প্রসঙ্গ: পেটের তাগিদে উপকূলীয় জেলেদের জীবনবাজি
সম্পাদকীয়
সুন্দরবন সংলগ্ন খোলপাটুয়া ও চুনা নদীতে হঠাৎ কুমিরের উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং একই সময়ে পেটের তাগিদে উপকূলীয় জেলেদের জীবনবাজি রেখে নদীতে নামার চিত্রটি আমাদের পুরো উপকূলীয় জীবিকার করুণ বাস্তবতা ফুটিয়ে তোলে। স্থানীয় বন বিভাগ ইতোমধ্যে কুমির অবমুক্তকরণ ও প্রজনন পরিবেশ জোরদার করার ফলে সুন্দরবনঘেঁষা নদী-খালে কুমিরের সংখ্যা বেড়েছে। এটি প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষার জন্য ইতিবাচক হলেও, এর অন্য পাশে রয়েছে হাজার হাজার ভূমিহীন ও দরিদ্র জেলের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। সুন্দরবনের প্রাণ প্রকৃতি রক্ষায় যেমন কুমিরের নিরাপদ বিচরণ অপরিহার্য, তেমনি সেই বনের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা প্রান্তিক মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তাও কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
স্থানীয় প্রশাসন বা বন বিভাগের পক্ষ থেকে জেলেদের পানিতে না নামার পরামর্শ বা সতর্কবার্তাই যে সংকটের একমাত্র সমাধান নয়, তা খুব স্পষ্ট। একজন জেলে যখন জানেন নদীতে নামলে কুমিরের মুখে পড়ার ভয় আছে, তবুও যদি পরিবারকে না খাইয়ে রাখা থেকে বাঁচতে তাঁকেই নামতে হয়, তবে বুঝতে হবে সমস্যাটি সতর্কতার অভাব নয়Ñসংকটটি মূলত বিকল্প উপার্জনের অভাব। সতর্কবার্তা তাদের জীবন বাঁচাতে পারে না, যতক্ষণ না তাদের পেটে খাবারের যোগান থাকে। পানিতে জাল টেনে চিংড়ির পোনা ধরা অনেক উপকূলীয় পরিবারের জন্য একমাত্র অবলম্বন। ফলে জীবনঝুঁকির কথা জেনেও তারা কুমির অধ্যুষিত খোলপাটুয়া ও চুনা নদীর গভীরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনÑএই দুটির মাঝে বৈপরীত্য তৈরি হতে দেওয়া যাবে না। বন বিভাগ যদি বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সফল নীতি গ্রহণ করতে পারে, তবে স্থানীয় সরকারের সহযোগিতায় জেলেদের পুনর্বাসনের পথও নিশ্চিত করতে হবে। শুধু মাইকিং বা নিষেধাজ্ঞা না চাপিয়ে, জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরশীল এসব ঝুঁকিপূর্ণ পেশার জেলেদের জন্য দ্রুত বিকল্প কর্মসংস্থান ও কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। উপকূলীয় অঞ্চলে সহজ শর্তে ক্ষুদ্রঋণ, গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগি খামার কিংবা বিকল্প কৃষি উদ্যোগে জেলে পরিবারগুলোকে যুক্ত করতে হবে।
একই সঙ্গে যেসব নির্দিষ্ট নদী পয়েন্টে কুমিরের তীব্র বিচরণ রয়েছে, সেখানে স্পষ্ট সতর্কতা চিহ্নের পাশাপাশি জেলেদের পোনা আহরণের নিরাপদ বিকল্প পদ্ধতি বা নির্দিষ্ট নিরাপদ অঞ্চল নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সুন্দরবন যেমন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ, তেমনি উপকূলের এই মানুষেরাও সুন্দরবনের অতন্দ্র প্রহরী। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ সয়ে টিকে থাকা এই মানুষগুলোর জীবনকে শুধু ‘ঝুঁকি’ শব্দটির ওপর ছেড়ে না দিয়ে, টেকসই বিকল্প জীবিকা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা প্রদানই এখন সময়ের দাবি।






