ডেঙ্গুতে মৃত্যু-আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছেই দায় কার?
এম.এম হায়দার আলী
বৃষ্টির জলে শহর ভাসে,
নর্দমাতে মশার বাসে।
কালো জলে জন্ম নেয় যে ভয়, সেই ভয়ের নাম, ডেঙ্গু আজময়। হাসপাতালের শয্যায় কাতর প্রাণ, তবু কি জাগবে নগরীর বিবেক-বোধের গান? এবার আসি মূল প্রসঙ্গে, প্রত্যেক বছর বর্ষা মৌসুমের ন্যায় এবারও দেশে আবারও ভয়াবহ ভাবে দেখা দিয়েছে ডেঙ্গুর প্রভাব। সম্প্রতি একটি জনগুরুত্বপূর্ণ পত্রিকার পাতায় ডেঙ্গুর ক্রমবর্ধমান প্রাদুর্ভাবের খবর চোখে পড়তেই নতুন করে সামনে এসেছে জনস্বাস্থ্যের এই বড় সংকট।
বর্ষা এলেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে, এ যেন আমাদের চেনা বাস্তবতা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিবছর একই চিত্র দেখা দেওয়ার পরও ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা কোথায়? খুলনা মহানগরীতে পরিস্থিতি ইতোমধ্যে উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গত এক সপ্তাহে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পাঁচজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা এবং হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। শুধু গত বুধবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ১৩৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে খুলনার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১০৩ জন। শুধু খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ৩৫ জন।
বর্তমানে সেখানে ১২৩ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ডেঙ্গুর এই ভয়াবহতার মধ্যেই সাতক্ষীরাতেও দেখা দিয়েছে উদ্বেগের ছাপ। সাতক্ষীরার তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাসিরুল জুলফিকার খোকন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে সাতক্ষীরা ব্লিস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পরিচিত একজন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তির ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, ডেঙ্গু এখন কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা পেশার মানুষের রোগ নয়, এর ঝুঁকি সবার জন্যই সমান।
অথচ সাতক্ষীরা শহরের চিত্র যেন ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে আমাদের প্রস্তুতির উল্টো গল্প বলছে। শহরের বিভিন্ন ড্রেনে মাসের পর মাস জমে আছে পচা, কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি। কোথাও জমেছে আবর্জনা, কোথাও বন্ধ হয়ে আছে পানি নিষ্কাশনের পথ। এসব স্থানে এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলেও কার্যকর ও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কিংবা মশক নিধন কার্যক্রম চোখে পড়ছে না,এমন অভিযোগ রয়েছে নগরবাসীর।
একদিকে হাসপাতালের বিছানায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর কষ্ট, অন্যদিকে শহরের ড্রেনে মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল, এই দুই চিত্র পাশাপাশি রাখলে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি রোগের চিকিৎসা করছি, নাকি রোগ তৈরির পরিবেশকেই বাঁচিয়ে রাখছি? ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু মশক নিধন অভিযান বা সচেতনতামূলক প্রচার যথেষ্ট নয়। শহরের ড্রেন, নালা, জলাবদ্ধ স্থান ও ময়লা-আবর্জনার স্তূপ নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। কোথায় এডিস মশার প্রজনন হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ একটি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগেই যদি তার আশপাশের প্রজননস্থল ধ্বংস করা যায়, তাহলে হয়তো পরবর্তী একজন মানুষকে হাসপাতালে যেতে হবে না।
প্রতিবছর বর্ষা আসে, আর সঙ্গে আসে ডেঙ্গুর ভয়। সংবাদপত্রের পাতায় উঠে আসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। হাসপাতাল গুলোতে বাড়ে রোগীর চাপ। কিছুদিন আলোচনা হয়, অভিযান চলে, তারপর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে সবকিছু আবার আগের জায়গায় ফিরে যায়। এভাবে কি একটি জনস্বাস্থ্য সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব? সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, শহরের ড্রেনে মাসের পর মাস পচা পানি জমে থাকলে এডিস মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ কতটা সফল হবে?
জনগুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কার্যকর, নিয়মিত ও দৃশ্যমান উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। ডেঙ্গু শুধু একটি রোগ নয়,এটি আমাদের নগর ব্যবস্থাপনা ও জনসচেতনতারও পরীক্ষা। হাসপাতালের শয্যা বাড়ানোর পাশাপাশি যদি মশার জন্মস্থান গুলো ধ্বংস করা না যায়, তাহলে আক্রান্তের সংখ্যা কমানো কঠিন হবে।
তাই এখনই প্রশ্ন তোলা জরুরি, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মানুষ হাসপাতালে যাবে, নাকি ডেঙ্গুর জন্মস্থানেই পৌঁছে যাবে প্রতিরোধের হাত? সময় এসেছে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে শুধু হাসপাতালে নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিচু এলাকায় বসবাসকারী এবং শহরের প্রতিটি ড্রেন ও জমে থাকা পানির বিরুদ্ধেও কার্যকর যুদ্ধ শুরু করার।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট






