দুই প্রজন্মের পাঠশালা
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
শিক্ষা শুধু পাঠ্যবই শেষ করা কিংবা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার নাম নয়। শিক্ষা মানুষের ভেতরে বিবেক, মূল্যবোধ, আত্মবিশ্বাস ও মানবিকতা তৈরি করে। আর সেই মানুষ তৈরির কাজে শিক্ষকের ভূমিকা অনন্য। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষক–শিক্ষার্থী সম্পর্কেও এসেছে বড় পরিবর্তন। সেই পরিবর্তন আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, সেটিই এখন ভাবার বিষয়।
একজন প্রবীণ শিক্ষক রফিকুল স্যার। বয়স আশির কোঠায়। শরীর নুয়ে গেছে, কিন্তু চোখে এখনো শিক্ষকের সেই মমতা। একদিন তাঁর পুরোনো ছাত্র মিজান দেখা করতে এলেন। মিজান এখন নিজেও একজন কলেজ শিক্ষক। মিজানকে দেখে বৃদ্ধ শিক্ষকের চোখ ভিজে উঠল। কথায় কথায় ফিরে এল বহু বছর আগের স্মৃতি। মিজান তখন পড়াশোনায় দুর্বল ছিলেন। রফিকুল স্যার শুধু শ্রেণিকক্ষে পড়িয়ে দায়িত্ব শেষ করেননি। বাড়িতে গিয়ে পড়িয়েছেন, প্রয়োজন হলে খাতা-কলম কিনে দিয়েছেন, অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেছেন। অর্থাৎ শিক্ষক তখন শুধু শিক্ষক ছিলেন নাÑছিলেন অভিভাবক, পরামর্শদাতা এবং কখনো কখনো পরিবারের একজন আপনজন।
কিন্তু সময় বদলেছে। মিজানের ছেলে তানভীর এখন কলেজে পড়ে। দাদার মতো শ্রদ্ধেয় সেই শিক্ষককে দেখে সে-ও শিক্ষকতা সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা জানায়। তার কথায় উঠে আসে নতুন বাস্তবতাÑশিক্ষকরা পড়ান, কিন্তু অনেক সময় শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষার্থীর জন্য সময় থাকে না। কোনো প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে কখনো বলা হয়, ‘কোচিংয়ে এসো।’ এই ছোট্ট কথোপকথনের মধ্যেই বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় পরিবর্তনের ছবি ফুটে ওঠে।
একসময় শিক্ষক–শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ভিত্তি ছিল শ্রদ্ধা, স্নেহ, বিশ্বাস ও দায়বদ্ধতা। এখন অনেক ক্ষেত্রে সেখানে যুক্ত হয়েছে ফলাফল, প্রতিযোগিতা, নম্বর, ভর্তি পরীক্ষা এবং আর্থিক লেনদেনের বাস্তবতা। তবে অতীতকে পুরোপুরি আদর্শ আর বর্তমানকে পুরোপুরি খারাপ হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে যাওয়া যাবে না। আগের সময়ের শিক্ষাব্যবস্থারও সীমাবদ্ধতা ছিল। আজকের শিক্ষকরা আগের চেয়ে অনেক বেশি চাপের মধ্যে কাজ করেন। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, পাঠ্যসূচি বিস্তৃত হয়েছে, মূল্যায়ন ব্যবস্থা জটিল হয়েছে, প্রশাসনিক দায়িত্ব বেড়েছে।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনও শিক্ষকদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়Ñশিক্ষক যদি শিক্ষার্থীর জন্য সময়ই না পান, তাহলে শিক্ষা কতটা পূর্ণতা পাবে? বাংলাদেশে শিক্ষার সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো অবকাঠামোর ঘাটতি নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা কেন দেওয়া হচ্ছে, সেই দর্শনের সংকট। আমরা শিক্ষাকে ক্রমেই পরীক্ষাকেন্দ্রিক করে ফেলছি। শিশুর হাতে বই দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সামনে ফলাফল ও প্রতিযোগিতার চাপও তুলে দিচ্ছি।
শিক্ষার্থীর প্রশ্ন করার আনন্দ, নতুন কিছু আবিষ্কারের আগ্রহ কিংবা ভুল থেকে শেখার সুযোগের চেয়ে নম্বর বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে শিখছেÑ‘কত নম্বর পেলাম?’ কিন্তু সে হয়তো জানতে পারছে নাÑ‘আমি কী শিখলাম?’ এখানেই শিক্ষকতার প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। একজন শিক্ষক শুধু গণিতের সূত্র, বিজ্ঞানের সংজ্ঞা, ইতিহাসের সাল কিংবা ব্যাকরণের নিয়ম শেখাবেনÑএতেই তাঁর দায়িত্ব শেষ নয়। তিনি শেখাবেন কীভাবে ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করতে হয়। কীভাবে ভিন্নমতকে সম্মান করতে হয়। কীভাবে অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতে হয়। কীভাবে নিজের সাফল্যের পাশাপাশি অন্যের প্রয়োজনকেও গুরুত্ব দিতে হয়। একটি ভালো শিক্ষকতা একজন শিক্ষার্থীর পুরো জীবনকে বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশে এমন শিক্ষকের অভাব নেই।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিক্ষক সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সময় দেন। দরিদ্র শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ান, ঝরে পড়া ঠেকাতে পরিবারকে বোঝান, মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেন। তাঁদের অবদান কোনো পরীক্ষার ফলাফলের তালিকায় ধরা পড়ে না। অথচ দেশের মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা অপরিসীম। সমস্যা হচ্ছে, এই মানবিক শিক্ষকতার জায়গাটি অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। একজন শিক্ষককে যদি কেবল পাঠ্যসূচি শেষ করা এবং পরীক্ষার ফল ভালো করার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই ফলাফলকেন্দ্রিক হয়ে উঠবেন। কিন্তু শিক্ষকের মূল্যায়নে যদি শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ, নৈতিক শিক্ষা, সৃজনশীলতা, সহমর্মিতা এবং শ্রেণিকক্ষের পরিবেশও গুরুত্ব পায়, তাহলে শিক্ষকতার পরিধিও বদলাবে। এখানে অভিভাবকদেরও দায়িত্ব রয়েছে।
