পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর ভাগ্য খুলল ‘বাঘ বিধবা’ মাহফুজার
oppo_2
পীযুষ বাউলিয়া পিন্টু, মুন্সিগঞ্জ (শ্যামনগর): দেশব্যাপী জ্বালানি তেলের সংকটের সময় গত এপ্রিল মাসে শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ ডেলমা ফিলিং স্টেশনের সামনে দীর্ঘ লাইনে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে দেখা যেত। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে মোটরসাইকেল চালকদের অপেক্ষা চলত দিনের পর দিন। প্রখর রোদে তৃষ্ণার্ত মানুষ আর রাতভর অপেক্ষায় থাকা ক্লান্ত চালকদের কাছে পানি, চা, কেক, ডিম ও কলা বিক্রির দৃশ্য উঠে আসে স্থানীয় সংবাদ প্রতিনিধির প্রতিবেদনে। জীবন-জীবিকার তাগিদে ‘বাঘ বিধবা’ মাহফুজা খাতুনের চায়ের কাপ সে সময় শত শত মানুষের ভরসা হয়ে ওঠে।
২৮ এপ্রিল স্থানীয় সংবাদপত্রে ‘তেলের লাইনেই সেই বাঘ বিধবা মাহফুজার শেষ ভরসা’ শিরোনামে খবর প্রকাশিত হলে তা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্টের (আইসিডি) নির্বাহী পরিচালক আশিকুজ্জামানের নজরে আসে। তিনি মাহফুজা খাতুনকে স্বাবলম্বী করার উদ্দেশ্যে একটি ছোট দোকান করে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। জেসিআই ঢাকা সাউথের উদ্যোগে এবং আইসিডির বাস্তবায়নে দোকানটি স্থাপন করে দেওয়া হয়। সম্প্রতি মাহফুজার দোকানে আসবাবপত্রসহ প্রয়োজনীয় মালামাল কিনে দেওয়া হয়। পাশাপাশি আগস্টের শেষ সপ্তাহে স্থানীয় নওয়াবেকী বাজার থেকে দোকানটির জন্য মুদি মালামাল সংগ্রহ করে দেওয়া হয়েছে।
পিছনে ফিরে তাকালে জানা যায়, ২০০২ সালের ১ জুন সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান মাহফুজার স্বামী সাত্তার। দুই সন্তানকে নিয়ে কুলকিনারাহীন অবস্থায় পড়েন তিনি। একসময় সামাজিক আড়াল ভেঙে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে সুন্দরবনের নদীতে নেমে পড়েন। তপ্ত রোদে জাল টেনে, দিনমজুরের কাজ করে কোনোমতে পার করেছেন দীর্ঘ দুই দশক। সম্প্রতি মুন্সিগঞ্জ বাজারে স্বামীর ভিটায় ঠাঁই মিললেও অভাব তাঁর পিছু ছাড়েনি।
এপ্রিল মাসে জ্বালানি সংকটের সময় প্রশাসন ও সুন্দরবন প্রেসক্লাবের সিদ্ধান্তে নির্দিষ্ট দিনে ইউনিয়নের জন্য তেল বরাদ্দ করা হচ্ছিল। ক্রম অনুসরণ করতে চালকেরা আগের রাত থেকেই ভিড় করতেন ফিলিং স্টেশনের সামনে। নির্জন ওই এলাকায় ক্ষুধা ও তৃষ্ণা মেটানোর সুযোগ ছিল না। সেই প্রয়োজনকেই নিজের বেঁচে থাকার অবলম্বন করে নেন মাহফুজা।
ছেলে মাহফুজুর রহমানকে সাথে নিয়ে ফিলিং স্টেশনের সামনে পলিথিনের একটি অস্থায়ী ছাউনি টানান তিনি। গভীর রাত থেকে শুরু করে পরদিন রাত ১০টা পর্যন্ত চলে তাঁর বেচাকেনা। চা, বিস্কুট, কলা, কেক ও সিদ্ধ ডিম বিক্রি করে প্রতিদিন দুই থেকে তিন হাজার টাকা আয় হতে থাকে। এভাবেই শুরু হয় তাঁর নতুন পথচলা।
বাঘ বিধবা মাহফুজা বলেন, “প্রচ- গরমে মানুষের সবচেয়ে বেশি চাহিদা পানি আর স্যালাইনের। পাশের বাড়িতে গেলেও কেউ পানি দিতে চায় না। কিন্তু আমার দোকানে পর্যাপ্ত মালামাল তোলার মতো টাকা ছিল না। মানুষের কাছে ধার নিয়ে কোনোমতে কিছু রসদ জোগাড় করেছিলাম।”
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘সিডিও’র নির্বাহী পরিচালক গাজী আল ইমরান মনে করেন, বাঘ বিধবা মাহফুজার এই লড়াই অত্যন্ত সাহসিকতার ও মানবিক। তিনি জানান, দুঃসময়ে এই সংগ্রামী নারী যেভাবে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং বর্তমানে তাঁর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা অত্যন্ত আনন্দদায়ক।
মথুরাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোহাদেচ্ছুর রহমান বলেন, সমাজে বাঘ বিধবাদের অবহেলা ও অপবাদ সহ্য করে চলতে হয়। তারা সামাজিকভাবে মর্যাদাহীন অবস্থায় থাকে। আত্মকর্মসংস্থানমূলক এমন উদ্যোগে সহায়তার মাধ্যমে সমাজে এই শ্রেণির মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত বলে মনে করেন তিনি। সরকারি সহায়তা পেলে দোকানটি আরও বড় করে জীবিকা নির্বাহ সহজ হতো বলে তিনি মত দেন।
মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম পল্টু জানান, মাহফুজাকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তিনি যেন আরও ভালোভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন, সে বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি। একই সঙ্গে আইসিডি যেভাবে স্থানীয় বাঘ বিধবাদের কল্যাণে কাজ করছে, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আগামীতে এ ধরনের মানবিক কাজে পাশে থাকার আগ্রহ জানান তিনি।









