রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩
রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রসঙ্গ: উপকূলের নিরাপত্তায় আধুনিক সতর্কীকরণ কেন্দ্র এখন সময়ের দাবি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ১০ মে, ২০২৬, ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ
প্রসঙ্গ: উপকূলের নিরাপত্তায় আধুনিক সতর্কীকরণ কেন্দ্র এখন সময়ের দাবি

সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের উপকূলীয় জনপদ মানেই প্রকৃতির সঙ্গে এক নিরন্তর সংগ্রামের নাম। বিশেষ করে সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্রতি বছরই ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও বেড়িবাঁধ ধসের আতঙ্কে দিন কাটায়। বৈশাখের কালো মেঘ কিংবা বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নি¤œচাপের খবর এলেই উপকূলের মানুষের মনে ফিরে আসে আইলা, সিডর কিংবা আম্পানের ভয়াবহ স্মৃতি। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এই দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে এখনো গড়ে ওঠেনি কোনো আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র—এটি নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় অবহেলার একটি বড় উদাহরণ।

প্রযুক্তির এই যুগে দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কবার্তা সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। একটি নির্ভরযোগ্য সতর্কীকরণ ব্যবস্থা অনেক সময় হাজারো মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পারে। কিন্তু আশাশুনিসহ উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনো সেই ব্যবস্থার ঘাটতি স্পষ্ট। স্থানীয় মানুষদের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, তারা শুধু দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করছেন না; তারা লড়াই করছেন অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ও তথ্যের অপ্রতুলতার সঙ্গেও। আইলার সময় সময়মতো খবর না পাওয়ার কারণে অসংখ্য মানুষ বিপদের মুখে পড়েছিল। অথচ সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকেও আমরা যথেষ্ট শিক্ষা নিতে পারিনি।

বর্তমানে স্থানীয় আবহাওয়া অফিসগুলো সীমিত তথ্য সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় দপ্তরে পাঠায়। এরপর বিশ্লেষণ শেষে সতর্কবার্তা আসে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সময়ক্ষেপণ ঘটে, যা দুর্যোগের সময় প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে উপকূলের নদী ও সাগরসংলগ্ন অঞ্চলে কয়েক ঘণ্টার বিলম্বও ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে সক্ষম। ফলে আশাশুনি অঞ্চলে একটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র স্থাপন এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের জীবন রক্ষার জন্য অপরিহার্য অবকাঠামো।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকার ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও বেড়িবাঁধের দুর্বলতা উপকূলবাসীর জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, আশাশুনি ও শ্যামনগর অঞ্চলের বহু কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বড় ধরনের জলোচ্ছ্বাস হলে এসব বাঁধ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই কেবল আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ বা বাঁধ সংস্কার করলেই চলবে না; প্রয়োজন দুর্যোগের আগাম ও নির্ভুল তথ্য দ্রুত মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সুনাম রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় মৃত্যুহার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু সেই সফলতা ধরে রাখতে হলে উপকূলীয় অঞ্চলে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। স্যাটেলাইটনির্ভর তথ্য, স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, সাইরেন নেটওয়ার্ক, মোবাইলভিত্তিক সতর্কবার্তা এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত তথ্য প্রচারের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ও আবহাওয়া অধিদপ্তরের উচিত দ্রুত আশাশুনি ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলকে ঘিরে একটি আধুনিক ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবক দল ও সাধারণ মানুষকে দুর্যোগ প্রস্তুতি বিষয়ে আরও সচেতন করতে হবে।

উপকূলের মানুষ বারবার প্রমাণ করেছেন, তারা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়তে জানেন। কিন্তু তাদের সেই লড়াইকে আরও নিরাপদ ও কার্যকর করতে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য। দুর্যোগের আগাম বার্তা যদি সময়মতো পৌঁছে যায়, তাহলে অসংখ্য প্রাণ ও সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব। তাই আশাশুনিসহ উপকূলীয় অঞ্চলে আধুনিক ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র স্থাপন এখন শুধু একটি দাবি নয়Ñএটি সময়ের অপরিহার্য প্রয়োজন।

Ads small one

মা: জীবনের চিরন্তন আশ্রয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ১০ মে, ২০২৬, ৭:০৫ অপরাহ্ণ
মা: জীবনের চিরন্তন আশ্রয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

বিশ্ব মাতৃ দিবস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ছবি, শুভেচ্ছা আর আবেগঘন কথায় ভরে উঠছে চারপাশ। কেউ মায়ের সঙ্গে পুরোনো ছবি প্রকাশ করবেন, কেউ লিখবেন স্মৃতির কথা, কেউবা হারিয়ে যাওয়া মায়ের জন্য অশ্রুসিক্ত হবেন নীরবে। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকে যায়Ñমাকে স্মরণ করার জন্য কি সত্যিই একটি বিশেষ দিনের প্রয়োজন আছে? যে মানুষটি আমাদের জন্মের আগেই আমাদের জন্য স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন, যার নিঃস্বার্থ ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের পুরো জীবন, তাঁকে কি কেবল একটি দিনের ভেতর সীমাবদ্ধ রাখা যায়? ‘মা’ শব্দটি পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট অথচ সবচেয়ে গভীর শব্দগুলোর একটি।

 

এই একটি শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে আছে নিরাপত্তা, ভালোবাসা, ত্যাগ, ক্ষমা, মায়া, শাসন, প্রার্থনা আর আশ্রয়ের এক বিশাল পৃথিবী। মানুষের জীবনে প্রথম যে মুখটি দেখা হয়, প্রথম যে কণ্ঠস্বর শোনা হয়, প্রথম যে স্পর্শে নিরাপত্তা অনুভূত হয়Ñসেটি মায়ের। পৃথিবীর সব সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে বদলে যেতে পারে, কিন্তু মায়ের ভালোবাসা বদলায় না। সন্তান ব্যর্থ হোক কিংবা সফল, সুন্দর হোক কিংবা অসুন্দর, ধনী হোক কিংবা দরিদ্রÑমায়ের চোখে সন্তানের পরিচয় একটাই, সে তাঁর সন্তান।সভ্যতার ইতিহাসে যত বড় মানুষ এসেছেন, তাঁদের জীবনের ভেতরেও মায়ের অবদান গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

 

পৃথিবীর বহু দার্শনিক, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক কিংবা রাষ্ট্রনায়ক তাঁদের সাফল্যের পেছনে মায়ের প্রেরণার কথা স্বীকার করেছেন। কারণ একজন মা কেবল সন্তান জন্ম দেন না; তিনি একজন মানুষ গড়ে তোলেন। একটি সমাজ, একটি রাষ্ট্র কিংবা একটি সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণ হয় মায়ের হাত ধরেই। আমাদের সমাজে মায়ের ভূমিকা নিয়ে কথা বলা হয় অনেক, কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই ভিন্ন। মা যেন একই সঙ্গে পরিবার, সংসার, সন্তান, সমাজÑসবকিছুর ভার বহনকারী এক নীরব যোদ্ধা। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পরিবারের সবার প্রয়োজন পূরণ করতে করতে নিজের ইচ্ছা, স্বপ্ন কিংবা ক্লান্তির কথা তিনি ভুলে যান। অথচ সেই মায়ের কাজের কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই, নেই ছুটি, নেই বেতন, নেই অবসরকালীন সুবিধা।

 

সংসারের প্রতিটি কাজকে আমরা ‘দায়িত্ব’ বলে ধরে নিই, কিন্তু সেটি যে কত বড় শ্রম, তা খুব কম মানুষই উপলব্ধি করেন। গ্রামের এক কৃষক পরিবারের মায়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি শুধু রান্নাঘরের মানুষ নন। কখনো মাঠে কাজ করছেন, কখনো গরু-ছাগল সামলাচ্ছেন, কখনো সন্তানকে স্কুলে পাঠাচ্ছেন, আবার কখনো সংসারের হিসাব কষছেন। শহরের কর্মজীবী মায়েদের জীবনও কম কঠিন নয়। অফিসের দায়িত্ব পালন শেষে বাসায় ফিরে আবার সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয়।

 

তাঁদের জন্য আলাদা কোনো বিশ্রামের জায়গা সমাজ তৈরি করেনি।সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, আমাদের সমাজে মায়ের ত্যাগকে এতটাই ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে দেখা হয় যে সেটি আর আলাদা করে মূল্যায়িত হয় না। একজন বাবা সংসারের জন্য অর্থ উপার্জন করলে তাঁকে সম্মান জানানো হয়, কিন্তু একজন মা সারাজীবন সংসার ও সন্তান সামলালেও সেটিকে ‘স্বাভাবিক দায়িত্ব’ হিসেবে দেখা হয়। এই মানসিকতা বদলানো জরুরি। কারণ পরিবার টিকিয়ে রাখার পেছনে মায়ের অবদান অর্থনৈতিক হিসাবের বাইরেও বিশাল সামাজিক মূল্য বহন করে। মাতৃত্ব কখনোই কেবল জৈবিক সম্পর্ক নয়; এটি একটি গভীর মানবিক অনুভূতি।

 

পৃথিবীতে এমন বহু নারী আছেন, যাঁরা জন্ম না দিয়েও মায়ের মতো ভালোবাসা দিয়ে সন্তান মানুষ করেন। এতিমখানার শিশুর প্রতি একজন সেবিকার মমতা, পথশিশুর মাথায় হাত রাখা একজন নারীর স্নেহ, কিংবা একজন শিক্ষিকার ছাত্রদের প্রতি যতœÑএসবও মাতৃত্বের বিস্তৃত রূপ। তাই মাতৃত্ব আসলে মানবতার সবচেয়ে কোমল ও মহৎ প্রকাশ। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবার ও সমাজের কাঠামোও বদলাচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার বাড়ছে, ব্যস্ততা বাড়ছে, প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়ছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের ভেতর এক ধরনের মানসিক দূরত্বও তৈরি হচ্ছে। এখন অনেক সন্তান বৃদ্ধ বাবা-মাকে সময় দিতে পারেন না।

 

কেউ বিদেশে, কেউ কর্মব্যস্ততায়, কেউ নিজের জীবনের প্রতিযোগিতায় এতটাই ব্যস্ত যে মায়ের সঙ্গে বসে দুটো কথা বলার সময়টুকুও বের করতে পারেন না। বৃদ্ধাশ্রমের দিকে তাকালে এই বাস্তবতা আরও নির্মম হয়ে ওঠে। সেখানে অনেক মা আছেন, যাঁরা একসময় সন্তানের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, অথচ বার্ধক্যে এসে তাঁরা একাকিত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সন্তানকে বড় করতে গিয়ে যে মা নিজের খাবার, ঘুম, স্বপ্ন সবকিছু বিসর্জন দিয়েছিলেন, শেষ বয়সে সেই সন্তানদের কাছেই তিনি হয়ে উঠছেন ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’।

 

আধুনিক সভ্যতার এই নির্মমতা আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো। অথচ একজন মায়ের চাহিদা খুব সামান্য। তিনি সন্তানের কাছে বড় কোনো সম্পদ চান না; চান একটু সময়, একটু খোঁজখবর, একটু সম্মান আর ভালোবাসা। মায়ের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হলো সন্তানের আন্তরিকতা। মাতৃ দিবস আমাদের শুধু শুভেচ্ছা জানানোর দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনারও দিন। আমরা কি সত্যিই আমাদের মায়েদের যথাযথ সম্মান দিচ্ছি?

 

তাঁদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভাবছি? তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছি? নাকি শুধু সামাজিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই দায়িত্ব শেষ করছি? আমাদের সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা, পারিবারিক নির্যাতন, অবহেলা কিংবা মানসিক চাপের বড় একটি অংশের শিকার হন মায়েরা। অনেক মা সংসারের শান্তির জন্য বছরের পর বছর নির্যাতন সহ্য করেন। কেউ সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের কষ্ট চেপে রাখেন। আবার কেউ অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হওয়ার কারণে নিজের অধিকার আদায় করতে পারেন না। ফলে মাতৃত্বকে সম্মান করার কথা বললেও বাস্তবে অনেক মা নিরাপত্তাহীন ও অবমূল্যায়িত জীবন কাটান।

মায়ের স্বাস্থ্য নিয়েও আমাদের উদাসীনতা স্পষ্ট। গ্রামীণ অঞ্চলে এখনো বহু মা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পান না। গর্ভকালীন সেবা, পুষ্টি, নিরাপদ প্রসব কিংবা প্রসব-পরবর্তী পরিচর্যার অভাবে অসংখ্য নারী ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। দরিদ্র পরিবারের মায়েরা প্রায়ই নিজের চিকিৎসার আগে সন্তানের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেন। ফলে দীর্ঘদিন অবহেলায় তাঁদের শারীরিক জটিলতা বাড়তে থাকে। শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

 

একজন মা দিনের পর দিন মানসিক চাপ, উদ্বেগ, ক্লান্তি কিংবা অবমূল্যায়নের শিকার হলেও তা নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়। সমাজ যেন ধরে নেয়Ñমা সব সহ্য করবেন। কিন্তু একজন মায়েরও ক্লান্তি আছে, স্বপ্ন আছে, ভেঙে পড়া আছে, কান্না আছে। তাঁকেও মানসিক সমর্থন প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের আবেগ প্রকাশের সহজ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কিন্তু অনেক সময় সেখানে মায়ের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ বাস্তব দায়িত্ববোধের জায়গাকে আড়াল করে দেয়।

 

ফেসবুকে মায়ের ছবি দিয়ে আবেগঘন স্ট্যাটাস দেওয়া সহজ, কিন্তু অসুস্থ মায়ের পাশে সময় নিয়ে বসা অনেকের পক্ষেই কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ভালোবাসা যেন অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতার চেয়ে প্রদর্শনীতে বেশি সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাতেও মায়ের প্রতি সম্মান ও পারিবারিক মূল্যবোধের বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব পাওয়া দরকার। একটি শিশু যখন ছোটবেলা থেকেই পরিবারের শ্রম, ত্যাগ ও দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা পাবে, তখন সে বড় হয়ে আরও মানবিক নাগরিক হবে। কারণ মা শুধু একজন ব্যক্তির মা নন; তিনি একটি প্রজন্মের নির্মাতা।

 

আজকের পৃথিবীতে যখন যুদ্ধ, সহিংসতা, লোভ ও বিভাজন বাড়ছে, তখন মাতৃত্বের মানবিক শিক্ষা আরও বেশি প্রয়োজন। একজন মা তাঁর সন্তানকে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ক্ষমার শিক্ষা দেন। এই মূল্যবোধগুলোই একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের ভিত্তি। বিশ্বের বহু দেশে কর্মজীবী মায়েদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি, শিশুসেবা সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মক্ষেত্রে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও কিছু অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু তা এখনো পর্যাপ্ত নয়।

 

বিশেষ করে বেসরকারি খাত ও অনানুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে কর্মরত মায়েদের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া গৃহিণীদের শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য নিয়েও এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনা হচ্ছে। কারণ একজন গৃহিণী প্রতিদিন যে পরিমাণ কাজ করেন, তা অর্থনৈতিকভাবে হিসাব করলে বিশাল মূল্য দাঁড়ায়। অথচ সেই শ্রমকে এখনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। মাতৃ দিবস তাই শুধু আবেগের নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও দায়িত্ববোধের প্রশ্নও।

 

একজন মাকে সম্মান জানানো মানে কেবল ফুল দেওয়া নয়; তাঁর অধিকার, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত জীবনেও মায়ের প্রতি আচরণ নিয়ে ভাবা দরকার। শেষ কবে আমরা মায়ের সঙ্গে নির্ভার হয়ে গল্প করেছি? শেষ কবে তাঁর ক্লান্তির কথা জানতে চেয়েছি? শেষ কবে তাঁকে বলেছিÑ‘মা, তোমাকে ভালোবাসি’? অনেক সময় আমরা ধরে নিই, মা তো আছেনই। কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই বুঝতে হয়, মা আর নেই। তখন হাজার অনুশোচনাও আর কোনো কাজে আসে না।মা হারানোর বেদনা পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর শূন্যতাগুলোর একটি। যে মানুষটি নিঃস্বার্থভাবে সারাজীবন পাশে ছিলেন, তাঁর অনুপস্থিতি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে অনুভূত হয়।

 

তাই মা বেঁচে থাকতে তাঁর মূল্য বোঝা জরুরি। একজন মা কখনো সন্তানের কাছে বড় কিছু প্রত্যাশা করেন না। সন্তানের সামান্য সাফল্যেই তিনি আনন্দিত হন, সামান্য কষ্টেই উদ্বিগ্ন হন। পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ প্রার্থনাগুলো সম্ভবত মায়েদের মুখ থেকেই আসে। আজ মাতৃ দিবসে পৃথিবীর সব মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। সেই মায়ের প্রতিও, যিনি গ্রামে সন্তানকে মানুষ করতে অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন; সেই মায়ের প্রতিও, যিনি শহরে চাকরি ও সংসারের দ্বৈত চাপ সামলাচ্ছেন; সেই মায়ের প্রতিও, যিনি সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য বিদেশে একা সংগ্রাম করছেন; সেই মায়ের প্রতিও, যিনি সন্তানের জন্য নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন।

 

শ্রদ্ধা সেই মায়ের প্রতিও, যিনি সন্তান হারিয়েও বেঁচে থাকার শক্তি খুঁজে নিয়েছেন। শ্রদ্ধা সেই বৃদ্ধ মায়ের প্রতিও, যিনি এখনো সন্তানের ফোনের অপেক্ষায় থাকেন। শ্রদ্ধা সেই একক মায়ের প্রতিও, যিনি একাই পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে লড়ে সন্তান মানুষ করছেন। মাতৃত্বের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। এটি ভালোবাসার সবচেয়ে বিশুদ্ধ রূপ। আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মা শুধু পরিবারের দায়িত্ব বহনকারী মানুষ হবেন না; তিনি হবেন সম্মানিত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক।

 

যেখানে মায়ের ত্যাগকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হবে না; বরং তা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। মাতৃ দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিইÑমাকে ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়, এটি দায়িত্বও। সেই দায়িত্ব শুরু হয় পরিবারের ভেতর থেকে, আচরণ থেকে, সম্মান থেকে, সময় দেওয়া থেকে। প্রতিটি দিন হোক মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানোর দিন। কারণ পৃথিবীতে যতদিন ‘মা’ শব্দটি থাকবে, ততদিন মানবতা বেঁচে থাকবে।

লেখক: সাংবাদিক

 

পাইকগাছায় জামায়াতের আগাম প্রস্তুতি; মেয়র ও চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নাম ঘোষণা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ১০ মে, ২০২৬, ৬:৫৬ অপরাহ্ণ
পাইকগাছায় জামায়াতের আগাম প্রস্তুতি; মেয়র ও চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নাম ঘোষণা

পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি: খুলনার পাইকগাছায় সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে তোড়জোড় শুরু করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা অনেক আগে থেকেই মাঠে ময়দানে কাজ শুরু করেছেন। তবে একমাত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ছাড়া অন্য কোন রাজনৈতিক দল থেকে এখনো দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেনি।

 

