সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩

জামায়াত-এনসিপি জোট থেকে নারী আসনে এমপি হচ্ছেন যারা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:০৯ অপরাহ্ণ
জামায়াত-এনসিপি জোট থেকে নারী আসনে এমপি হচ্ছেন যারা

অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোট থেকে সংরক্ষিত নারী আসনে যারা সংসদ সদস্য মনোনীত হবেন তাদের নাম ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) তাদের তালিকা নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হবে।

বিষয়টি  নিশ্চিত করেছেন ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।

তিনি বলেন, “আগামীকাল সকাল ১০টায় আগারগাঁওয়ের ইসি কার্যালয়ে ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য মনোনীতদের জন্য নমিনেশন পেপার সাবমিট করা হবে।”

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ৭৭টি আসন পায়। এর বিপরীতে জোটটি সংরক্ষিত নারী আসন পাবে ১৩টি। প্রাপ্ত আসন অনুপাতে ৬৮টি আসনের বিপরীতে এককভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পাবে ১২টি আসন। আর এনসিপি পাবে একটি।

তবে জামায়াতের ১২ আসন থেকে তিনটি জোটসঙ্গীদের ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি  জানিয়েছেন ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির অন্যতম সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মাওলানা আব্দুল হালিম।

তিনি বলেন, “জোটসঙ্গীদের ত্যাগ ও নিষ্ঠার মূল্যায়ন করবে জামায়াত। সেজন্য ১২টি আসনের মধ্যে জোটের শরিক এনসিপি, জাগপা এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে তিনটি আসন দেওয়া হয়েছে। জামায়াত ৯টি আসন নেবে।”

জামায়াত সূত্রে জানা গেছে, চূড়ান্ত তালিকায় থাকা জামায়াতের ৯ নারী হলেন—মহিলা জামায়াত সেক্রেটারি নুরুন্নিসা সিদ্দিকা, সহকারী সেক্রেটারি মারজিয়া বেগম, মানবসম্পদ ও আইন বিভাগের সম্পাদক অ্যাডভোকেট সাবিকুন নাহার মুন্নি, নাজমুন্নাহার নিলু এবং প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ। অঞ্চলভিত্তিক প্রতিনিধিত্বে চট্টগ্রাম থেকে মেরিনা সুলতানা, সিলেট থেকে মাহফুজা খানম এবং বগুড়া থেকে সাজেদা সামাদ রয়েছেন। এছাড়া জুলাই শহীদ জারিফ আব্দুল্লাহর মা রোকেয়া বেগমকেও জামায়াতের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নের তালিকায় রাখা হয়েছে।

অপরদিকে জামায়াতের ছেড়ে দেওয়া তিনটি আসনে এনসিপি নেত্রী ডা. মাহমুদা মিতু, জাগপা সভাপতি তাসমিয়া প্রধান এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবা করিমকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

এনসিপি জাতীয় সংসদে প্রাপ্ত ছয়টি আসনের বিপরীতে সংরক্ষিত নারী কোটায় একটি আসন পাবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির এক শীর্ষ নেতা বলেন, “ওই আসনে দলের যুগ্ম সদস্য সচিব মনিরা শারমিনের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে।”

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একজন নায়েবে আমির  বলেন, “জামায়াতের সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে অনেক যাচাই-বাছাই ও আলোচনা করা হয়েছে। আমরা কোনও নেতার কোটা রাখিনি। আমির সাহেবের স্ত্রীর নামও আলোচনায় ছিল, কিন্তু বাদ দেওয়া হয়েছে।”

Ads small one

বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস: গাড়ির শহর নয়, মানুষের শহর চাই

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫২ অপরাহ্ণ
বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস: গাড়ির শহর নয়, মানুষের শহর চাই