অনেক অভিভাবক সন্তানের সাফল্যকে শুধু পরীক্ষার নম্বর দিয়ে বিচার করেন। সন্তান প্রথম হয়েছে কি না, জিপিএ কত, ভর্তি পরীক্ষায় কোথায় সুযোগ পেয়েছেÑএসব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু সন্তান কেমন মানুষ হচ্ছে, তার মধ্যে সহমর্মিতা আছে কি না, সে অন্যকে সম্মান করতে শেখেছে কি নাÑএসব প্রশ্ন অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। শিক্ষার উদ্দেশ্য যদি মানুষ তৈরি করা হয়, তাহলে পরিবার ও বিদ্যালয়কে একই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোচিংনির্ভরতা। অতিরিক্ত কোচিং যখন শ্রেণিকক্ষের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তখন শিক্ষার মূল প্রতিষ্ঠানই দুর্বল হয়ে পড়ে। কোচিং থাকবে কি থাকবে নাÑএই বিতর্কের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কেন একজন শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষের বাইরে অতিরিক্ত নির্ভরতার প্রয়োজন অনুভব করছে? শ্রেণিকক্ষে যদি পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা, প্রশ্ন করার সুযোগ এবং ব্যক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে অতিরিক্ত নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। তবে এর জন্য শিক্ষকদের ওপর শুধু দায় চাপালে চলবে না। তাঁদের প্রয়োজন পর্যাপ্ত সময়, প্রশিক্ষণ, সম্মানজনক কর্মপরিবেশ এবং বাস্তবসম্মত দায়িত্ববণ্টন।
আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তিও বড় পরিবর্তন এনেছে। একজন শিক্ষার্থী এখন কয়েক সেকেন্ডে বিশ্বের নানা প্রান্তের তথ্য পেতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল কনটেন্টÑসবই শিক্ষার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। কিন্তু তথ্য পাওয়া আর জ্ঞান অর্জন এক বিষয় নয়। ইন্টারনেট তথ্য দিতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উত্তর দিতে পারে; কিন্তু কোন তথ্য সত্য, কোনটি মিথ্যা, কোনটি নৈতিক এবং কোন সিদ্ধান্তটি মানবিকÑসেটি বোঝানোর ক্ষেত্রে একজন ভালো শিক্ষকের প্রয়োজন এখনো অটুট। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষককে প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে না; বরং প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে আরও মানবিক শিক্ষক হতে হবে। দুই প্রজন্মের এই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি এখানেই। রফিকুল স্যার তাঁর ছাত্র মিজানকে শুধু পড়াননি; তিনি তাঁর মধ্যে একজন শিক্ষক হওয়ার বীজ বপন করেছিলেন। মিজান যদি তাঁর নিজের ছাত্রদের মধ্যে সেই একই মানবিকতা ছড়িয়ে দিতে পারেন, তাহলে একটি প্রজন্মের শিক্ষকতা পরবর্তী প্রজন্মে উত্তরাধিকার হিসেবে পৌঁছে যাবে। এটাই শিক্ষার সবচেয়ে সুন্দর উত্তরাধিকার।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ভালো শিক্ষা মানে শুধু ভালো ফল নয়; ভালো মানুষ তৈরি করাও ভালো শিক্ষার মাপকাঠি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের পুরোনো রূপ হয়তো আর হুবহু ফিরবে না। সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, শিক্ষার পদ্ধতি বদলেছে। কিন্তু সম্পর্কের মূল ভিত্তিÑশ্রদ্ধা, বিশ্বাস, স্নেহ ও দায়িত্ববোধÑকেন হারিয়ে যাবে? একজন শিক্ষক যদি তাঁর শিক্ষার্থীর নাম মনে রাখেন, তার সমস্যার কথা শোনেন, ভুল করলে শুধরে দেন এবং সবচেয়ে কঠিন সময়ে বলেনÑ‘তুমি পারবে’, তাহলে সেই শিক্ষার্থী হয়তো বহু বছর পরও সেই শিক্ষককে ভুলবে না।
রফিকুল স্যারের মতো শিক্ষকরা তাই শুধু অতীতের স্মৃতি নন; তাঁরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে একটি প্রশ্নও রেখে যানÑআমরা কি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে পারছি, যেখানে একজন শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, জীবনের জন্যও শিক্ষকের কাছে যেতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে।কারণ পাঠশালা বদলাবে, বই বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, শিক্ষার পদ্ধতি বদলাবে। কিন্তু একজন শিক্ষকের হৃদয় থেকে শিক্ষার্থীর হৃদয়ে যে আলো পৌঁছে যায়, তার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার ভবিষ্যৎ আধুনিক হোক, কিন্তু তার হৃদয় যেন মানবিক থাকে।
লেখক: সংবাদকর্মী