ইতোমধ্যে উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান, মেয়র এবং ৯ টি ইউনিয়ন পরিষদের দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দল থেকে নাম ঘোষণার পর নির্বাচনী তৎপরতা বেড়েছে প্রার্থীদের মধ্যে। ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন প্রার্থীরা। তারা একদিকে যেমন নিজ এলাকার দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে সংযোগ বাড়িয়েছেন অন্যদিকে সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা করছেন।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সবার নজর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিকে। সাধারণ মানুষ যেমন একটি সুন্দর নির্বাচনের অপেক্ষায় রয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলো ও নিচ্ছেন ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি। জেলার গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা পাইকগাছা ১০ টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। সরকারি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি এখনো তাদের কোন প্রার্থী ঘোষণা করেনি।

 

তবে দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে ময়দানে কাজ করছেন। নির্বাচন কবে হবে সেটি এখনো নির্ধারণ না হলেও বসে নেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। স্থানীয় সরকারের ৩ টি নির্বাচনের আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে দলটি। দলটির পক্ষ থেকে উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের সকল চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।

 

উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য আলহাজ্ব মাওলানা আমিনুল ইসলাম, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সহ সভাপতি মাওলানা কামাল হোসেন, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে সাবেক উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পৌর মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি শাহানারা খাতুন, পৌরসভার মেয়র প্রার্থী হিসেবে জামায়াত নেতা এডভোকেট মোর্তজা জামান আলমগীর রুলুর নাম ঘোষণা করা হয়েছে।

 

১০ টি ইউনিয়নের মধ্যে হরিঢালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে উপজেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মুফতি মাওলানা আব্দুল হান্নান, কপিলমুনির চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা বুলবুল আহমেদ, দেলুটিতে ইউনিয়ন আমীর গোলাম মোস্তফা, সোলাদানায় উপজেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি হাফেজ মাওলানা নুরে আলম, লস্করে উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা সাঈদুর রহমান, গদাইপুরে ইসলামি ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন, রাড়ুলিতে জেলা জামায়াতের ইউনিট সদস্য সহকারী অধ্যাপক আব্দুল মোমিন সানা, চাঁদখালীতে ইউনিয়ন আমীর মাওলানা আসগর হোসাইন ওরফে জাহাঙ্গীর ও গড়ইখালীতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামায়াত নেতা প্রধান শিক্ষক আনিসুর রহমানের নাম ঘোষণা করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন জেলা জামায়াতের সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা গোলাম সরোয়ার।

 

উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা সাঈদুর রহমান বলেন একমাত্র লতা ইউনিয়ন বাদে উপজেলা, পৌরসভা এবং ৯ টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। প্রার্থীরা সবাই ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে এলাকায় কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা সাঈদুর রহমান।

সাতক্ষীরায় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬ এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ১০ মে, ২০২৬, ৫:৩৭ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬ এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণ

পত্রদূত রিপোর্ট: “ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সাতক্ষীরায় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬ এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়েছে।

 

রবিবার (১০ মে) বিকালে সাতক্ষীরা জেলা স্টেডিয়ামে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ও জেলা প্রশাসন ও জেলা ক্রীড়া অফিস সাতক্ষীরার আয়োজনে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিষ্ণুপদ পাল এর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ্ কাউসার আজিজ।

সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শেখ মঈনুল ইসলাম মঈন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রিপন বিশ্বাস, সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আসাদুজ্জামান, সদর উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত, জেলা তথ্য অফিসার মোঃ জাহারুল ইসলাম, জেলা ক্রীড়া অফিসার মোঃ মাহবুবুর রহমান প্রমুখ।

 

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের ৮ টি ইভেন্টের বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। এ সময় সাতক্ষীরা জেলা ও উপজেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জেলা ক্রীড়া অফিসের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে আগত অতিথি এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। সমগ্র অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাতক্ষীরা জেলা তথ্য অফিসের উচ্চমান সহকারী মোঃ মনিরুজ্জামান।