্ষীরায় উৎপাদিত আম কুরিয়ারে ঢাকায় পাঠাতে কেজি প্রতি খরচ হয়েছে ১২ থেকে ১৫ টাকা। প্যাকিংসহ অন্যান্য খরচ যোগ করলে প্রতি কেজির খরচ ২০ টাকার কম নয়। একই আম চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে রেলওয়ের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠাতে প্রতি কেজির খরচ হয়েছে ১টাকা ৩১ পয়সা। রেলে ঝুক্কি—ঝাকি কম হওয়ায় প্যাকিংসহ অন্যান্য খরচ কম। ফলে রেলে আম পরিবহনে প্যাকিংসহ খরচ গড়ে ৫টাকার বেশি নয়। সাতক্ষীরা এবং চাপাইনবাবগঞ্জের এই আম পরিবহনের খরচের পার্থক্য গড়ে প্রায় ১৫ টাকা। সেক্ষেত্রে সাতক্ষীরার আম তুলনামূলক সুস্বাদু হওয়া সত্বেও পরিবহন ব্যয়ের এই পার্থক্যের কারনে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পিছিয়ে পড়ছে।
আশির দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সাতক্ষীরার যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ করে পন্য পরিবহনের সিংহভাগ ছিল নদী কেন্দ্রীক। তখন সড়ক পথে খুলনায় যেতে হতো যশোর হয়ে এবং সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় যেতে সময় লাগতো ১৫/২০ ঘন্টা। নৌপথ বন্ধ হওয়ার পর সারাদেশের সাথে সাতক্ষীরার যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এখন সড়ক পথ। সারাদেশে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগন্তরকারী উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে সাতক্ষীরায় সড়ক উন্নয়ন হয়েছে কম। এর অন্যতম প্রধান কারন মনে করা হয় সাতক্ষীরা বাংলাদেশের দক্ষিণ—পশ্চিমাঞ্চলের সর্বশেষ জেলা।
প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানারেইল কোম্পানি লিমিটেড সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কার্যক্রম সম্পন্ন করে এবং এ সম্পর্কিত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেয়। নাভারণ—সাতক্ষীরা—মুন্সিগঞ্জ রেললাইনের সম্ভাব্যতা ম্যাপে নাভারণ থেকে সাতক্ষীরা হয়ে শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জ গ্যারেজ পর্যন্ত ৯৮ দশমিক ৪২ কিলোমিটার এলাকায় মোট আটটি স্টেশনের কথা বলা হয়। স্টেশনগুলোর সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করা হয় নাভারণ, বাগআচড়া, কলারোয়া, সাতক্ষীরা, পারুলিয়া, কালিগঞ্জ, শ্যামনগর ও মুন্সীগঞ্জে। এছাড়া ম্যাপে বাঁকাল, লাবণ্যবতী, সাপমারা খাল ও কাকশিয়ালী নদীর ওপর রেল সেতু নির্মাণের স্থান নির্ধারণ করা হয়। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, নাভারন থেকে বাগআচড়া স্টেশনের দূরত্ব ১২ দশমিক ৪ কিলোমিটার, বাগআচড়া থেকে কলারোয়া ১২ দশমিক ৬৮, কলারোয়া থেকে সাতক্ষীরা ১৪ দশমিক ২৩, সাতক্ষীরা থেকে পারুলিয়া ১৫ দশমিক ১১, পারুলিয়া থেকে কালিগঞ্জ ১৮ দশমিক ৩৭, কালিগঞ্জ থেকে শ্যামনগর ১৩ দশমিক ৮২ ও শ্যামনগর থেকে মুন্সীগঞ্জ স্টেশনের দূরত্ব হবে ১১ দশমিক ৮১ কিলোমিটার। প্রকল্পটি মুন্সিগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের পরিবর্তে আরও ১০ কি.মি. বাদ দিয়ে শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ গ্যারেজ বাজার পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয় এবং সেটিরই পিডিপিপি প্রণয়ন করা হয়।
এর আগে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ‘কন্সট্রাকশন অব নিউ বিজি ট্র্যাক ফর্ম নাভারন টু সাতক্ষীরা’ প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৩২৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা চীনের কাছে থেকে ঋণ সহায়তা চাওয়া হয়। প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৬৬২ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৩৩২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। পাকিস্তান শাসন আমলে ১৯৫৮ সালে সাতক্ষীরা—ভেটখালী সড়ক নির্মাণের সময়ও রেললাইনের জায়গা ধরে জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়। তখনও রেলের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। কিন্তু সে প্রক্রিয়া বেশিদুর যায়নি।
এই পরিস্থিতির অবসানে জরুরিভাবে নাভারন—সাতক্ষীরা—মুন্সিগঞ্জ রেল লাইন নির্মাণ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সরকারের আশু হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। আর সেজন্য প্রয়োজন সাতক্ষীরার রাজনীতিবীদ, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজসহ সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ। লেখক: সাবেক জবি শিক্ষার্থী ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা