জীবনানন্দের ‘বনলতা’র খোঁজে
তারিক ইসলাম
‘সব পাখি ঘরে আসে- সব নদী- ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;/ থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’
বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে তীব্র এক আবেশের নাম ‘বনলতা সেন’। মাত্র বারো লাইনের একটি কবিতা, অথচ আট দশকেরও বেশি সময় ধরে বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে তা বুনে চলেছে এক চিরন্তন রূপকথা। জীবনানন্দ দাশের কাব্যে হাজার বছর ধরে পথ হাঁটা ক্লান্ত এক পথিকের একমাত্র আশ্রয় হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন নাটোরের এই নারী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কে এই বনলতা সেন? তিনি কি কবির কল্পনার কোনো মানসকন্যা, নাকি রক্ত-মাংসের কোনো বাস্তব চরিত্র? নাকি রূপক অর্থে জীবনানন্দের পরম প্রশান্তির রূপায়ণ?
সাহিত্য গবেষকদের মধ্যে বনলতা সেনের পরিচয় নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই। কবির ব্যক্তিগত খাতা ও ডায়েরি থেকে জানা যায়, তাঁর জীবনে বেশ কয়েকজন নারীর উপস্থিতি ছিল। কেউ বলেন, বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের দিনগুলোতে কবির পরিচিত কোনো তরুণীই পরবর্তীতে নাটোরের প্রেক্ষাপটে রূপ পেয়েছেন। আবার অনেক গবেষকের মতে, শোভনা বা ‘ওয়াই’ ছদ্মনামের যে নারীর উল্লেখ কবির ডায়েরিতে বারবার এসেছে, তিনিই হয়তো এই বনলতা। তবে তথ্য-উপাত্তের চেয়ে বড় সত্য হলো, জীবনানন্দ তাঁকে নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক বা ঐতিহাসিক পরিচয়ে আটকে রাখেননি।
বরিশাল থেকে কলকাতা কিংবা দিল্লির নির্জন জীবনপথে কবি বহন করেছেন এক গভীর একাকিত্ব। পৃথিবীর কোলাহল, সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগর ঘুরে আসা পথশ্রান্তি শেষে তিনি যে আশ্রয়ের খোঁজ করেছিলেন, বনলতা সেন মূলত সেই শান্তির প্রতীক। নাটোর শহর যেমন ঐতিহাসিক সমৃদ্ধি ও নীরবতার জন্য পরিচিত, তেমনি ‘নাটোরের বনলতা’ যেন এক চিরন্তনী রূপক, যা স্পর্শ করলে মুছে যায় সমস্ত জরা ও ক্ষয়।
আজকের দ্রুতগতি, প্রযুক্তি নির্ভর ও মানসিক অস্থিরতার যুগে দাঁড়িয়ে আমরা প্রত্যেকেই এক একজন শ্রান্ত পথিক। চারপাশের অনিশ্চয়তা, প্রতিযোগিতা ও নিঃসঙ্গতার মাঝে আমরাও যেন প্রতিনিয়ত একটু নির্ভেজাল প্রশান্তি খুঁজে ফিরি। তাই একুশ শতকে এসেও বনলতা সেনের আবেদন সামান্যতমও কমেনি। তিনি কেবল ১৯৪২ সালে প্রকাশিত একটি কবিতার চরিত্র নন; বরং আধুনিক মানুষের বুকে লুকিয়ে থাকা গভীর এক স্বস্তির আকুলতা।
জীবনানন্দ দাশ তাঁর এই কালজয়ী সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আমাদের মনে করিয়ে দেন, জীবনের সব হিসেব-নিকেশ ও লেনদেন শেষে মানুষের আসল প্রাপ্তিটুকু থাকে ভালোবাসায় এবং আত্মিক শান্তিতে। বনলতার চোখের সেই ‘পাখির নীড়ের মতো’ ছায়া আজও আমাদের ডেকে যায়। তাই বনলতা সেনের খোঁজে কবির যে যাত্রা, তা আসলে একাকী কোনো কবিপুরুষের নয়-তা আমাদের সবারই নিজের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক চিরন্তন প্রয়াস।
লেখক: তারিক ইসলাম, সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।