সাকিবুর রহমান বাবলা

শহর মানুষের জন্য-গাড়ির জন্য নয়। অথচ আধুনিক নগরজীবনের একটি বড় বৈপরীত্য হলো, মানুষের চলাচলের জন্য নির্মিত সড়কের বিপুল অংশ ক্রমেই ব্যক্তিগত গাড়ির দখলে চলে যাচ্ছে। একটি গাড়িতে অনেক সময় একজন বা দুজন মানুষ চলাচল করলেও সেই গাড়ি সড়কের উল্লেখযোগ্য জায়গা দখল করে। ফলাফল-যানজট, জ্বালানি অপচয়, বায়ু ও শব্দদূষণ, কর্মঘণ্টার ক্ষতি এবং নগরজীবনে বাড়তি চাপ। এই বাস্তবতার বিপরীতে সচেতনতা তৈরির একটি প্রতীকী ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস। প্রতি বছর ২২ সেপ্টেম্বর দিবসটি পালিত হয়। ইউরোপে পরিবেশ ও জ্বালানি-সচেতনতার বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্য দিয়ে এর ধারণার বিকাশ ঘটে; ২০০০ সালে ইউরোপীয়ন কমিশন বার্ষিক ‘ইন টাউন উইদাউট মাই কার’ কর্মসূচির মাধ্যমে এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রচারণার রূপ দেয়। বর্তমানে এটি ইউরোপীয়ন মোবিলিটি সপ্তাহের ১৬–২২ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচির সমাপনী ‘কার-ফ্রি ডে’ হিসেবে পালিত হয়।

গাড়িমুক্ত দিবসের অর্থ এই নয় যে আধুনিক সমাজে সব গাড়ি নিষিদ্ধ করে দিতে হবে। এর মূল দর্শন হলোÑব্যক্তিগত গাড়িনির্ভরতা কমানো এবং মানুষের সামনে বিকল্প, নিরাপদ ও কার্যকর চলাচলের ব্যবস্থা তুলে ধরা। হাঁটা, সাইকেল, রিকশা, বাস, মেট্রোরেল, ট্রেনসহ গণপরিবহন ও সক্রিয় যাতায়াতের মাধ্যমকে অগ্রাধিকার দেওয়াই এই উদ্যোগের কেন্দ্রীয় বার্তা। ইউরোপীয়ন কমিশনের ‘ইউরোপিয়ান মোবিলিটি উইক’-ও আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে গণপরিবহন, হাঁটা, সাইক্লিং ও অন্যান্য পরিচ্ছন্ন পরিবহনব্যবস্থাকে উৎসাহিত করে।

 

বাংলাদেশেও দিবসটির একটি দীর্ঘ ধারাবাহিকতা রয়েছে। ২০০৬ সালে বেসরকারি উদ্যোগে দেশে প্রথমবার বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস পালনের তথ্য পাওয়া যায়। ২০১৬ সাল থেকে ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে দিবসটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে আসছে।

ঢাকার যানজটের জন্য শুধু ব্যক্তিগত গাড়িকে এককভাবে দায়ী করা যায় না; অপর্যাপ্ত গণপরিবহন, রাস্তার সীমাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অবৈধ দখল ও পার্কিং, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নির্মাণকাজ এবং যানবাহনের সমন্বয়হীনতাও এর জন্য দায়ী। বিশ্বব্যাংকও ঢাকার যানজটকে অবকাঠামো ও গণপরিবহনের ঘাটতির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেছে। তবে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নগর পরিবহন ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। ২০০৬ সালের এক ঢাকাকেন্দ্রিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, শহরের মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ বাসিন্দা গাড়ি ব্যবহার করলেও মিরপুর রোডের প্রায় ৬০ শতাংশ জায়গা গাড়ি দখল করে রাখতÑযা ব্যক্তিগত গাড়ির জায়গা ব্যবহারের অসমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র।

পরিবহন খাত জলবায়ু পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আইইএ-এর হিসাবে, ২০২৪ সালে সড়ক পরিবহন খাতের কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন ৬ গিগাটনের কিছু বেশি ছিল এবং এর ৬০ শতাংশের বেশি এসেছে যাত্রীবাহী গাড়ি ও ভ্যান থেকে।

ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো শুধু যানজটের বিষয় নয়; এটি জ্বালানি দক্ষতা ও জলবায়ু নীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। আইইএ-এর হিসাবে পরিবহন খাত বিশ্বব্যাপী মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে গণপরিবহন ও সাইক্লিংয়ের মতো অধিক দক্ষ পরিবহনব্যবস্থা জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াতে পারে।

গাড়ির নির্গমনে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পাশাপাশি নাইট্রোজেন অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও সূক্ষ্ম কণাসহ বিভিন্ন দূষক থাকতে পারে। যানবাহনের ধরন, জ্বালানির মান, ইঞ্জিনের অবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং যানজটের পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্গমনের মাত্রাও পরিবর্তিত হয়। ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের গবেষণাতেও যান চলাচল ও নির্মাণকাজ-প্রবণ এলাকায় পিএম২.৫-এর উচ্চমাত্রার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবন পরিবহনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু একই সঙ্গে পরিবহন খাত দেশের জ্বালানি ব্যবহারের একটি বড় অংশের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৬৩ শতাংশ পেট্রোলিয়াম পণ্যের সঙ্গে পরিবহন খাতের সম্পর্ক রয়েছে এবং দেশের মোট নির্গমনের প্রায় ১৫ শতাংশ পরিবহন খাত থেকে আসে।

এ কারণে ব্যক্তিগত গাড়ির অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। যানজটে দীর্ঘ সময় গাড়ি চলাচল বা ইঞ্জিন চালু রেখে দাঁড়িয়ে থাকলে একই দূরত্ব অতিক্রম না করেও জ্বালানি খরচ হয়। ফলে যানজট কমানো মানে শুধু সময় বাঁচানো নয়Ñজ্বালানি সাশ্রয়ও।
বাংলাদেশের বায়ুদূষণের স্বাস্থ্যগত মূল্যও অত্যন্ত বড়। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে বায়ুদূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত কারণে ১ লাখ ৫৯ হাজারের বেশি অকালমৃত্যু এবং ২৫০ কোটির বেশি অসুস্থতার দিন ছিল; সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য ব্যয়ের অর্থনৈতিক মূল্য জিডিপির ৮.৩ শতাংশের সমপরিমাণ বলে অনুমান করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবল গাড়ির কারণে নয়Ñবায়ুদূষণের সামগ্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বোঝায়।

তবে এই দিবসে পুরো দেশের সব ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক যানবাহন একদিন বন্ধ করে দিলে সেটিকে নিঃশর্তভাবে ইতিবাচক বলা যাবে না। অ্যাম্বুলেন্স, অগ্নিনির্বাপণ, জরুরি চিকিৎসা, খাদ্য ও পণ্য সরবরাহ, আইনশৃঙ্খলা, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ প্রয়োজনসম্পন্ন মানুষের চলাচলসহ অপরিহার্য সেবার জন্য যানবাহন প্রয়োজন। তাই বাস্তবসম্মত গাড়িমুক্ত কর্মসূচিতে জরুরি ও প্রয়োজনীয় চলাচলের জন্য সুস্পষ্ট ব্যতিক্রম এবং পর্যাপ্ত বিকল্প পরিবহন থাকতে হবে। এর দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব হলো মানুষের আচরণ ও নগর পরিবহন নীতিতে পরিবর্তনের পথ তৈরি করা।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে যানবাহনের নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, যানবাহন পরিদর্শন ও বৈদ্যুতিক গণপরিবহনের দিকে এগোচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রকল্পে ঢাকায় ৪০০টি শূন্য-নির্গমন বৈদ্যুতিক বাস চালুর উদ্যোগ, যানবাহন পরিদর্শন কেন্দ্র সম্প্রসারণ এবং নির্গমন পরীক্ষার ব্যবস্থা উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ দেখায় যে সমাধান শুধু গাড়ি কমানো নয়; পরিবহনব্যবস্থাকে পরিচ্ছন্ন, দক্ষ ও জনবান্ধব করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

নাগরিকের দায়িত্বের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও নগর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব আরও বড়। মানুষকে শুধু ‘গাড়ি ব্যবহার করবেন না’ বললেই হবে না; তাকে নিরাপদ, সাশ্রয়ী, সময়নিষ্ঠ ও মর্যাদাপূর্ণ বিকল্প দিতে হবে। কারণ ভালো গণপরিবহন ছাড়া গাড়িনির্ভরতা কমানো কঠিন।

বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই গাড়িবিরোধিতা নয়Ñঅতিরিক্ত গাড়িনির্ভরতার বিরুদ্ধে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নগরদর্শন। ব্যক্তিগত গাড়ি প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু একটি শহরের পরিবহনব্যবস্থা যদি এমন হয় যে অল্পসংখ্যক মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ির সুবিধার জন্য বিপুলসংখ্যক মানুষকে যানজট, দূষণ ও সময়ের ক্ষতি সহ্য করতে হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।

একটি বাসে বেশি মানুষ, একটি সাইকেলে শূন্য জ্বালানি, একটি হাঁটার পথে কোনো পার্কিংয়ের প্রয়োজন নেইÑএই সরল সত্যের মধ্যেই টেকসই নগরপরিকল্পনার একটি বড় দর্শন নিহিত। বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস সেই দর্শনকে বছরে একদিন দৃশ্যমান করে। কিন্তু প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন ২২ সেপ্টেম্বরের প্রতীকী বার্তা বছরের বাকি ৩৬৪ দিনেও নগর পরিকল্পনা, পরিবহননীতি এবং নাগরিক আচরণে প্রতিফলিত হবে।

শহরের সড়ক যত বেশি মানুষের জন্য উন্মুক্ত হবে, শহর তত বেশি বসবাসযোগ্য হবে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত গাড়ি কমানো নয় শুধুÑলক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি শহর গড়ে তোলা, যেখানে মানুষের চলাচল গাড়ির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

খোলা কলাম/ শেষ চিরকুটে স্তব্ধ মরিয়ম

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৪৫ অপরাহ্ণ
খোলা কলাম/ শেষ চিরকুটে স্তব্ধ মরিয়ম

মোহাম্মদ মুজাহিদ

কিছু মৃত্যু মানুষকে কাঁদায়, কিছু মৃত্যু মানুষকে ভাবায়। আবার কিছু মৃত্যু এমন কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে সমাজের আয়নায় নিজেদেরও একবার দেখে নিতে হয়। রাজধানীর ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাটে ১৯ বছরের মরিয়ম খাতুনের নিথর দেহ উদ্ধারের ঘটনা তেমনই এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচিত এই তরুণীর মৃত্যু এরই মধ্যে জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মরিয়মের কক্ষ থেকে একাধিক হাতে লেখা চিরকুট উদ্ধারের খবর প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসব লেখায় ভালোবাসা, বিশ্বাসভঙ্গ, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও মানসিক যন্ত্রণার কথা উঠে আসার দাবি করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো একজন ১৯ বছরের তরুণী কী এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিলেন, যার শেষ প্রান্তে গিয়ে তাঁর জীবন থেমে গেল? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনো একটি চিরকুটে নেই। হয়তো আছে বহু দিনের জমে থাকা অভিমান, না-বলা কথা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, একাকিত্ব কিংবা এমন কোনো বাস্তবতায় যা এখনো পুরোপুরি আমাদের সামনে আসেনি। মৃত্যুর আগে মানুষ কী লিখে যায়, সেটি কখনো কখনো তাঁর ভেতরের অদৃশ্য পৃথিবীর দরজা খুলে দেয়। কিন্তু একটি চিরকুটকে পুরো ঘটনার চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়াও বিপজ্জনক। কারণ একটি লেখা হয়তো কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তের আবেগ। তার পেছনে থাকতে পারে দীর্ঘদিনের ঘটনা। থাকতে পারে এমন কিছু সম্পর্ক, কথোপকথন কিংবা পরিস্থিতি, যার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

 

মরিয়মের চিরকুট নিয়ে মানুষের আগ্রহ স্বাভাবিক। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো চিরকুটের প্রতিটি শব্দের সত্যতা যাচাই করা, হাতের লেখা ফরেনসিকভাবে পরীক্ষা করা, ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির বক্তব্য যাচাই করা।কারণ মরিয়ম এখন কথা বলতে পারবেন না। তাঁর হয়ে কথা বলবে তাঁর লেখা, তদন্তের আলামত এবং সত্য উদঘাটনের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো। মরিয়মের লেখা বলে যেসব কথা গণমাধ্যমে এসেছে, সেখানে ভালোবাসা ও বিশ্বাসের পাশাপাশি অভিমান ও কষ্টের কথাও আলোচনায় এসেছে। ভালোবাসার সম্পর্ক যখন একজন মানুষের কাছে আশ্রয় হয়ে ওঠে, তখন সেই সম্পর্কেই যদি কোনো কারণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তার অভিঘাতও গভীর হতে পারে। কিন্তু এখানে আবেগের চেয়েও বড় প্রশ্ন কী ঘটেছিল?সম্পর্কের ভেতরে কি কোনো বিরোধ ছিল?

 

মরিয়ম কি কোনো ধরনের চাপের মধ্যে ছিলেন? তিনি কি কারও কাছে নিজের কষ্টের কথা জানিয়েছিলেন? মৃত্যুর আগে তাঁর সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিলেন? ঘটনার আগে তাঁর আচরণে কোনো অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেছিলেন কি কেউ? চিরকুটগুলো কখন, কোথায় এবং কী পরিস্থিতিতে লেখা হয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া একটি তরুণীর মৃত্যুকে শুধু ব্যক্তিগত ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না। গাজী নজরুল ইসলাম একজন সংসদ সদস্য। ফলে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই জনআলোচনায় আসবে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় যেন তদন্তের পথে প্রভাব না ফেলে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

একজন জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনাকে রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত করা যেমন অনুচিত, তেমনি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো অভিযোগকে উপেক্ষা করাও সমানভাবে অনুচিত। আইনের চোখে প্রত্যেকেই জবাবদিহির আওতায়। অভিযোগ সত্য না মিথ্যা সেটি নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আদালত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা সংবাদ শিরোনাম নয়। ইতোমধ্যে মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা ও গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে মামলায় ওঠা অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াতেই তার সত্যতা নির্ধারিত হবে। মরিয়মের বয়স মাত্র ১৯ এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি ভাবায়। মাত্র ১৯ বছর বয়স। এই বয়সে একজন তরুণীর সামনে থাকার কথা ভবিষ্যতের স্বপ্ন। পড়াশোনা, পরিবার, ভালোবাসা, নিজের পরিচয় তৈরি করা, জীবনের কত কিছুই তো তখনো বাকি থাকে। কিন্তু মরিয়মের জীবনের সেই সম্ভাবনাগুলো আজ থেমে গেছে।

 

তাঁর মৃত্যু নিয়ে আমরা হয়তো কয়েক দিন আলোচনা করব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট হবে। নানা মত, নানা মন্তব্য, নানা ব্যাখ্যা আসবে। তারপর হয়তো নতুন কোনো ঘটনা এসে এই ঘটনাটিকে আড়াল করে দেবে। কিন্তু একটি পরিবারে শোক থেকে যাবে। একজন মায়ের বুক খালি থাকবে। একজন বাবার চোখে প্রশ্ন থাকবে। স্বজনদের মনে থেকে যাবে কেন? এই কেন এর উত্তরই সবচেয়ে জরুরি। শেষ চিরকুট কি সত্যিই শেষ কথা? মরিয়মের ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া চিরকুটগুলো নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নানা তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। কোথাও ভালোবাসার কথা, কোথাও অভিমান, কোথাও বিশ্বাসভঙ্গের বেদনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে গেলে চলবে না।

 

চিরকুটের বক্তব্যের ব্যাখ্যা আর মৃত্যুর আইনি কারণ এক বিষয় নয়। চিরকুটে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটি তদন্তের সূত্র হতে পারে। নিজে থেকেই অপরাধের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। আবার চিরকুটে কোনো ব্যক্তির নাম না থাকলেও সেটি তদন্তের বাইরে রাখা যায় না। তাই চিরকুটকে কেন্দ্র করে আবেগ নয় প্রমাণের ভিত্তিতে এগোতে হবে। মরিয়মের মৃত্যু আমাদের সমাজের জন্যও একটি আয়না। আমরা কি আমাদের প্রিয় মানুষটির নীরব কষ্ট বুঝতে পারি? একজন মানুষ যখন বারবার বলে আমি ভালো নেই, তখন আমরা কি সত্যিই শুনি? কেউ যখন অভিমান করে দূরে সরে যায়, তখন আমরা কি তাকে সময় দিই? কেউ যখন সম্পর্কের ভেতরে নিজেকে একা মনে করে, তখন তার পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ কি থাকে? নাকি আমরা তখনও ভাবি এগুলো পারিবারিক ব্যাপার, সময় গেলে ঠিক হয়ে যাবে?

 

অনেক সময় মানুষ মৃত্যুর আগে সরাসরি সাহায্য চায় না। তার আচরণ, কথাবার্তা, লেখা কিংবা নীরবতার মধ্যেই হয়তো সংকেত থাকে। সেই সংকেতগুলো বুঝতে না পারার দায় শুধু একটি পরিবারের নয় সমাজেরও। মরিয়মের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা মন্তব্য, অভিযোগ ও ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়ছে। কেউ কাউকে দায়ী করছেন, কেউ আবার পুরো ঘটনাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছেন। কিন্তু আমরা যদি সত্যিই মরিয়মের প্রতি ন্যায়বিচার চাই, তাহলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত তথ্য ও অনুমানকে আলাদা করা। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা তদন্তে আসুক। আলামত থাকলে তা পরীক্ষা করা হোক। চিরকুট থাকলে তার ফরেনসিক পরীক্ষা হোক।

 

সিসিটিভি ফুটেজ থাকলে তা দেখা হোক। কললিস্ট ও যোগাযোগের তথ্য প্রয়োজন হলে যাচাই করা হোক। ঘটনার আগে ও পরে কারা কোথায় ছিলেন তা তদন্তে স্পষ্ট হোক। পরিবার, স্বজন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া হোক এবং সবশেষে যে সত্য বেরিয়ে আসে, সেটিই সামনে আসুক। আমাদের দেশে অনেক মৃত্যু সময়ের সঙ্গে সংবাদপত্রের পুরোনো পাতায় হারিয়ে যায়। কিন্তু প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে একটি গল্প থাকে। মরিয়মের গল্পও হয়তো কোনো একটি পরিবারের গল্প নয়। এটি হতে পারে সম্পর্কের ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্য, ভালোবাসার নামে প্রত্যাশা, মানসিক চাপ, সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক জটিলতা এবং তরুণ প্রজন্মের একাকিত্ব নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবার সুযোগ।

 

তবে এসব বিশ্লেষণের আগে একটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া জরুরি মরিয়মের সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল? শেষ কথা মরিয়ম আজ নেই। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া চিরকুটগুলো যেন নীরবে প্রশ্ন করছে আমার সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল? এই প্রশ্নের উত্তর কোনো রাজনৈতিক স্লোগানে নেই। কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টেও নেই। কারও ব্যক্তিগত ধারণাতেও নেই। উত্তর আছে তদন্তে। উত্তর আছে প্রমাণে। উত্তর আছে সত্য উদঘাটনে।

 

মরিয়মের মৃত্যু নিয়ে কারও বিরুদ্ধে আগেভাগে রায় দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার কোনো প্রভাবশালী পরিচয়ের আড়ালে সত্য চাপা পড়ুক সেটিও কাম্য নয়। একজন ১৯ বছরের তরুণীর মৃত্যুর সত্য জানতে চাওয়া কোনো পক্ষ নেওয়া নয় এটি ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক দাবি। শেষ চিরকুটে যদি মরিয়মের কোনো আর্তনাদ থেকে থাকে, সেই আর্তনাদ যেন তদন্তের টেবিলে হারিয়ে না যায়। মরিয়ম আর কথা বলতে পারবেন না এখন তাঁর হয়ে কথা বলুক সত্য।

(এটা সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব মত)।

 

বাবা, আমি বাসায় যাব/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:০৬ অপরাহ্ণ
বাবা, আমি বাসায় যাব/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

‘বাবা, আমি বাসায় যাব।’ সাত বছরের শিশু অনুশ্রী দাসের এই শেষ কথাটি এখন শুধু একটি পরিবারের শোকের স্মৃতি নয়; এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ডেঙ্গু মোকাবিলা এবং শিশুদের চিকিৎসাসেবার বাস্তবতা নিয়ে বড় একটি প্রশ্নও ছুড়ে দেয়। আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে থাকা একটি শিশু যখন বাবাকে দেখে বাড়ি ফেরার কথা বলে, তখন সেই কথার মধ্যে থাকে শিশুর নিরাপত্তার আকাক্সক্ষা, পরিবারের প্রতি নির্ভরতা এবং অসুস্থতার গভীর অসহায়তা।

 

চট্টগ্রামের পহাড়তলীর রেলওয়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী অনুশ্রী ছিল সুবল চন্দ্র দাস ও লিপি দম্পতির দুই সন্তানের ছোট। গত ১৪ সেপ্টেম্বর জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর পরীক্ষায় তার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। শুরুতে পরিস্থিতি খুব খারাপ মনে হয়নি। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সে দুর্বল হয়ে পড়ে, খাওয়া-দাওয়া কমে যায়। এরপর দ্রুত অবনতি। প্লাটিলেট নেমে আসে ২৩ হাজার ৫০০-তে। আক্রান্ত হয় লিভার ও কিডনি। শেষ পর্যন্ত লাইফ সাপোর্টেও রাখা হয় তাকে। কিন্তু চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে শনিবার বিকেলে চলে যায় সাত বছরের শিশুটি।

 

অনুশ্রীর মৃত্যু আমাদের আবার মনে করিয়ে দিলÑডেঙ্গু শুধু একটি মৌসুমি জ্বর নয়। এটি এমন একটি রোগ, যা শিশুদের ক্ষেত্রে খুব দ্রুত জটিল আকার নিতে পারে। তাই জ্বর হলেই আতঙ্কিত হওয়ার যেমন প্রয়োজন নেই, তেমনি ‘সাধারণ জ্বর’ ভেবে অবহেলা করারও সুযোগ নেই। বিশেষ করে শিশুর খাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, পেটের সমস্যা, বমি, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব কিংবা অন্য কোনো সতর্কসংকেত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

 

অনুশ্রীর পরিবারের সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতাগুলোর একটি ছিল আইসিইউ বেড খোঁজা। মেয়ের অবস্থা খারাপ হওয়ার পর বাবা চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে যোগাযোগ করেছেন। একাধিক হাসপাতালে খোঁজ করেও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে শিশু আইসিইউ বেড পাননি বলে জানিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় অনুশ্রীকে। এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে। একটি শিশুর অবস্থা যখন দ্রুত অবনতির দিকে যায়, তখন চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন হয় সময়ের। আর সেই সময় যদি পরিবারের সদস্যদের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে আইসিইউ বেড খুঁজতে ছুটতে হয়, তাহলে সংকট আরও গভীর হয়ে ওঠে।

 

চিকিৎসাব্যবস্থায় শুধু হাসপাতাল থাকা যথেষ্ট নয়; সংকটাপন্ন রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় বেড, প্রশিক্ষিত জনবল, শিশুদের নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও থাকতে হয়। অনুশ্রীর গল্পের আরেকটি দিক আমাদের ভাবায়। মেয়ের অসুস্থতার সময় বাবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবার কাছে প্রার্থনা চেয়েছেন। মুসলিম বন্ধুদের মসজিদে গিয়ে দোয়া করার অনুরোধ করেছেন। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছে চেয়েছেন দোয়া ও আশীর্বাদ।

 

একটি শিশুকে বাঁচানোর আকুতিতে তখন ধর্মীয় পরিচয়ের কোনো দেয়াল ছিল না। ছিল শুধু একজন বাবার অসহায় আবেদনÑআমার সন্তানকে বাঁচতে দিন।এই মানবিক দৃশ্যটি আমাদের সমাজের জন্যও একটি শিক্ষা। রোগের সামনে মানুষ আগে মানুষ। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা শিশুর কোনো ধর্মীয় পরিচয় চিকিৎসার প্রয়োজনকে আলাদা করে না। ডেঙ্গুর মশাও ধর্ম দেখে কামড়ায় না। তাই জনস্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্বও কোনো একক ব্যক্তি, পরিবার বা সম্প্রদায়ের নয়; এটি সবার। অনুশ্রীর সপ্তম জন্মদিনও খুব বেশি দূরের ঘটনা নয়। গত ২ আগস্ট পরিবারের সঙ্গে জন্মদিন পালন করেছিল সে। বাবা তাকে বলেছিলেন নিজের ‘বেঁচে থাকার প্রেরণা’।

 

মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে সেই সন্তানকে নিজের হাতে শেষ বিদায়ের জন্য সাজাতে হয়েছে বাবাকে। জীবনের এই নির্মম পরিণতি কোনো পরিবারের জন্যই কাম্য নয়। ডেঙ্গু মোকাবিলায় তাই শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা বাড়ালেই হবে না। রোগের উৎস নিয়ন্ত্রণ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বৃষ্টির পানি জমে থাকা বন্ধ করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে স্কুল, পরিবার ও স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে ডেঙ্গুর সতর্কসংকেত সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। জ্বর কমে গেলেই যে বিপদ কেটে গেছেÑএমন ধারণা ভুল হতে পারে।

 

ডেঙ্গুর রোগীর শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন দ্রুত নজরে রাখা প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ ব্যবহার না করা এবং পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের বিষয়েও সতর্ক থাকা জরুরি। তবে সব দায় পরিবারের ওপর চাপিয়ে দিলেই রাষ্ট্র ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। একটি শিশুর বাবা যদি সংকটময় সময়ে একাধিক হাসপাতালে ফোন করে আইসিইউ বেড খুঁজতে বাধ্য হন, তাহলে আমাদের স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে শিশুদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা সুবিধার প্রাপ্যতা, হাসপাতালগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং জরুরি বেডের তথ্য দ্রুত পাওয়ার ব্যবস্থা কতটা কার্যকরÑএগুলো পর্যালোচনা করা দরকার।

 

অনুশ্রীর মৃত্যু হয়তো আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। তার বাবা-মায়ের শূন্যতা কোনো শব্দে পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু একটি শিশুর মৃত্যু যদি আমাদের ব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে সাহায্য করে, তাহলে সেই শোক থেকে অন্তত ভবিষ্যতের জন্য কিছু শিক্ষা নেওয়া সম্ভব। ‘বাবা, আমি বাসায় যাব’Ñএই চারটি শব্দ যেন শুধু অনুশ্রীর শেষ কথা হয়ে না থাকে। এটি যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, হাসপাতালের বিছানায় প্রতিটি শিশু কারও সন্তান, কারও স্বপ্ন, কারও বেঁচে থাকার প্রেরণা।

 

একটি শিশুকে বাঁচাতে শুধু চিকিৎসকের হাত নয়, দরকার প্রস্তুত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, দ্রুত চিকিৎসা, পর্যাপ্ত আইসিইউ এবং কার্যকর জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ। অনুশ্রীর বাবা মেয়েকে বাঁচাতে পারেননিÑএ কথা একজন বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনা। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, অনুশ্রীর মতো আর কোনো শিশুকে যেন একইভাবে হারাতে না হয়, সে জন্য আমরা কী করছি? শোকের পর সবচেয়ে জরুরি কাজ তাই কান্না থামানো নয়; ব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি ছিল, তা খুঁজে বের করা। কারণ একটি শিশুর শেষ আকুতি যদি আমাদের বিবেককে নাড়া না দেয়, তাহলে আর কী আমাদের নাড়া দেবে? ‘বাবা, আমি বাসায় যাব’Ñঅনুশ্রীর এই কথাই হোক ডেঙ্গু মোকাবিলায় আমাদের নতুন করে ভাবার ডাক।

লেখক: সচ্চিদানন্দ দে সদয়